সবজির চাষে চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলা তৈরির নিয়ম ও পদ্ধতি

সবজির চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলা তৈরিঃ-
সবজির চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চারা উৎপাদন করে যেসব সবজি ও মসলার চাষ করা হয় তার মধ্যে বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপি, ব্রকলি, বেগুন, টমেটো, মরিচ ও পেঁয়াজ উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে আগাম শীতকালীন, গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালীন চারা উৎপাদন প্রসার লাভ করছে। চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলা তৈরিতে নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা উচিত।
বীজতলার উপকারিতাঃ-
- অল্প জায়গা লাগে।
- চারার যত্ন ও পরিচর্যা করা সহজ হয়।
- আগাম চারা উৎপাদন করে মূল জমি থেকে পানি নেমে যাবার পরপরই আগাম সবজি উৎপাদন করা যায়।
- চারা রোপণের মাধ্যমে জমির সর্বত্র সমান সংখ্যক গাছ রাখা সম্ভব হয়।
- জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
বীজতলা তৈরির উপকরণঃ-
- সুনিষ্কাশিত ঊর্বর দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ সমৃদ্ধ মাটি, উত্তমরূপে পচানো গোবর/কম্পোস্ট ও
- টিএসপি সার।
- বীজতলা ঢেকে দেয়ার জন্য কলাপাতা অথবা পলিথিন, বাঁশের বাতা অথবা কঞ্চি।
- কেরোসিন, ছাই, চুন, তুঁতে, কীটনাশক ইত্যাদি।
- ভালো গুণসম্পন্ন বীজ।
- দা, কোদাল, শাবল ইত্যাদি।
বীজতলা তৈরির পদ্ধতিঃ-
(১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট প্রস্থ আকারের ১টি বীজতলা তৈরির জন্য।)
- জমির মাটি গভীরভাবে চাষ দিয়ে অথবা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। তারপর আইল হতে ৯ ইঞ্চি দূরে ১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট চওড়া আকারে মাপ দিয়ে চার পাশ থেকে ৪ ইঞ্চি গভীর করে মাটি তুলে বেডের উপর বিছিয়ে দিতে হবে যাতে নালা থেকে বেড ৬ ইঞ্চি উঁচু হয়, এতে বেড হঠাৎ বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হবে না এবং জমির আন্তঃপরিচর্যা করতে সুবিধা হবে।
- মাটি, বালি ও পচা গোবর সার বা কম্পোস্ট (২ঃ১ঃ১ অনুপাতে) মিশিয়ে বীজতলার মাটি তৈরি করতে হয়।
- মাটি উর্বর হলে রাসায়নিক সার না দেয়াই ভালো। উর্বরতা কম হলে উক্ত মাপের বীজতলার
- মাটিতে ১০০ গ্রাম টিএসপি সার বীজ বপনের অন্তত এক সপ্তাহ আগে মিশাতে হবে।
- বীজ বপনের কয়েকদিন আগে বীজতলার মাটি ২০-২৫ সে. মি. গভীর করে ঝুরঝুরা, উপরিভাগ মসৃণ এবং সমান ও ঢেলামুক্ত করে তৈরি করতে হবে।
- এরপর বীজতলার উপরিভাগে সমানভাবে বীজ বপন করতে হবে এবং বীজের উপর ঝুরঝুরে মাটি চালনির দ্বারা চেলে বীজগুলোকে ঢেকে দিতে হবে।

বীজতলায় বীজ বপনঃ-
- বীজতলায় সারি করে বা ছিটিয়ে বীজ বপন করা যায়, তবে সারিতে বপন করা উত্তম। সারিতে বপনের জন্য প্রথমে নির্দিষ্ট দূরত্বে (৪ সে.মি.) কাঠি দিয়ে ক্ষুদ্র নালা তৈরি করে তাতে বীজ ফেলে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
- ছোট বীজের বেলায় বীজের দ্বিগুণ পরিমাণ শুকনো ও পরিষ্কার বালু বা মিহি মাটি বীজের সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে মাটিতে বীজ বপন করতে হয়।
- শুকনো মাটিতে বীজ বপন করে সেচ দেয়া উচিত নয়, এতে মাটিতে চটা বেঁধে চারা গজাতে ও বাতাস চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সেচ দেয়া মাটির জো অবস্থা এলে বীজ বপন করতে হয়।
- যে সমস্ত বীজের আবরণ শক্ত, সহজে পানি প্রবেশ করে না, সেগুলোকে সাধারণত বোনার পূর্বে পরিষ্কার পানিতে ১৫-২০ ঘণ্টা অথবা শতকরা এক ভাগ পটাশিয়াম নাইট্রেট দ্রবণে এক রাত ভিজিয়ে বপন করতে হয়। (যেমন- লাউ, চিচিঙ্গা, মিষ্টি কুমড়া, করলা, উচ্ছে ও ঝিঙ্গা)
বীজতলায় চারা উৎপাদন ও চারার যত্নঃ-
- চারা গজানোর পর থেকে ১০-১২ দিন পর্যন্ত হালকা ছায়া দ্বারা অতিরিক্ত সূর্যতাপ থেকে চারা রক্ষা করা প্রয়োজন।
- বীজতলায় রাসায়নিক সার ব্যবহার না করাই ভালো। তবে যদি চারার বৃদ্ধি কম হয় বা চারা হলুদ হয়ে যায় তখন প্রতি ১ বর্গমিটার জায়গায় ১০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০ গ্রাম জিপসাম ছিটিয়ে দিয়ে সাথে সাথে পানি দিতে হবে। এতে চারার বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।
- চারা অবস্থায় কাণ্ডের গোড়ায় পচন রোগ দেখা যায়। একে ডাম্পিং অফ বলে। বিভিন্ন ছত্রাক এর জন্য দায়ী। বীজতলার মাটি সব সময় ভেজা থাকলে এবং মাটিতে বাতাস চলাচলের ব্যাঘাত হলে এ রোগ বেশি হয়।
- এ জন্য বীজতলার মাটি সুনিষ্কাশিত রাখা রোগ দমনের প্রধান উপায়। প্রতিষেধক হিসেবে মাটিতে ক্যাপটান, কপার অক্সিক্লোরাইড বা ডায়থেন এম-৪৫ (১-২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে বীজতলার মাটি ভালো করে ভিজিয়ে কয়েকদিন পর বীজ বপন করতে হবে।
- এছাড়াও সৌরতাপ, পোলট্রি রিফিউজ ও খৈল ব্যবহার করেও ডাম্পিং অফ থেকে চারাকে রক্ষা করা যায়।









