কিছু ইসলাম সম্পর্কিত প্রশ্ন ও তার উত্তর

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যার প্রতিটি দিক রয়েছে সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল। তবে ধর্মীয় অনেক বিষয়ে আমাদের মনে নানা প্রশ্ন জাগে — যেমন ঈছালে ছওয়াব, ওছীলা, জিন, কারামত কিংবা মেরাজ সম্পর্কে। এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই এ পোষ্টে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত কিন্তু নির্ভরযোগ্য উত্তর তুলে ধরেছি, যা পাঠকদের ইসলামের গভীর বিষয়গুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ও সঠিক ধারণা দিতে সহায়তা করবে।
১. প্রশ্ন: ঈছালে ছওয়াব কি?
উত্তর:
ঈছালে ছওয়াব কি: “ঈছালে ছওয়াব” অর্থ- ছওয়াব রেছানী বা ছওয়াব পৌঁছানো। মৃত মুসলমানদের জন্য কৃত নামায, রোযা, দান-সদকা, তাসবীহ-তাহলোীল, তিলাওয়াত ইত্যাদি শারীরিক ও আর্থিক ইবাদতের ছওয়াব পৌঁছে থাকে। এক মতে ফরয ইবাদতের দ্বারাও ঈছালে ছওয়াব করা যায়। এতে নিজের যিম্মাদারীও আদায় হবে, মৃতও ছওয়াব পেয়ে যায়।
২. প্রশ্ন: দোয়ার মধ্যে ওছীলা কি?
উত্তর:
দোয়ার মধ্যে ওছীলা কি: দোয়া কবূল হওয়ার জন্য নবীদের বা কোন জীবিত বা মৃত নেককার লোকের ওছীলা দিয়ে কিংবা কোন নেক কাজের ওছীলা দিয়ে দু’আ করা জায়েয বরং তা মোস্তাহাব।
৩. প্রশ্ন: জিন কি?
উত্তর:
জিন কি: আল্লাহ তা’আলা আগুনের তৈরী এক প্রকার জীব সৃষ্টি করেছেন, যারা আমাদের দৃষ্টির অগোচরে, তাদেরকে জিন বলে। তাদের মধ্যে ভাল-মন্দ সবরকম হয়। তাদের সন্তানাদিও হয়। তাদের মধ্যে বেশী প্রসিদ্ধ এবং বড় দুষ্ট হলো ইবলীস অর্থাৎ, শয়তান। জিন মানুষের উপর আছর করতে পারে।
৪. প্রশ্ন: কারামত, কাশফ, এল্হাম বলতে কি বুঝায়?
উত্তর:
বুযুর্গ এবং ওলী আউলিয়াদের দ্বারা আল্লাহ তাআলা যেসব অসাধারণ কাজ দেখিয়ে থাকেন, তাকে বলা হয় কারামত। আর জাগ্রত বা নিদ্রিত অবস্থায় তাঁরা যে সব ভেদের কথা জানতে পারেন বা চোখের অগোচর জিনিসকে দেলের চোখে দেখতে পারেন, তাকে বলা হয় কাশফ ও এলহাম।
বুযুর্গদের কারামত ও কাশফ এলহাম সত্য। মৃত্যুর পরও কোন বুযুর্গের কারামত প্রকাশিত হতে পারে।
কারামত, কাশফ ও এলহাম হয়ে থাকে বুযুর্গ এবং ওলীদের।
৫. প্রশ্ন: বুযুর্গ এবং ওলী কাদের বলে?
উত্তর:
বুযুর্গ এবং ওলী বলা হয় আল্লাহর প্রিয় বান্দাকে। শরীআতের বরখেলাফ করে কেউ আল্লাহর প্রিয় তথা ওলী বা বুযুর্গ হতে পারে না।
অতএব যারা শরী’আতের বরখেলাফ করে যেমন নামায রোযা করে না, গাঁজা, শরাব বা নেশা খায়, বেগানা মেয়েলোককে স্পর্শ করে বা দেখে, গান-বাদ্য করে ইত্যাদি, তারা কখনও বুযুর্গ নয়।
যদি তারা অলৌকিক কিছু দেখায়ও তবুও তা কারামত নয় বরং বুঝতে হবে হয় সেটা যাদু বা কোনরূপ তুকতাক ও ভেল্কিবাজী, কিংবা যে কোন রূপ প্রতারণা। অনেক সময় শয়তান এসব লোকদেরকে গায়েব জগতের অনেক খবর জানিয়ে দেয়। যাতে করে তা শুনে মূর্খ লোকেরা তাদের ভক্ত হয়ে যায় এবং এভাবে তারা বিভ্রান্তির শিকার হয়। এসব দেখে তাদের ধোঁকায় পড়া যাবে না।
- কাশফ এবং এলহামম যদি শরী’আতের মোয়াফেক হয় তাহলোে তা গ্রহণযোগ্য, অন্যথায় তা গ্রহণযোগ্য নয়।
- কোন বুযুর্গ বা পীর সম্বন্ধে এই আকীদা রাখা শির্ক যে, সময় আমাদের অবস্থা জানেন।
- কোন পীর বা বুযুর্গকে দূর দেশ থেকে ডাকা এবং মনে করা যে তিনি জানতে পেরেছেন- এটা শির্ক। কোন পীর বুযুর্গ গায়েব জানেন না, তবে কখনও কোন বিষয়ে তাদের কাশ্ফ এল্হাম হতে পারে, তাও আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল 1
- কোন পীর বুযুর্গের মর্যাদা, চাই সে যতবড় হোক, কোন নবী বা সাহাবী থেকে বেশী বা তাঁদের সমানও হতে পারে না।
৬. প্রশ্ন: মেরাজ কি বা কাকে বলে?
উত্তর:
মেরাজ কি বা কাকে বলে: আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তা’আলা একদা রাত্রে জাগরিত অবস্থায় স্ব-শরীরে মক্কা শরীফ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত নিয়ে যান।
সেখান থেকে সাত আসমানের উপর এবং সেখান থেকেও আরও উপরে যতদূর আল্লাহর ইচ্ছা নিয়ে যান। সেখানে আল্লাহর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথাবার্তা বলেন।
তখনই পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের বিধান দেয়া হয় এবং সেই রাতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার দুনিয়াতে প্রত্যাবর্তন করেন।
একে মেরাজ বলে।
৭. প্রশ্ন: আরশ/কুরছী কি?
উত্তর:
আরশ কুরছী কি: ‘আরশ’ অর্থ চেয়ার বা আসন। আল্লাহ যেমন, তাঁর আরশ এবং কুরছীও তেমনই শানের হয়ে থাকবে। সপ্তম আসমানের উপর আরশ ও কুরছী অবস্থিত।
হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী আরশ ‘কুরছী’ এত বিশাল যে, তা সমগ্র আকাশ ও জমিনকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে।
এখানে উল্লেখ্য যে, আল্লাহ পাক কোন মাখ্লূকের ন্যায় উঠা-বসা করেন না এবং তিনি কোন নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নন।
মাখলূকের কোন কার্যকলাপ ও আচার-আচরণের সাথে আল্লাহর কোন কার্যকলাপ ও আচার-আচরণের তুলনা হয় না। তারপরও তাঁর আরশ কুরছী থাকার কি অর্থ, তা অনুধাবন করা মানব জ্ঞানের উর্ধ্বে। আমাদেরকে শুধু আরশ কুরছী সম্বন্ধে আকীদা বিশ্বাস রাখতে হবে।
৮. প্রশ্ন: আল্লাহর দীদার বলতে কি বুঝায়?
উত্তর:
আল্লাহর দীদার বলতে কি বুঝায়: আল্লাহর দীদার বা আল্লাহকে দেখা সম্বন্ধে ইসলামের আকীদা হলো দুনিয়ায় থেকে জাগ্রত অবস্থায় এই চর্ম চক্ষুর দ্বারা কেউ আল্লাহকে দেখতে পারেনি এবং পারবে না। তবে বেহেশতবাসীগণ বেহেশতে গিয়ে আল্লাহর দীদার (দর্শন) লাভ করবেন।
বেহেশতের অন্যান্য নেয়ামতের তুলনায় এই নেয়ামত (আল্লাহর দীদার) সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট ও উপাদেয় মনে হবে। উল্লেখ্য যে, স্বপ্নে আল্লাহকে দেখা যায়, তবে সেটাকে দুনিয়ার চর্ম চক্ষু দ্বারা দেখা বলা হয় না।
তো বন্ধুরা, ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন ইমানদার ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য। সঠিকভাবে জানা ও মানা ইসলামী জীবনের অপরিহার্য অংশ। এই প্রশ্নোত্তরগুলো আমাদের নানান ভুল ধারণা ও কুসংস্কার দূর করে সঠিক পথে চলার দিকনির্দেশনা দেয়। আশা করি, পোষ্টে আলোচিত বিষয়গুলো পাঠকদের জন্য উপকারী হবে এবং ইসলামী জ্ঞানে আগ্রহী পাঠকেরা আরও গভীরভাবে কোরআন ও সহীহ হাদীস অধ্যয়নে আগ্রহী হবেন — এই কামনায় শেষ করছি।





