গরু ও মহিষের গলাফুলা রোগঃ লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা

গরু ও মহিষের গলাফুলা রোগ, যা হেমোরেজিক সেপটিসিমিয়া (Haemorrhagic Septicemia বা HS) নামে পরিচিত, একটি তীব্র সংক্রামক রোগ। এটি পশুপালনকারীদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। এই রোগে আক্রান্ত পশুর মৃত্যুর হার খুবই বেশি। তবে সঠিক জ্ঞান ও সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এই ব্লগ পোস্টে গলাফুলা রোগের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
(১) গরুর গলাফুলা রোগ কী?
গলাফুলা রোগ একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যা প্রধানত গরু ও মহিষের মধ্যে দেখা যায়। এটি পাসচুরেলা মাল্টোসিডা (Pasteurella multocida) নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট হয়। বাংলাদেশে এই রোগ সাধারণত বর্ষা ও গ্রীষ্মকালে বেশি দেখা দেয়। এই রোগে আক্রান্ত পশুর গলা ফুলে যায়, জ্বর হয় এবং রক্তে বিষাক্ততার লক্ষণ দেখা দেয়। দ্রুত চিকিৎসা না করলে পশু ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মারা যেতে পারে।
(২) গরুর গলাফুলা রোগের কারণ
গলাফুলা রোগের মূল কারণ হলো পাসচুরেলা মাল্টোসিডা ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া নিম্নলিখিত উপায়ে পশুর শরীরে ছড়ায়:
- সংক্রামিত পশুর সংস্পর্শ: সুস্থ পশু যদি অসুস্থ পশুর সংস্পর্শে আসে, তবে এই রোগ ছড়াতে পারে।
- মলমূত্রের মাধ্যমে: আক্রান্ত পশুর মলমূত্রের সংস্পর্শে এলে রোগ ছড়ায়।
- দূষিত খাদ্য ও পানি: দূষিত খাদ্য বা পানির মাধ্যমেও এই ব্যাকটেরিয়া পশুর শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
(৩) গরুর গলাফুলা রোগের লক্ষণ
গলাফুলা রোগে আক্রান্ত পশুদের মধ্যে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা যায়-
- গলা ও শরীরের ফোলা: প্রথমে গলার নিচে ফোলা শুরু হয়। পরে চোয়াল, বুক, পেট এবং কানের অংশ ফুলে যায়।
- শ্বাসকষ্ট: পশু গলা বাড়িয়ে মুখ দিয়ে শ্বাস নেয় এবং ঘড়ঘড় শব্দ করে।
- খাওয়া বন্ধ: আক্রান্ত পশু খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়।
- উচ্চ জ্বর: পশুর শরীরের তাপমাত্রা ১০৫°-১০৭° ফারেনহাইট পর্যন্ত বেড়ে যায়।
- ডায়রিয়া: কিছু ক্ষেত্রে পশুর ডায়রিয়া হতে পারে।
- লালা ঝরা: নাক ও মুখ দিয়ে লালা ঝরতে দেখা যায়।
- দ্রুত মৃত্যু: তীব্র আক্রান্ত পশু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা যেতে পারে।
(৪) গরুর গলাফুলা রোগের চিকিৎসা
গলাফুলা রোগের চিকিৎসা সময়মতো শুরু করা অত্যন্ত জরুরি। নিম্নে এই রোগের চিকিৎসা বর্ণনা করা হলো-
১. সালফাডিমিডিন সোডিয়াম (Sulphadimidin Sodium) সংযুক্ত ওষুধ
বোলাস:
- Vesadin (ভেসাডিন-Rampart Power) 5gm
- Sulphasol-Vet (সালফাসল ভেট/Acme) 5gm
- Diadin (ডায়াডিন-Renata A. Health) 5gm
ব্যবহারের নিয়ম: প্রথম দিন প্রতি ৫০ কেজি ওজনের জন্য ২টি বোলাস বা প্রতি কেজি ওজনের জন্য ২০০ মি.গ্রা। দ্বিতীয় দিন থেকে ৩-৫ দিন ১টি বোলাস খাওয়াতে হবে। বাছুরের ক্ষেত্রেও এটি উপকারী।
ইনজেকশন:
- Dimidin (ডিমিডিন-Techno Drugs) 30/100ml
- Sulphasol-Vet (সালফাসল-ভেট/Acme Animal Health) 30/100ml
- Diadin (ডায়াডিন-Renata Animal Health) 30/100ml
- Salidone (সলিডন-ACI) 25/100ml
ব্যবহারের নিয়ম: প্রতি ৫০ কেজি ওজনের জন্য ১৫-৩০ মি.লি মাংসপেশী বা চামড়ার নিচে ইনজেকশন দিতে হবে। দ্বিতীয় দিন থেকে প্রথম মাত্রার অর্ধেক ৩-৫ দিন প্রয়োগ করতে হবে।
২. অক্সিটেট্রাসাইক্লিন (Oxytetracycline) সংযুক্ত ওষুধ
ইনজেকশন:
- Tetravet (টেট্রাভেট-Acme Animal Health) 50mg
- Oxytet (অক্সিটেট-ACI Animal Health) 50mg
- Lolymycin (লাইলোমাইসিন-Loly Pharma) 50mg
- Chemycin (কেমাসিন-Chemist) 50mg
- Technomycin (টেকনোমাইসিন-Techno Drugs) 50mg
- Oxyvet (অক্সিভেট-Globe Animal Health) 50mg
- Otetra-Vet (ওটেট্রা ভেট/Square Agrovet Division) 50mg
ব্যবহারের নিয়ম: প্রতি ১০ কেজি ওজনের জন্য ২ মি.লি (50mg) মাংসপেশীতে ২৪ ঘণ্টা পরপর ৫ দিন প্রয়োগ করতে হবে।
৩. প্রেডনিসোলন এসিটেট ও অন্যান্য সংযুক্ত ওষুধ
ইনজেকশন:
- Chlortetrasone (ক্লোরটেট্রাসন-Advance Animal Science)
- Chlorsone (ক্লোরসন-Techno Drugs)
ব্যবহারের নিয়ম: প্রতি ১০ কেজি ওজনের জন্য ১ মি.লি (Chlorsone) বা ২.৫ মি.লি (Chlortetrasone) মাংসপেশী বা চামড়ার নিচে ৩-৫ দিন প্রয়োগ করতে হবে।
৪. জেন্টামাইসিন (Gentamicin) সংযুক্ত ওষুধ
ইনজেকশন:
- Gentasone-Vet (জেন্টাসন-ভেট/Chemist) 50mg
- Genacyn Vet (জেনাসিন ভেট/Square Agrovet Division) 50mg
- Gentacin 5% (জেন্টাসিন/Techno Drugs) 50mg
- Acigent 10% (এসিজেন্ট-১০%/ACI) 100mg
ব্যবহারের নিয়ম: গরু ও মহিষের জন্য প্রতি ১০০ কেজি ওজনের জন্য ১০ মি.লি, ছাগল ও বাছুরের জন্য ১০ কেজি ওজনের জন্য ১ মি.লি মাংসপেশীতে ৩-৫ দিন প্রয়োগ করতে হবে।
৫. এমোক্সিসিলিন (Amoxycilin) সংযুক্ত ওষুধ
ইনজেকশন:
- Amoxyvet (এমক্সিভেট/Techno Drugs) 1gm
- Hicomx (হিকোমক্স-Opsonin) 1gm
ব্যবহারের নিয়ম: প্রতি ১০০ কেজি ওজনের জন্য ১ ভায়েল (১ গ্রাম) দিনে ১ বার ৩-৫ দিন মাংসপেশী, শিরাপথে বা চামড়ার নিচে প্রয়োগ করতে হবে।
৬. এলার্জি ও ব্যথার চিকিৎসা
এন্টিহিস্টামিন:
- Flugan (ফ্লুগান-Techno Drugs) 50mg
- Promin (প্রোমিন-Globe Animal Health) 50mg
- Promevet (প্রোমিভেট-FnF) 50mg
- Dellergin (ডিলারজিন-Renata) 0.50mg
ব্যবহারের নিয়ম: বড় পশুর জন্য ১.৫-২.০ মি.লি/৫০ কেজি ওজনে, ছোট পশুর জন্য ০.৫ মি.লি/১০ কেজি ওজনে মাংসপেশীতে ৩-৪ দিন প্রয়োগ করতে হবে।
ফেনিরামিন মেলিয়েট:
- Antihista-Vet (এন্টিহিস্টা-ভেট/Square)
- Asta-Vet (এস্টাভেট-Acme)
- Hista-Vet (হিস্টা-ভেট/ACI)
ব্যবহারের নিয়ম: গরু ও মহিষের জন্য ৫-১০ মি.লি, ছাগল ও ভেড়ার জন্য ০.৫-১ মি.লি প্রতিদিন শিরা বা মাংসপেশীতে প্রয়োগ করতে হবে।
ব্যথার জন্য:
- Difen (ডাইফেন-ACI Animal Health) 25mg
- Genac-Vet (জিনাক ভেট/Globe Animal Health) 25mg
- Declofen-Vet (ডিক্লোফেন-ভেট/Opsonin) 25mg
ব্যবহারের নিয়ম: গরু ও মহিষের জন্য ২-৪ মি.লি/৫০-১০০ কেজি, ছাগল ও ভেড়ার জন্য ০.২-০.৪ মি.লি/৫-১০ কেজি মাংসপেশীতে প্রয়োগ করতে হবে।
৭. সুস্থতার জন্য ভিটামিন
পশু সুস্থ হয়ে উঠলে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট দেওয়া যেতে পারে। এটি পশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
(৫) গরুর গলাফুলা রোগ প্রতিরোধের উপায়
গলাফুলা রোগ প্রতিরোধে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত-
- আক্রান্ত পশুকে আলাদা করা: রোগের লক্ষণ দেখা মাত্র আক্রান্ত পশুকে সুস্থ পশু থেকে আলাদা করে রাখতে হবে।
- চলাচল সীমাবদ্ধ করা: মড়ক দেখা দিলে পশুর চলাচল সীমিত করতে হবে।
- স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ: পশুকে পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে লালন-পালন করতে হবে।
- ভ্যাকসিনেশন: সরকারি পশু হাসপাতালে যোগাযোগ করে সুস্থ পশুদের ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
(৬) শেষ কথা
গলাফুলা রোগ পশুপালন শিল্পে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে, যেখানে গরু ও মহিষ পালন অর্থনীতির একটি বড় অংশ, এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পশুর মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।
গলাফুলা রোগ গরু ও মহিষের জন্য একটি মারাত্মক রোগ। তবে সঠিক চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পশুপালনকারীদের এই রোগ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। স্থানীয় পশু চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করে এবং সরকারি পশু হাসপাতালের সহায়তা নিয়ে এই রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব।
অনুরোধ!! পোষ্ট ভালো লাগলে প্লিজ উপরের শেয়ার আইকনে ক্লিক করে পোষ্টটি শেয়ার করে দিন।









