গরু মোটাতাজাকরণ এর স্বাস্থ্যসম্মত উপায় ও কৌশলসমূহ

(১) গরু মোটাতাজা করার লাভজনকতা
গরু হুষ্টপুষ্ট করে বিভিন্ন করা খুব লাভজনক। অল্প সময়ে অল্প পুঁজিতে গরু হুষ্টপুষ্ট করে বেকারত্ব ও দরিদ্রতা দূর করা যায়। অল্প সময়ে ঝাঁড় বাছুরকে সুষম খাদ্য খাওয়ায়ে দৈতিক বৃদ্ধি করে গরু মোটাতাজা করা হয়। মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে দ্বিতীয় প্রধান ধর্মীয় উৎসব কুরবানীর ঈদে বিপুল পরিমান গরুর চাহিদা তো বেয়াহেই, তাছাড়া মানুষ এখন প্রচুর মাংস খায়। আর মাংসের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গরুর মাংস। সারা বিশ্বেই কিন্তু জনপ্রিয়তার দিক থেকে গরুর মাংস এক নম্বরে। সুতরাং দেশের পাশাপাশি গরুর মাংস রপ্তানি করারও কিন্তু বড় সুযোগ আছে।
(২) গরু মোটাতাজা করার উদ্দেশ্য
গরু হুষ্টপুষ্ট করার মূল লক্ষ্যগুলো নিম্নরূপ-
- অল্প সময়ে (৪-৬ মাস) অধিক মুনাফা অর্জন করা যায়।
- আর্থিক ক্ষতির বৃদ্ধি করা।
- বেকারত্ব ও দারিদ্রতা দূর করা যায়।
(৩) গরু মোটাতাজাকরণের পদ্ধতি
গরু হুষ্টপুষ্ট করার জন্য নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা দরকার-
- পশু নির্বাচন।
- পুষ্টি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা।
- মূলধন বা পুঁজি দ্রুত ফেরত আসে।
- খরচের তুলনায় লাভ বেশি।
- রোগরোধ করা হয়।
- পরজীবী মুক্ত করা ও চিকি প্রদান।
- বাজারজাতকরণ।
(৪) মোটাতাজাকরণের জন্য গরু নির্বাচনের নিয়মাবলী
দেউ-দুরহর বয়সের সংকর বা দেশী জাতের ঘাঁড় বাছুর নির্বাচন করা। ভালো জাতের গরু, ঘাড় খাটো, হাড়ের জোড়াগুলো মোটা প্রকৃতির, বুক চওড়া ও পাঁজরের হাড় চ্যাপটা, কোমরের দুগাশ প্রশস্ত ও পুক, কপাল প্রশস্ত, উঁচু ও লম্বা, চামড়া চিলা, স্বাস্থ্যহীন ও রোগমুক্ত গরু নির্বাচন করতে হয়।
(৫) গরুকে পরজীবী থেকে মুক্ত করা
গরু ক্রয় করার পরেই গরুর অভ্যন্তরিন ও বহি:পরজীবী মুক্ত করতে হবে। অন্যথায় গরুর খাদ্যের বিরাট অংশ খেয়ে গরুকে পুষ্টিহীন ও রক্ত শূন্য করে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
(৬) গরুকে টিকা প্রদানের গুরুত্ব
প্রাণিক রোগে আক্রান্তের হাত থেকে ব্রহ্মা করতে টিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু হুষ্ট-পুষ্টিকরণ সল্প সময়ের জন্য করা হয়, তাই নিয়মজ টিকাসমূহ প্রদান করতে হবে-
| রোগ | টিকার নাম | পরিমান | প্রয়োগের স্থান | রোগ প্রতিরোধের কাল |
|---|---|---|---|---|
| ক্ষুরা রোগ (এফ.এম.ডি) | ট্রাইড্যালেন্ট এফ.এম.ডি টিকা | ৬ মিলি | চামড়ার নীচে | চার (৪) মাস |
| ভড়কা (আ্যানথ্রাক্স) | ভড়কা টিকা | ১ মিলি | চামড়ার নীচে | এক (১) বছর |
| বাদলা (বি.কিউ) | বাদলা টিকা | ৫ মিলি | চামড়ার নীচে | ছয় (৬) মাস |
(৭) গরুর ঘর তৈরি এবং আবাসন ব্যবস্থাপনা
প্রতিটি গরুর জন্য টেবর্ড চ ফুট, প্রস্থ ও ফুট ও উচ্চতা চ ফুট জায়গা প্রয়োজন। ঘরের ভেতর আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা। ঘরের দেশে একদিকে চালু রাখা। ঘরের ভেতর খাদ্য ও পানি পাত্র থাকবে।
(৮) গরুর পুষ্টি এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনা
সঠিক পরিমাণে পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ালো ঝাঁড় বাছুরের ওজন প্রতিদিন প্রায় এক কেজি পর্যন্ত বাড়ে। ১০০-১৫০ কেজি ওজনের একটি ঝাঁড় বাছুরকে প্রতিদিন ইউরিয়া প্রতিক্ষ্যাকাত খড় ৩-৪ কেজি, সবুজ কাঁচা ঘাস ১০-১২ কেজি, চালের কুড়া ১ কেজি, গমের ভুসি ১.২৫ কেজি, তিলের খেল ৪০০ গ্রাম, হাড়ের গুঁড়া ৫০ গ্রাম, লবণ ৫০ গ্রাম ও রোলাগুড় ২৫০ গ্রাম খাওয়াতে হয়। পানি পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়াতে হবে।
(৯) গরুর জন্য ইউ.এম.এস (ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র) তৈরির পদ্ধতি
ইউ.এম.এস তৈরীর প্রথম শর্ত হল এর উপাদানগুলির অনুপাত সর্বদা সঠিক রাখতে হবে অর্থাৎ ১০০ ভাগ ইউ.এম.এস এর শুরু পদার্থের মধ্যে ৮২ ভাগ খড়, ১৫ ভাগ মোলাসেস (চিটাওড়) এবং ৩ ভাগ ইউরিয়া থাকতে হবে। এ হিসাব মতে ১০০ কেজি শুকনা খড়, ঘনকুদ্র উপর নিভ্নে করে ১৫-২০ কেজি মোলাসেস (চিটাওড়) ও ৩ কেজি ইউরিয়া মিশানোই চলবে প্রথমে খড়, মোলাসেস ও ইউরিয়ার পরিমাণ মেশে নিতে হবে। এর পর পালিতে ইউরিয়া ও চিটাওড় মিশানো উহা ভালভাবে খড়ের সাথে মিশাতে হবে। পানি বেশী হলে দ্রবণটুকু খড় চুরি নিতে পারবে না আবার কম হলে দ্রবণ ছিটানো সমস্যা হবে। শুকনো খড়কে পলিথিন বিছানো বা পাকা যেবেবেতে সমভাবে বিসিয়ে ইউরিয়া লোচালেস দ্রবণটি আতে অন্তে ঝরণা বা হাত দিয়ে ছিটিয়ে দিতে হবে এবং সাথে সাথে খড়কে উচিতয়ে দিতে হবে বাতে খড় দ্রবণ চুরে নেয়। প্রস্তুতকৃত ইউরিয়া মোলাসেস খড় সঙ্গে সঙ্গে গরুকে খাওয়ানো যায় তখনা একবারে ২/৩ দিনের তৈরীখতু সংরক্ষণ করে আস্তে আস্তে খাওয়ানো যায়। তবে কোন অবস্থাতেই খড় বানিয়ে তিন দিনের বেশী রাখা উচিত নয়। কারণ তাতে খড়ে ইউরিয়া এবং মোলাসেস এর পরিমাণ কমতে থাকবে।
(১০) গরুর ওজন মাপার বিভিন্ন পদ্ধতি
পণ্ডর ওজন মাপার বিভিন্ন পদ্ধতি-

(১১) বাজারজাতকরণের কৌশল
হাইপ্রুষ্টকরণ গরু লাভজনকভাবে সঠিক সময়ে ভালো মূল্যে বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ হচ্ছে আরেকটি উদ্ভাস্যবোগ্য বিষয়। বাংলাদেশে মাংসের জন্য বিক্রয়যোগ্য গরাদিপণ্ডর বাজার মূল্যেও যৌসুমভিত্তিক হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। কাজেই একজন প্রতিপালককে গরু হাইপ্রুষ্টকরণের জন্য অবশ্যই গরুর ক্রয় মূল্য যখন কম থাকে তখন গরু ক্রয় করে বিক্রয় মূল্যের উর্ধ্বগতির সময়ে বিক্রয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণত কোরবানির ঈদের সময়ে গরুর মূল্য অত্যধিক থাকে এবং এর পরের মাসেই বাজার দর হ্রাস পায়। তাই এখন গরু হাইপ্রুষ্টকরণের উপযুক্ত সময়। স্বল্প সময়ে অধিক লাভবান হওয়ার সহজ এবং সুবিধাজনক উপায়ের মধ্যে গরু হাইপ্রুষ্টকরণ একটি অত্যন্ত মুলোপযোগী পদ্ধতি।
(১২) সুস্থ এবং অসুস্থ গরু চেনার উপায়
সুস্থ ও অসুস্থ গরু চেনার উপায় হলো-
◄ অসুস্থ গরু ভীষণ ক্লান্ত থাকে ও ঝিমাবে। আর সুস্থ গরুর গতিবিধি চটপট থাকে। কান ও লেজদিয়ে মশা মাটি তাড়ায়।
◄ সুস্থ গরুর নাকের ওপরের অংশটা ভেজা বা বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা থাকবে। অন্যদিকে অসুস্থ গরুর নাক থাকবে শুকনা। ওষধ খাওয়ানো পর্বর শরীরের অঙ্গগুলো নষ্ট হতে শুরু করায় এগুলো ঘাস-প্রশস্ত কৃত হয়। মনে হবে হাঁপাচ্ছে।
◄ অতিরিক্ত স্টেরায়েড দেয়া গরুর মুখ থেকে প্রতিনিয়ত লালা ঝরে। এসব গরু কিছু থেতে চায় না।
◄ সুস্থ গরুর শরীরের মত উজ্জ্বল, পিঠের কুঁজ মোটা, টান টান দাগমুক্ত হবে।
◄ সুস্থ গরুর রানের মাংস শক্ত থাকবে। আর অসুষ্ঠু গরুর পা হবে নরম ঘলখলে।
◄ গরুর শরীরে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী হলে বুঝবেনে গরুটি অসুস্থ।
এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করে আপনি স্বল্প সময়ে লাভজনক গরু পালন করতে পারেন। এটি না শুধু আর্থিক লাভ দেয়, বরং নিরাপদ মাংস সরবরাহ করে সমাজকে সাহায্য করে।
তাই আসুন ‘বিজ্ঞান সম্মত খামার গড়ি নিরাপদ মাংস সরবরাহ করি।’
[তথ্যসূত্র: বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তর ময়মনসিংহ বিভাগ, ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।]









