৪টি পুষ্টির অভাবজনিত রোগসমূহঃ পয়টার, রাতকানা, রিকেটস ও রক্তশূন্যতা

৪টি পুষ্টির অভাবজনিত রোগসমূহঃ পয়টার, রাতকানা, রিকেটস ও রক্তশূন্যতা

পুষ্টির অভাবজনিত চার ধরণের রোগ, যেমন- পয়টার (Goitre); রাতকানা (Night Blindness); রিকেটস (Rikets) ও রক্তশূন্যতা সম্পর্কে কিছু গরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো-

(১) পয়টার (Goitre)

(a) পয়টার (Goitre)

◾ প্রচলিত অর্থে পলগন্ড বলতে থাইরয়েড গ্রন্থির যেকোনো ফোলাকে বোঝার। গলগজ্ঞের কিন্তু বিশেষ ধরনকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পরটার নামে ডাকা হয়, অর্থাৎ সব গলগন্ড পরটার নয়। টিউমার, ক্যান্সার, প্রদাহসহ নানা কারণে থাইরয়েড ফুলে যেতে পারে, সেগুলো গয়টার নয়।

◾ আবার, গরটার থাইরয়েড গ্রন্থির কোনো নির্দিষ্ট রোগ বোঝায় না, বরং থাইরয়েডের বিভিন্ন রোগের এক সাধারণ বহিঃপ্রকাশকে বোঝায়। নানা কারণে গয়টার হতে পারে। খাবারে আয়োডিনের অভাব গয়টার তথা গণপণ্ডের অন্যতম কারণ। সমুদ্র থেকে দূরে উত্তর বঙ্গ এবং পার্বত্য এলাকার মাটিতে আয়োডিন কম থাকায় ওই সব অঞ্চলের মানুষের এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।

(২) রাতকানা (Night Blindness)

(b) রাতকানা (Night Blindness)

◾ ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জেৱোফ্যালমিয়া (Xerophthalmia) নামক রোগ হয়। ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব পুরণ না হলে রোগটির মাত্রা ও তীব্রতা বাড়তে থাকে। জেরোফথালমিয়ার সাত থেকে আটটি মাত্রা রয়েছে, যার সর্বনিম্ন মাত্রা হচ্ছে রাতকানা। সাধারণত দুই থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা দেয়। এতে চোখের সংবেদী ‘রড’ কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্বল্প আলোতে ভালো দেখতে পায় না। চোখে সবকিছু ঝাপসা দেখা যায়।

◾ রোগটা বেড়ে গেলে কর্নিয়া ঘোলাটে হয়ে যায়। রাতকানা দশা থেকে শুরু করে চতুর্থ বা পঞ্চম মাত্রার জেরোফথ্যালমিয়া ভিটামিন ‘এ’- সহ কিছু ওষুধ প্রয়োগে ভালো হয় কিন্তু রোগ চূড়ান্ত মাত্রায় বা তার কাছাকাছি পৌঁছে গেলে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার ছাড়া আর তেমন কিছু করার থাকে না।

◾ এই রোগ প্রতিরোধের জন্য ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাদ্য, যেমন: মাছের যকৃতের তেল, কলিজা, সবুজ শাকসবজি, রঙিন ফল (পাকা আম, কলা ইত্যাদি) ও সবজি (মিষ্টি কুমড়া, গাজর ইত্যাদি) এবং মলা-ঢেলা মাছ খাওয়া উচিত।

(৩) রিকেটস (Rikets)

(c) রিকেটস (Rikets)

◾ এটি কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ নয়, ভিটামিন ‘ডি’ এর অভাবে এ রোগ হয়। অে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণ, দাঁত ও হাড় গঠন প্রভৃতি শারীরবৃত্তীয় কাজে এই ভিটামিন প্রয়োজন। দুধ, মাখন, ডিম, কডলিভার তেল ও হাঙ্গরের তেলে প্রচুর ভিটামিন ‘ডি’ পাওয়া যায়। সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির প্রভাবে মানুষের ত্বকে জমা থাকা কোলেস্টেরল থেকেও এটি তৈরি হয়, তবে সেক্ষেত্রে ভিটামিন ডি তৈরির শেষ ধাপটি সংঘটিত হয় কিডনিতে।

◾ দেহের হাড়গুলো দুর্বল হওয়া, গিঁট ফুলে যাওয়া, হাড়গুলো বিশেষ করে পায়ের হাড় বেঁকে যাওয়া ইত্যাদি এ রোগের লক্ষণ। এছাড়া এই রোগে অনেক সময় দেহের কাঠামো ঠিক থাকে না, হাড়গুলো ভঙ্গুর হয়ে যায় এবং বক্ষদেশ সরু হয়ে যায়।

◾ শিশুদের পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়াতে হবে। চোখ এবং জননাঙ্গ ঢেকে রেখে নবজাতককে কিছুক্ষণ রোদে রাখা ভালো। এতে সূর্যালোকের অতি বেগুনি রশ্মির প্রভাবে শরীরে কোলেস্টেরল থেকে ভিটামিন ‘ডি’ তৈরি হয়। নিয়মিতভাবে সারা শরীর সারা দিন কালো বা গাঢ় রঙের কাপড়ে ঢেকে রাখলে কিংবা দীর্ঘদিন ধরে ঘরের বাইরে না বের হলে ত্বক পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায় না এবং এ কারণে ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

(৪) রক্তশূন্যতা (Anemia)

(d) রক্তশূন্যতা (Anemia)

◾ আমাদের দেশে শিশু ও নারীদের ক্ষেত্রে রক্তস্বল্পতা বা রক্তশূন্যতা একটি সাধারণ রোগ। রক্তশূন্যতা হচ্ছে দেহের এমন একটি অবস্থা, যখন বয়স এবং লিঙ্গভেদে রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘনত্ব স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যায়। খাদ্যের মুখ্য উপাদান লৌহ, ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন বি-12 ইত্যাদির অভাব ঘটলে এ রোগ দেখা যায়। রক্তস্বল্পতার শতাধিক কারণ জানা গেছে এবং পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি না হয়েও রক্তস্বল্পতা হতে পারে। তবে বাংলাদেশে সাধারণত লৌহের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা বেশি হয়।

◾ শিশুদের, প্রজননের উপযুক্ত বয়সী নারীদের (15-45 বছর) এবং গর্ভবতীদের এই রোগ বেশি হয়। লৌহের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা বা রক্তশূন্যতা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। যেমন, অত্যধিক রক্তপাত ঘটলে, কৃমির আক্রমণে, লৌহ গঠিত খাদ্য উপাদান শরীরে যথাযথভাবে শোষিত না হলে, বাড়ন্ত শিশু বা গর্ভবতী নারীদের খাদ্যে লৌহের পরিমাণ কম থাকলে, অন্ত্রে সংক্রমণ ঘটলে, কম বয়সী শিশুদের খাদ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ লৌহের অভাব হলে। রক্তশূন্যতা হলে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দেয়: দুর্বলতা অনুভব করা, মাথাব্যথা, মনমরা ভাব, অনিদ্রা, চোখে অন্ধকার দেখা, খাওয়ার অরুচি, বুক ধড়ফড় করা ইত্যাদি।

◾ এ রোগ প্রতিরোধের জন্য লৌহসমৃদ্ধ খাবার, যেমন যকৃৎ, মাংস, ডিম, চিনাবাদাম, শাকসবজি, বরবটি, মসুর ডাল, খেজুরের গুড় খেতে হয়। পরীক্ষা করে অস্ত্রে কৃমির বা হুকওয়ার্ম-এর সংক্রমণ নিশ্চিত হলে কৃমিনাশক ঔষধ সেবন করা যায়। প্রয়োজন হলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পৌঁহ উপাদানযুক্ত ওষুধ সেবন করে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভবপর হয়।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা করা বিপজ্জনক হতে পারে। কেননা রক্তস্বল্পতার এমন কিছু ধরন (যেমন: থ্যালাসেমিয়া) রয়েছে, যেখানে প্রচলিত মাত্রায় পৌঁহজাতীয় ওষুধ বা খাদ্য গ্রহণ করলে রোগী আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা শুরু করার আগে তার সঠিক কারণ নির্ণয় করা আবশ্যক।

অনুরোধ!! পোষ্ট ভালো লাগলে প্লিজ উপরের শেয়ার আইকনে ক্লিক করে পোষ্টটি শেয়ার করে দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জরায়ুর সমস্যার লক্ষণ, কারণ, ঝুঁকি এবং চিকিৎসার গাইড

জরায়ুর সমস্যার লক্ষণ, কারণ, ঝুঁকি এবং চিকিৎসার গাইড

আলোচ্য বিষয়: (১) জরায়ুর সমস্যা কী? (২) জরায়ুর সমস্যার লক্ষণ (৩) জরায়ুর সমস্যার কারণ (৪) জরায়ুর সমস্যার ঝুঁকি (৫) জরায়ুর সমস্যার নির্ণয় (৬) জরায়ুর সমস্যার চিকিৎসা (৭) জরায়ুর সমস্যা প্রতিরোধের উপায় (৮) জরায়ুর সমস্যা নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণা (৯) কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন? (১০) উপসংহার Read
বৃক্ককিডনি বিকল, কিডনি ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন, মূত্রনালি সুস্থ রাখার উপায়।

কিডনি বিকল, কিডনি ডায়ালাইসিস, কিডনি প্রতিস্থাপন ও সতর্কতা

আলোচ্য বিষয়: বৃক্ক/কিডনি বিকল, বৃক্ক বা কিডনি ডায়ালাইসিস, ডায়ালাইসিস কি? ডায়ালাইসিস কিভাবে করে? কিডনি প্রতিস্থাপন/সংযোজন ও সতর্কতা। Read
পুঁই শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা

পুঁই শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা

আলোচ্য বিষয়: (১) পুঁই শাকের উপকারিতা (২) পুঁই শাকের অপকারিতা Read
কত বছর পর্যন্ত পুরুষাঙ্গ বৃদ্ধি পায়

কত বছর পর্যন্ত পুরুষাঙ্গ বৃদ্ধি পায়?

আলোচ্য বিষয়: (১) পুরুষাঙ্গের বৃদ্ধি কখন শুরু হয়? (২) কত বছর পর্যন্ত পুরুষাঙ্গ বৃদ্ধি পায়? (৩) পুরুষাঙ্গের বৃদ্ধির পেছনে কী কী কারণ কাজ করে? (৪) বয়ঃসন্ধির পর পুরুষাঙ্গ কি বৃদ্ধি পায়? (৫) ২১ বছরের পর পুরুষাঙ্গ বড় করার উপায় কী? (৬) পুরুষাঙ্গের বৃদ্ধি নিয়ে ভুল ধারণা (৭) পুরুষাঙ্গের গড় আকার কত? (৮) কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন? (৯) উপসংহার Read
বাচ্চা না হওয়ার কারণ ও করণীয়

বাচ্চা না হওয়ার কারণ ও করণীয়

আলোচ্য বিষয়: (১) মেয়েদের বাচ্চা না হওয়ার কারণ (২) ছেলেদের বাচ্চা না হওয়ার কারণ (৩) বাচ্চা না হওয়ার পেছনে খাদ্য ও নিউট্রিশনের ভূমিকা (৪) বাচ্চা না হলে করণীয় Read
পেটের বিভিন্ন রকম সমস্যা/পেটের বিভিন্ন রোগঃ (a) অজীর্ণতা বা বদহজম (b) আমাশয় (c) কোষ্ঠকাঠিন্য বা পায়খানা কষা (d) গ্যাস্ট্রিক ও পেপটিক আলসার (e) অ্যাপেনডিসাইটিস (f) কৃমিজনিত রোগ ও (g) ডায়রিয়া ইত্যাদি সমস্যা বা রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও করণীয়।

পেটের বিভিন্ন রকম সমস্যা বা রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও করণীয়ঃ বদহজম, আমাশয়, পায়খানা কষা, গ্যাস্ট্রিক, পেপটিক আলসার, অ্যাপেনডিসাইটিস, কৃমিজনিত রোগ, ডায়রিয়া ইত্যাদি

আলোচ্য বিষয়: পেটের বিভিন্ন রকম সমস্যা বা রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও করণীয়ঃ বদহজম, আমাশয়, পায়খানা কষা, গ্যাস্ট্রিক, পেপটিক আলসার, অ্যাপেনডিসাইটিস, কৃমিজনিত রোগ, ডায়রিয়া ইত্যাদি। Read
ছাগলের মাংসের উপকারিতা informationbangla.com

ছাগলের মাংসের উপকারিতা

আলোচ্য বিষয়: (১) ছাগলের মাংসের উপকারিতা কি? ছাগলের মাংস কেন খাবেন? (২) ছাগলের মাংসের অপকারিতা কি? কারা ছাগলের মাংস খাবেন না? (৩) কীভাবে ছাগলের মাংস খাবেন? (৪) ছাগলের মাংসের উপকারি পুষ্টি উপাদান সমূহ (৫) উপসংহার Read
বীর্য বাহির হয় না বা রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন কী, বীর্য বাহির না হবার কারণসমূহ

বীর্য বাহির হয় না বা রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন কী? বীর্য বাহির না হবার কারণসমূহ

আলোচ্য বিষয়: পুরুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন (অর্থাৎ বীর্য বাহির হয় না)। এই সমস্যাটি খুবই কম সংখ্যক পুরুষের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়, তবে এটি একটি জটিল সমস্যা নয়—অনেকে মনে করেন কিন্তু এটা অনেক জটিল নয়। Read
স্নায়বিক ও মাথার রোগ সমূহঃ প্যারালাইসিস (Paralysis), এপিলেপসি (Epilepsy) ও (c) পারকিনসন রোগ (Parkinson's disease) কি? রোগ হওয়ার কারণ ও রোগের লক্ষণ।

৩টি স্নায়বিক ও মাথার রোগ সমূহঃ প্যারালাইসিস, এপিলেপসি ও পারকিনসন রোগ কি? রোগ হওয়ার কারণ ও রোগের লক্ষণ

আলোচ্য বিষয়: নিম্নে ৩টি স্নায়বিক ও মাথার রোগ সমূহঃ প্যারালাইসিস, এপিলেপসি ও পারকিনসন রোগ কি? রোগ হওয়ার কারণ ও রোগের লক্ষণ তুলে ধরা হলো- Read
শীতে পায়ের গোড়ালি ফাটা রোধ করার উপায়

শীতে পায়ের গোড়ালি ফাটা দূর করার উপায়

আলোচ্য বিষয়: চলুন আজ জেনে নেই, কীভাবে পায়ের গোড়ালি ফাটা দূর করতে পারবেন- (১) পায়ের গোড়ালি ফাটার কারণ (২) শীতে পায়ের গোড়ালি ফাটা রোধ করার উপায় Read