গরুর খাদ্য ও খাবার

গরু পালন মোটাতাজাকরণ একটি লাভজনক প্রক্রিয়া, তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিকভাবে গরুর খাদ্য ও খাবার ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গরুর যত্ন নেওয়া।
(১) গরুর খাদ্য সামগ্রীর শ্রেণিবিন্যাস

গরুর খাদ্যকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে-
ক) আঁশ বা ছোবড়া জাতীয় খাদ্য
এই জাতীয় খাদ্যকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়-
১. কাঁচা অবস্থায়: যেমন- যেকোনো ধরনের কাঁচা ঘাস, কচুরিপানা, লতাপাতা ইত্যাদি।
২. শুকনো অবস্থা: যেমন- শুকনো খড়, শুকনো ঘাস ইত্যাদি।
খ) দানাদার জাতীয় খাদ্য
দানাদার খাদ্য সাধারণত কম আঁশযুক্ত ও শুষ্ক হয়। এটি প্রধানত আমিষ, শর্করা এবং চর্বি জাতীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহের জন্য ব্যবহার করা হয়। এর উদাহরণ হলো: গম ভাঙ্গা, ভুট্টা ভাঙ্গা, চাউলের কুড়া, ভুষি, খৈল, ডালের খোসা ইত্যাদি।
আমাদের দেশে সাধারণত খড়, ভূষি, কুঁড়া, চাউল, গম, খৈল, গাছের পাতা, ঘাস ও আগাছা ইত্যাদি গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
(২) গরুর খাদ্য প্রস্তুতের পূর্বশর্ত
গরুর জন্য সঠিক খাদ্য প্রস্তুত করতে হলে নিম্নলিখিত ১১টি শর্ত মেনে চলা প্রয়োজন-
১. খাদ্যে গরুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানসমূহ সঠিক মাত্রায় থাকতে হবে।
২. স্থানীয় বাজারে সহজে এবং সস্তায় পাওয়া যায় এমন উপকরণ খাদ্য তৈরির জন্য ব্যবহার করা উচিত।
৩. খাদ্য অবশ্যই সু-স্বাদু ও সহজপাচ্য হতে হবে।
৪. বিভিন্ন ধরনের খাদ্য সামগ্রী দিয়ে খাদ্য তৈরি করা উচিত।
৫. খাদ্য টাটকা হতে হবে; ময়লা, ছাতাপড়া ও দুর্গন্ধমুক্ত হতে হবে।
৬. খাদ্য প্রস্তুতের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন গরুর পেট পূর্ণ হয়, অর্থাৎ খাদ্যের আয়তন বেশি হওয়া প্রয়োজন।
৭. গরুর জন্য কাঁচা ঘাস অত্যাবশ্যক। এতে পর্যাপ্ত ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ থাকে এবং এটি সহজে হজম হয়।
৮. খাদ্য উপাদান হঠাৎ করে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করা উচিত নয়; প্রয়োজনে দিনে দিনে অল্প অল্প করে পরিবর্তন করতে হবে।
৯. খাদ্য সঠিকভাবে তৈরি করতে হবে। যেমন- ছোলা, খেসারি, মাসকলাই, ভুট্টা, গম, খৈল ইত্যাদি মিশ্রণের পূর্বে ভেঙ্গে নিতে হবে। এতে সুষমভাবে মেশানো যাবে এবং হজম সহজ হবে।
১০. ছোবড়া জাতীয় খাদ্য (যেমন খড় বা কাঁচা ঘাস) আস্ত না দিয়ে ছোট ছোট করে কেটে খাওয়াতে হবে। এতে অপচয় কম হয় এবং গরুর হজমে সহায়তা করে।
১১. খাদ্য অবশ্যই অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভজনক হতে হবে।
(৩) খাদ্যের উপাদান ও তাদের কার্যকারিতা

খাদ্য থেকে দেহের জন্য প্রয়োজনীয় ৬টি উপাদান পাওয়া যায়: শর্করা, আমিষ, চর্বি, খনিজ পদার্থ, ভিটামিন এবং পানি। নিচে এদের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো-
| উপাদানের নাম | কাজ | উৎস |
| ১. শর্করা | শরীরে শক্তি উৎপাদন করে | ঘাস, খড়, চালের কুড়া, চালের খুদ, গমের ভাঙ্গা, চিটাগুড়, ভুট্টা ভাঙ্গা, ডাল ভাঙ্গা, ছোলা ভাঙ্গা, কাসাভা, আলু, কাউন ইত্যাদি। |
| ২. আমিষ | শরীরের ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধি সাধন করে | বিভিন্ন প্রকার তৈল বীজের খৈল, ডাল ও ডালের ভুষি, সয়াবিন বীজ ভাঙ্গা, ইউরিয়া, শুটকি মাছের গুড়া ইত্যাদি। |
| ৩. ভিটামিন | রোগ প্রতিরোধ করে ও খাদ্য বিপাকে সহায়তা করে | কাঁচা লতাপাতা, সবুজ ঘাস, গুল্ম, শাক সবজি এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিটামিন। |
| ৪. চর্বি | শরীরের শক্তি ও তাপ উৎপাদন করে | তিলের খৈল, বাদাম খৈল, সয়াবিন ও অন্যান্য তৈল বীজের খৈল। |
| ৫. খনিজ দ্রব্য | দেহের ক্ষার ও এসিডের ভারসাম্য রক্ষা করে ও হাড় গঠনে সাহায্য করে | লবণ, শামুক-ঝিনুক গুড়া, হাড়ের গুড়া, ডিমের খোসার গুড়া, বোন মিল, ক্যালসিয়াম ফসফেট বা খড়িমাটি, রক ফসফেট ইত্যাদি। |
| ৬. পানি | খাদ্য পরিপাক এবং দেহের অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নির্গমন করে | বিশুদ্ধ পানি। |
(৪) ওজনভেদে সুষম দানাদার খাদ্যের তালিকা
গরুর ওজন অনুযায়ী দানাদার খাদ্যের মিশ্রণ নিচের তালিকা অনুযায়ী করা যেতে পারে-
| খাদ্য উপাদান | ১০০ কেজির কম ওজনের জন্য | ১০০-১৫০ কেজি ওজনের জন্য | ১৫০-২০০ কেজি ওজনের জন্য |
| ১. গমের ভূষি | ২৫০ গ্রাম | ১ কেজি | ১ কেজি |
| ২. চালের কুড়া | ২৫০ গ্রাম | ৫০০ গ্রাম | ৭৫০ গ্রাম |
| ৩. তিলের খৈল | ১০০ গ্রাম | ২০০ গ্রাম | ২৫০ গ্রাম |
| ৪. চিটাগুড় | ২০০ গ্রাম | ২৫০ গ্রাম | ২৫০ গ্রাম |
| ৫. হাড়ের গুড়া/চুন | ৩০-৪০ গ্রাম | ২৫ গ্রাম | ২৫ গ্রাম |
| ৬. লবণ | ২৫ গ্রাম | ৩০ গ্রাম | ৩০ গ্রাম |
(৫) সূত্রের সাহায্যে গরুর ওজন নির্ণয়

ওজন মাপার যন্ত্র ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় সূত্রের মাধ্যমে সহজ উপায়ে গরুর ওজন নির্ণয় করা যায়।
সূত্র:

পদ্ধতি:
- লম্বা বা দৈর্ঘ্য: গরুর কাঁধের নীচে সামনের পায়ের উপরের জোড়া থেকে শরীরের শেষ সীমা (লেজের গোড়া) পর্যন্ত।
- বুকের বেড়: সামনের পায়ের পিছনের দিক ঘেঁষে বুকের চারদিকের মাপ নিতে হবে।
- প্রাপ্ত পাউন্ড ওজনকে ২.২ দ্বারা ভাগ করলে কেজিতে ওজন পাওয়া যাবে।
- মনে রাখতে হবে, শুধুমাত্র খাওয়ার যোগ্য মাংসের ওজন মোট ওজনের প্রায় ৫২%।
উদাহরণ:
একটি গরুর দৈর্ঘ্য ২৪ ইঞ্চি এবং বুকের বেড় ৫০ ইঞ্চি হলে,
গরুটির ওজন = (২৪ × ৫০ × ৫০) ÷ ৩০০ = ৬,০০,০০০ ÷ ৩০০ = ২০০০ পাউন্ড।
যদি পাউন্ডকে কেজি করতে হয় তবে, ২০০০ পাউন্ড × ০.৪৫৩ = ৯০৬ কেজি।
(৬) দৈনিক খাদ্য তালিকা (মোটাতাজাকরণ)
গরুর শারীরিক ওজন অনুযায়ী ধানের খড়, কাঁচা ঘাস এবং দানাদার খাদ্যের দৈনিক চাহিদার তালিকা নিচে দেওয়া হলো-
| শারীরিক ওজন (কেজি) | ধানের খড় (কেজি) | কাঁচা ঘাস (কেজি) | দানাদার খাদ্য (কেজি) |
| ৫০ | ০.৫০ | ২.০০ | ১.২০ |
| ৭৫ | ১.০০ | ৩.০০ | ২.০০ |
| ১০০ | ২.০০ | ৫.০০ | ৩.৫০ |
| ১৫০ | ২.০০ | ৫.০০ | ৩.৫০ |
| ২০০ | ৩.০০ | ৬.০০ | ৪.০০ |
| ২৫০ | ৩.৫০ | ৭.০০ | ৪.৫০ |
| ৩০০ | ৪.০০ | ৮.০০ | ৫.০০ |
| ৩৫০ | ৪.০০ | ৮.০০ | ৫.০০ |
| ৪০০ | ৪.০০ | ৯.০০ | ৫.০০ |
| ৪৫০ | ৪.০০ | ১.০০ (১০.০০) | ৫.০০ |
| ৫০০ | ৪.০০ | ১০.০০ | ৫.০০ |
সঠিক নিয়ম মেনে খাদ্য সরবরাহ করলে গরু দ্রুত স্বাস্থ্যবান হয় এবং খামারি লাভবান হতে পারেন।
গবাদি পশু পালন ও মাংস উৎপাদনের ক্ষেত্রে সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণি ও পুষ্টি বিভাগ (বাকৃবি, ময়মনসিংহ) এর সূত্রমতে, গরুর ধরন ও ওজন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নিচে গরু মোটাতাজাকরণের বিভিন্ন খাদ্য তালিকা এবং উন্নত মানের খাবার তৈরির পদ্ধতি আলোচনা করা হলো।
(৭) গরু মোটাতাজাকরণে সুষম খাদ্যের তালিকা

গরুর শারীরিক অবস্থা এবং ওজনের ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিনের খাদ্যের চার্ট নিচে দেওয়া হলো-
ক) টেবিল নং-১: মধ্যম বয়সী দুর্বল ও শীর্ণকায় গরুর খাদ্য
মধ্যম বয়সী দুর্বল ও শীর্ণকায় গরুকে মোটাতাজা করে গো-মাংস উৎপাদনের জন্য নিম্নোক্ত রসদটি উপযুক্ত-
- খড়: ২.৫ কেজি
- ঘাস: ৫.০ কেজি
- গমের ভূষি/চালের কুঁড়া: ০.৫ কেজি
- ইউরিয়া: ৮০ গ্রাম
- লালী গুড়: ৪০০ গ্রাম
- লবণ: ৩৫ গ্রাম
খ) টেবিল নং-২: ১২০-১৫০ কেজি ওজনের বাছুরের খাদ্য
- খড়: ৩.০ কেজি
- ঘাস: ৪.০ কেজি
- গমের ভূষি/চালের কুঁড়া: ০.২৫ কেজি
- তিলের খৈল: ০.২৫ কেজি
- ইউরিয়া: ৩০ গ্রাম
- নালী গুড়: ৩০০ গ্রাম
- লবণ: ৩০ গ্রাম
- হাঁড়ের গুঁড়া: ৩০ গ্রাম
গ) টেবিল নং-৩: ১২০ কেজি ওজনের গরুর মোটাতাজাকরণ খাদ্য
- ইউরিয়া প্রক্রিয়াজাত খড়: ২.৫ কেজি
- ঘাস: ৬.০ কেজি
- চালের কুঁড়া: ১.০ কেজি
- তিলের খৈল: ০.৫ কেজি
- শুটকি মাছের গুড়া: ১০০ গ্রাম
- নালী গুড়: ৩০০ গ্রাম
- হাড়ের গুড়া: ৩০ গ্রাম
- লবণ: ৩০ গ্রাম
(৮) ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত খড় (UMS) তৈরির পদ্ধতি

ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত খড় বা ইউএমএস (UMS) গরুর জন্য একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার। ১০ কেজি ইউএমএস তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো হলো-
- খড়: ১০ কেজি
- ইউরিয়া: ৩০০ গ্রাম
- মোলাসেস (চিটা গুড়): ২.৫ কেজি
- পানি: ৫-৬ লিটার
তৈরির নিয়মাবলী:
১. প্রথমে একটি পাত্রে পরিমাণ মত ইউরিয়া গুলে নিতে হবে।
২. অতঃপর ইউরিয়া মিশানো পানি চিটা গুড়ের সাথে মিশাতে হবে।
৩. মেঝে বা উঠানে পলিথিন বিছিয়ে পরিমাণমত খড় মেপে নিয়ে পলিথিনের উপর বিছাতে হবে।
৪. ইউরিয়া এবং চিটাগুড় মিশ্রিত দ্রবণের অর্ধেক পরিমাণ নিয়ে পলিথিনে বিছিয়ে রাখা খড়ের উপর ছিটাতে হবে যাতে খড়ের উপর দ্রবণ লাগে।
৫. বিছানো খড় উল্টে দিতে হবে যাতে উপরের ভিজা অংশ নিচে যায় এবং নীচের শুকনা অংশ উপরে আসে।
৬. অবশিষ্ট ইউরিয়া মোলাসেস মিশ্রিত দ্রবণ পূর্বের নিয়মে ছিটিয়ে দিতে হবে।
৭. দ্রবণ মিশানো শেষ হলে খড়গুলোকে গাদা করে তুলে রাখতে হবে। গাদা করার সময় খড় হাত দ্বারা ঘষে দিতে হবে যাতে দ্রবণ খড়ের গায়ে লেগে থাকে।
৮. মিশ্রণটি খড়ের গায়ে ঠিক মত লেগেছে কিনা প্রমাণের জন্য গাদা তৈরির ১ ঘণ্টা পর কিছু খড় হাতের মুঠে নিয়ে চাপ দিতে হবে। যদি মোলাসেস হাতের তালুতে বা আঙ্গুলে লেগে থাকে তবে বুঝতে হবে মিশ্রণটি সঠিক হয়েছে।
(৯) ইউএমএস (UMS) এর গুণাগুণ ও উপকারিতা

ইউএমএস ব্যবহারের ফলে গবাদি পশুর নানাবিধ উন্নতি লক্ষ্য করা যায়-
- এটি সহজে হজম হয় এবং খড়ের খাদ্য উপাদানের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।
- খাদ্যের পুষ্টিমান বাড়ে এবং দেহে আমিষের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়।
- এটি শর্করা ও খনিজ পদার্থ সরবরাহ করে।
- প্রাণির শারীরিক ওজন ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
- গরু-মহিষের দুধ উৎপাদন ও কর্মশক্তি বৃদ্ধি পায়।
- গরু মোটাতাজাকরণে এই খাদ্য বেশি কার্যকর এবং এর ফলে খামারির আয় বৃদ্ধি পায়।
সুবিধা ও সাবধানতা:
- সুবিধা: ইউএমএস তৈরি পদ্ধতি খুব সহজ এবং খরচ তুলনামূলক কম। এই খাবার তৈরির সাথে সাথেই খাওয়ানো যায় এবং ২-৩ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। পরিমাণমতো ইউরিয়া মিশালে বিষক্রিয়ার কোনো ভয় থাকে না। এটি সকল বয়সের এবং গর্ভবতী গরু-মহিষকেও খাওয়ানো যায়। খামারিরা তাদের চাহিদামত যেকোনো সময় এটি প্রস্তুত করতে পারেন।
- সাবধানতা: ইউএমএস তৈরিতে ইউরিয়া, মোলাসেস, খড় ও পানির আনুপাতিক পরিমাণ সবসময় ঠিক রাখতে হবে। ইউরিয়ার মাত্রা কোনো অবস্থাতেই বাড়ানো যাবে না এবং সবসময় পরিষ্কার পানি ব্যবহার করতে হবে।
(১০) ইউএমএস (UMS) তৈরির আনুপাতিক চার্ট

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০০ কেজির একটি গরুর ক্ষেত্রে প্রতিদিন ৭.৫ কেজি ইউএমএস এবং ৩.০ কেজি দানাদার খাদ্য (সাথে পর্যাপ্ত পানি) প্রদান করলে ৩ মাস পর্যন্ত প্রতিদিন ১ কেজি হারে দৈহিক ওজন বৃদ্ধি পায়।
বিভিন্ন পরিমাণ খড়ের জন্য উপকরণগুলোর অনুপাত নিচে দেওয়া হলো-
| খড় (কেজি) | পানি (লিটার) | চিটাগুড় (কেজি) | ইউরিয়া (কেজি) |
| ৫ কেজি | ২.৫ – ৩.৫ | ১ – ১.৫ | ০.১৫ |
| ১০ কেজি | ৫ – ৭ | ২ – ২.৫ | ০.৩০ |
| ২০ কেজি | ১০ – ১৪ | ৪ – ৫ | ০.৬০ |
| ৫০ কেজি | ২৫ – ৩৫ | ১০ – ১২ | ১.৫০ |
| ১০০ কেজি* | ৫০ – ৭০ | ২০ – ২৪ | ৩.০০ |
(১১) ইউরিয়া দ্বারা খড় প্রক্রিয়াজাতকরণে আরও কিছু তথ্য
খড় প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ইউরিয়া মিশ্রিত পানি দিয়ে খড়গুলোকে দেহল বা স্তূপ করে রাখতে হবে। খড়গুলো কুটি কুটি করে কেটে ১০ কেজি খড়ের জন্য ইউরিয়া ও ৮/১০ লিটার পানির মিশ্রণ ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রক্রিয়াজাতকরণের স্থানটি একটু উঁচু ও শুকনো হওয়া বাঞ্ছনীয়। সঠিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত খড় গরুর স্বাস্থ্য ও খামারের মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
আমাদের দেশের গরু সাধারণত খড় খেয়ে জীবনধারণ করে। বর্ষাকালে গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা যায়। ইউরিয়া প্রক্রিয়াজাতকরণ খড় খাওয়ানোর মাধ্যমে গরুর বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়, মাংস এবং দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। যে সকল এলাকাতে কাঁচা ঘাসের অভাব প্রকট পক্ষান্তরে ধান আবাদের সুবাদে খড় উৎপাদন যথেষ্ট হয় সে সকল এলাকার কৃষকরা গরুর খাদ্য হিসাবে ইউরিয়া মোলাসেস ব্যবহার করতে পারে, যা তাদের আর্থিকভাবেও লাভবান করবে। ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক খাওয়ানো গবাদি পশুর খড়ের খাদ্যমান বেড়ে যায়, হজম যোগ্যতা বাড়ে এবং ইউরিয়া দ্বারা শরীরের প্রয়োজনীয় আমিষের চাহিদা পূরণ হয়। তাছাড়া বর্ষাকালে ও অন্যান্য দুর্যোগপূর্ণ সময়ে গো খাদ্যের সংকটের সময় এটি মজুত খাদ্য হিসেবে কাজ করে। নিয়মিত খাওয়ালে গরুর দৈনিক ওজন বাড়ে।
(১২) ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক তৈরির উপাদান ও পদ্ধতি

ব্লকের মধ্যে শতকরা ৫০-৬০ ভাগ চিটাগুড়, ২৫-২৬ ভাগ গমের ভূষি, ৮-৯ ভাগ ইউরিয়া এবং ৫-৬ ভাগ চুনা (খাওয়ার চুন) দেয়া থাকে। এক কেজির একটি ব্লকে সাধারণত ৯ মেগা শক্তি ও ২৪০ গ্রাম প্রোটিন থাকে। তাছাড়া অতি প্রয়োজনীয় খনিজ ও ভিটামিনের মিশ্রণও এর সাথে দেয়া থাকে।
৯ কেজি পরিমাণ ব্লক তৈরির পদ্ধতি নিম্নে বর্ণনা করা হলো-
১। ৫-৬ কেজি পরিমাণ চিটাগুড় একটি পাত্রে ঢেলে দিন। লোহার কড়াই বা খালি ড্রামের অর্ধাংশে বা এ জাতীয় শক্ত পাত্র হলে ভাল হয়।
২। ২.৫ থেকে ৩ কেজি পরিমাণ গমের ভূষি মেপে নিন।
৩। এবার ৩৫ গ্রাম লবণ (যদি সম্ভব হয় সাথে ২০০ গ্রাম ভিটামিন ও খনিজ মিশ্রণ) মেপে নিন।
৪। এবার ৮০-৯০ গ্রাম ইউরিয়া আলাদা করে মেপে নিন।
৫। ওজনকৃত চুনের গুড়া, ইউরিয়া ও লবণ ভালভাবে মিশিয়ে নিন।
৬। এবার কড়াইটি তাপাধার থেকে নামিয়ে নিন এবং ভালভাবে নাড়াচাড়া করুন যতক্ষণ পর্যন্ত না নালি বা চিটাগুড়ের আঠা আঠা জমাট ভাব আসে।
৭। মিশ্রণটি ফুটন্ত নালি বা চিটাগুড়ের সাথে মিশিয়ে নিন এবং পরে ওজনকৃত গমের ভূষি ঢেলে দিন ও একটি শক্ত কাঠি বা হাতল এর সাহায্যে নাড়াচাড়া করে ভূষি ও পূর্বের মিশ্রণে সম্পূর্ণভাবে মিশিয়ে নিন।
৮। নালি, ভূষি, চুনা, ইউরিয়া ও খনিজদ্রব্য মিশ্রিত মিশ্রণ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ (ছাচের আকার ও ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী) নিয়ে ব্লক তৈরি করুন।
৯। মিশ্রণটি ছাচে ঢালার পরে ছাচের মাপ অনুযায়ী ঢাকনা উপরে রেখে চাপ দিতে থাকুন যেন মিশ্রণটি শক্ত জমাট বাঁধা (ছাচের আকারের মত) একটি ব্লকে পরিণত করতে সাহায্য করে।
১০। সাবধানতার সহিত ব্লকটি ছাচ থেকে তুলে নিন এবং ৩০ মিনিটের মত বাইরে রেখে দিন। এ সময়ের মধ্যে সাধারণত ব্লকটি শক্ত হয়ে যায়।
১১। যদি এক সঙ্গে অধিক পরিমাণ ব্লক তৈরি করার প্রয়োজন হয় তবে তা পলিথিনের মোড়ক আচ্ছাদিত করা বাঞ্ছনীয়। এতে ব্লকের গায়ে ধূলা-বালি ইত্যাদি লাগার সম্ভাবনা থাকেনা এবং অনেক দিনের জন্য সংরক্ষণ করা যায়।
(১৩) গরুকে মোলাসেস ব্লক খাওয়ানোর নিয়মাবলী ও ছাচের মাপ
- গরুকে দৈনিক ১০০ গ্রাম-এর বেশি দেয়া উচিৎ নয়। একটি ১ কেজি ব্লক গরুকে ৮-১০ দিন খাওয়ানো যাবে।
- প্রথম প্রথম ব্লক খেতে না চাইলে ব্লকের উপর লবণ বা ভূষি ছিটিয়ে দিন এবং প্রতিদিন যত্ন সহকারে খাওয়াতে অভ্যাস করুন।
- ব্লক খাওয়ানোর পাশাপাশি গরুকে অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার যেমন- খড়, তাজা ঘাস, পানি ইত্যাদি খেতে দিন।
ছাচ তৈরির মাপ (২ কেজি ওজনের ব্লকের জন্য):
- দৈর্ঘ্য: ৯ ইঞ্চি
- প্রস্থ: ৪.৫ – ৫ ইঞ্চি
- উচ্চতা: ৪ ইঞ্চি
বিশেষ সাবধানতা:
১। ব্লকটি সাধারণত পানিতে গুলে অথবা ভেঙ্গে খাওয়ানো উচিত নয়।
২। ব্লকটি হাঁস ও মুরগিকে খেতে দেয়া উচিৎ নয়।
৩। চিটাগুড় পাতলা থাকলে অপেক্ষাকৃত বেশি সময় ধরে ফুটাতে হয় যতক্ষণ পর্যন্ত না আঠালো ভাব আসে।
৪। ইউরিয়া মিশ্রিত ব্লক খাওয়ানোর জন্য গরুর বয়স কমপক্ষে এক বছর হতে হবে।
(১৪) তাজা ও ভিজা খড় সংরক্ষণ পদ্ধতি

কিছু নিয়ম-কানুন মেনে তাজা ও ভিজা খড় সংরক্ষণ করা যায়। এতে দীর্ঘদিন পর্যন্ত খড়ের গুণগত মান অক্ষুন্ন থাকে এবং প্রাণি খাদ্যের পুষ্টিমান বজায় থাকে। প্রতি ১০০ কেজি খড়ের জন্য ১.৫-২ কেজি ইউরিয়া এবং পলিথিনের প্রয়োজন হয়।
তৈরির ধাপসমূহ:
- প্রথমে পানি জমা হয়না এমন একটি উঁচু স্থান বাছাই করতে হবে।
- বাছাইকৃত উঁচু জায়গাটি পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
- পলিথিনের উপর ঝেড়ে ঝেড়ে ছড়ায়ে দিয়ে খড় বিছাতে হবে।
- ৮-১০ ইঞ্চি উঁচু স্তরে স্তরে পরিমাণ মত ইউরিয়া ছিটাতে হবে।
- ভালভাবে পা দিয়ে খড় চেপে দিতে হবে যাতে খড়ের গাদায় বাতাস না থাকে।
- সবশেষে পলিথিন দিয়ে এমন ভাবে ঢেকে দিতে হবে যাতে বাহির থেকে বাতাস এবং পানি না ঢুকতে পারে।
সাধারণ শুকনা খড় বনাম সংরক্ষিত খড়ের পুষ্টিগুণ:
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত খড়ে প্রোটিন থাকে ৯-১২% (শুকনা খড়ে মাত্র ৪-৫%)। এর রুমেন পাচ্যতা ৪৫% এবং বিপাকীয় শক্তি প্রতি কেজিতে ১০ মেগাজুল। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু শুকনা খড় খাওয়ালে গরুর ওজন কমে (দৈনিক ৩৭৯ গ্রাম), কিন্তু সংরক্ষিত খড় খাওয়ালে ওজন বাড়ে (দৈনিক ২৮৩ গ্রাম)।
(১৫) খাদ্য মজুদ ও দানাদার মিশ্রণ তৈরির ফরমূলা
খাদ্য মজুদ করার ক্ষেত্রে ঘর অবশ্যই মাঁচাযুক্ত হতে হবে। কুঁড়া ২ মাসের বেশি মজুদ করলে ছত্রাক পড়তে পারে, তাই ২ মাস পর পর মজুদ করা ভালো। গমের ভূষি অবশ্যই শুকনা হতে হবে। ডাল বা কালাই-এর ভূষি ৪ মাস এবং ঝিনুকের গুড়া এক বৎসর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। খৈল না ভাঙ্গিয়ে আস্ত রাখলে এক বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। মোলাসেস চিনিকল থেকে সারা বছরের জন্য মজুদ করা যেতে পারে। সকল ক্ষেত্রেই খেয়াল রাখতে হবে যেন বৃষ্টিতে খাবার না ভিজে। গুঁড়া জাতীয় খাদ্যে পোকা রোধে শুকনা নিম পাতা ব্যবহার করা যেতে পারে।
খাওয়ানোর নিয়ম:
সংরক্ষিত খড় গাদা থেকে বের করার পর কিছুক্ষণ ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে এমোনিয়া গ্যাস বের করে দিয়ে খাওয়াতে হয়। সাবধানতার জন্য সংরক্ষিত খড়ের সাথে ৪০% সাধারণ শুকনা খড় মিশিয়ে খাওয়ালে এমোনিয়াজনিত বিষক্রিয়ার ভয় থাকে না। একটি গাদা ১ বৎসর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। গাদা ঢাকার জন্য ছেড়া ফাটা পলিথিন ব্যবহার করা যাবে না।
দানাদার খাদ্য মিশ্রণের ৪টি কার্যকরী ফরমূলা:
- ফরমূলা-১: তিলের খৈল ২৫%, গমের ভূষি ২৫%, চাউলের কুড়া ২৫%, খেসারী ডাল ২৫%।
- ফরমূলা-২: গম ভাংগা ২৫%, তিলের খৈল ২৫%, গমের ভূষি ২৫%, খেসারির ডালের ভূষি ২৫%।
- ফরমূলা-৩: তিলের খৈল ২৫%, ভূট্টার গুড়া ২৫%, গমের ভূষি ২৫%, চালের কুড়া ২৫%।
- ফরমূলা-৪: তিলের খৈল ২৫%, চালের কুড়া ২৫%, গমের ভূষি ২৫%, ডালের ভূষি ২৫%।
বিশেষ প্রয়োজনে তিলের খৈলের পরিবর্তে চীনাবাদাম, নারিকেল বা সরিষার খৈল ব্যবহার করা যেতে পারে।
আমাদের দেশের গরু সাধারণত খড় খেয়ে জীবনধারণ করে। তবে বর্ষাকালে গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে ইউরিয়া প্রক্রিয়াজাতকরণ খড় খাওয়ানোর মাধ্যমে গরুর বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় এবং মাংস ও দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে যে সকল এলাকায় কাঁচা ঘাসের অভাব প্রকট কিন্তু ধান আবাদের ফলে প্রচুর খড় উৎপাদিত হয়, সেখানকার কৃষকরা ইউরিয়া মোলাসেস ব্যবহার করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন। ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক খাওয়ালে খড়ের খাদ্যমান ও হজমযোগ্যতা বাড়ে এবং ইউরিয়া শরীরের প্রয়োজনীয় আমিষের চাহিদা পূরণ করে। দুর্যোগপূর্ণ সময়ে এটি মজুত খাদ্য হিসেবেও অত্যন্ত কার্যকর।
(১৬) ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক তৈরির পদ্ধতি ও পুষ্টিগুণ

একটি এক কেজির ব্লকে সাধারণত ৯ মেগা শক্তি এবং ২৪০ গ্রাম প্রোটিন থাকে। এতে শতকরা ৫০-৬০ ভাগ চিটাগুড়, ২৫-২৬ ভাগ গমের ভূষি, ৮-৯ ভাগ ইউরিয়া এবং ৫-৬ ভাগ খাওয়ার চুন থাকে। এছাড়া এতে প্রয়োজনীয় খনিজ ও ভিটামিনের মিশ্রণও যোগ করা হয়।
৯ কেজি ব্লক তৈরির ধাপসমূহ:
১. একটি লোহার কড়াই বা শক্ত পাত্রে ৫-৬ কেজি চিটাগুড় নিন।
২. ২.৫ থেকে ৩ কেজি গমের ভূষি মেপে আলাদা রাখুন।
৩. ৩৫ গ্রাম লবণ (সম্ভব হলে ২০০ গ্রাম ভিটামিন ও খনিজ মিশ্রণসহ) মেপে নিন।
৪. ৮০-৯০ গ্রাম ইউরিয়া আলাদা করে মেপে নিন।
৫. চুনের গুড়া, ইউরিয়া ও লবণ ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।
৬. চিটাগুড় বা নালি গরম করে আঠালো ভাব না আসা পর্যন্ত নাড়াচাড়া করুন।
৭. ফুটন্ত চিটাগুড়ের সাথে আগের মিশ্রণটি এবং গমের ভূষি মিশিয়ে শক্ত কাঠি দিয়ে ভালো করে নাড়ুন।
৮. মিশ্রণটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢেলে চাপ দিয়ে ব্লকের আকার দিন এবং ৩০ মিনিট বাইরে রেখে শক্ত হতে দিন।
৯. অধিক পরিমাণে তৈরি করলে পলিথিনে মুড়িয়ে রাখুন যাতে ধুলাবালি না লাগে এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়।
গরুকে ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক খাওয়ানোর নিয়ম ও সতর্কতা:

গরুকে দৈনিক ১০০ গ্রামের বেশি ব্লক দেওয়া উচিত নয়। একটি ১ কেজি ব্লক ৮-১০ দিন খাওয়ানো যায়। শুরুতে খেতে না চাইলে উপরে লবণ বা ভূষি ছিটিয়ে অভ্যাস করতে হবে। ব্লকের পাশাপাশি খড়, ঘাস ও পানি দিতে হবে। তবে মনে রাখবেন, ব্লক কখনো পানিতে গুলে বা ভেঙে খাওয়ানো যাবে না এবং এটি হাঁস-মুরগিকে দেওয়া নিষিদ্ধ। এছাড়া গরুর বয়স কমপক্ষে এক বছর না হলে ইউরিয়া মিশ্রিত ব্লক দেওয়া উচিত নয়।
(১৭) তাজা ও ভিজা খড় সংরক্ষণ এবং পুষ্টিমান
নিয়ম মেনে তাজা ও ভিজা খড় সংরক্ষণ করলে দীর্ঘ সময় এর গুণগত মান ও পুষ্টি বজায় থাকে। প্রতি ১০০ কেজি খড়ের জন্য ১.৫-২ কেজি ইউরিয়া এবং পলিথিন প্রয়োজন।
তৈরির নিয়ম:
পানি জমে না এমন উঁচু স্থানে পলিথিন বিছিয়ে তার উপর খড় ছড়িয়ে দিন। প্রতি ৮-১০ ইঞ্চি স্তরে ইউরিয়া ছিটিয়ে পা দিয়ে ভালোভাবে চাপ দিন যাতে বাতাস বের হয়ে যায়। শেষে পলিথিন দিয়ে এমনভাবে ঢেকে দিন যেন বাতাস বা পানি ভেতরে না ঢুকতে পারে।
সাধারণ শুকনো খড়ের তুলনায় সংরক্ষিত খড়ে পুষ্টি অনেক বেশি থাকে। যেমন: প্রোটিনের পরিমাণ ৪-৫% থেকে বেড়ে ৯-১২% হয় এবং রুমেন পাচ্যতা ২৭% থেকে বেড়ে ৪৫% এ দাঁড়ায়। এটি খাওয়ালে গরুর ওজন কমার পরিবর্তে দৈনিক প্রায় ২৮৩ গ্রাম পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। খড় খাওয়ানোর আগে গাদা থেকে বের করে কিছুক্ষণ ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে যাতে অ্যামোনিয়া গ্যাস বের হয়ে যায়।
(১৮) খাদ্য মজুত ও দানাদার খাদ্যের ফর্মুলা
খাদ্য মজুতের ক্ষেত্রে ঘর অবশ্যই মাঁচাযুক্ত হতে হবে। কুঁড়া ২ মাস এবং ডাল বা কালাইয়ের ভূষি ৪ মাস পর্যন্ত মজুত করা যায়। খৈল আস্ত রাখলে এক বছর এবং ঝিনুকের গুঁড়াও এক বছর সংরক্ষণ করা সম্ভব। দানাদার খাদ্যের পোকা রোধে শুকনা নিমের পাতা ব্যবহার করা যেতে পারে।
দানাদার খাদ্য মিশ্রণের কয়েকটি ফর্মুলা:
- ফর্মুলা-১: তিলের খৈল ২৫%, গমের ভূষি ২৫%, চাউলের কুড়া ২৫%, খেসারী ডাল ২৫%।
- ফর্মুলা-২: গম ভাঙা ২৫%, তিলের খৈল ২৫%, গমের ভূষি ২৫%, খেসারির ডালের ভূষি ২৫%।
- ফর্মুলা-৩: তিলের খৈল ২৫%, ভুট্টার গুড়া ২৫%, গমের ভূষি ২৫%, চালের কুড়া ২৫%।
- ফর্মুলা-৪: তিলের খৈল ২৫%, চালের কুড়া ২৫%, গমের ভূষি ২৫%, ডালের ভূষি ২৫%।
১০০-২০০ কেজি ওজনের গরুর জন্য দৈনিক খাদ্য তালিকায় ২ কেজি অপ্রক্রিয়াজাত খড়, ১.৫ কেজি প্রক্রিয়াজাত খড়, ৪-৫ কেজি সবুজ ঘাস, ১.৫ কেজি দানাদার খাদ্য, ৫০০ গ্রাম চিটাগুড় এবং ৪০ গ্রাম লবণ রাখা ভালো।
(১৯) উন্নত জাতের ঘাস উৎপাদন কৌশল

পশুখাদ্যের অভাব মেটাতে স্থায়ী ও অস্থায়ী ঘাস চাষ করা জরুরি। স্থায়ী ঘাস একবার লাগালে কয়েক বছর থাকে (যেমন: নেপিয়ার, পারা, জার্মান), আর মৌসুমী ঘাস এক মৌসুমেই শেষ হয়ে যায়।
১. নেপিয়ার ঘাস: এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় উচ্চ ফলনশীল ঘাস। এটি জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না, তাই উঁচু দোঁআশ মাটি এর জন্য উপযুক্ত। বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাসে কাটিং বা মোথা পদ্ধতিতে এটি রোপণ করা হয়। বছরে ৫-৯ বার ঘাস কাটা যায় এবং হেক্টর প্রতি ১৭৫-২২০ টন ফলন পাওয়া যায়।
২. পারা ঘাস: এটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ঘাস যা মাটিতে লতার মতো ছড়িয়ে পড়ে। এটিও কাটিং ও মোথা দ্বারা বংশ বিস্তার করে। বছরে ৬-৭ বার কাটা যায় এবং ১০০-১২০ টন ফলন দেয়।
৩. জার্মান ঘাস: এটি নিচু ও জলাবদ্ধ জমিতে এমনকি আবদ্ধ পানিতেও চাষ করা যায়। এটি দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় অন্য আগাছা জন্মাতে পারে না। খাল, বিল বা নালা এই ঘাসের জন্য উপযুক্ত। এটিও মোথা ও কাটিং দিয়ে রোপণ করা হয়।
৪. জাম্বু ঘাস: এটি একবার লাগালে ২ থেকে আড়াই বছর পর্যন্ত সংগ্রহ করা যায়। জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ত স্থান ছাড়া সব জায়গায় এটি ভালো জন্মে। ফাল্গুন-চৈত্র মাস রোপণের জন্য উত্তম সময়।
গবাদি পশুর সঠিক বৃদ্ধি ও খামারের লাভের জন্য এই উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং খাদ্য তৈরির কৌশলগুলো অত্যন্ত কার্যকর।
গবাদি পশু মোটাতাজাকরণ ও ডেইরি খামারের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো উন্নত মানের ঘাস ও এর সঠিক ব্যবস্থাপনা। নিচে ঘাস চাষ থেকে শুরু করে ইপিল ইপিল চাষ এবং ঘাস সংরক্ষণের আধুনিক পদ্ধতিগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
(২০) উন্নত ঘাস চাষ ও পুষ্টিমান
সঠিক পরিমাণে বীজ ও সারের ব্যবহার ঘাসের ভালো ফলন নিশ্চিত করে। একর প্রতি ৩ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। জমি তৈরির সময় একর প্রতি ২০:৩০:১২ কেজি অনুপাতে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমপি সার প্রয়োগ করতে হয়। ঘাস লাগানোর ১ মাস পর এবং প্রতিবার কাটার পর একর প্রতি ২০-৩০ কেজি ইউরিয়া সার দিতে হবে।
ঘাস কাটার সময়কাল ঋতুভেদে ভিন্ন হয়। গ্রীষ্মকালে ৩০-৪৫ দিন পরপর এবং শীতকালে সেচ সুবিধা সাপেক্ষে ৪০-৫৮ দিন পরপর ঘাস কাটা যায়। প্রথম বছর ৫-৬ বার এবং দ্বিতীয় বছর ৭-৮ বার ঘাস সংগ্রহ করা সম্ভব। এতে বছরে কাঁচা ঘাসের মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ১০০-১৫০ টন। পুষ্টিমানের দিক থেকে ১ কেজি কাঁচা ঘাসে থাকে ১৯০ গ্রাম শুষ্ক পদার্থ, ১৮০ গ্রাম জৈব পদার্থ, ২১ গ্রাম প্রোটিন, ৭৫ গ্রাম ফাইবার এবং বিপাকীয় শক্তি থাকে ৪৫৪ কিলো ক্যালরি। এর পাচ্যতা প্রায় ৬৪%। এই ঘাস সংরক্ষণের জন্য সাইলেজ পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর।
(২১) ইপিল ইপিল: উচ্চ আমিষযুক্ত গো-খাদ্য

ইপিল ইপিল একটি অধিক আমিষ যুক্ত লেগুমিনাস গাছ। এর পাতা ও কঁচি ডগা গবাদিপশুকে কাঁচা বা শুষ্ক অবস্থায় খাওয়ানো যায়। এই গাছ ২০-৩০ ফুট লম্বা হয় এবং পাতা দেখতে তেঁতুল বা কড়ই গাছের মতো। এটি অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল এবং বহুবর্ষজীবী হলেও মূলত গ্রীষ্মকালে বেশি বাড়ে। এর প্রধান তিনটি জাত হলো— পেরু, হাওয়াই ও এল সালভাদর।
ক) চাষ ও বংশ বিস্তার
ইপিল ইপিল অধিক খরা সহিষ্ণু কারণ এর মূল মাটির গভীরে যায়। তবে এটি জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না এবং অম্ল মাটিতে ভালো হয় না। এর লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা মাঝারি। এটি বাঁধ, রাস্তার ধার বা সীমানা বেড়া বরাবর লাগানো যায়। সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে এর বীজ সংগ্রহ করা হয়। বীজ পাকলে এর পড বা খোসা গাঢ় বাদামী বা খয়েরী রঙ ধারণ করে।
বীজ বপনের আগে তা পরিশোধন করে নিতে হয়। বীজের শক্ত আবরণ নরম করতে বপনের পূর্বে ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম পানিতে ৩ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে। এরপর গরম পানি ফেলে ৩-৪ বার ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে দ্রুত ছায়ায় শুকাতে হবে। এছাড়া ১২-২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখলেও অঙ্কুরোদগম দ্রুত হয়।
খ) চারা তৈরি ও রোপণ
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ (এপ্রিল-মে) মাসে পলিথিন ব্যাগে বা বীজতলায় চারা তৈরি করা যায়। পলিথিন ব্যাগে দুটি করে বীজ দিতে হয় এবং চারা গজানোর পর দুর্বলটি তুলে ফেলতে হয়। বপনের ৩-৪ দিনে অঙ্কুরোদগম শুরু হয়ে ২-৩ সপ্তাহে শেষ হয়। ১০-১২ সপ্তাহ পর চারা ২০-৩০ সেন্টিমিটার লম্বা হলে তা রোপণের উপযোগী হয়। বেড়া হিসেবে লাগালে ঘন করে লাগাতে হয়, তবে ঘাস সংগ্রহের জন্য চাষ করলে ডাবল লাইনের দূরত্ব ৬ ফুট এবং বীজের ব্যবধান ৩ ফুট হওয়া উচিত। এই ঘাস গরুকে খাওয়ানোর সময় ডাল কেটে অন্য ঘাসের সাথে মিশিয়ে দেওয়া ভালো।
(২২) কাঁচা ঘাস সংরক্ষণ পদ্ধতি
বছরের সব সময় কাঁচা ঘাস পাওয়া যায় না, তাই অতিরিক্ত ঘাস ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য দুই পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যায়: ‘হে’ এবং ‘সাইলেজ’।
ক) হে (Hay) তৈরির পদ্ধতি

‘হে’ হলো এমনভাবে সংরক্ষিত ঘাস যেখানে ৪০-৮৫% শুষ্ক পদার্থ থাকে এবং জলীয় উপাদান ১৫-২০% এর বেশি থাকে না। ওট বা যব হে তৈরির জন্য সেরা। এছাড়া মটরশুঁটি, খেসারি বা মাস কলাইও ব্যবহার করা যায়।
তৈরির নিয়ম:
ভোরের শিশির শুকানোর পর নরম কাণ্ডের ঘাস কাটতে হবে। কাটার পর কয়েক ঘণ্টা রোদে ফেলে রাখতে হবে। প্রখর রোদে বাঁশের ঝাঁঝরি দিয়ে উল্টেপাল্টে ৪-৫ ঘণ্টা শুকাতে হবে। ছাদ, গাছ বা তে-পায়া স্ট্যান্ডের ওপর নেড়েও ঘাস শুকানো যায়। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন পাতা গুঁড়ো হয়ে না যায়। ভালো মানের হে অবশ্যই পাতাযুক্ত, সবুজ, নরম, ধূলিমুক্ত এবং সুগন্ধযুক্ত হতে হবে।
খ) সাইলেজ (Silage) তৈরির পদ্ধতি

বায়ুশূন্য অবস্থায় কাঁচা ঘাস সংরক্ষণ করাকে সাইলেজ বলে। ভুট্টা, জোয়ার, নেপিয়ার বা গিনি ঘাস সাইলেজের জন্য উপযুক্ত। সাইলেজ রাখার জায়গাকে ‘সাইলো পিট’ বলে। এটি মাটির ওপর দেয়াল দিয়ে বা মাটির গর্ত করে তৈরি করা যায়। আদর্শ সাইলো পিট ১ মিটার গভীর, ১.৫ মিটার চওড়া ও ৬ মিটার লম্বা হয়।
প্রস্তুত প্রণালী:
ফুল আসার আগে যখন ঘাসে ৭০% পানি থাকে, তখন ঘাস কেটে ছোট ছোট টুকরো করে পিটে ভরাট করতে হবে। প্রতিটি স্তর এমনভাবে চেপে ভরাট করতে হবে যেন কোনো বাতাস না থাকে। এরপর খড় দিয়ে ঢেকে তার ওপর পলিথিন বা মাটি চাপা দিয়ে বায়ুরোধক করতে হবে। লেগুমিনাস জাতীয় ঘাস হলে স্তরে স্তরে মোলাসেস বা চিটাগুড় মিশ্রিত পানি দিতে হবে। এভাবে ২৫-৩০ দিন রাখলেই সাইলেজ তৈরি হয়, যা কয়েক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।
দেশীয় ঘাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ৩০০ কেজি ঘাসের স্তরের ওপর ৩-৪% হারে (৯-১২ কেজি) চিটাগুড় ও ৭-১০ কেজি পানির মিশ্রণ ছিটিয়ে দিতে হয়। সাইলেজ খাওয়ানোর সময় পিটের একপাশ থেকে বের করতে হবে এবং বাকি অংশ ঢেকে রাখতে হবে।
গবাদি পশুর সঠিক বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। বিশেষ করে ঘাস সংরক্ষণ এবং উচ্চ পুষ্টিমান সম্পন্ন এ্যালজি চাষ খামারিদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। নিচে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
(২৩) ঘাস সংরক্ষণ ও খাওয়ানোর নিয়ম
ঘাস সংরক্ষণের প্রক্রিয়ায় স্তরে স্তরে সাজানো এবং সঠিক আর্দ্রতা বজায় রাখা জরুরি।
- সংরক্ষণ প্রক্রিয়া: ঘাসের স্তরের উপর ১৫ কেজি শুকনো খড়ের একটি স্তর বিছাতে হবে এবং তা ভালভাবে গাদা করতে হবে। এরপর একই প্রক্রিয়ায় এক স্তর দেশীয় ঘাস ও এক স্তর খড় সাজাতে হবে ও গাদা করতে হবে। সাইলো পিট ভর্তি করেও মাটির উপর ৩-৪ ফুট পর্যন্ত ঘাস উঁচু করতে হবে।
- আচ্ছাদন: শেষ স্তরে খড়ের পুরো আবরন দিয়ে পলিথিন দ্বারা ভালভাবে ঢেকে দিতে হবে। সর্বশেষে পলিথিনের উপরে ৪-৬ ইঞ্চি করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
- খাওয়ানোর নিয়ম: এভাবে সংরক্ষিত ঘাস হতে প্রতি ১০০ কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ১০ কেজি হিসাবে গরুকে খাওয়ানো যায়।
(২৪) এ্যালজি চাষ: একটি সম্ভাবনাময় প্রাণিখাদ্য

এ্যালজি হচ্ছে এক ধরনের ক্ষুদ্র এককোষী উদ্ভিদ যা কৃত্রিমভাবে পানিতে চাষ করে গরুকে সবুজ পানীয় হিসেবে খাওয়ানো হয়। এটি গবাদি পশুর জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাদ্য এবং এটি খাওয়ানোর কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই।
এ্যালজির বৈশিষ্ট্য ও পুষ্টিমান:
- বৈশিষ্ট্য: এ্যালজি এককোষী থেকে বহুকোষী বিশাল বৃক্ষের মত হতে পারে। তবে আমাদের আলোচ্য এ্যালজি এককোষী এবং প্রধানত দুই ধরনের: ক্লোরেলা, সিনডেসমাস এবং প্যাডিয়াসট্রডাম। এরা অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল এবং পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন, কার্বন ডাই অক্সাইড ও জৈব নাইট্রোজেন আহরণ করে সূর্যালোকে সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বেঁচে থাকে।
- পুষ্টিগুণ: শুষ্ক এ্যালজিতে শতকরা ৫০-৭০ ভাগ আমিষ, ২০-২২ ভাগ চর্বি ও ৮-২৬ ভাগ শর্করা থাকে। এছাড়া এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও বিভিন্ন ধরনের বি-ভিটামিন থাকে। রোমস্থকারী প্রাণীতে এ্যালজির আমিষের পাচ্যতা প্রায় ৭০%।
(২৫) এ্যালজি উৎপাদনের সহজ পদ্ধতি
বাড়িতে বা খামারে খুব সহজেই কিছু উপকরণ দিয়ে এ্যালজি উৎপাদন করা সম্ভব।
ক) প্রয়োজনীয় উপকরণ
১. এ্যালজির বীজ, ২. কৃত্রিম অগভীর পুকুর, ৩. পরিষ্কার স্বচ্ছ পানি, ৪. মাসকলাই বা অন্যান্য ডালের ভূষি এবং ৫. ইউরিয়া।
খ) উৎপাদন ধাপসমূহ
- পুকুর তৈরি: প্রথমে ছায়াযুক্ত জায়গায় ১০ ফুট লম্বা, ৪ ফুট চওড়া এবং ০.৫ ফুট গভীর একটি কৃত্রিম পুকুর তৈরি করতে হবে। পুকুরের পাড় ইট বা মাটির হতে পারে। এবার ১১ ফুট লম্বা ও ৫ ফুট চওড়া একটি স্বচ্ছ পলিথিন পুকুরের নীচে বিছিয়ে দিতে হবে। উল্লেখ্য যে, মাটি বা সিমেন্টের চাড়িতেও এ্যালজি চাষ করা সম্ভব।
- পুষ্টি উপাদান প্রস্তুতি: ১০০ গ্রাম মাসকলাই বা অন্য ডালের ভূষিকে ১ লিটার পানিতে সারা রাত ভিজিয়ে কাপড় দিয়ে ছেঁকে পানিটুকু সংগ্রহ করতে হবে। একই ভূষি অন্তত ৩ বার ব্যবহার করা যায় এবং পরে তা গরুকে খাওয়ানো যায়।
- মিশ্রণ তৈরি: পুকুরে ২০০ লিটার পরিষ্কার পানি, ১৫-২০ লিটার এ্যালজি বীজ এবং ভূষি ভেজানো পানি মিশাতে হবে। এরপর এতে ২-৩ গ্রাম ইউরিয়া যোগ করতে হবে।
- পরিচর্যা: প্রতিদিন সকাল, দুপুর ও বিকালে অন্তত তিনবার কালচারটিকে নেড়ে দিতে হবে। পানির পরিমাণ কমে গেলে পরিষ্কার পানি যোগ করতে হবে এবং প্রতি ৩ দিন পরপর ১-২ গ্রাম ইউরিয়া ছিটিয়ে দিতে হবে।
গ) এ্যালজি সংগ্রহ ও গরুকে খাওয়ানোর সতর্কতা
সঠিক সময়ে এ্যালজি সংগ্রহ এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ফলন ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
সংগ্রহ:
১২-১৫ দিন পর এ্যালজি পানির রং গাঢ় সবুজ হলে তা খাওয়ানোর উপযোগী হয়। একবার খাওয়ানোর পর পুকুরে নতুন করে পানি ও সার দিলে পুনরায় চাষ শুরু হয়, এক্ষেত্রে নতুন বীজের প্রয়োজন হয় না।
সতর্কতা:
- পুকুরটি অবশ্যই ছায়াযুক্ত স্থানে হতে হবে।
- অতিরিক্ত ভূষি ভেজানো পানি দেওয়া যাবে না।
- পানির রং বাদামী হয়ে গেলে বুঝতে হবে চাষটি নষ্ট হয়ে গেছে এবং নতুন করে শুরু করতে হবে।
- পানির রং হালকা নীল হলে তা ফেলে দিয়ে নতুন করে চাষ শুরু করতে হবে।
(২৬) দুর্যোগকালীন আপদকালীন গো-খাদ্য
বন্যা, অতিবৃষ্টি বা খরার সময় যখন কাঁচা ঘাসের সংকট দেখা দেয়, তখন পশুপালন কঠিন হয়ে পড়ে। এই দুর্যোগের সময়ে আমরা নিচের অপ্রচলিত খাদ্যগুলো গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে পারি-
১. কলা গাছ বা পাতা
২. আঁখের গোড়ার সবুজ পাতা, ডগা ও ছোবড়া
৩. কচুরিপানা
৪. বট পাতা
৫. জিগা পাতা
৬. কাঁঠাল পাতা
[তথ্যসূত্র: গরু মোটাতাজাকরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ সহায়িকা, ইউপিপি-উজ্জীবিত প্রকল্প, পিকেএসএফ]









