বাংলাদেশে ঈদ কেন সৌদি আরবের সাথে একই দিনে হয় না? কোনটা আসলে ঠিক?

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আজকের এই ব্লগ পোস্টটা খুবই সাধারণ বিষয় নিয়ে লিখছি, বিষয়টা হলো: বাংলাদেশে ঈদ কেন সৌদি আরবের সাথে একই দিনে হয় না? কোনটা আসলে ঠিক? সৌদির সাথে মিল রেখে ঈদ করা ভালো, নাকি আমাদের দেশের চাঁদ দেখে পরের দিন ঈদ করা?
এটা নিয়ে প্রতি বছর রমজান-ঈদের সময় ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়। কেউ বলে “সৌদি তো মক্কা-মদিনার দেশ, ওদের সাথে মিল রাখা উচিত!” আবার কেউ বলে “না ভাই, চাঁদ তো আমাদের আকাশে দেখা যায়নি, আমরা কীভাবে একদিন আগে ঈদ করব?”
চলুন, একদম শুরু থেকে সহজ করে বোঝাই।
প্রথম কথাঃ চাঁদ দেখার নিয়মটা কী?
নবীজি (সা.) বলেছেন,
“চাঁদ দেখে রোজা শুরু করো, চাঁদ দেখে রোজা ভাঙো (ঈদ করো)।”
(বুখারি ও মুসলিম)
এখানে খুব স্পষ্ট কথা – চাঁদ দেখে। কিন্তু কার চাঁদ? সারা বিশ্বের একই চাঁদ তো! তাহলে সমস্যা কোথায়?
সমস্যা হলো দেখার জায়গা। পৃথিবী গোলাকার। সৌদি আরব আমাদের থেকে প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা পশ্চিমে। সূর্যাস্ত সৌদিতে আমাদের থেকে আগে হয়। ফলে চাঁদ যখন সৌদির আকাশে সূর্যাস্তের পর একটু উঁচুতে উঠে আসে, তখন বাংলাদেশে সূর্য এখনো ডোবে না। আমাদের সূর্য ডোবার পর যখন আকাশ অন্ধকার হয়, তখন চাঁদটা আরও নিচে চলে যায় বা দেখা যায় না।
অর্থাৎ – সৌদিতে চাঁদ দেখা গেলেও বাংলাদেশে সেদিন দেখা যায় না। পরের দিন দেখা যায়। এজন্যই বেশিরভাগ বছর আমাদের ঈদ সৌদির একদিন পর হয়।
এটা কি নতুন কথা? না, এটা শত শত বছরের নিয়ম
পুরনো আলেমরা এটাকে বলেন ইখতিলাফুল মাতালে – অর্থাৎ “আলাদা আলাদা জায়গায় চাঁদ দেখা”।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.), ইমাম শাফেয়ী (রহ.), ইমাম আহমদ (রহ.) – প্রায় সবাই এই মতের।
- সাহাবী ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছিলেন, সিরিয়ায় চাঁদ দেখা গেলেও মদিনায় না দেখা গেলে মদিনাবাসী সেটা মানবে না।
অর্থাৎ, নিজের এলাকায় চাঁদ দেখা গেলে তবেই মাস শুরু/শেষ। দূরের দেশের চাঁদ দেখলেই সবাই মানতে হবে – এটা পুরনো ফিকহের মূলধারার মত নয়।
তাহলে কেন কিছু লোক সৌদির সাথে একদিনে ঈদ করে?
কারণগুলো ভালোই-
- মক্কা-মদিনার সাথে মিল রাখতে চান।
- হজের সময় আরাফাতের দিন সবাই একসাথে হয়, তাই ঈদও একদিনে হওয়া উচিত মনে করেন।
- টিভি-ইন্টারনেটে সৌদির ঘোষণা দেখে সুবিধা হয়।
- কিছু আলেম বলেন, আজকাল যোগাযোগ এত ভালো, তাই সারা বিশ্বে একই দিনে হওয়া উচিত।
কিন্তু এই মতটা সংখ্যালঘু। বেশিরভাগ দেশ (বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া) নিজের চাঁদ দেখে ঈদ করে।
বাংলাদেশে আসল নিয়ম কী?
আমাদের দেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি আছে। ধর্মমন্ত্রী সাহেবের নেতৃত্বে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এটা চালায়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে চাঁদ দেখার খবর আসে। সবাই একমত হলে ঘোষণা হয়।
এটা সরকারি, অফিসিয়াল। এই নিয়ম মেনে চললে কোনো গুনাহ হয় না। বরং এটাই শরিয়তসম্মত।
- সৌদির সাথে একই দিনে ঈদ করা → উদ্দেশ্য ভালো হতে পারে, কিন্তু আমাদের আকাশে চাঁদ না দেখে ঈদ করলে হাদিসের সরাসরি নির্দেশ মানা হয় না। এটা জায়েজ হলেও প্রধান মত নয়।
- সৌদির পরের দিন ঈদ করা → এটাই যৌক্তিক, বৈজ্ঞানিক, শরিয়তের মূলধারার মত, আর বাংলাদেশের অফিসিয়াল নিয়ম। এতে কোনো সমস্যা নেই।
শেষ কথা
ঈদ তো আনন্দের দিন। তর্ক করে মন খারাপ করার দরকার নেই। যে যার মাজহাব/আলেমের মত অনুসরণ করে ঈদ করুক। কিন্তু একে অপরকে খারাপ বলবেন না।
আমরা সবাই মুসলিম। এক আল্লাহর বান্দা। ঈদের দিনে দোয়া করি – আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে রাখুন, ঐক্য দান করুন, আর পরের বছর যেন সবাই একসাথে ঈদ করতে পারি (যদি চাঁদের অবস্থা তাই হয়)।
সবাইকে ঈদ মোবারক!
আপনার মতামত কমেন্টে জানান – আপনি কোনটা মানেন? সৌদির সাথে, নাকি দেশের চাঁদ দেখে?
[তথ্যসূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিয়ম, জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি, ফিকহের ক্লাসিক্যাল মতামত]






