১০-ই মহররমঃ তাৎপর্য, ইতিহাস এবং মহররমের রোজার গুরুত্ব

দশম মহররম, যা ইসলামী ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস মহররমের দশম দিন হিসেবে পরিচিত, মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনটি ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত: মূসা (আ.) এবং বনি ইসরাইলের ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি এবং ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত। তবে, এই দিনে রোজা পালনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মূসা (আ.)-এর মুক্তির ঘটনাকে স্মরণ করা। এই ব্লগ পোস্টে দশম মহররমের ঐতিহাসিক তাৎপর্য, রোজার গুরুত্ব এবং কারবালার ঘটনার বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এটি পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং তথ্যবহুল হবে।
(১) ১০-ই মহররমের ঐতিহাসিক তাৎপর্য
ক) মূসা (আ.)-এর মুক্তি
ইসলামী ইতিহাসে দশম মহররমের প্রধান তাৎপর্য হলো মূসা (আ.) এবং বনি ইসরাইলের ফেরাউনের নির্যাতন থেকে মুক্তি। আল্লাহ তা‘আলা এই দিনে মূসা (আ.) এবং তার অনুসারীদের লোহিত সাগর পার করে নিরাপদে পৌঁছে দেন এবং ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করেন। এই ঘটনার স্মরণে মুসলিমরা দশম মহররমে রোজা রাখেন। রাসূল (সা.) এই দিনে রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং এটি সুন্নত আমল হিসেবে বিবেচিত হয়।
খ) ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত
দশম মহররমের সঙ্গে আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা জড়িত, যা হলো ৬১ বা ৬২ হিজরিতে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত। কারবালার ময়দানে ইয়াজিদের সেনাবাহিনী কর্তৃক তিনি এবং তার পরিবারের ৭৯ জন সদস্য শহীদ হন। এই ঘটনা মুসলিম ইতিহাসের একটি বিয়োগান্ত অধ্যায়। তবে, এই ঘটনার স্মরণে রোজা রাখার প্রচলন কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে থাকলেও, এটি মূসা (আ.)-এর মুক্তির স্মরণে রোজা রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
(২) মহররমের রোজার গুরুত্ব
দশম মহররমের রোজা মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল। রাসূল (সা.) বলেছেন, এই দিনে রোজা রাখলে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ হয়। এই রোজা মূসা (আ.)-এর প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম। তবে, এই দিনে রোজা রাখার সময় ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের ঘটনার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
(৩) ইসলামী ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
ক) রাসূল (সা.)-এর পর খিলাফতের যুগ
রাসূল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তারপর হযরত ওমর (রা.), হযরত উসমান (রা.) এবং হযরত আলী (রা.) খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উসমান (রা.)-এর শাসনামলের শেষের দিকে কিছু বিদ্রোহী তাকে হত্যা করে, যা ইসলামী ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
খ) আলী (রা.)-এর খিলাফত ও সিফিনের যুদ্ধ
উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর হযরত আলী (রা.) খলিফা নির্বাচিত হন। তবে, সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া (রা.) তার খিলাফত মেনে নেননি। উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে মুয়াবিয়া (রা.) এবং আলী (রা.)-এর মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এই দ্বন্দ্ব ৩৭ হিজরিতে সিফিনের যুদ্ধে রূপ নেয়। এই যুদ্ধে আলী (রা.) প্রায় বিজয়ী হয়েছিলেন, কিন্তু মুয়াবিয়া (রা.)-এর পক্ষ থেকে কোরআনের ফয়সালার প্রস্তাব আসে। এই প্রস্তাবের ফলে একটি তৃতীয় পক্ষ গঠন করা হয়, যেখানে মুয়াবিয়া (রা.)-এর পক্ষে আমর ইবনে আস (রা.) এবং আলী (রা.)-এর পক্ষে আবু মুসা আশ‘আরি (রা.) প্রতিনিধিত্ব করেন।
গ) খারিজিদের উত্থান
সিফিনের যুদ্ধের পর আলী (রা.)-এর দল থেকে প্রায় ১২,০০০ লোক বেরিয়ে যায়। তারা আলী (রা.), মুয়াবিয়া (রা.), আমর ইবনে আস (রা.) এবং আবু মুসা আশ‘আরি (রা.)-কে কাফের বলে ফতোয়া দেয়। এই দলটি খারিজি নামে পরিচিত হয়। খারিজিদের আকিদা ছিল, কবিরা গুনাহ করলে ব্যক্তি কাফের হয়ে যায়। আলী (রা.) নহরওয়ানের যুদ্ধে তাদের দমন করেন। তবে, খারিজি মতবাদ পলিটিক্যাল সমালোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
ঘ) আলী (রা.)-এর শাহাদাত
৪০ হিজরির রমজান মাসের ১৭ তারিখে খারিজিদের একটি গুপ্ত পরিকল্পনায় আলী (রা.) ফজরের নামাজের সময় আব্দুর রহমান বিন মুলজিম নামে এক ব্যক্তির হাতে শহীদ হন। এই হত্যাকাণ্ডে খারিজিরা মুয়াবিয়া (রা.), আমর ইবনে আস (রা.) এবং আবু মুসা আশ‘আরি (রা.)-এর উপরও হামলার পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু শুধু আলী (রা.)-এর হত্যাকাণ্ডই সফল হয়।
ঙ) হাসান (রা.) এবং মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে চুক্তি
আলী (রা.)-এর শাহাদাতের পর তার পুত্র হাসান (রা.) খলিফা নির্বাচিত হন। তবে, তিনি মুসলিমদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এড়াতে মুয়াবিয়া (রা.)-এর হাতে খিলাফত ছেড়ে দেন। এই চুক্তিতে মুয়াবিয়া (রা.)-কে সুন্নাহ মেনে চলা এবং আহলে বাইতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শর্ত দেওয়া হয়। মুয়াবিয়া (রা.) ২০ বছর খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন, যার সময় মুসলিম বিশ্ব অনেক উন্নতি লাভ করে।
চ) ইয়াজিদের শাসন ও কারবালার ঘটনা
৬০ হিজরিতে মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইন্তেকালের পর তার পুত্র ইয়াজিদ খলিফা হন। তবে, তার খিলাফত অনেক সাহাবী মেনে নেননি, যার মধ্যে ছিলেন আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রা.), আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) এবং আব্দুল্লাহ বিন জুবায়র (রা.)। এই সময় কুফাবাসী ইমাম হুসাইন (রা.)-কে খলিফা হিসেবে বায়াত করতে আমন্ত্রণ জানায়। হুসাইন (রা.) তার পরিবার ও আহলে বাইতের ৮০ জন সদস্য নিয়ে কুফায় যাত্রা করেন।
কিন্তু ইয়াজিদের নিয়োজিত গভর্নর আব্দুল্লাহ বিন জিয়াদ ৪০০০ সৈন্য নিয়ে হুসাইন (রা.) ও তার সঙ্গীদের ঘিরে ফেলে। হুসাইন (রা.) যুদ্ধ এড়াতে তিনটি প্রস্তাব দেন: ইয়াজিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, সীমান্তে জিহাদের জন্য যাওয়া, অথবা মদিনায় ফিরে যাওয়া। কিন্তু তার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। ৬১ বা ৬২ হিজরির দশম মহররমে কারবালার ময়দানে হুসাইন (রা.) এবং তার ৭৯ জন সঙ্গী শহীদ হন। এই ঘটনা মুসলিম বিশ্বে একটি বিয়োগান্ত অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয়।
ছ) হাররার যুদ্ধ ও মক্কায় হামলা
ইয়াজিদের শাসনামলে মদিনাবাসী তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ৬৩ হিজরিতে মুসলিম বিন উকবার নেতৃত্বে ইয়াজিদের সেনাবাহিনী মদিনায় হামলা চালায়, যা হাররার যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ শহীদ হন এবং মদিনায় লুটপাট চালানো হয়। একই বছরে হুসাইন বিন নুমায়রের নেতৃত্বে মক্কায় হামলা চালানো হয়, যেখানে আব্দুল্লাহ বিন জুবায়র (রা.) খিলাফতের দাবি করছিলেন। এই হামলায় কাবা ঘরের দেয়ালে মিনজানিকের গোলা লাগে।
জ) আব্দুল্লাহ বিন জুবায়র (রা.)-এর শাহাদাত
আব্দুল মালেক বিন মারওয়ানের শাসনামলে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নেতৃত্বে মক্কায় পুনরায় হামলা চালানো হয়। এই হামলায় আব্দুল্লাহ বিন জুবায়র (রা.) এবং তার অনুসারীরা শহীদ হন। আব্দুল্লাহ বিন জুবায়র (রা.) ছিলেন জান্নাতের ১০ জন সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত সাহাবী জুবায়র বিন আওয়াম (রা.) এবং আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর কন্যা আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)-এর সন্তান।
(৪) খারিজি মতবাদ ও পলিটিক্যাল সমালোচনা
খারিজি মতবাদ এবং পলিটিক্যাল সমালোচনার মধ্যে পার্থক্য বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। খারিজিরা বিশ্বাস করত, কবিরা গুনাহ করলে ব্যক্তি কাফের হয়ে যায়। কিন্তু পলিটিক্যাল সমালোচনা, যেমন ইয়াজিদের শাসনের বিরোধিতা, খারিজি মতবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। আব্দুল্লাহ বিন জুবায়র (রা.), মদিনাবাসী এবং অন্যান্য সাহাবীরা ইয়াজিদের শাসনের বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু তারা খারিজি ছিলেন না। পলিটিক্যাল সমালোচনাকে খারিজি মতবাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
(৫) ইতিহাস থেকে শিক্ষা
কারবালার ঘটনা, হাররার যুদ্ধ এবং মক্কায় হামলার ঘটনাগুলো মুসলিম ইতিহাসের দুঃখজনক অধ্যায়। এই ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমদের পরীক্ষা করেছেন এই ঘটনাগুলোর মাধ্যমে। তবে, এই ঘটনাগুলোর জন্য কাউকে কাফের বা ফাসেক বলে ট্যাগ করা উচিত নয়।
দশম মহররম মুসলিমদের জন্য একটি পবিত্র দিন, যা মূসা (আ.)-এর মুক্তির স্মরণে রোজা পালনের মাধ্যমে উদযাপিত হয়। কারবালার ঘটনা এই দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, রোজার মূল উদ্দেশ্য মূসা (আ.)-এর ঘটনার স্মরণ। এই দিনে ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করে মুসলিমদের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা উচিত। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে এই ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।
FAQs
প্রশ্ন: দশম মহররমে রোজা রাখার প্রধান কারণ কী?
উত্তর: দশম মহররমে রোজা রাখার প্রধান কারণ হলো মূসা (আ.) এবং বনি ইসরাইলের ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তির স্মরণ।
প্রশ্ন: কারবালার ঘটনা কখন ঘটেছিল?
উত্তর: কারবালার ঘটনা ৬১ বা ৬২ হিজরিতে দশম মহররমে ঘটেছিল।
প্রশ্ন: খারিজি মতবাদ কী?
উত্তর: খারিজি মতবাদ হলো এই বিশ্বাস যে, কবিরা গুনাহ করলে ব্যক্তি কাফের হয়ে যায়। এটি পলিটিক্যাল সমালোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।









