পুরাতন পাসপোর্ট বাতিল করে নতুন ই-পাসপোর্ট করার পদ্ধতি

বাংলাদেশে পাসপোর্ট সংক্রান্ত প্রক্রিয়া এখন অনেকটাই ডিজিটাল এবং সহজ হয়েছে। পুরাতন পাসপোর্ট বাতিল করে নতুন ই-পাসপোর্ট করার প্রয়োজন হতে পারে বিভিন্ন কারণে। যেমন, তথ্যের অমিল, পুরাতন পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়া, অথবা ইলেকট্রনিক পাসপোর্টের আধুনিক সুবিধা গ্রহণের ইচ্ছা। এই ব্লগ পোস্টে পুরাতন পাসপোর্ট বাতিল এবং নতুন ই-পাসপোর্ট করার প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ফি, এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে। এই নির্দেশিকা পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং তথ্যবহুল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
(১) ই-পাসপোর্ট কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
ই-পাসপোর্ট হলো একটি আধুনিক, মেশিন রিডেবল এবং বায়োমেট্রিক পাসপোর্ট, যা আন্তর্জাতিক নাগরিক বিমান চলাচল সংস্থার (ICAO) নির্দেশনা অনুসারে তৈরি করা হয়। এতে একটি ইলেকট্রনিক চিপ থাকে, যেখানে পাসপোর্টধারীর ব্যক্তিগত তথ্য, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, রেটিনা স্ক্যান এবং ছবি সংরক্ষিত থাকে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ২০২০ সালে ই-পাসপোর্ট চালু করেছে। এই পাসপোর্টের সুবিধা হলো এটি নিরাপদ, জালিয়াতি প্রতিরোধী এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য সহজে গ্রহণযোগ্য।
(২) কেন পুরাতন পাসপোর্ট বাতিল করতে হয়?
পুরাতন পাসপোর্ট বাতিলের প্রয়োজন হতে পারে বিভিন্ন কারণে। সাধারণ কারণগুলো হলো-
- তথ্যের অমিল: পাসপোর্টে দেওয়া নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্ম তারিখ বা অন্যান্য তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধনের সাথে মিল না থাকলে।
- পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ: পুরাতন পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বা শেষ হওয়ার কাছাকাছি হলে।
- হারিয়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত: পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে বা ব্যবহারের অনুপযোগী হলে।
- ই-পাসপোর্টে আপগ্রেড: পুরাতন হাতে লেখা বা মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (MRP) থেকে ই-পাসপোর্টে রূপান্তরের ইচ্ছা।
- ভুল তথ্য সংশোধন: পাসপোর্টে ভুল তথ্য থাকলে, যেমন ঠিকানা, বৈবাহিক অবস্থা বা পেশা।
এই কারণগুলোর জন্য পুরাতন পাসপোর্ট বাতিল করে নতুন ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা প্রয়োজন।
(৩) পুরাতন পাসপোর্ট বাতিল করার প্রক্রিয়া
পুরাতন পাসপোর্ট বাতিল করা একটি সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (MRP) বা ই-পাসপোর্ট বাতিল করা যায় না গোপনে, কারণ এতে বায়োমেট্রিক তথ্য (ফিঙ্গারপ্রিন্ট, রেটিনা স্ক্যান) সার্ভারে সংরক্ষিত থাকে। তবে, হাতে লেখা পাসপোর্ট (২০১০ সালের আগের) তথ্য গোপন করা সম্ভব, কারণ এগুলো এনালগ পদ্ধতিতে সংরক্ষিত। তবে, এটি অবৈধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
পদক্ষেপ ১: তথ্য সংশোধন বা বাতিলের প্রয়োজনীয়তা যাচাই
প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে কেন পাসপোর্ট বাতিল করা প্রয়োজন। যদি তথ্যের অমিল থাকে, তবে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করে নিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি পিতার নামে ভুল থাকে, তবে NID-তে সঠিক তথ্য আপডেট করতে হবে।
পদক্ষেপ ২: পাসপোর্ট অফিসে যোগাযোগ
পাসপোর্ট বাতিলের জন্য আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস বা বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করতে হবে। অনলাইন আবেদনের ক্ষেত্রে ভুল থাকলে, আবেদন বাতিলের জন্য অতিরিক্ত পরিচালকের (AD) কাছে দরখাস্ত লিখতে হবে। দরখাস্তে নাম, জন্ম তারিখ, পাসপোর্ট আবেদনের OID/রেফারেন্স নম্বর এবং বাতিলের কারণ উল্লেখ করতে হবে।
পদক্ষেপ ৩: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
পাসপোর্ট বাতিলের জন্য নিম্নলিখিত কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে-
- পুরাতন পাসপোর্টের মূল কপি এবং ফটোকপি।
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধনের কপি।
- পুলিশ রিপোর্ট (যদি পাসপোর্ট হারিয়ে যায় বা চুরি হয়)।
- তথ্য সংশোধনের প্রমাণপত্র (যেমন, বিবাহ সনদ, পেশার প্রমাণ)।
পদক্ষেপ ৪: ফি ফেরতের বিষয়
অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে আবেদন বাতিল হলে ফি ফেরত পাওয়া যায় না। তাই, অফলাইন পেমেন্ট (ব্যাংক ড্রাফট বা ই-চালান) করা নিরাপদ।
(৪) নতুন ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন
পুরাতন পাসপোর্ট বাতিলের পর নতুন ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে হবে। এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক এবং সহজ।
ধাপ ১: অনলাইন রেজিস্ট্রেশন
ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে www.epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে যেতে হবে। এখানে-
- “Apply Online for E-Passport/Re-Issue” বাটনে ক্লিক করুন।
- একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন বা বিদ্যমান অ্যাকাউন্টে লগইন করুন।
- ব্যক্তিগত তথ্য, পিতা-মাতার তথ্য, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা, এবং পাসপোর্টের ধরন (৫ বছর বা ১০ বছর মেয়াদী) নির্বাচন করুন।
ধাপ ২: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
নতুন ই-পাসপোর্টের জন্য নিম্নলিখিত কাগজপত্র প্রয়োজন-
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধনের কপি।
- পুরাতন পাসপোর্টের কপি (যদি থাকে)।
- বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদানের জন্য সাম্প্রতিক ছবি (৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য 3R সাইজের ল্যাব প্রিন্ট ছবি)।
- বিবাহ সনদ (যদি স্বামী/স্ত্রীর নাম যুক্ত করতে হয়)।
- পেশার প্রমাণপত্র (যেমন, শিক্ষার্থীদের জন্য আইডি কার্ড)।
- পিতা-মাতার NID (১৮ বছরের কম বয়সী আবেদনকারীদের জন্য)।
ধাপ ৩: ফি পরিশোধ
ই-পাসপোর্টের ফি পাসপোর্টের ধরন এবং প্রক্রিয়াকরণের সময়ের ওপর নির্ভর করে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী-
- ৪৮ পৃষ্ঠা, ৫ বছর মেয়াদী:
- সাধারণ (২১ কর্মদিবস): ৪,০২৫ টাকা
- জরুরি (১০ কর্মদিবস): ৬,৩২৫ টাকা
- অতি জরুরি (২ কর্মদিবস): ৮,৬২৫ টাকা
- ৪৮ পৃষ্ঠা, ১০ বছর মেয়াদী:
- সাধারণ: ৫,৭৫০ টাকা
- জরুরি: ৮,০৫০ টাকা
- অতি জরুরি: ১০,৩৫০ টাকা
ফি পরিশোধ করা যায় অনলাইনে (বিকাশ, নগদ, ক্রেডিট/ডেবিট কার্ড) বা নির্দিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে।
ধাপ ৪: বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদান
অনলাইন আবেদন জমা দেওয়ার পর অ্যাপয়েন্টমেন্টের তারিখ ও সময় নির্ধারিত হবে। আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট, রেটিনা স্ক্যান এবং ছবি প্রদান করতে হবে।
ধাপ ৫: পুলিশ ভেরিফিকেশন
আবেদন জমা দেওয়ার পর পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। বর্তমান এবং স্থায়ী ঠিকানা আলাদা হলে দুটি ঠিকানায় আলাদা ভেরিফিকেশন প্রয়োজন।
ধাপ ৬: পাসপোর্ট সংগ্রহ
প্রক্রিয়াকরণ সম্পন্ন হলে ডেলিভারি স্লিপের মাধ্যমে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে। সাধারণত ৪-৬ সপ্তাহ সময় লাগে। বিদেশে থাকলে দূতাবাসের মাধ্যমে ডাকযোগে পাসপোর্ট পাওয়া যায়।
(৫) কিছুু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
- তথ্যের সঠিকতা: আবেদন জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য দুবার যাচাই করুন। ভুল তথ্যের কারণে আবেদন বাতিল হতে পারে এবং ফি ফেরতযোগ্য নয়। আবেদন জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য যাচাই করুন। ভুল হলে আবেদন বাতিল করে পুনরায় আবেদন করতে হবে।
- অবৈধ পন্থা এড়িয়ে চলুন: পুরাতন পাসপোর্টের তথ্য গোপন করা বা বায়োমেট্রিক তথ্য মুছে ফেলার চেষ্টা অবৈধ এবং এর জন্য জেল-জরিমানা হতে পারে।
- দালালের সাহায্য এড়ানো: দালালের মাধ্যমে কাজ করলে ঝুঁকি বাড়ে। নিজে অনলাইনে আবেদন করা সহজ এবং নিরাপদ।
- অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় মেনে চলা: নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হতে হবে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিস হলে পুনরায় নিতে হবে। সময়মতো অফিসে উপস্থিত না হলে নতুন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে।
- অপ্রত্যয়িত কাগজপত্র: কোনো কাগজপত্র সত্যায়নের প্রয়োজন নেই, তবে সঠিক কপি জমা দিতে হবে।
(৬) বিদেশে ই-পাসপোর্ট আবেদন
বিদেশে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকরা বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারেন। প্রক্রিয়া একই, তবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে দূতাবাসের ওয়েবসাইট বা নির্দিষ্ট আউটসোর্সিং কোম্পানির মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ, মালয়েশিয়ায় Expat Services-এর মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়।
(৭) ই-পাসপোর্টের সুবিধা
ই-পাসপোর্টের কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো-
- উচ্চ নিরাপত্তা: ৪১টি নিরাপত্তা ফিচার, যেমন হলোগ্রাফিক ইমেজ, জালিয়াতি প্রতিরোধ করে।
- আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা: বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ এই পাসপোর্ট গ্রহণ করে।
- দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ: বায়োমেট্রিক তথ্যের কারণে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া দ্রুত হয়।
- ডিজিটাল সুবিধা: অনলাইনে আবেদন এবং স্থিতি চেক করা যায়।
(৮) ই-পাসপোর্টের অবস্থা চেক করা
আবেদনের অবস্থা জানতে www.epassport.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে ডেলিভারি স্লিপ নম্বর বা পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে চেক করা যায়। বিদেশে থাকলে দূতাবাসের ওয়েবসাইটে এই সুবিধা পাওয়া যায়।
পুরাতন পাসপোর্ট বাতিল করে নতুন ই-পাসপোর্ট করা একটি সহজ এবং ডিজিটাল প্রক্রিয়া। তবে, সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং নিয়ম মেনে আবেদন করা গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ পন্থা বা দালালের সাহায্য এড়িয়ে নিজে আবেদন করলে সময় এবং অর্থ উভয়ই সাশ্রয় হবে। ই-পাসপোর্ট বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য আন্তর্জাতিক ভ্রমণকে আরও নিরাপদ ও সহজ করেছে। তাই, সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আজই আপনার ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করুন।।









