ধানের রোগ সমূহের নাম, লক্ষণ সমূহ ও প্রতিকার

আলোচ্য বিষয়:
কৃষিক্ষেত্রে ধান একটি প্রধান ফসল, কিন্তু বিভিন্ন রোগের আক্রমণে এর ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী ধানের প্রধান প্রধান রোগ, তাদের লক্ষণ ও সমন্বিত দমন ব্যবস্থা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
(১) ধানের ভাইরাসজনিত রোগ সমূহের নাম, লক্ষণ সমূহ ও প্রতিকার
ক) টুংরো (Tungro)
লক্ষণসমূহ:
- পাতার রং হলুদ হয়ে যায়।
- আক্রান্ত পাতা মুচড়িয়ে যায়।
- পাতা হেলে পড়ে এবং কাণ্ড থেকে পাতার ফাঁক বেড়ে যায়।
- কচি পাতা ছোট এবং প্রশস্ত হয়।
- গাছের বাড়-বাড়তি কমে গিয়ে বেটে হয়ে যায়।
- ফুল ফুটতে দেরী হয় এবং ছড়া পুরোপুরি থোড় থেকে বের হয় না।
- শিকড় পচে গাছ মরে যেতে পারে।
- সবুজ পাতা ফড়িং গাছে দেখা যায় এবং এলোপাথাড়ি ভাবে গাছ আক্রান্ত হয়।
রোগ হওয়ার সময় ও অনুকূল পরিবেশ:
- চারা থেকে থোড় আসার আগ পর্যন্ত এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
- নিচু জমি ও সমভাবে পরিমিত বৃষ্টি এই রোগের জন্য অনুকূল।
সমন্বিত রোগ দমন ব্যবস্থা:
- টুংরো প্রতিরোধক সম্পন্ন জাত যেমন: চান্দিনা, ব্রিশাইল, দুলাভোগ, বিআর ৬, আশা, প্রগতি, ময়না, মোহিনী, শাহীবালাম, গাজী, বিনাসাইল, কিরণ, মংগল ও দিশারী জাতের ধান চাষ করতে হবে।
- বীজতলায় ও যেসব গাছে সবুজ পাতা ফড়িং বাস করে সেগুলো দমন করুন।
- জমি হতে পানি নিষ্কাশন করে মাটি হাত দিয়ে শুকিয়ে দিন ও পরে পানি দিন।
- আক্রান্ত গাছ জমি থেকে তুলে দূরে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলুন।
- সুস্থ ও সবল চারা লাগান এবং বিকল্প পোষক ধ্বংস করুন।
(২) ধানের ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ রোগ সমূহের নাম, লক্ষণ সমূহ ও প্রতিকার
ক) পাতা পোড়া রোগ (Bacterial Leaf Blight)
লক্ষণসমূহ:
- বীজতলার চারা গাছগুলো শুকিয়ে মরে যায় এবং রোপণের পর ধানের চারা মরে যায়।
- রোগের শুরুতে পাতার অগ্রভাগ মরে ছাই সবুজ বা শুকনো খড়ের রং হয়।
- পাতার ধার হতে মরতে শুরু করে ও পরে সম্পূর্ণ শুকিয়ে মরে যায়।
- আক্রান্ত পাতায় কমলা রঙের ছোট ছোট গুটিকা দেখা যায়, যা বীজানু ভর্তি থাকে।
অনুকূল পরিবেশ:
- চারা থেকে থোড় আসা পর্যন্ত এই রোগ বেশি হয়।
- অনবরত ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টি রোগ বিস্তারে সাহায্য করে।
- পোকামাকড়ের আক্রমণ বা ঘর্ষণে পাতার ক্ষত দিয়ে বীজানু প্রবেশ করে।
- বাতাসে উচ্চ আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং অধিক নাইট্রোজেন সারের ব্যবহার রোগ বাড়িয়ে দেয়।
দমন ব্যবস্থা:
- বীজতলায় সেচ দিয়ে চারা তুলুন।
- প্রতিরোধক জাত যেমন: ব্রিশাইল, ময়না, গাজী এবং মোটামুটি প্রতিরোধক জাত যেমন: চান্দিনা, বিপ্লব, আশা, সুফলা, প্রগতি চাষ করুন।
- সুষম সার ব্যবহার করুন এবং অহেতুক ইউরিয়া সার প্রয়োগ করবেন না।
- ঝড়ো হাওয়ার পর ইউরিয়া প্রয়োগ না করে প্রতি বিঘায় ৫ কেজি এমপি (পটাশ) সার উপরিপ্রয়োগ করুন।
- ফসল কাটার পর জমির আগাছা বা নাড়া পুড়িয়ে ফেলুন।
খ) পাতার লালচে রেখা রোগ (Bacterial Leaf Streak)
লক্ষণসমূহ:
- পাতায় লম্বালম্বিভাবে ভেজা, সরু লালচে দাগ (০.৫-১ মি.মি. প্রস্থ এবং ৩.০ মি.মি. লম্বা) হয়।
- দাগগুলো বড় হয়ে লালচে রঙের হয়ে যায় ও পাতা নষ্ট হয়, ফলে ফলন কমে।
দমন ব্যবস্থা:
- এই রোগ সাধারণত বিনা ঔষধে ভালো হয়ে যায় যদি সুষম সার ব্যবহার করা হয়।
- বিপ্লব, ব্রিশাইল, দুলাভোগ, আশা, প্রগতি, ময়না, গাজী, মোহিনী, শাহীবালাম, কিরণ ও দিশারী জাতের চাষ করুন 36।
- ২-৩ কিস্তিতে ইউরিয়া প্রয়োগ করুন এবং প্রয়োজনে পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করুন।
(৩) ধানের ছত্রাকজনিত রোগ রোগ সমূহের নাম, লক্ষণ সমূহ ও প্রতিকার
ক) ধানের খোল পোড়া রোগ (Sheath Blight)
লক্ষণসমূহ:
- দূর থেকে আক্রান্ত জমি মরিচা রঙের মতো দেখা যায়।
- পানির সমান্তরালে থাকা কাণ্ডের খোলের ওপর ছাই-সবুজ বা বাদামী রঙের ছোপ ছোপ পচা দাগ দেখা যায় 40।
- রোগটি ক্রমশ ওপরের খোলসগুলোতে সংক্রামিত হয় এবং শেষ পর্যায়ে পাতা পচে যায়।
অনুকূল পরিবেশ:
- রোপণের এক মাস হতে থোড় আসা পর্যন্ত।
- গরম বাতাস, অধিক জলীয় বাষ্প এবং অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ব্যবহার।
- ঘন করে চারা লাগানো এবং জমিতে আগাছা থাকা।
দমন ব্যবস্থা:
- আক্রান্ত ফসল ও আগাছা পুড়িয়ে ফেলুন এবং জমি থেকে পানি সরিয়ে দিন।
- বেনলেট, হোমাই, টপসিন-এম বা কার্বেন্ডাজিম জাতীয় ওষুধের যেকোনো একটি হেক্টরে ২ কেজি হারে স্প্রে করুন।
- অথবা হিনোসান ৫০ ইসি ৬৪০ মি.লি. ১০০০ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করুন।
খ) খোল পচা রোগ (Sheath Rot)
লক্ষণসমূহ:
- সাধারণত ডিগ পাতা ও তার নিচের পাতার খোলে বাদামী দাগ দেখা দেয় এবং পরে সম্পূর্ণ খোল পচে যায়।
- আক্রান্ত অংশে সাদা পাউডারের মতো বস্তু দেখা যেতে পারে।
- ধানের ছড়া থোড় থেকে আংশিক বের হয় বা একেবারেই বের হয় না।
দমন ব্যবস্থা:
- সুস্থ সবল ও শোধিত বীজ ব্যবহার করুন।
- ব্রিশাইল, প্রগতি, হাসি, শাহজালাল, মংগল ও নাইজারশাইল চাষ করলে এই রোগ কম হয়।
গ) কাণ্ড পচা রোগ (Stem Rot)
লক্ষণসমূহ:
- কাণ্ডের নিচে পানির অংশে কালো চৌকা দাগ দেখা যায়, যা পরে গিট পচিয়ে দেয় এবং গাছ হেলে পড়ে।
দমন ব্যবস্থা:
- জলাবদ্ধতা দূর করুন এবং জমি শুকিয়ে আবার পানি দিন।
- ব্রিবালাম, ময়না, হাসি, শাহজালাল ও মংগল জাতের চাষ করুন।
ঘ) ধানের ব্লাস্ট রোগ (Blast)
লক্ষণসমূহ:
- পাতায় চোখের মতো দাগ হয় যার মাঝখানটা সাদা বা ছাই রঙের এবং চারপাশ গাঢ় বাদামী।
- রোগটি ছড়ার গোড়াতেও আক্রমণ করে (Neck Blast), ফলে ছড়া ভেঙে পড়ে বা ধান চিটা হয়।
দমন ব্যবস্থা:
- দুলাভোগ, প্রগতি, ময়না, গাজী, কিরণ ও দিশারী জাতের চাষ করুন।
- আক্রান্ত জমিতে সেচের ব্যবস্থা করুন এবং হিনোসান ৫০ ইসি প্রয়োগ করুন।
ঙ) অন্যান্য ছত্রাকজনিত রোগ
- পাতার স্কলড (Leaf Scald): পাতায় ভেজা ভেজা ঢেউয়ের মতো দাগ দেখা যায়।
- বাদামী দাগ (Brown Spot): পাতায় ছোট ছোট বাদামী দাগ হয়, যা পরে পুরো পাতা নষ্ট করে দেয়। পটাশ ও নাইট্রোজেনের অভাবে এটি বেশি হয়।
- বাকানী (Bakanae): কুশি হঠাৎ লম্বা ও ফেকাশে হয়ে যায় এবং পরে মারা যায়।
- চারার গোড়া পচা: চারার গোড়া পচে সাদা সুক্ষ্ম আঁশ দেখা যায়।
(৪) ধানের কৃমি ঘটিত রোগ রোগ সমূহের নাম, লক্ষণ সমূহ ও প্রতিকার
ক) উফরা (Ufra)
লক্ষণসমূহ:
- আক্রান্ত পাতায় প্রথমে সাদা ছিটেফোঁটা দাগ দেখা যায়, যা পরে বাদামী হয়।
- ধানের ছড়া কুঁচকানো বা মোচড়ানো অবস্থায় বের হয় অথবা একেবারেই বের হতে পারে না।
দমন ব্যবস্থা:
- আক্রান্ত জমির নাড়া পুড়িয়ে ফেলুন এবং পটাশ ও দস্তা সার ব্যবহার করুন।
- আক্রমণের শুরুতে ফুরাডান ৩জি হেক্টরে ৩০ কেজি হারে প্রয়োগ করুন।
খ) শিকড়ের গিট রোগ (Root Knot)
লক্ষণসমূহ:
- শিকড়ে গুটিকা সৃষ্টি হয়, গাছ হলুদ ও নিস্তেজ হয়ে যায় এবং কুশি কমে যায়।
দমন ব্যবস্থা:
- ফুরাডান ৩জি ব্যবহার করে চারা শোধন বা জমিতে প্রয়োগ করুন।
[তথ্যসূত্র: ডঃ এস এ মিয়া এবং ডঃ এ কে এম শাহজাহান, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)।]









