কোরবানির যৌক্তিকতা কি? এটা তো পশু হত্যা?

কোরবানির যৌক্তিকতা কি এটা তো পশু হত্যা

কোরবানির ঈদ কি শুধুই পশু হত্যা? নাস্তিক ও সমালোচকদের প্রশ্নের সহজ উত্তর

অনেকেই, বিশেষ করে নাস্তিক বন্ধুরা প্রায়ই বলেন— “তোমরা মুসলমানরা কোরবানির নামে কেন পশু হত্যা করো? এটা তো নিষ্ঠুরতা! তোমরা রক্ত দেখে আনন্দ পাও।”

কথাগুলো শুনলে মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। কিন্তু আবেগের বশে না ভেবে, চলুন একটু ঠান্ডা মাথায় লজিক দিয়ে বিষয়গুলো বুঝি। কোরবানি আসলে কেন এবং এর পেছনের যুক্তিগুলো কী?

এখানে ৭টি সহজ পয়েন্টে উত্তর দেওয়া হলো-

১. আমরা মুসলিমরা কি হত্যা দেখে আনন্দ পাই?

মোটেও না। কোরবানির হাটে যখন আমরা গরু বা ছাগল কিনি, তখন সেগুলোর প্রতি একটা মায়া জন্মে যায়। ঈদের দিন যখন সেই পশুটাকে জবাই দেওয়া হয়, তখন কোনো মুসলমানের মুখে অট্টহাসি দেখবেন না। বরং সবার মনে একটা কষ্ট থাকে, অনেকের চোখ দিয়ে পানিও পড়ে। যারা গান-বাজনা করে বা উল্লাস করে, তারা ইসলাম মেনে সেটা করে না, সেটা তাদের অজ্ঞতা। আমাদের কাছে এটা ‘স্যাক্রিফাইস’ বা ত্যাগ, কোনো উৎসব বা খেলা নয়।

২. সবাই মাংস খান, আর আমরা কুরবানি দিলেই দোষ?

যারা কোরবানি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাদের বেশির ভাগই কিন্তু নিজেরা মাংস খান। বার্গার, গ্রিল, চিকেন ফ্রাই—সবই তো চলে। তখন কি পশু হত্যা হয় না? সারা বছর কসাইখানায় হাজার হাজার পশু জবাই হয়, তখন তো কারো মায়া লাগে না। সমস্যাটা আসলে পশু হত্যা নিয়ে নয়, সমস্যা হলো আমরা ‘আল্লাহর নামে’ দিচ্ছি—এটাই তাদের সহ্য হয় না। গরুর প্রতি ভালোবাসা থাকলে সবাই নিজেরাও মাংস খাওয়া ছেড়ে দিতেন।

৩. মাংস কি অপচয় হয়? আল্লাহ কি মাংস খান?

অনেকে বলেন, “এত মাংস অপচয় না করে টাকাটা গরিবদের দিলেই তো হতো।”

শুনুন ভাই, আল্লাহ রক্ত বা মাংস কিছুই খান না। তিনি দেখেন আমাদের ‘তাকওয়া’ বা মনের ইচ্ছা। আর আমরা তো মাংস ফেলে দেই না বা নষ্ট করি না। এই মাংসের বড় একটা অংশ গরিব-দুঃখী, এতিম এবং আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়। বছরে অন্তত একটা দিন গরিব মানুষ পেট ভরে মাংস খেতে পারে এই কোরবানির কারণেই। এতে সামাজিক সম্প্রীতি বাড়ে, অপচয় হয় না।

৪. ছেলের জীবন কেন নিজের জীবনের চেয়ে প্রিয়?

ইব্রাহিম (আ.)-এর ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন আসে—নিজের জীবনের চেয়ে ছেলের জীবন কেন বেশি প্রিয় হলো?

সহজ উদাহরণ দেই। ১৯৭১ সালের কথা ভাবুন। মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য হাসিমুখে জীবন দিয়েছেন। তখন নিজের প্রাণের মায়া ছিল না। কিন্তু সেই মুক্তিযোদ্ধার সামনে যদি তার সন্তানকে মারতে যাওয়া হতো, তিনি কি সেটা সহ্য করতেন? না। বাবা-মায়ের কাছে নিজের জানের চেয়ে সন্তানের জান অনেক বেশি প্রিয়। আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-কে সেই সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাই উৎসর্গ করতে বলেছিলেন—এটাই ছিল পরীক্ষার মূল বিষয়।

৫. আগুনে ঝাঁপ দিই না কেন?

কেউ কেউ বলেন, “ইব্রাহিম (আ.) তো আগুনেও নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন, তোমরা কেন আগুনে ঝাঁপ দাও না?”

ভাই, আমরা মহাপুরুষদের আদর্শ পালন করি, তাদের মতো বিপদে পড়ে মরতে চাই না। যেমন—আমরা বঙ্গবন্ধু বা জিয়ার মৃত্যুতে শোক পালন করি, সম্মান জানাই। কিন্তু তাই বলে কি আমরা চাই আমাদেরও তাদের মতো মেরে ফেলা হোক? না। ইসলামে নিজের ক্ষতি করা নিষেধ। আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-কে আগুন থেকে বাঁচিয়েছিলেন, সেটা ছিল মোজেজা। আমরা সেই শিক্ষাটা মনে রাখি, আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দেই না।

৬. গাছের কি প্রাণ নেই?

যারা পশুপাখির কষ্টের কথা বলে নিরামিষাশী হওয়ার পরামর্শ দেন, তাদের বলি—বিজ্ঞানের ভাষায় গাছেরও প্রাণ আছে।

হিসাব করে দেখুন, ১০০ জন মানুষকে খাওয়াতে একটা গরুই যথেষ্ট। কিন্তু ১০০ জন মানুষকে শাক-সবজি দিয়ে খাওয়াতে হলে হাজার হাজার গাছ বা চারা কাটতে হয়। তাহলে বেশি প্রাণ হত্যা কারা করছে?

যদি বলেন, “গাছের অনুভূতি কম বা ২টা ইন্দ্রিয় কম”—তাহলে একটা পাল্টা প্রশ্ন করি। ধরুন, আপনার ভাইয়ের দুটি ইন্দ্রিয় নেই (সে বোবা ও কালা), এখন কেউ যদি তাকে খুন করে, আপনি কি আদালতে বলবেন— “জজ সাহেব, আমার ভাইয়ের অনুভূতি কম ছিল, তাই খুনির বিচার দরকার নেই”? নিশ্চয়ই না! প্রাণ প্রাণই। আল্লাহ আমাদের যেটা খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, আমরা সেটাই খাই।

৭. ইসলামই পশুর কষ্ট কমায়

লক্ষ করবেন, ইসলামি পদ্ধতিতে (জবাই) পশুর গলার নির্দিষ্ট রগ বা নিউরন কাটা হয়। এতে মস্তিষ্কের সাথে শরীরের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে পশু আর কোনো ব্যথা অনুভব করে না। যা ছটফট করে, তা কেবল শরীর থেকে রক্ত বের হওয়ার রিফ্লেক্স বা ঝাঁকুনি।

অথচ অনেক ধর্মে পশুকে এক কোপে মাথা আলাদা করা হয় (বলি দেওয়া)। এতে পশুর হার্ট অ্যাটাক হয় এবং মেরুদণ্ড বা স্পাইনাল কর্ডের সাথে মগজের সংযোগ থাকায় প্রচণ্ড কষ্ট পেয়ে মারা যায়। বিজ্ঞান বলে, ইসলামি পদ্ধতিই পশুর জন্য সবচেয়ে কম কষ্টের।

শেষ কথা

আশা করি, সহজ এই কথাগুলো দিয়ে আপনাদের ভুল ধারণাগুলো একটু হলেও ভাঙতে পেরেছি। কোরবানি মানে শুধু পশু জবাই নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে গরিবের মুখে হাসি ফোটানো, ত্যাগের মহিমা এবং আল্লাহর নির্দেশ মানা।

যুক্তিগুলো কেমন লাগলো কমেন্টে জানাতে পারেন। ভালো লাগলে শেয়ার করে অন্যদের জানার সুযোগ করে দিন। ধন্যবাদ!

অনুরোধ!! পোষ্ট ভালো লাগলে প্লিজ উপরের শেয়ার আইকনে ক্লিক করে পোষ্টটি শেয়ার করে দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সূরা ইয়াসিন অর্থসহ বাংলা উচ্চারণ ও ফজিলত

সূরা ইয়াসিন অর্থসহ বাংলা উচ্চারণ ও ফজিলত

○ ইসলাম
আলোচ্য বিষয়: (১) সূরা ইয়াসিন সংক্ষিপ্ত পরিচিতি (২) সূরা ইয়াসিন অর্সসহ বাংলা উচ্চারণ (৩) সূরা ইয়াসিনের গুরুত্ব ও ফজিলত Read
শ্বশুর শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক

শ্বশুর শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক

○ ইসলাম
নিম্নে ‘শ্বশুর শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক’ নিয়ে বিস্তারিভাবে আলোচনা করা হলো- Read
আখলাকে যামিমাহ কি, বলতে কি বুঝায়, বর্জনীয় কেন, কুফল, আখলাকে যামিমাহ উদাহরণ

আখলাকে যামিমাহ কি/বলতে কি বুঝায়? বর্জনীয় কেন/কুফল? আখলাকে যামিমাহ উদাহরণ

○ ইসলাম
আলোচ্য বিষয়: (১) আখলাকে যামিমাহ কি/বলতে কি বুঝায়? (২) আখলাকে যামিমাহ বর্জনীয় কেন/কুফল? (৩) আখলাকে যামিমাহ উদাহরণ Read
পরিচ্ছন্নতা কী, কাকে বলে দৈহিক, পোশাকের ও পরিবেশের পরিচ্ছন্নতার গুরুত্বসমূহ

পরিচ্ছন্নতা কী, কাকে বলে? দৈহিক, পোশাকের ও পরিবেশের পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব

○ ইসলাম
আলোচ্য বিষয়: (১) পরিচ্ছন্নতা কাকে বলে? (২) পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব (৩) দৈহিক পরিচ্ছন্নতা (৪) পোশাকের পরিচ্ছন্নতা (৫) পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা Read
অবাধ্য স্ত্রীকে বাধ্য করার আমল

অবাধ্য স্ত্রীকে বাধ্য করার আমলঃ স্ত্রীকে মারা যাবে কিনা? স্ত্রীকে কখন কিভাবে কতটুকু মারা যাবে?

○ ইসলাম
আলোচ্য বিষয়: অবাধ্য স্ত্রীকে বাধ্য করার আমলঃ স্ত্রীকে মারা যাবে কিনা? স্ত্রীকে কখন কিভাবে কতটুকু মারা যাবে? (১) অবাধ্য স্ত্রীকে বাধ্য করার আমল-এ যা যা করণীয় (২) স্ত্রীকে শাসন করার পদ্ধতি ও মাসায়েল (৩) স্ত্রীর প্রতি স্বামী রাগান্বিত হলে, স্ত্রীর যা যা করণীয় (৪) স্ত্রীর প্রতি স্বামীর রাগ এলে, স্বামীর যা যা করণীয় Read
আশুরাঃ কেন এটি ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন

আশুরা কি? আশুরার দিন কাকে বলে? কেন এটি ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন

○ ইসলাম
আলোচ্য বিষয়: আশুরা কি? আশুরার দিন কাকে বলে? কেন এটি ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি-দিন। Read
ওযুর সুন্নাত সমূহ কি কি

ওযুর সুন্নাত সমূহ কি কি?

○ ইসলাম
আলোচ্য বিষয়: হাদিস ও ইসলামী আলেমদের বর্ণনা অনুযায়ী ওযুর সুন্নাত সাধারণত ১৮টি বলে গণ্য করা হয়। নিচে সেই ১৮টি ওযুর সুন্নাত সমূহ কি কি, এগুলো বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো। Read
আল্লাহ যখন কোন কার্য সম্পাদনের সিন্ধান্ত নেন তখন তিনি বলেন, ‘হয়ে যাও’ আর তৎক্ষণাৎ তা হয়ে

আল্লাহ ‘কুন ফায়াকুন’ বলেই মুহূর্তে কিছু ঘটাতে পারেন, তাহলে তিনি কেন পৃথিবীকে ৬ দিনে সৃষ্টি করলেন?

○ ইসলাম
আলোচ্য বিষয়: আল্লাহ যখন কোন কার্য সম্পাদনের সিন্ধান্ত নেন তখন তিনি বলেন, ‘হয়ে যাও’ আর তৎক্ষণাৎ তা হয়ে যায়। তাহলে আকাশ এবং পৃথিবী সৃষ্টিতে তাঁর ৬ দিন (period) লাগলো কেন? Read
informationbangla.com default featured image compressed

সূরা ইয়াসিন অর্সসহ বাংলা উচ্চারণ ও ফজিলত

○ ইসলাম
আলোচ্য বিষয়: (১) সূরা ইয়াসিনের বিভিন্ন নাম (২) সূরা ইয়াসিন অর্সসহ বাংলা উচ্চারণ ও ফজিলত (৩) সূরা ইয়াসিনের গুরুত্ব ও ফজিলত Read
নামাজের নিষিদ্ধ সময়

নামাজের নিষিদ্ধ সময়

○ ইসলাম
আলোচ্য বিষয়: (১) নামাজের নিষিদ্ধ সময়সমূহ কয়টি ও তা কখন? (২) নামাজের নিষিদ্ধ সময় সমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিষিদ্ধ সময়ে নামাজ পড়লে কি হয়? Read