আশুরা/মহররমের রোজাঃ মুসা (আ.) ও রাসূল (সা.)-এর শুকরিয়া আদায়

মহররম মাস ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস, যার দশম দিন, যা ‘আশুরা’ নামে পরিচিত, বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই দিনটির সাথে জড়িত রয়েছে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঘটনা, যা মুসলিমদের জন্য শুকরিয়া ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি সুযোগ। এই ব্লগ পোস্টে আমরা আশুরার সিয়ামের পটভূমি, এর তাৎপর্য এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার আলোকে এই দিনটির গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করব।
(১) মদিনায় আশুরা/মহররমের রোজার শুরু
যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন, তখন তিনি লক্ষ্য করেন যে মদিনার ইহুদি সম্প্রদায় মহররমের দশম দিনে সিয়াম পালন করে। তিনি তাদের কাছে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন। তারা জানান, এই দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই দিনে আল্লাহ তা’আলা হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে রক্ষা করেন এবং ফেরাউন ও তার সৈন্যদলকে সাগরে ডুবিয়ে দেন। এই ঘটনার শুকরিয়া হিসেবে হযরত মুসা (আ.) এই দিনে সিয়াম পালন করতেন, আর ইহুদিরাও তাঁর অনুসরণে এই দিনে সিয়াম পালন করে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলেন, “আমরা মুসা (আ.)-এর প্রতি তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।” অর্থাৎ, মুসলিম উম্মাহ হিসেবে আমাদের মুসা (আ.)-এর শুকরিয়ার সাথে বেশি সম্পর্ক রয়েছে। তিনি নিজে মহররমের দশম দিনে সিয়াম পালন করেন এবং সাহাবীদেরও এই দিনে সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন। এই ঘটনা থেকেই আশুরার সিয়াম মুসলিমদের জন্য একটি সুন্নত আমল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
(২) আশুরা/মহররমের রোজার তাৎপর্য
আশুরার সিয়াম শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আমল নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও তাঁর অসীম ক্ষমতার স্মরণ। এই দিনে মুসা (আ.)-এর নেতৃত্বে বনি ইসরাইলের মুক্তি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, যা আল্লাহর ন্যায়বিচার ও দয়ার প্রতীক। এই দিনে সিয়াম পালনের মাধ্যমে মুসলিমরা সেই শুকরিয়া আদায় করে, যা মুসা (আ.) করেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আশুরার দিনের সিয়াম সম্পর্কে আমি আশা করি যে, আল্লাহ তা’আলা এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।” (সহীহ মুসলিম)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, আশুরার সিয়ামের ফযিলত অত্যন্ত বেশি।
(৩) ইহুদিদের সাথে পার্থক্য রক্ষা
যখন সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জানতে চান যে, ইহুদিরা এই দিনে সিয়াম পালন করে বলে কি আমাদেরও তা করতে হবে, তখন তিনি ইহুদিদের সাথে পার্থক্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আগামী বছর যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে আমি মহররমের নয় তারিখেও সিয়াম পালন করব।” এর মাধ্যমে তিনি ইহুদিদের অনুকরণ থেকে মুসলিমদের আলাদা করতে চেয়েছেন। তিনি শুধু দশম দিন নয়, বরং নয় ও দশম দিন অথবা দশম ও এগারতম দিন সিয়াম পালনের পরামর্শ দেন।
এই নির্দেশনা মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এটি শুধু ইহুদিদের সাথে পার্থক্য রক্ষার জন্য নয়, বরং মুসলিমদের নিজস্ব পরিচয় ও ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার জন্যও। এই কারণে আলেমরা সুপারিশ করেন যে, আশুরার সিয়াম পালনের সময় নয় ও দশম দিন অথবা দশম ও এগারতম দিন একসাথে সিয়াম পালন করা উত্তম।
(৪) কীভাবে আশুরা/মহররমের রোজা পালন করবেন?
- রোজার নিয়ত করা: সিয়ামের জন্য নিয়ত করা অপরিহার্য। আপনি মনে মনে নিয়ত করতে পারেন, “আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আশুরার সিয়াম পালন করছি।”
- রোজার সময়সূচি: মহররমের দশম দিনের সাথে নয় বা এগারতম দিন সিয়াম পালন করুন। এটি সুন্নতের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করে।
- ইবাদত বৃদ্ধি: এই দিনে বেশি বেশি দুআ, কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির করুন। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
- দান-সদকা: আশুরার দিনে দান-সদকা করা অত্যন্ত ফযিলতপূর্ণ। এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি মাধ্যম।
(৫) আশুরা/মহররমের শিক্ষা
আশুরার সিয়াম শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনার শুকরিয়া নয়, বরং এটি আমাদের জীবনে ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর উপর ভরসার শিক্ষা দেয়। ফেরাউনের মতো অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে মুসা (আ.)-এর বিজয় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর সাহায্য সবসময় সত্যের পক্ষে থাকে। এই দিনে সিয়াম পালনের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি এবং তাঁর রহমতের প্রতি আশাবাদী হই।
মহররমের দশম দিন, আশুরা, মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এটি কেবল একটি সিয়ামের দিন নয়, বরং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, ধৈর্য ও বিশ্বাসের প্রতীক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা অনুযায়ী, আমাদের উচিত এই দিনে সিয়াম পালন করা এবং ইহুদিদের সাথে পার্থক্য রক্ষার জন্য নয় বা এগারতম দিনের সিয়ামও যুক্ত করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে এই ফযিলতপূর্ণ আমলের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভের তৌফিক দান করুন। আমীন।
অনুরোধ!! পোষ্ট ভালো লাগলে প্লিজ উপরের শেয়ার আইকনে ক্লিক করে পোষ্টটি শেয়ার করে দিন।









