গরু মোটাতাজাকরণ স্বাস্থ্য পুষ্টি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা

গরু মোটাতাজাকরণ স্বাস্থ্য পুষ্টি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা

(১) গরু মোটাতাজাকরণের সুবিধা সমূহ

⇒ কম মূলধণ ও কম জায়গার প্রয়োজন হয়।

⇒ অল্প সময়ের (৪-৬ মাসের) মধ্যে গরু মোটাতাজাকরে অধিক মূল্যে বাজারে বিক্রয় করা যায় অর্থাৎ আর্থিক  মুনাফা অর্জন করা যায়।

⇒ খুব সল্প সময়ের মধ্যে লাভসহ মুনাফা ফেরত পাওয়া যায়।

⇒ বসতভিটা আছে এমন সকল পরিবার স্বল্প বিনিয়োগকরে এ প্রকল্পের আওতায় আসার ব্যাপক সুযোগ লাভ করতে পারে। ফলে বেকার এবং মহিলাদের কর্মসংস্থানে সুযোগ বেশি হয়।

⇒ বাজারের মাংসের চাহিদা সব সময় বেশি থাকার কারণে বাজার দর কমার সম্ভাবনা কম ও লোকসানের ঝুঁকি  কম থাকে।

⇒ বাড়ন্তগরুর রোগ-ব্যাধির প্রকোপ খুব কম থাকে। ফলে আর্থিক ক্ষতির সম্ভবনা খুব কম। ∙

⇒ স্থানীয় বাজার-হাট থেকে অনায়াসে প্রাণি ক্রয় করে প্রকল্প শুরু করা যায়।

(২) মোটাতাজাকরণ গরুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা

⇒ গরু মোটাতাজা করার জন্য প্রাণি ক্রয়ের পর সংক্রামক রোগের টিকা প্রদানের করতে হবে।

⇒ গরুকে কোন টিকা দেওয়া না থাকলে ক্রয় করার ৭ দিন পর থেকে বিভিন্ন ধরনের টিকা ১৫ দিন পর পর দিতে  হবে।

⇒ প্রাণিকে যে সকল রোগ প্রতিরোধে টিকা প্রয়োগ করা যেতে পারে- তড়কা, ক্ষুরা, বাদলা (প্রয়োজন  বোধে), গলাফুলা (প্রয়োজন বোধে), ইত্যাদি।

⇒ গরুর নিম্নে বর্ণিত রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সর্ম্পকে সচেতন থাকতে হবে-

  • তড়কা;
  • বাদলা;
  • ক্ষুরা;
  • কৃমি;
  • বদহজম/পেটের পিড়া।

⇒ মোটাতাজা করার গরুকে পরিস্কার পানি দিয়ে নিয়মিত গোসল করাতে হবে।

⇒ প্রতিদিন গরুকে ভালভাবে গোসল করালে গরুর শরীর সুস্থ থাকে এবং দেহে পরজীবি (উকুন, আঁঠালি, মাছি,  মাইটস) আক্রমণ থেকে গরু মুক্ত থাকে।

(৩) মোটাতাজাকরণ গরুর পুষ্টি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা

আমাদের দেশীয় গরুর খাদ্য ব্যবস্থাপনার প্রতি সাধারণত তেমন কোন গুরুত্ব দেয়া হয় না। ফলে এদের নিকট থেকে  আশানুরূপ উৎপাদনও পাওয়া যায় না। অথচ:

⇒ গরুকে পর্যাপ্ত কাঁচা ঘাস।

⇒ পরিমিত প্রক্রিয়াজাত খড়।

⇒ দানাদার খাদ্য (কুড়া, গমের ভূষি, চাউলের খুদ, খৈল, কলাই, মটর, খেশারী, কুড়া ইত্যাদি)।

⇒ পর্যাপ্ত পরিমানে পরিস্কার পানি  (নলকুপের টাটকা পানি) সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন ব্যবস্থা।

⇒ নিয়মিত কৃমিনাশক চিকিৎসা ও টিকা প্রদানের  ব্যবস্থা।

এগুলো করা হলে এদের উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি করা যায়। আমাদের দেশে গবাদি পশুর সবচেয়ে সহজলভ্য ও  সাধারণ খাদ্য হল খড় যার ভিতর আমিষ। শর্করা ও খনিজের ব্যাপক অভাব রয়েছে। বর্তমানে খড়কে ইউরিয়া দ্বারা  প্রক্রিয়াজাত করলে তার খাদ্যমান বহুগুণে বেড়ে যায়।

খাদ্য উপকরণে যে পুষ্টি উপাদান অধিক পরিমানে থাকে তাকে সে জাতীয় খাদ্য বলে। যেমন:

⇒ শর্করা জাতীয় খাদ্য (ভুট্টা, গম, কাওন, চাউলের কুঁড়া, গমের ভুষি ইত্যাদি)।

⇒ আমিষ জাতীয় খাদ্য (সয়াবিন মিল, তিল, খৈল, শুটকিমাছ, মিটমিল ইত্যাদি)।

⇒ চর্বি  জাতীয় খাদ্য (এনিমেল ফ্যাট, হাঁস-মুরগরি তৈল, ভেজিটেবল অয়েল, সার্কলিভার ওয়েল ইত্যাদি)।

⇒ ভিটমিন জাতীয় খাদ্য (শাক সব্জি ও কৃত্রিম ভিটামিন)

⇒ খনিজ জাতীয় খাদ্য (ঝিনুক, ক্যালশিয়াম ফসফেট, রকসল্ট, লবন ইত্যাদি)।

প্রাণির খাদ্যকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়:

  • আঁশ বা ছোবড়া জাতীয় খাদ্যঃ খড়, সবুজ ঘাষ বা কাঁচা ঘাষ। ইত্যাদি
  • দানাদার জাতীয় খাদ্যঃ চালের কুঁড়া, গমের ভূষি, খেসারি ভাঙ্গা, তিল বা বাদাম খৈল ইত্যাদি।
  • সহযোগী অন্যান্য খাদ্য : খনিজ উপাদান, ভিটামিন ইত্যাদি।

গরুকে প্রচুর পরিমানে বিশুদ্ধ পানি খাওয়ানো:

⇒ দেহ কোষে শতকরা ৬০- ৭০ ভাগ পানি থাকে। তাই কোন প্রাণি খাদ্য না খেয়েও কিছু দিন বাঁচতে  পারে। কিন্তু পানি ছাড়া সামান্য কিছু দিনের বেশী বাঁচে না।

⇒ সাধারণত দেহ থেকে পানির ক্ষয় হয় মলমূত্র ও শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে।

⇒ অপরদিকে পানি আহরিত হয় পানি পান করে। রসালো খাদ্য গ্রহণ করে এবং দেহের ভিতর বিভিন্ন  পুষ্টি উপাদানের অক্সিডেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

⇒ দেহের বেশির ভাগ অংশ পানি দ্বারা গঠিত।

প্রণির দেহে পানির কাজ:

⇒ খাদ্যতন্ত্রের মধ্যে খাদ্য নরম ও পরিপাকে সহায্য করে।

⇒ খাদ্যতন্ত্রের মধ্যে পুষ্টি উপাদান তরল করে দেহের প্রত্যন্ত অ লে পরিবহণ করে।

⇒ দেহের তাপ নিয়ন্ত্রণ করে ও দেহকে সতেজ রাখে।

⇒ দেহের ভিত্তিতে দুষিত পদাথর্  অপসারণ করে।

⇒ দেহের গ্রন্থি হতে নিঃসৃত রস। হরমোন।এনজাইম এবং রক্ত গঠনে ভূমিকা রাখে।

(৪) প্রাণিকে সবুজ/কাঁচা ঘাস ও দানাদার খাদ্য খাওয়ানোর পরিমান

১০০ কেজির কম ওজনের জন্য:

  • ইউরিয়া প্রক্রিয়াজাত  খড় বা শুধু খড়ঃ ২ কেজি
  • দানাদার খাদ্য সুষমঃ ২.৫-৩ কেজি
  • সবুজ ঘাসঃ ৪-৫ কেজি

১০০-১৫০ কেজি ওজনের জন্য:

  • ইউরিয়া মোলাসেস খড় বা শুধু খড়ঃ ৩ কেজি
  • দানাদার খাদ্য সুষমঃ ৩.০-৩.৫ কেজি
  • সবুজ ঘাসঃ ৭-৮ কেজি

১৫০-২০০ কেজি এবং তদুর্দ্ধ ওজনের জন্য:

  • ইউরিয়া মোলাসেস খড় বা শুধু খড়ঃ ৪ কেজি
  • দানাদার খাদ্য সুষমঃ ৪.০-৪.৫ কেজি
  • সবুজ ঘাসঃ ৮-১২ কেজি

সতর্কতা:

  • গরু মোটাতাজাকরণ করার জন্য কোন প্রকার ঔষধ ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • মোটাতাজাকরণ গরুতে ষ্টেরয়েড ব্যবহার করার বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকতে হবে।

অনুরোধ!! পোষ্ট ভালো লাগলে প্লিজ উপরের শেয়ার আইকনে ক্লিক করে পোষ্টটি শেয়ার করে দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মাছ, হাঁস ও মুরগির সমন্বিত চাষ পদ্ধতি

মাছ, হাঁস ও মুরগির সমন্বিত চাষ পদ্ধতি

আলোচ্য বিষয়: নিম্নে মাছ, হাঁস ও মুরগির সমন্বিত চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো- (১) মাছ, হাঁস ও মুরগির জাত নির্বাচন (২) মাছ, হাঁস ও মুরগির সংখ্যা নির্ধারন (৩) মাছ, হাঁস ও মুরগির চাষ ব্যবস্থাপনা Read
ছাগলের দুধ জ্বর বা মিল্ক ফিভার রোগের লক্ষণ

ছাগলের দুধ জ্বর বা মিল্ক ফিভার রোগের লক্ষণ

আলোচ্য বিষয়: ছাগল পালন ব্যবসায় খামারিদের জন্য একটি আতঙ্কের নাম হলো মিল্ক ফিভার বা দুগ্ধ জ্বর। মূলত শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাবজনিত কারণে এই সমস্যাটি হয়ে থাকে। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে এটি ছাগলের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। ছাগলের দুধ জ্বর বা মিল্ক ফিভার রোগের লক্ষণগুলো হলো- Read
সুস্থ ছাগল চেনার উপায়, অসুস্থ ছাগলকে চিনবেন কিভাবে

সুস্থ ছাগল চেনার উপায়, অসুস্থ ছাগলকে চিনবেন কিভাবে?

আলোচ্য বিষয়: (১) সুস্থ ছাগলের বৈশিষ্ট্য (২) অসুস্থ ছাগলের বৈশিষ্ট্য Read
ছাগল পালন পদ্ধতি, আধুনিক পদ্ধতিতে ছাগল পালন, বৈজ্ঞানিক উপায়ে ছাগল পালন

ছাগল পালন পদ্ধতি? আধুনিক পদ্ধতিতে ছাগল পালন? বৈজ্ঞানিক উপায়ে ছাগল পালন?

আলোচ্য বিষয়: (১) বাণিজ্যিক ছাগল খামার (২) ছাগলের ঘর, সেড বা বাসগৃহ (৩) ছাগলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা (৪) সুস্থ ছাগলের বৈশিষ্ট্য (৫) ছাগল সুস্থ রাখতে করণীয় (৬) ব্ল্যাক বেঙ্গল বা বেঙ্গল ছাগলের কিছু বৈশিষ্ট্য (৭) ছাগলের বয়স নির্ণয় (৮) ছাগলের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়াদি Read
ছাগলের প্রজননের কাল ও ছাগলের প্রজনন সময় কোনটি (informationbangla.com)

ছাগলের প্রজননের কাল ও ছাগলের প্রজনন সময় কোনটি?

আলোচ্য বিষয়: একটা ছাগল ফার্মের লাভ লস ছাগলের প্রজনন এর উপরেও কিন্তু অনেকটাই নির্ভর করে তাই ছাগলের প্রজননের সঠিক নিয়ম গুলি জেনে প্রজনন করানো উচিত। Read
ডেইরি ফার্ম করার নিয়ম, ৪টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, ডেইরি খামার করার নিয়ম

ডেইরি ফার্ম করার নিয়মঃ ৮টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট (ডেইরি খামার করার নিয়ম)

আলোচ্য বিষয়: (১) ডেইরি খামার হলে আগে গাভীর জাত এবং বংশ সম্পর্কে জানুন (২) গাভীর খাদ্যের উৎস সম্পর্কে চিন্তা করুন তারপর ডেইরি ফার্ম করুন (৩) ডেইরি ফার্ম করার পূর্বেই গাভীর প্রজনন পরিকল্পনা (ব্রিডিং প্ল্যান) প্রস্তুত করুন (৪) ডেইরি খামার পরিচালনা করার পক্রিয়া ও পদ্ধতি অধ্যয়ন করুন (৫) আপনার ডেইরি ফার্মে মূলধন বিনিয়োগ করুন (৬) ডেইরি গাভী সংগ্রহের উৎস খুঁজুন (৭) স্থানীয় দুধের বাজার নিয়ে গবেষণা করুন (৮) প্রাণীসম্পদ অফিসের সাথে যোগাযোগ রাখুন Read
ছাগলের খামার করতে কত টাকা লাগবে, ছাগলের খামারের খরচ (informationabangla.com)

ছাগলের খামার করতে কত টাকা লাগবে? ছাগলের খামারের খরচ

আলোচ্য বিষয়: ছাগলের খামার করতে কত টাকা লাগবে? এটা কেউ আপনাকে বলে দিতে পাবে না। আপনি যদি অনন্যের দেখানো খরচের হিসাব দেখে খামার শুরু করে দেন পরবর্তীতে আপনি অবশ্যই বিপদে পড়বেন। এখানে খরচের খাত সমূহ এবং ধারণা দেওয়া হলো নিজের পরিকল্পনা উনুযায়ী নিজেই ক্যালকুলেশন করে নিতে পারবেন। Read
গবাদি পশুর পুষ্টি উপাদান সমূহ

গবাদি পশুর পুষ্টি উপাদান সমূহ

আলোচ্য বিষয়: নিচের ছকে গবাদি পশুর পুষ্টি উপাদান সমূহের নাম, পুষ্টির উৎস ও পুষ্টির কার্যকারিতা দেখানো হলো- Read
ওজন অনুযায়ী গরুর খাদ্য তালিকা, গরুকে খাবার দেওয়ার নিয়ম ও ঘাস খাওয়ানোর উপকারিতা

ওজন অনুযায়ী গরুর খাদ্য তালিকা, গরুকে খাবার দেওয়ার নিয়ম ও ঘাস খাওয়ানোর উপকারিতা

আলোচ্য বিষয়: (১) গরুকে খাবার দেওয়ার নিয়ম বা গরুকে খাবার খাওয়ানোর নিয়ম (২) গরু ছাগল বা গবাদিপশুকে ঘাস খাওয়ানোর উপকারিতা (৩) ১০০ কেজি দৈহিক ওজনের গরুর খাদ্য তালিকা (৪) ১৫০ কেজি ওজনের গরুর খাদ্য তালিকা (৫) ১৫০-২০০ কেজি ওজনের গরুর খাদ্য তালিকা (৬) গরুর দানাদার খাদ্য তৈরির তালিকা (৭) ওজন অনুযায়ী গরুর খাদ্যের পরিমাণ (৮) গরু মোটাতাজাকরণ খাদ্য সরবরাহ পদ্ধতি (৯) গরুকে পানি ও খাদ্য খাওয়ানোর পদ্ধতি Read
বাছুর গরু পালন পদ্ধতি ও বাছুরের খাদ্য তালিকা

বাছুর গরু পালন পদ্ধতি ও বাছুরের খাদ্য তালিকা

আলোচ্য বিষয়: (১) বাছুর কাকে বলে? (২) বাছুর গরু পালন পদ্ধতি (৩) বাছুরের খাদ্য তালিকা Read