জলবিদ্যুৎ থেকে বিটকয়েনঃ ভুটানের ক্রিপ্টোকারেন্সি বিপ্লব

হিমালয়ের কোলে অবস্থিত ভুটান, একটি ছোট স্থলবেষ্টিত রাজ্য, যা দীর্ঘদিন ধরে তার অনন্য উন্নয়ন দর্শন—গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (জিএনএইচ)—এর জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। এই দর্শন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের সুখ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক সংযোগের ওপর জোর দেয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভুটান একটি নতুন পথে পা বাড়িয়েছে—বিটকয়েন মাইনিং। এই উদ্যোগ ভুটানকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উদ্ভাবনের মানচিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থানে নিয়ে এসেছে। ভারত ও চীনের মাঝে অবস্থিত এই কার্বন-নেগেটিভ দেশটি কীভাবে বিটকয়েনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা খুঁজে পাচ্ছে, এবং এই পথ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
বিটকয়েন একটি ডিজিটাল মুদ্রা, যার লেনদেন ব্লকচেইন নামক একটি শেয়ার্ড লেজারে রেকর্ড করা হয়। মোট ২১ মিলিয়ন বিটকয়েনের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ এখনো মাইন করা বাকি। মাইনিং প্রক্রিয়ায় জটিল গাণিতিক সমস্যা সমাধানের জন্য সুপার কম্পিউটার এবং প্রচুর বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ভুটান এই প্রক্রিয়ায় তার প্রাকৃতিক সম্পদ—জলবিদ্যুৎ—কে কাজে লাগিয়েছে।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী ত্শেরিং তবগে বলেন, “এটি একটি সাধারণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত। অনেকে এটি করে বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।” গ্রীষ্মকালে জলপ্রবাহ বৃদ্ধি পেলে হাইড্রোপাওয়ার প্ল্যান্টগুলো অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে, যা বিটকয়েন মাইনিংয়ে ব্যবহৃত হয়। ভুটানের ঠান্ডা আবহাওয়া (গড় তাপমাত্রা ১৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) সুপার কম্পিউটার ঠান্ডা রাখতে অতিরিক্ত কুলিংয়ের প্রয়োজনীয়তা কমায়, যা মাইনিংকে আরও লাভজনক করে।
৮ লাখ জনসংখ্যার ভুটান একাধিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সমুদ্রপথের অভাব এবং পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে কৃষি ও শিল্পায়ন সীমিত। দেশটি খাদ্যের বেশিরভাগ ভারত থেকে আমদানি করে। পর্যটন, যা জিডিপির ১০% অবদান রাখে, কোভিড-১৯ এর পরে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফিরে আসেনি। ২০২৩ সালে পর্যটন থেকে আয় ছিল ৩৩৪ মিলিয়ন ডলার, যেখানে মোট জিডিপি ছিল মাত্র ৩.০২ বিলিয়ন ডলার। উচ্চমূল্য-কম পর্যটক নীতির অংশ হিসেবে বিদেশি পর্যটকদের প্রতিদিন ১০০ ডলার টেকসই উন্নয়ন ফি দিতে হয়, যা ভারতীয়দের জন্য ১৫ ডলার।
এছাড়া, যুব বেকারত্ব (২০২৪ সালে ১৯%) এবং ব্রেইন ড্রেন ভুটানের জন্য উদ্বেগের বিষয়। ২০২২ সালে ১০% শিক্ষিত তরুণ বিদেশে পাড়ি জমান, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায়। ২০১৯-২০২৩ সালের মধ্যে অসংখ্য সরকারি কর্মকর্তা চাকরি ছেড়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৩ সালে সরকার ১০০ মিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি বিক্রি করে সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করে। ফলে ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে চাকরি ছাড়ার সংখ্যা ১,৯০০ থেকে কমে ৫০০-এ নেমে আসে।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান আরখামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ভুটানের বিটকয়েন হোল্ডিংসের মূল্য ৬০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি, যা দেশের জিডিপির ৩০%। এছাড়া, ভুটান কিছু ইথেরিয়াম এবং লিংক এআইও ধারণ করে। তবে বিটকয়েনের বাজার অস্থিতিশীল, এবং এই নির্ভরতা অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভুটানের পরিবেশবান্ধব জলবিদ্যুৎ এবং কৌশলগত পরিকল্পনা এই ঝুঁকি কিছুটা কমায়।
ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগেল ওয়াংচুক বলেছেন, “একটি ছোট দেশ হওয়া মানে আমাদের স্মার্ট হতে হবে। প্রযুক্তি আমাদের লক্ষ্য অর্জনের অপরিহার্য হাতিয়ার।” বিটকয়েন মাইনিং ভুটানের পরিবেশবান্ধব আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি নতুন পথ দেখাচ্ছে। দেশটির সীমিত বেসরকারি বিনিয়োগ এবং পরিবেশ-সচেতন নীতির কারণে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হলেও, জলবিদ্যুৎ এবং ঠান্ডা আবহাওয়া বিটকয়েন মাইনিংয়ের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে।
ট্রাক হোল্ডিংস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টসের সিইও উজ্জ্বল দীপ তাহাল বলেন, “ভুটানের সবুজ শক্তি বিটকয়েন মাইনিংয়ের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ।” ভুটান জলবিদ্যুৎ ভারতে রপ্তানি করলেও, লাভজনক না হলে সেই বিদ্যুৎ মাইনিংয়ে ব্যবহার করা হয়।
ভুটান তার সুখ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মেলবন্ধনের মাধ্যমে একটি ব্যতিক্রমী পথ বেছে নিয়েছে। বিটকয়েন মাইনিংয়ের এই সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, এটি ছোট দেশগুলোর জন্য একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। ভুটান প্রমাণ করছে, সীমিত সম্পদ নিয়েও স্মার্ট কৌশলের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অবদান রাখা সম্ভব। এই পথ কতটা টেকসই, তা সময়ই বলবে। তবে ভুটানের এই বিপ্লব নিঃসন্দেহে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
অনুরোধ!! পোষ্ট ভালো লাগলে প্লিজ উপরের শেয়ার আইকনে ক্লিক করে পোষ্টটি শেয়ার করে দিন।

