লাভজনক খামার করতে ও গরুর খামার করে লস করতে না চাইলে করণীয়

প্রিয় ‘ইনফরমেশন বাংলা’-এর পাঠকগণ, আজকে আলোচনাতে আপনাদের স্বাগতম, আজকের পর্বে আমরা আলোচনা করব খামারে ক্ষতির ঝুকি থেকে নিরাপদে থাকার উপায় সমূহ কি?

(১) সকল খামারিদের জন্য সকর্কতা
⮚ প্রাণীর পুষ্টিকর খাদ্যের উপর নির্ভর করছে প্রত্যাশিত উৎপাদন। হঠাৎ প্রাণীর খাদ্যের পরিবর্তন করা হলে এবং প্রাণীর খাদ্যে পুষ্টির মান সঠিক না হলে খামারের উৎপাদন কমে যাবে।
⮚ সাধারণত খামারের পরিবেশ সুরক্ষা না থাকলে সহজেই প্রাণীর দেহে রোগ-জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। তাই খামারের পরিবেশ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সকল প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
⮚ খামারের প্রতিটি প্রাণিকে নিয়মিত টিকা প্রদান ও কৃমিনাশক প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।
⮚ খামারের বাসস্থান/আঙ্গিনা দৈনিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করতে হবে।
⮚ প্রাণির খাবার পাত্র ও পানির পাত্র অবশ্যই দৈনিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে ব্যবহার করতে হবে।
⮚ প্রাণিকে প্রত্যহ পরিষ্কার পানি। টাটকা খাদ্য খাওয়াতে হবে।
⮚ প্রাণির খাদ্য উপাদান ভেজালমুক্ত ও গুণগত মানের হতে হবে।
(২) সুস্থ ও অসুস্থ পশুর ১০টি পার্থক্য জানা
নিম্নে উল্লিখিত সুস্থ ও অসুস্থ পশুর ১০টি পার্থক্য জেনে রাখুন-
১। সুস্থ পশুর মাজলে (ঠোঁটের লোমবিহীন অংশ) ভেজা ভেজা বিন্দু বিন্দু ঘাম থাকবে। অসুস্থ পশুর মাজলে ঘাম থাকবে না।
২। সুস্থ পশুর মুখ থেকে সাধারনত লালা পড়েনা। অন্যদিকে অসুস্থ পশুর মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা নিগর্ত হয়।
৩। সুস্থ পশু স্বাভাবিকভাবেই জাবর কাটবে। অপরদিকে অসুস্থ পশু জাবর কাটবেনা।
৪। সুস্থ পশুর লেজে কোন মশামাছি বা কীটপতঙ্গ গায়ে বসলে লেজের সাহায্যে তাৎক্ষণিক ভাবে তাড়িয়ে দেয়। অসুস্থ পশুরলেজ নিশ্চল থাকে।
৫। সুস্থ পশুর চোখ পরিস্কার থাকে এবং কান সবর্দা সজাগ থাকে ও সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এবং অসুস্থ পশুর চোখে আঘাত লাগলে বা সিস্ট হলে চোখ থেকে পানি পড়ে এবং জন্ডিস হলে চোখ হলুদ বর্ন ধারন করে।
৬। সুস্থ পশুর শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকে এবং পশুর শ্বাস প্রশ্বাস অস্বাভাবিক থাকে।
৭। সুস্থ পশুর-খাদ্য গ্রহন স্বাভাবিক থাকে। অপরদিকে অসুস্থ পশুর অনেক সময় খাবার নাক মুখ দিয়ে বের হয়ে আসে।
৮। সুস্থ পশুর নাক পরিস্কার থাকে ও অসুস্থ পশুর নাক দিয়ে তরল পদার্থ বের হয়।
৯। সুস্থ পশুর চামরা কোমল, মসৃন, ও চাকচিক্যপূর্ন হয়। অসুস্থ ক্ষেত্রে তা খসখসে ও রুক্ষ হয়। পশুর লোম শায়িত অবস্থায় থাকে এবং খাড়া থাকে।
১০। সুস্থ পশুর বক্ষদেশের সকল হাড় স্পষ্ট দেখা যাবে,লেজের গোড়া সংকীর্ন থাকবে। অপরদিকেঅসুস্থ পশুরবক্ষদেশের হাড় স্পষ্ট দেখা যাবেনা। লেজের গোড়া প্রশস্ত থাকবে।
(৩) গবাদি পশুর খাবার পাত্র উঁচু না করা
গবাদি পশুকে আল্লাহ মাথা নিচু করে খাবার খাবে এমন করে সৃষ্টি করেছেন। তার মানে শুধু মাথা নিচু করাই না, আমরা অযথা খাদ্য পাত্র উঁচু করি, এতে তার স্লাইভা/থুতু প্রোডাকশন কম হয় যার কারনে রুমেনের এক্টিভিটিতে প্রভাব পড়ে। সহজভাবে বলতে গেলে খাবার খরচ অনুযায়ি মাংশ উৎপাদন হবে না। খাবার পাত্র নিচু করে দিলে গরুর ঘার মোটা হয়।
(৪) মশা-মাছি দূর বা নিয়ন্ত্রণ করা
ভাইরাস বহণকারী মশা মাছির মাধ্যমেও পশু অসুস্থ হতে পারে তাই খামার থেকে মশা-মাছি দূর করতে করণীয় জেনে রাখুন-
⮚ ১লিটার পানির মধ্যে ২ মিলি তারপিন তেল (খাঁটি) ও ২ গ্রাম কর্পূর বা ন্যাপথালিন স্প্রে বোতলে নিয়ে গরুর গায়ে স্প্রে করবেন। ওলানে স্প্রে করলে এই গন্ধ দুধেও আসতে পারে। তাই ওলানে স্প্রে না করায় ভালো। তবে এতে মশা-মাছি আর কাছে আসবে না।
⮚ যারা গবাদিপশুর বাসস্থানের আশেপাশে গোবর রাখেন- তারা ১ লিটার পানিতে ১০ মিলি ফরমালিন এবং ২ টা ন্যাপথালিন গুড়া করে মিশিয়ে ছেঁকে নিয়ে স্প্রে বোতলে তুলবেন৷ তারপর প্রতি বর্গমিটারে ২৫০ মিলি করে স্প্রে করবেন। প্রথম সপ্তাহে দিনে তিন চার বার করে স্প্রে করবেন। পরবর্তীতে সপ্তাহে দুই দিন করে স্প্রে করবেন৷ এতে গবাদিপশুর বাসস্থানের মশা-মাছি দূর হবে।
⮚ আপনার গবাদিপশুকে স্যাঁতসেঁতে জায়গায় রাখবেন না। শুকনো জায়গায় রাখুন। রোদ খাওয়ান। দিনে কমপক্ষে একঘন্টা রোদে রাখলেও শরীরে অটোমেটিক ভিটামিন ডি তৈরি হয়৷
(৫) ছাগল খামারিদের জন্য পরামর্শ
⮚ অবশ্যই একসাথে দুই জাতেরই (যেমন- ব্লাক-বেঙ্গল ও সিরহি) ছাগল পালন করতে হবে। ব্ল্যাক বেঙ্গল এর ক্ষেত্রে প্রথমবার ১ টি বাচ্চা হবার সম্ভাবনা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ অপরদিকে যমুনাপাড়ির ক্ষেত্রে প্রথমবার ২টি বাচ্চা দেওয়ার সম্ভাবনা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ, অতএব খামারের উদ্দেশ্য যদি population বৃদ্ধি হয় সে ক্ষেত্রে অবশ্যই যমুনাপারি ছাগল দিয়ে খামার শুরু করতে হবে।
⮚ শুধুমাত্র কুরবানীকে লক্ষ রেখে কখনোই ছাগলের খামার করা যাবে না কারণ একটি পরিবার কুরবানীর সময় ৩-৪ দিনের মধ্যে ১০-১২ কেজি (গোটা খাসির ওজন ২০ কেজি) খাসির মাংস খেয়ে থাকে অথচ ৩৬৫ দিনের মধ্যে যদি মাত্র ২০ দিন ১ কেজি করে কিনলে ২০ কেজি হয় অতএব এ থেকে বুঝা যায় যে, ছাগলের খামার লাভজনক করতে শুধুমাত্র কুরবানীকে টার্গেট না করে সারাবছর মাংস উৎপাদনের জন্য পালতে হবে।
⮚ ছাগল কুরবানীর ক্ষেত্রে ৮০-৯০ ভাগ মানুষের পছন্দ ব্ল্যাক-বেঙ্গল জাতের ছাগল অপরদিকে year-round বা সারাবছর মাংস উৎপাদনের জন্য যমুনাপারি ছাগল পালন করাই ভালো কারণ ব্ল্যাক-বেঙ্গল থেকে যমুনাপারি ছাগলের বৃদ্ধিহার বেশি।
⮚ বাচ্চার বয়স এক মাস হলে অবশ্যই পিপিআর ভ্যাকসিন দিতেই হবে কোন প্রকার গড়িমসি যাবেনা।
⮚ প্রতি ১.৫-২ মাস পরপর ওষুধ মিশ্রিত পানি দিয়ে ছাগলকে গোসল করাতে হবে।
⮚ বিশেষ করে শীতকালে যে সব বাচ্চা জন্মগ্রহণ করবে তাদের অবশ্যই ভালো ভাবে যত্ন নিতে হবে তা না হলে বাচ্চার মৃত্যুহার কমানো যাবেনা।
⮚ খাদ্য খরচ কমানোসহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নিম্নোক্ত অপ্রচলিত খাদ্যের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। যেমন- UMB UMS UMC ইত্যাদি।
অনুরোধ!! পোষ্ট ভালো লাগলে প্লিজ উপরের শেয়ার আইকনে ক্লিক করে পোষ্টটি শেয়ার করে দিন।







