মাসকলাই এর জাত

মাসকলাই এর জাত

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত মাসকলাইয়ের বিভিন্ন উন্নত জাত হল বারি মাস-১, বারি মাস-২ (শরৎ), বারি মাস-৩ (হেমন্ত) এবং বারি মাস-৪ ইত্যাদি। বারি উদ্ভাবিত এ জাতসমূহ কৃষক পর্যায়ে আবাদ করে দেশে ডালের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব।

ডালশস্যটির চাষ ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই চলছে। এটি বনেও জন্মে, তবে এঁটেল মাটিতে ভাল ফলে। খরাসহিষ্ণু এই ডাল বর্ষা ও শীত মৌসুমের ফসল। ধানের সঙ্গে প্রায়শ পর্যায়িক চাষে এবং কখনও কখনও মিশ্রচাষেও ফলানো হয়। অগভীর চষা জমিতেই ভাল ফলন দেয়, গভীর চষা জমিতে ফলের বদলে ডালপালাই বেশি বাড়ে। বাংলাদেশে মাসকলাই একটি গুরুত্বপূর্ণ আমিষ সমৃদ্ধ সুপাচ্য খাদ্য উপাদান।

মাষকলাই ডাল প্রচুর পুষ্টি গুণ সম্পন্ন ডাল। এর প্রতি ১০০ গ্রামে আছেঃ ক্যালরিঃ ৩৪১ পটাসিয়ামঃ ৯৮৩ মি. গ্রা. প্রোটিনঃ ২৫ গ্রাম সোডিয়ামঃ ৩৮ মি.গ্রা. কেলসিয়ামঃ ১৩৮ মি. গ্রা. আয়রনঃ ৭.৫৭ মি. গ্রা. প্রায়।

নিম্নে মাসকলাই এর জাতসমূহের পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হলো-

(১) বারি মাস-১

১৯৮১ সালে ভারত থেকে পান্ত ৩০ নামে মাসকলাইয়ের একটি অগ্রবর্তী লাইন আনা হয়। পরবর্তীতে বহুস্থানীক পরীক্ষার মাধ্যমে এ জাত উচ্চ ফলনশীল হিসেবে বিবেচিত হয় এবং ১৯৯০ সালে কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য বারি মাস-১ নামে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে।

বারি মাস-১
বারি মাস-১
  • গাছের উচ্চতা ৩২-৩৬ সেমি।
  • এ জাতের বীজের রং কালচে বাদামী। বীজের আকার বড়।
  • হাজার বীজের ওজন ৩৮-৪৩ গ্রাম।
  • জাতটি দিবস নিরপেক্ষ হওয়ার ফলে খরিফ-১ ও খরিফ-২ মৌসুমে চাষ করা যায়।
  • ডাল রান্না হওয়ার সময় কাল ৩০-৩৫ মিনিট।
  • আমিষের পরিমাণ ২১-২৩%।
  • জীবনকাল ৬৫-৭০দিন।
  • ফলন হেক্টরপ্রতি ১৪০০-১৫০০ কেজি।
  • এ জাত হলদে মোজাইক ভাইরাস রোগ সহনশীল।

(২) বারি মাস-২ (শরৎ)

মাসকলাইয়ের এ জাতটি ১৯৮৭ সালে বিএমএ-২১৪১ এবং বিএমএ-২১৪০ অগ্রবর্তী লাইনের মধ্যে সংকরায়ণ করা হয়। পরবর্তীতে প্রাথমিক, অগ্রগামী ও অঞ্চলভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে এ জাতটি দেশে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়।

বারি মাস-২
বারি মাস-২
  • গাছের আকার মধ্যম। গাছের উচ্চতা ৩৩-৩৫ সেমি। স্থানীয় জাতের মতো লতানো হয় না।
  • পত্র ফলক মাঝারী সরু। পাকা ফলের রং কালচে, ফল খাড়া, ফলের গায়ে শুং আছে।
  • বীজের রং কালচে। বীজের আকার স্থানীয় জাতের চেয়ে বেশ বড়।
  • হাজার বীজের ওজন ৩২-৩৬ গ্রাম।
  • রান্না হওয়ার সময়কাল ৩০-৩৫ মিনিট।
  • আমিষের পরিমাণ ২১-২৪%।
  • জীবনকাল ৬৫-৭০ দিন।
  • ফলন হেক্টরপ্রতি ১৪০০-১৬০০কেজি।
  • জাতটি দিবস নিরপেক্ষ এবং হলদে মোজাইক ভাইরাস রোগ সহনশীল।

(৩) বারি মাস-৩ (হেমন্ত)

মাসকলাইয়ের এ জাতটি ভারত হতে সংগৃহীত লাইন বিএমএ-২১৪০ এবং বিএমএ-২০৩৮ এর মধ্যে সংকরায়ণ প্রক্রিয়ায় উদ্ভাবন করা হয়। পরবর্তীতে অঞ্চলভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন করা হয়।

বারি মাস-৩
বারি মাস-৩
  • গাছের আকার মধ্যম। গাছের উচ্চতা ৩৫-৩৮ সেমি। স্থানীয় জাতের মতো লতানো হয় না।
  • ফল পাকলে কালো হয়। শুঁটিতে ঘন শুং আছে।
  • বীজের রং কালচে। বীজের আকার স্থানীয় জাতের চেয়ে বড়। হাজার বীজের ওজন ৪০-৪৫ গ্রাম।
  • রান্না হওয়ার সময়কাল ৩০-৩৭ মিনিট।
  • আমিষের পরিমাণ ২১-২৪%।
  • জীবনকাল ৬৫-৭০ দিন।
  • ফলন হেক্টরপ্রতি ১৫০০-১৬০০ কেজি।
  • এ জাত হলদে মোজাইক ভাইরাস রোগ সহনশীল।

(৪) বারি মাস-৪

প্রস্তাবিত লাইনটি ডাল গবেষণা কেন্দ্রে ২০০৭ সালে বারি মাস-২ ও BBL-05016 এর সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয়। পরবর্তীতে F3 ও F4 জেনারেশনে উক্ত কৌলিক সারিটি অগ্রায়িত করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে Pure line হিসেবে লাইনটিকে নির্বাচন করা হয়।

এর পর ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জয়দেবপুর, যশোর, জামালপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, বরেন্দ্র ও পাবনা অঞ্চলে ফলন ও অভিযোজন ক্ষমতা, রোগ বালাই ও পোকান্ডমাকড় সংবেদনশীলতা এবং গুণগত মান মূল্যায়ন করা হয়। তন্মধ্যে এটি উচ্চফলনশীল এবং পোকা ও রোগ প্রতিরোধী লাইন হিসেবে নির্বাচন করা হয়।

বারি মাসকলাই-৪ এর ফলসহ গাছ
বারি মাসকলাই-৪ এর ফলসহ গাছ

দীর্ঘদিন পরীক্ষার পর লাইনটি একটি সম্ভাবনাময় লাইন হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় জাত হিসেবে মুক্তায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয় এবং ২০১৭ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক বারি মাস-৪ হিসেবে অবমুক্ত করা হয়।

জাতের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য-

  • গাছ খাটো আকৃতির (৪২-৪৬ সেমি)।
  • পাতা সবুজ রঙের ও কান্ড খয়েরী পিগমেন্টেশনযুক্ত।
  • বীজ কালচে বাদামী বর্ণের।
  • পাউডারী মিলডিউ ও হলুদ মোজাইক রোগ সহনশীল।
  • গাছে ফলের সংখ্যা বেশি (২৮-৩১টি)।
  • তুলনামূলক বড় আকৃতির বীজ (১০০০ বীজের ওজন ৫০.৪-৫৪.০ গ্রাম)।
  • জীবনকাল: ৬৯-৭৩ দিন।
  • ফলন: ১২৫০-১৪৪০ কেজি/হেক্টর।

অনুরোধ!! পোষ্ট ভালো লাগলে প্লিজ উপরের শেয়ার আইকনে ক্লিক করে পোষ্টটি শেয়ার করে দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পটল চাষ পদ্ধতি

পটল চাষ পদ্ধতি

আলোচ্য বিষয়: (১) পটলের জাতের নাম (২) হাইব্রিড পটলের জাত পরিচিতি (৩) পটল চাষ পদ্ধতি বর্ণনা Read
ক্যাপটাস গাছের চাষ বা টবে ক্যাকটাস চাষ পদ্ধতি

ক্যাকটাস গাছের চাষ বা টবে ক্যাকটাস চাষ পদ্ধতি

আলোচ্য বিষয়: (১) ক্যাকটাসের জাত পরিচিতি (২) ক্যাপটাস গাছের চাষ বা টবে ক্যাকটাস চাষ পদ্ধতি (৩) ক্যাকটাস চাষে গাছের পরিচর্যা (৪) ক্যাকটাস চাষে রোগবালাই দমন ব্যবস্থাপনা Read
কালোজিরা চাষ পদ্ধতি

কালোজিরা চাষ পদ্ধতি

আলোচ্য বিষয়: (১) কালোজিরা গাছের জাত ও বৈশিষ্ট্য (২) কালোজিরা চাষ পদ্ধতি Read
মৃত্তিকা পানি কাকে বলে, মৃত্তিকা পানির গুরুত্ব ও মৃত্তিকা পানির শ্রেনিবিভাগ

মৃত্তিকা পানি কাকে বলে? মৃত্তিকা পানির গুরুত্ব ও মৃত্তিকা পানির শ্রেনিবিভাগ

আলোচ্য বিষয়: (১) মৃত্তিকা পানি কাকে বলে? (২) মৃত্তিকা পানির গুরুত্ব (৩) মৃত্তিকা পানির শ্রেনিবিভাগ Read
কামরাঙ্গা শিম চাষ পদ্ধতি

কামরাঙ্গা শিম চাষ পদ্ধতি

আলোচ্য বিষয়: (১) কামরাঙ্গা শিমের কিছু বৈশিষ্ট্য (২) কামরাঙ্গা শিমের জাত পরিচিতি (৩) কামরাঙ্গা শিম চাষ পদ্ধতি বর্ণনা (৪) কামরাঙ্গা শিম চাষের প্রয়োজনীয়তা Read
মুলা চাষ পদ্ধতি

মুলা চাষ পদ্ধতি

আলোচ্য বিষয়: (১) মুলার জাতের নাম ও পরিচিত (২) মুলা চাষ পদ্ধতি Read
রজনীগন্ধা ফুলের বৈশিষ্ট্য ও চাষ পদ্ধতি

রজনীগন্ধা ফুলের বৈশিষ্ট্য ও চাষ পদ্ধতি

আলোচ্য বিষয়: (১) রজনীগন্ধার পরিচয় (২) রজনীগন্ধা ফুলের ব্যবহার (৩) রজনীগন্ধা ফুলের বৈশিষ্ট্য (৪) রজনীগন্ধা ফুলের জাত পরিচিতি (৫) রজনীগন্ধা ফুলের চাষ পদ্ধতি Read
বীজের অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষা

বীজের অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষা

আলোচ্য বিষয়: (১) গম বীজের অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষা (২) ভুট্টা বীজের অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষা (৩) চীনাবাদাম বীজের অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষা Read
রজনীগন্ধা ফুলের বৈশিষ্ট্য ও রজনীগন্ধা ফুল চাষ পদ্ধতি এবং পরিচর্যা

রজনীগন্ধা ফুলের বৈশিষ্ট্য ও রজনীগন্ধা ফুল চাষ পদ্ধতি এবং পরিচর্যা

আলোচ্য বিষয়: (১) রজনীগন্ধা ফুলের বৈশিষ্ট্য (২) রজনীগন্ধা ফুল চাষ পদ্ধতি এবং পরিচর্যা Read
আনারস চাষের পদ্ধতি (জাতের নামসহ)

আনারস চাষের পদ্ধতি (জাতের নামসহ)

আলোচ্য বিষয়: (১) আনারসের উন্নত জাতের নাম ও বৈশিষ্ট্য (২) আনারস চাষ পদ্ধতির বর্ণনা (৩) হরমোন প্রয়োগে সারা বছর আনারস চাষের পদ্ধতি Read