শ্রোতার সঙ্গে ভাব বিনিময় করুনঃ কথা বলার দক্ষতা অর্জন করুন

ইনফরমেশন বাংলা-এর আজকের এই পোষ্টটিতে তুলে ধরা হবে- শ্রোতার সঙ্গে ভাব বিনিময় করুনঃ কথা বলার দক্ষতা অর্জন করুনঃ বক্তব্যে শ্রোতাদের মন জয় করা সহজ উপায়, একজন সফল বক্তা হওয়ার উপায়, বক্তব্য ওয়ার নিয়ম ও ভাষণ দেওয়ার নিয়ম, কথা বলার কৌশল, কথা বলার জড়তা দূর করার উপায় সম্পর্কে। আশা করি শেষ অবধি সাথেই থাকবেন, চলুন শুরু করা যাক।
লেখকঃ ডেল কার্নেগী
কিভাবে একজন বক্তা সফল হন? শ্রোতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করনে? তাহলে একজন খ্যাতনামা বক্তার রোজনামচা দিয়েই আরম্ভ করা যাক— আমি যখনই কোন নতুন শহরে যাই তখনই সময় করে ঘুরতে বেরাই, দেখে নিই পোস্টমাষ্টার, দাড়ি কামানোর নাপিত, হোটেল ম্যানেজার ছাত্র পরিয়ে স্কুলের হেডমাষ্টার, মন্ত্রিমণ্ডলী, বিভিন্ন দোকান পসরা আর লোকজনের গতিবিধি, চলাফেলা, কথাবার্তা, বাচনভঙ্গি এবং উচ্চারণ বৈশিষ্ট্য। তারও পরে হাতে সময় থাকলে বিভিন্ন লোকের সঙ্গে মেলামেশার চেষ্টা করি, কথা বলি। এতে করে আমি যা শিখি তা আমার বাস্তব জীবনের নানা পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োগ করি।.
তাহলে উপরোক্ত বক্তার বক্তব্য থেকে আমার দুটি প্রশ্নেরই উত্তর পেয়ে গেলাম।
শ্রোতার সঙ্গে ভাব বিনিময় করুনঃ কথা বলার দক্ষতা অর্জন করুন, বক্তব্যে শ্রোতাদের মন জয় করা সহজ উপায়-
(১) শ্রোতার ভাল লাগার দিকে লক্ষ রেখেই বক্তব্য রাখুন
◼ বিখ্যাত বক্তা জর্জ হ্যারিস ঠিক তাই করেছিলেন। তিনি একবার স্থানীয় লোকের উপর একটি গবেষণা করেছিলেন। পরে তিনি যখন জনসাধারণের সামনে বক্তব্য রাখলেন তা ছিল জনসাধারণের দৈনন্দিন জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, সুখ-দুঃখ, এবং ভাল- মন্দ বিষয়ে। সুতরাং সহজেই বুঝতে পারছেন শ্রোতারা তাঁর বক্তব্যে অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছিল। কারণ শ্রোতারা নিজেদের কথাই শুনতে পাচ্ছিল মিঃ জর্জ হ্যারিসের কাছ থেকে।
◼ অনেক কাল আগেই ফিলাডেলফিয়ার এক নৈশভোজের আসরে মাইকেল রবিন্সের বক্তৃতা শোনার সুযোগ হয়েছিল। খাদ্য এবং পানীয় ভরা ব্যাঙ্কেয়েট সুসজ্জিত নর-নারীরা বেশিরভাগই ছিলেন পরিশীলিত এবং এক মর্যাদাসম্পন্ন। মিঃ মাইকেল রবিন্সের সফলতা ছিল সেখানেই, তিনি আলাদা আলাদাভাবে প্রত্যেকটি শ্রোতার সম্পর্কেই কিছু- না-কিছু প্রশংসাসূচক বক্তব্য রাখতে পেরেছিলেন। মানুষ নিজের প্রশংসা শুনতে ভালবাসে এটা তিনি জানতেন। তাই সস্তা চাটুকারিতা না করেও তিনি শ্রোতার মন জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
(২) শ্রোতাদের কাছে সৎ ও আন্তরিক হোন
◼ সব সময় মনে রাখতে হবে প্রতিটি আলাদা আলাদা শ্রোতা মিলেই একটি বিশাল শ্রোতামণ্ডলী গড়ে ওঠে। সুতরাং এইদিক থেকে প্রত্যেকটি শ্রোতাই আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব। তাই আপনার সৎ এবং আন্তরিক প্রশংসা শ্রোতার মনে রেখাপাত করবেই। তাই বক্তৃতাকালীন সময়ে মাঝে মাঝেই সরাসরি শ্রোতার মতামত জানার চেষ্টা করতে পারেন। তাই বলে অনেক উর্বর মস্তিস্ক বক্তার মত যেন ভুল করেও বলবেন না- বিশ্বাস করুন এত বুদ্ধিমান বিচক্ষন শ্রোতা আমি এ পর্যন্ত কোথাও দেখিনি।
◼ যে মুহুর্তে উপরের কথাটি বললেন শ্রোতারা বুঝে ফেলবে আপনি চাটুকারিতায় তাদের মন ভোলাতে চাইছেন।
সুতরাং যা আপনি নিজে বিশ্বাস করেন না তেমন কথা শ্রোতার ঘাড়ে চাপানোর আদৌ চেষ্টা করবেন না।
(৩) নিজে শ্রোতার সঙ্গে একমত হোন
যত তাড়াতাড়ি সম্ভভ আপনার প্রথম কথাটি শ্রোতাকে খুশি করবে তত তাড়াতাড়ি আপনি শ্রোতার সঙ্গে একাত্ম হবেন।
◼ ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ক্যাকমিলার আমেরিকান একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন- আপনাদের আমন্ত্রণে এখানে এসে কিছু বলতে পারার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। কিন্তু আমার মা- তিনি ছিলেন আমেরিকান। এই ইন্ডিয়ানাতেই তিনি জন্মেছিলেন। আর আমার মায়ের পিতা, আমার মাতামহ ছিলেন আপনাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। সুতরাং আমি গর্বিত হচ্ছি একথা ভেবে যে আমার নাড়ীর সঙ্গে, হৃদয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে আপনাদেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানের আলোকবর্তিকা। আর আমি ধারকবাহকের ভূমিকা পালন করছি সেই প্রাচীন পরিবারের মহান ঐতিহ্যকে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফরের বাইরে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের উপরেও আপনাদের সঙ্গে আমার এক সুপ্রাচীন বন্ধুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যমন্ডিত সম্পর্ক বিদ্যমান।
◼ তাঁর এ বক্তৃতার প্রভাব ম্যাজিকের মত ছাত্র-ছাত্রীদের হৃদয় কাড়তে সক্ষম হয়েছিল। সরাসরি শ্রোতাকে সম্বোধন করে বক্তব্য রাখলে আসাধারণ ফল হয়। যেমন : একজন বক্তা সালফিউরিক এসিড সম্পর্কে বলতে উঠে এত সুন্দর করে বলেছিলেন অতি নীরস এই বিষয়টি সম্পর্কে আর শ্রোতার সঙ্গে এত দ্রুত মানসিক সংযোগ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন, যা মনে রাখার মত। যেমন : আপনাদের দৈনন্দিন জীবনে সালফিউরিক এসিড আপনাদের সর্বক্ষণই ঘিরে আছে। সালফিউরিক এসিড না হলে গাড়ি চলবে না, কারণ কেরোসিন বা গ্যাসোলিন পরিশোধনে সালফিউরিক এসিড লাগে। বাড়িতে বা অফিসে আলো জ্বলবে না সালফিউরিক এসিড না হলে, কারণ বাষ্প তৈরীতে এসিড লাগে। স্নান করার সময় আপনি যে বাথটাবে বসেন তার প্লেটিং করার সময় সালফিউরিক এসিড লেগেছে, আপনি যে সাবান মাখেন সেটা তৈরীতেও এই একই এসিড লেগেছে। আপনার চিরুনি, চুলের ব্রাশ, দাড়ি কমানোর ক্ষুর-সব কিছু তৈরীর গোড়াতেই আছে সালফিউরিক এসিড। আপনার প্রাতঃরাশের টেবিলে ছুরি কাঁটাচামচ এবং সুন্দর কাপ, ডিশ সবকিছুর পেছনেই রয়েছে এই এসিডের বিশেষ ভূমিকা। সুতরাং যেখানেই আপনি যান না কেন এই এসিড থেকে আপনার মুক্তি নেই।
◼ এখানে বক্তা নীরস এসিডের সঙ্গে শ্রোতার দৈনন্দিন জীবনকে টেনে এনে বক্তব্যকে হৃদয়গ্রাহী করে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।
(৪) শ্রোতাকে আপনার কথার অংশীদার করুন
◼ আমার খুবই প্রিয় বিষয় হল শ্রোতার সঙ্গে কথা বলা। কিছু জিজ্ঞেস করে জেনে নেয়া। এভাবে শ্রোতার কাছ থেকে সাড়া পেলে আমি খুব সহজেই তাদের সঙ্গে মানসিক সংযোগ ঘটাতে পারি। শ্রোতারাও আমাকে নিজেদেরই একজন বলে ভাবতে পারে, বক্তা হিসেবে দূরে সরিয়ে রাখে না। যদি কোনও বিষয়ে আপনার বক্তব্যে শ্রোতাদের অংশগ্রহণও করাতে পারেন তাহলে শ্রোতরাও আপনার বক্তব্যের ভাগীদার হয়ে পড়বে অচিরেই।
(৫) কখনও শ্রোতার সামনে সবজান্তা বলে ভাববেন না
◼ আমেরিকার একজন সিনেটর একার জানিয়েছিলেন, যখনই আমি শ্রোতার সামনে কিছু বলতে উঠি আমি কখনই নিজেকে হোমরা-চোমরা বলে ভাবি না। আমি নিজেকে শ্রোতাদের একজন বলে ভাবি। ক্ষমা না চেয়েও আমি ভদ্র সুন্দরভাবে অনুরোধের ভঙ্গিতে বক্তব্য রাখি। একমাত্র ভদ্রতা এবং সৌজন্যই শ্রোতার সামনে বক্তার, আত্মবিশ্বাস ও সদিচ্ছা ফিরিয়ে আনে। আপনার কথা বলার সামান্যতম বাকচাতুর্য ও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে যদি তা শ্রোতার আত্মমর্যাদায় আঘাত হানে। আপনি যে মুহুর্তে বলতে শুরু করেন, আপনার সমস্ত কিছু শ্রোতার সামনে প্রদর্শিত হওয়ার জন্য রাখা হয়, কিছুই গোপন থাকে না। কোন ছল-চাতুরিই খাটে না নিজেকে আচ্ছাদিত রাখার জন্য।
◼ এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে জরুরী নির্দেশটি দিয়ে গেছেন একজন চীনা ধর্মগুরু। তাঁর নাম কানফুসিয়াস। কয়েক হাজার বছর আগে তিনি বলেছিলেন ‘কখনো মানুষের কাছে জ্ঞান-গরিমার, বাকবিতন্ডায় চোখ ধাঁধিয়ে দেবার চেষ্টা করবে না।
◼ মানুষকে একমাত্র সততা, নিষ্ঠা এবং আন্তরিক সমবেদনাপূর্ণ বক্তব্য ও ব্যবহারেই তুমি আপন করে নিতে পার। সারাজীবনের জন্য কাছে টেনে নিতে পার। অন্য কিছুতে নয়।
তাহলে সারকথা হল- বক্তব্য, বক্তা এবং শ্রোতা এই ত্রিমুখী সূত্রকে মনের মধ্যে গেঁথে যিনি বারবার বিধি নির্দেশ অনুশীলন করবেন তিনি অতি সহজেই লোকের মন জয় করতে পারবেন।
[তথ্যসূত্র: ডেল কার্নেগী বই অনুবাদ]









