সন্ধি কাকে বলে? সন্ধি কত প্রকার ও কি কি?

সন্ধি কাকে বলে, সন্ধি কত প্রকার ও কি কি

আজ আমরা সন্ধি নিয়ে আলোচনা করব। সন্ধি কাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি? বিস্তারিত জানার চেষ্টা করব।

(১) সন্ধি কাকে বলে?

সন্ধি শব্দের অর্থ মিলন। কথা বলার সময় দুটি ধ্বনি মিলে এক হলে বা একটি লোপ পেলে কিংবা একটির প্রভাবে অপরটি পরিবর্তিত হলে তাকে সন্ধি বলে। এক কথায়, সন্নিহিত দুটি ধ্বনির মিলনের নাম সন্ধি।

ড. মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, “একাধিক ধ্বনি এক বা একাধিক পদে পাশাপাশি অবস্থিত হইলে পর, দ্রুত উচ্চারণকালে ধ্বনিগুলোর মধ্যে ত্রিবিধ পরিবর্তন ঘটিতে দেখা যায়। ফলে, (১) ধ্বনিগুলোর মধ্যে আংশিক বা পূর্ণ মিলন সাধিত হয়।নতুবা, (২) তাহাদের একটির লোপ হয় ; কিংবা (৩) তাহাদের একটি অপরটির প্রভাবে পরিবর্তিত হয়। একাধিক ধ্বনির এরূপ মিলন, লোপ বা পরিবর্তনের নাম সন্ধি।”

(২) সন্ধির প্রয়োজনীয়তা

  • উচ্চারণে সহজপ্রবণতা।
  • ধ্বনিগত মাধুর্য সম্পাদন।
  • দ্রুত উচ্চারণ করা যায়।
  • নতুন শব্দ গঠন করে।
  • ভাষাকে শ্রুতিমধুর ও সংক্ষিপ্ত করে।
  • ভাষার শব্দ সম্পদ বৃদ্ধি করে। ইত্যাদি।

(৩) সন্ধির প্রকারভেদ/শ্রেণীবিভাগ

সন্ধি প্রধানত ২ প্রকার। এগুলো হলো–

  • বাংলা সন্ধি
  • তৎসম সন্ধি

ক) বাংলা সন্ধি

সংস্কৃত ছাড়া বাংলায় গৃহীত ও প্রচলিত অন্যান্য শব্দকে বলা হয় খাঁটি বাংলা শব্দ। এসব শব্দের সন্ধিই বাংলা সন্ধি।

বাংলা সন্ধি ২ প্রকার। যথাঃ

  • বাংলা স্বরসন্ধি
  • বাংলা ব্যঞ্জনসন্ধি

i) বাংলা স্বরসন্ধি

বাংলা স্বরসন্ধিঃ যখন বাংলা শব্দের মধ্যে বা দুটি বাংলা শব্দে স্বরধ্বনি ও স্বরধ্বনির মিলনে ধ্বনির পরিবর্তন ঘটে, তখন তাকে বাংলা স্বরসন্ধি বলে। যেমন– শত + এক = শতেক, মিথ্যা + উক = মিথ্যুক।

এটি ঘটে খাঁটি বাংলা (দেশজ) শব্দে। পরিবর্তন হয় উচ্চারণগত ও প্রাকৃতিকভাবে

স্বরসন্ধি আবার ২ প্রকার। যথাঃ

  • অন্তঃসন্ধি (নে + অন = নয়ন)
  • বহিঃসন্ধি ( মহা + আশয় = মহাশয়)

II) বাংলা ব্যঞ্জনসন্ধি

বাংলা ব্যঞ্জনসন্ধিঃ যখন বাংলা শব্দের মধ্যে স্বরে ও ব্যঞ্জনে, ব্যঞ্জনে ও ব্যঞ্জনে, অথবা ব্যঞ্জনে ও স্বরে মিলন ঘটে এবং তাতে উচ্চারণে পরিবর্তন হয়, তখন তাকে বাংলা ব্যঞ্জনসন্ধি বলে। যেমন– কাঁচা + কলা = কাঁচকলা, তিল + এক = তিলেক।

এখানে মূল শব্দগুলো খাঁটি বাংলা বা দেশজ শব্দ। ধ্বনির পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে সরল ও প্রাকৃতিক, সংস্কৃতের মতো জটিল নয়।

ব্যঞ্জনসন্ধি আবার ২ প্রকার। যথাঃ

  • অন্তঃসন্ধি (ভজ্ + ত = ভক্ত)
  • বহিঃসন্ধি (জগৎ + ঈশ = জগদীশ)

খ) তৎসম সন্ধি

বাংলা ভাষায় বহু সংস্কৃত শব্দ অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। এসব শব্দই তৎসম। তৎ অর্থ তার, আর সম অর্থ সমান অর্থাৎ, তৎসম অর্থ তার সমান বা সংস্কৃতের সমান।

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত তৎসম সন্ধি ৩ প্রকার। যথাঃ

  • তৎসম স্বরসন্ধি
  • তৎসম ব্যঞ্জনসন্ধি
  • বিসর্গ সন্ধি

I) তৎসম স্বরসন্ধি

তৎসম স্বরসন্ধিঃ যেখানে এক স্বরবর্ণের সঙ্গে আরেক স্বরবর্ণ যুক্ত হয়ে পরিবর্তন ঘটে। যেমন– রবি + ইন্দ্র = রবীন্দ্র, গুরু + ঋষি = গুরুর্ষি।

যখন তৎসম (সংস্কৃতমূল) শব্দ বা উপসর্গ–প্রত্যয়ের মিলনে এক স্বরধ্বনির সঙ্গে অন্য স্বরধ্বনি যুক্ত হয়ে পরিবর্তন ঘটে, তখন তাকে তৎসম স্বরসন্ধি বলে।

এটি ঘটে সংস্কৃত ধ্বনিতত্ত্বের নিয়মে, এবং পরিবর্তন হয় নির্দিষ্ট ব্যাকরণিক নিয়ম অনুসারে।

II) তৎসম ব্যঞ্জনসন্ধি

তৎসম ব্যঞ্জনসন্ধিঃ যেখানে এক ব্যঞ্জনের সঙ্গে অন্য ব্যঞ্জন যুক্ত হয়ে উচ্চারণে পরিবর্তন হয়। যেমন– তৎ + কর্ম = তৎকর্ম, লোক + নাথ = লোখনাথ।

যখন তৎসম (সংস্কৃতজাত) শব্দগুলির মধ্যে এক ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে অন্য ব্যঞ্জনবর্ণ যুক্ত হয়ে ধ্বনিগত পরিবর্তন ঘটায়, তখন তাকে তৎসম ব্যঞ্জনসন্ধি বলে।

এখানে শব্দগুলো সংস্কৃত মূলের এবং ধ্বনির পরিবর্তন হয় সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মে — অর্থাৎ নির্দিষ্ট ধ্বনিতাত্ত্বিক রীতি অনুসারে।

বাংলা ব্যঞ্জনসন্ধি হয় বাংলা শব্দের মধ্যে স্বাভাবিক ধ্বনি পরিবর্তনে, আর তৎসম ব্যঞ্জনসন্ধি হয় সংস্কৃত ব্যাকরণের নির্দিষ্ট নিয়মে।

III) বিসর্গ সন্ধি

বিসর্গ সন্ধিঃ বিসর্গের সঙ্গে কোন স্বরধ্বনি বা বিসর্গ ছাড়া অন্য কোন ব্যঞ্জনধ্বনির মিলনকে বিসর্গ সন্ধি বলা হয়। যেমন– নমঃ + কার = নমস্কার।

ড. মুহম্মদ এনামুল হক বলেন, “বিসর্গ সন্ধি সম্বন্ধে কতগুলো সাধারণ জ্ঞাতব্য বিষয় জানিয়ে রাখা আবশ্যক। বিসর্গ ব্যঞ্জন বর্ণ বলিয়া বিসর্গ যোগে যে সন্ধি গয়, তাহা ব্যঞ্জন সন্ধিরই অন্তর্গত। তবে, বুঝিবার সুবিধার জন্যই সাধারণত ইহাকে বিসর্গ সন্ধি বলা হয়।”

বিসর্গ সন্ধির প্রকারভেদ/শ্রেণীবিভাগ:

বিসর্গ সন্ধি ২ প্রকার। যথাঃ

  • র জাত বিসর্গ
  • স জাত বিসর্গ

র জাত বিসর্গঃ শব্দের শেষে র থাকলে উচ্চারণের সময় র লোপ পেয়ে যখন বিসর্গে পরিণত হয়, তখন তাকে র জাত বিসর্গ বলে। যেমন– পুনর = পুনঃ

স জাত বিসর্গঃ শব্দের শেষে স থাকলে উচ্চারণের সময় স লোপ পেয়ে যখন বিসর্গে পরিণত হয়, তখন তাকে স জাত বিসর্গ বলে। যেমন– নমস = নমঃ, মনস = মনঃ ইত্যাদি।

তাহলে আজ এখানেই থাকলো। আশা করি সন্ধি কাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি? কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছেন।

অনুরোধ!! পোষ্ট ভালো লাগলে প্লিজ উপরের শেয়ার আইকনে ক্লিক করে পোষ্টটি শেয়ার করে দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

উদ্ভিদের প্রজনন অঙ্গ কোনটি, pdf, কী, কি, কাকে বলে, পরাগায়ন, উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধি, প্রজনন বিভাগ।

উদ্ভিদের প্রজননঃ ফুল ও ফুলের বিভিন্ন অংশ, পুষ্পমঞ্জরি, পরাগায়ন ও পরাগায়নের মাধ্যম, পুং ও স্ত্রী গ্যামেটোকাইটের উৎপত্তি, নিষেক, নতুন স্পোরোফাইট গঠন এবং ফলের উৎপত্তি ছবি সহ বিস্তারিত

আলোচ্য বিষয়: ফুলকে উদ্ভিদের প্রজনন অঙ্গ বলা হয় কেন? উদ্ভিদের প্রজনন অঙ্গ কোনটি, উদ্ভিদের প্রজনন class 7/8/9/10, উদ্ভিদের প্রজনন mcq, উদ্ভিদের প্রজনন pdf, উদ্ভিদের প্রজনন কী, উদ্ভিদের প্রজনন পরাগায়ন, কোন উদ্ভিদের মূল প্রজননে অংশগ্রহণ করে, উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধি, উদ্ভিদ প্রজনন কাকে বলে, উদ্ভিদ প্রজনন কি, উদ্ভিদ প্রজনন, উদ্ভিদ প্রজনন সৃজনশীল প্রশ্ন, উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ। Read
পদ কাকে বলে, পদ কত প্রকার ও কি কি

পদ কাকে বলে? পদ কত প্রকার ও কি কি?

আলোচ্য বিষয়: (১) পদ কাকে বলে? (২) পদের প্রকারভেদ/শ্রেণীবিভাগ ক) বিশেষ্য খ) বিশেষণ গ) সর্বনাম ঘ) অব্যয় ঙ) ক্রিয়া Read
অর্থনীতি কাকে বলে

অর্থনীতি কাকে বলে?

আলোচ্য বিষয়: নিম্নে অর্থনীতি কাকে বলে, এর সংঙ্গাসমূহ তুলে ধরা হলো- Read
চতুর্ভুজ কাকে বলে

ত্রিভুজ কাকে বলে? কত প্রকার ও কি কি? চিত্রসহ

আলোচ্য বিষয়: (১) চতুর্ভুজ কাকে বলে? (২) চতুর্ভুজের প্রকারভেদ ক) বর্গক্ষেত্র (Square) খ) আয়তক্ষেত্র (Rectangle) গ) সমান্তরালিক (Parallelogram) ঘ) রম্বস (Rhombus) ঙ) ট্রাপিজয়েড বা ট্রাপিজিয়াম (Trapezoid) চ) অসমবাহু চতুর্ভুজ (Irregular Quadrilateral) (৩) চতুর্ভুজের বৈশিষ্ট্য (৪) চতুর্ভুজের গাণিতিক বিশ্লেষণ (৫) চতুর্ভুজের ব্যবহার (৬) চতুর্ভুজের ইতিহাস ও গুরুত্ব Read
ফাংশন কাকে বলে, ফাংশনের চিত্রসহ বর্ণনা

ফাংশন কাকে বলে? ফাংশনের চিত্রসহ বর্ণনা

আলোচ্য বিষয়: (১) ফাংশন কাকে বলে? ফাংশনের চিত্র (২) ডোমেন ও রেঞ্জ কাকে বলে? চিত্রসহ বর্ণনা Read
informationbangla.com default featured image compressed

সমাস কাকে বলে? সমাস কত প্রকার ও কি কি?

আলোচ্য বিষয়: (১) সমাস কাকে বলে? (২) সমাসের প্রকারভেদ/শ্রেণীবিভাগ Read
সুশাসন কাকে বলে, সুশাসনের প্রকৃতি ও ধরণ, উপাদান বা ভিত্তি কি

সুশাসন কাকে বলে? সুশাসনের প্রকৃতি ও ধরণ, উপাদান বা ভিত্তি কি?

আলোচ্য বিষয়: (১) সুশাসন কাকে বলে? সুশাসন কি? (২) সুশাসনের প্রকৃতি ও ধরণ (৩) সুশাসনের ভিত্তি বা উপাদানসমূহ (৪) সুশাসনের প্রতিবন্ধকতা (৫) সুশাসন নিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নোত্তর Read
শব্দ ও পদের মধ্যে পার্থক্য কি, বিস্তারিত বর্ণনা

শব্দ ও পদের মধ্যে পার্থক্য কি? বিস্তারিত বর্ণনা

আলোচ্য বিষয়: (১) শব্দ ও পদের মধ্যে পার্থক্য কি? (২) শব্দ কি? (৩) পদ কি? (৪) তাহলে শব্দ ও পদের মধ্যে মূল পার্থক্য কি? (৫) উদাহরণের মাধ্যমে শব্দ ও পদের পার্থক্য (৬) শব্দ ও পদের গুরুত্ব (৭) শেষ কথা Read
এসিড কাকে বলে, এসিডের বৈশিষ্ট্যসমূহ ও চেনার উপায় কি

এসিড কাকে বলে? এসিডের বৈশিষ্ট্যসমূহ ও চেনার উপায় কি?

আলোচ্য বিষয়: (১) অম্ল বা এসিড কাকে বলে? (২) সবল বা শক্তিশালী এসিড কাকে বলে? (৩) দুর্বল অ্যাসিড কাকে বলে? (৪) এসিডের বৈশিষ্ট্যসমূহ ও চেনার উপায় কি? (৫) সংকেতসহ কয়েকটি এসিডের উদাহরণ Read
মূল্যবোধ কাকে বলে, মূল্যবোধের বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ ও উৎস কি কি

মূল্যবোধ কাকে বলে? মূল্যবোধের বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ ও উৎস কি কি?

আলোচ্য বিষয়: (১) মূল্যবোধ কি বা মূল্যবোধ কাকে বলে? (২) মূল্যবোধের বৈশিষ্ট্য (৩) মূল্যবোধের প্রকারভেদ (৪) মূল্যবোধের উৎস ও বিকাশ (৫) মূল্যবোধের ভিত্তি বা উপাদান (৬) মূল্যবোধ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নোত্তর Read