মুসলমানেরা অশিক্ষিত এবং পশ্চাৎপদ?!

আজকের দিনে অনেক সময় শোনা যায় যে, মুসলমানরা অশিক্ষিত এবং পিছিয়ে পড়া একটি জাতি। এই কথাটি শুনতে যেমন খারাপ লাগে, তেমনি ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এর কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। যারা এমন কথা বলেন, তারা সম্ভবত ইসলামের মূল নীতি এবং এর গৌরবময় ইতিহাস সম্পর্কে অবগত নন।
আসুন, আমরা খুব সহজভাবে, কিন্তু তথ্য সহকারে দেখি—ইসলাম জ্ঞানচর্চাকে কীভাবে দেখে এবং অতীতে মুসলিমরা কী কী অবদান রেখেছিল।
১. জ্ঞানের ভিত্তি: কোরআনের প্রথম নির্দেশ ‘পড়ুন’
অন্যান্য ধর্ম যখন উপাসনা বা আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিল, তখন ইসলাম শুরু করেছিল জ্ঞান এবং যুক্তিকে সামনে রেখে।
- মহান আল্লাহর প্রথম বাণী: পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের প্রতি যে প্রথম শব্দটি পাঠিয়েছিলেন, সেটি ছিল—“ইক্বরা” (পড়ুন বা Read)। নামাজ, রোজা বা অন্য কোনো ইবাদতের আগে ‘পড়ার’ এই নির্দেশটিই প্রমাণ করে ইসলামে জ্ঞানের গুরুত্ব কতখানি।
- জ্ঞানার্জন ফরয (বাধ্যতামূলক): রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর ওপর ফরয (বাধ্যতামূলক)।” এই নির্দেশের ফলস্বরূপই মুসলিম সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে জ্ঞানচর্চার একটি বিরাট ঢেউ উঠেছিল।
এই ধর্মীয় ভিত্তিই প্রমাণ করে যে, কোনো মুসলমান অশিক্ষিত বা পশ্চাৎপদ থাকাটা আসলে ইসলামের মূল আদর্শের বিরোধী কাজ।
২. স্বর্ণযুগ: জ্ঞানের আলোয় জগৎ আলোকিত
জ্ঞান অর্জনের এই ধর্মীয় নির্দেশকে পালন করতে গিয়ে মুসলিমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে এক বিশাল বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। এই যুগকে বলা হয় ‘ইসলামের স্বর্ণযুগ’।
- বিশ্ববিদ্যালয় ও বাইতুল হিকমাহ: মাত্র কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই মুসলিম শাসিত শহর, যেমন—বাগদাদ, কর্ডোবা, কায়রো ও দামেস্ক, পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সুবিশাল ‘বাইতুল হিকমাহ’ (House of Wisdom), যা ছিল আজকের যুগের প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র ও লাইব্রেরি।
- অনুসন্ধান ও আবিষ্কার: সে সময়কার মুসলিম বিজ্ঞানীরা শুধু পূর্বের গ্রিক বা ভারতীয় জ্ঞান অনুবাদই করেননি, বরং সেই জ্ঞানকে আরও উন্নত করে নতুন নতুন আবিষ্কার করেছিলেন। শত শত বছর ধরে পৃথিবীর নেতৃত্ব ছিল মুসলমানদের হাতে।
৩. যুগান্তকারী আবিষ্কারে মুসলিমদের অবদান
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আজকের আধুনিক বিজ্ঞান যে স্তম্ভগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার অনেকগুলোই মুসলিমদের দেওয়া।
| ক্ষেত্র | মুসলিম অবদান | গুরুত্ব |
| গণিত | ‘আল-জেব্রা’ (বীজগণিত) আবিষ্কার। শূন্যের ধারণা (যা ছাড়া গণনা অসম্ভব)। | ‘Algebra’ শব্দটি নিজেই এসেছে মুসলিম গণিতজ্ঞ আল-খোয়ারিজমি-এর বই ‘আল-জাবর’-এর নাম থেকে। |
| চিকিৎসা | ইবনে সিনা’র (Avicenna) ‘আল-কানুন ফিত-তিব’ (The Canon of Medicine) গ্রন্থ। | এই বইটি প্রায় ৫০০ বছর ধরে ইউরোপের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে প্রধান পাঠ্যপুস্তক ছিল। তারা রোগের চিকিৎসা ও হাসপাতালের ধারণা উন্নত করেন। |
| জ্যোতির্বিদ্যা | অ্যাস্ট্রোল্যাব (উচ্চতা ও অবস্থান নির্ণায়ক যন্ত্র) তৈরি। উন্নত মানচিত্র তৈরি। | এই আবিষ্কারগুলোই কলম্বাস বা অন্য ইউরোপীয় নাবিকদের দূর-দূরান্তে সমুদ্রযাত্রা এবং বিশ্ব আবিষ্কারে সাহায্য করেছিল। |
| রসায়ন | জাবির ইবনে হাইয়ানকে আধুনিক রসায়নের জনক বলা হয়। তিনি অ্যাসিড (যেমন সালফিউরিক অ্যাসিড) আবিষ্কার করেন। | পরীক্ষামূলক পদ্ধতির মাধ্যমে রসায়নকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। |
৪. তাহলে আজকের পিছিয়ে পড়া কেন?
যদি আমাদের ইতিহাস এতই গৌরবময় হয়, তবে আজকের দিনে কেন মুসলমানদের একটি অংশ পিছিয়ে আছে?
আসলে, জ্ঞানচর্চা থেকে মুসলমানদের পিছিয়ে পড়াটা ইসলামের কোনো সমস্যা নয়, বরং ইসলামের এই ‘পড়ুন’ এবং ‘জ্ঞানার্জন ফরয’—এই প্রধান নির্দেশ থেকে সরে আসার ফল। যখন থেকে মুসলিম শাসকরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করলেন, তখন থেকেই মুসলিম সভ্যতা পিছিয়ে পড়তে শুরু করল।
বর্তমানে আমরা যা দেখি, তা ইসলামের আসল রূপ নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা আর জ্ঞানের প্রতি অনীহার ফল।
শেষ কথা
জ্ঞানচর্চার এই গৌরবময় ইতিহাস আমাদের সম্পদ। অশিক্ষিত ও পশ্চাৎপদ এই ধারণাটি একটি মিথ্যা অভিযোগ, যা আমাদের ইতিহাসের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের কর্তব্য হলো, আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই জ্ঞানপিপাসু মানসিকতাকে ফিরিয়ে আনা এবং নতুন করে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়া।









