ছাগলের রোগ-ব্যাধি ও তার প্রতিকার

ছাগল পালন লাভজনক হলেও সঠিক সময়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং সঠিক চিকিৎসা না করলে খামারিরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। নিচে ছাগলের প্রধান কিছু রোগ, তাদের লক্ষণ এবং প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-
(১) ছাগ-বসন্ত বা গোট পক্স (Goat Pox)
এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস ঘটিত রোগ।
- লক্ষণ: অল্প জ্বর হওয়া, চোখ ও নাক দিয়ে জল পড়া এবং নাক, কান ও বাঁটের চামড়ায় লাল ভাব ও ছোট ছোট জলফোস্কা দেখা যায়। পরবর্তীতে এই জলফোস্কা শুকিয়ে ছাল উঠে যায়।
- সতর্কতা: ছাগ-শিশুর ক্ষেত্রে প্রবল জ্বর হয় এবং ফোস্কা হওয়ার আগেই মৃত্যু হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার প্রায় ৮০ শতাংশ।
- চিকিৎসা: আক্রান্ত ছাগলকে আলাদা করতে হবে। প্রত্যহ ২-৩ বার হাইড্রোজেন পারক্সাইড ও সমপরিমাণ উষ্ণ জল দিয়ে ঘা পরিষ্কার করে অ্যান্টিবায়োটিক মলম লাগাতে হব। শুশ্রূষাকারী ব্যক্তিকে জীবাণুনাশক দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে।
(২) পিপিআর (PPR) বা গোট প্লেগ
এটি একটি মারাত্মক ভাইরাস ঘটিত রোগ যা প্রধানত বর্ষাকালে ছড়ায়।
- বিস্তার: সংস্পর্শ, খাবার জল, বিছানা ও অন্যান্য বর্জ্যের মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়ায়। সব বয়সের ছাগল আক্রান্ত হতে পারে, তবে ১-২৪ মাস বয়সীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।
- লক্ষণ: প্রবল জ্বর (১০৪-১০৫° ফা.), অবসাদ, ক্ষুধামন্দা, চোখের পর্দা লাল হওয়া, নাসাক্ষরণ (পরবর্তীতে পুঁজযুক্ত) এবং হাঁচি দেখা দেয়। শেষে ডায়রিয়া হয় এবং জলের অভাবে প্রাণী মারা যায়।
- চিকিৎসা ও প্রতিরোধ: এই রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তবে লক্ষণ অনুযায়ী ডায়রিয়া বা শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক ও স্যালাইন দেওয়া হয়। সুস্থ প্রাণীদের অবশ্যই টীকাকরণ করতে হবে।
(৩) সংক্রামক ছাগ-নিউমোনিয়া (CCPP)
পশ্চিমবঙ্গে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে ছড়ায়।
- লক্ষণ: প্রবল জ্বর, দৈহিক পরিশ্রমে অক্ষমতা, পুঁজযুক্ত নাসাক্ষরণ, হাঁপানি এবং মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া। এতে শরীরের বৃদ্ধি কমে যায়।
- প্রতিকার: অ্যান্টিবায়োটিকে তেমন ফল পাওয়া যায় না। বর্ষার আগে সমস্ত প্রাণীকে টীকাকরণ করানোই একমাত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
(৪) এঁষো/ক্ষুরা রোগ (FMD)
এটি একটি সংক্রামক ভাইরাস ঘটিত রোগ। এতে প্রাণীর মৃত্যু না হলেও দৈহিক বৃদ্ধি ও উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- লক্ষণ: প্রবল জ্বর এবং জিভ, ঠোঁট, মাড়ি, ক্ষুরের মাঝখানে ও বাঁটে ফোস্কা বা ঘা দেখা দেয়। মুখে ঘায়ের কারণে প্রাণী কিছু খেতে পারে না।
- চিকিৎসা: আক্রান্ত ছাগলকে আলাদা করে মুখের ঘা ফিটকিরি বা পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মিশ্রিত জল দিয়ে ধুয়ে জীবাণুনাশক মলম লাগাতে হবে। মশা-মাছির উপদ্রব থেকে প্রাণীকে রক্ষা করতে হবে।
(৫) অন্যান্য গুরুতর রোগ
| রোগের নাম | ধরন ও লক্ষণ | চিকিৎসা ও প্রতিরোধ |
| গলা ফোলা রোগ | ব্যাকটেরিয়া ঘটিত; প্রবল জ্বর, কষ্টকর শ্বাস-প্রশ্বাস, কাশি ও হঠাৎ মৃত্যু। | বর্ষার আগে টীকাকরণ। |
| তড়কা রোগ (Anthrax) | ব্যাকটেরিয়া ঘটিত; প্রবল জ্বর (১০৮° ফা.) ও হঠাৎ মৃত্যু। | আক্রান্ত প্রাণীকে আলাদা করা ও পেনিসিলিন ইনজেকশন দেওয়া। বর্ষার আগে টিকা দেওয়া জরুরি। |
| পেটের অসুখ | এনটেরোটক্সিমিয়া (পেটে ব্যথা, পাতলা পায়খানা) ও কক্সিডিওসিস (রক্ত আমাশয়)। | দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ও সঠিক যত্ন। |
(৬) চামড়ার রোগ ও নিত্য পরিচর্যা
- উকুন: উকুন বা পোকা-মাকড়ের কারণে চামড়ায় খোস, পাঁচড়া বা ঘা হতে পারে। উকুন হলে ৫ শতাংশ সেভিন পাউডার ব্যবহার করা যায়। ঘা পরিষ্কার করে ২.৫ শতাংশ স্যালিসাইলিক অ্যাসিড বা বেনজোয়িক অ্যাসিড মলম দিনে ২ বার লাগাতে হবে।
- ডাস্টিং: পরজীবী নাশক পাউডার স্প্রে করা।
- ডিপিং: পরজীবী নাশক দ্রবণে স্নান করানো (ভরা পেটে দুপুরে রোদ থাকাকালীন করা উচিত)।
- ব্রাশিং: দিনে অন্তত একবার শরীর ব্রাশ করলে রক্ত চলাচল ভালো থাকে ও পরজীবী কমে।
(৭) টীকাকরণ ও কৃমিনাশক সূচী
ছাগল জন্মানোর ৩ মাস পর থেকে নিয়মিত টীকাকরণ করতে হবে।
- টিকা: পিপিআর এবং ছাগ-বসন্তের টিকা বছরে একবার চামড়ার নিচে দিতে হয়। এঁনো বা খুরাই রোগের টিকা প্রতি ৬ মাস অন্তর দিতে হয়।
- কৃমিনাশক: বছরে অন্তত ৪ বার (প্রতি ৩ মাস অন্তর) বর্ষার আগে ও পরে কৃমিনাশক ঔষধ খালি পেটে খাওয়াতে হবে। গর্ভবতী বা অসুস্থ ছাগলকে এটি খাওয়ানো অনুচিত। ঔষধের সাথে ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।









