গরুর সুষম খাবার তৈরির উপকরণসমূহের তালিকা ও সঠিক নিয়মাবলী

প্রিয় খামারি ভাই-বোন বন্ধুরা, ইনফরমেশন বাংলা (informationBangla.com) এর আজকের নতুন আলোচনায় আপনাদের স্বাগতম জানাই।
গবাদিপশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য সুষম খাবারের কোনো বিকল্প নেই। একটি আদর্শ সুষম খাদ্য তৈরির প্রধান উপকরণসমূহ হলো খড়, সবুজ ঘাস, দানাদার খাদ্য এবং বিশুদ্ধ পানি। তাই আজকে আলোচনাং নিচে সুষম খাদ্য তৈরির বিস্তারিত নিয়মাবলী আলোচনা করা হলো।
(১) গরুকে দৈনিক কি পরিমাণ খড় ও কাঁচা ঘাস সরবরাহ কতে হয়?
- খড়: গবাদিপশুকে দৈনিক ২-৩ কেজি খড় খাওয়ানো প্রয়োজন। খড়কে ছোট করে কেটে বড় চাড়ির মধ্যে পানিতে ভিজিয়ে ৩০০-৪০০ গ্রাম ঝোলাগুড় মিশিয়ে খাওয়ালে খড়ের পুষ্টিমান বৃদ্ধি পায়।
- কাঁচা ঘাস: একটি দেশী গরুর জন্য দৈনিক ১০-১২ কেজি এবং সংকর জাতের গরুর জন্য ১২-১৫ কেজি সবুজ ঘাস সরবরাহ করা প্রয়োজন। দুগ্ধবতী গাভী থেকে বেশি দুধ পাওয়ার জন্য কাঁচা ঘাসের কোনো বিকল্প নেই।
(২) গরুর দানাদার খাদ্য মিশ্রন কোন উপাদান? কী পরিমাণে দিয়ে তৈরি করতে হয়?
খড় ও কাঁচা ঘাসের পাশাপাশি গবাদিপশুকে দৈনিক পুষ্টিকর দানাজাতীয় খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। ১০ কেজি দানাদার খাদ্য তৈরির একটি আদর্শ ফর্মুলা নিচে দেয়া হলো-
| ক্রমিক নং | দানাদার খাদ্য উপাদান | শতাংশ | ১০ কেজি ফর্মুলা (কেজি) |
| ১ | গমের ভূষি | ৫০% | ৫.০০০ |
| ২ | চাউলের কুঁড়া | ২০% | ২.০০০ |
| ৩ | খেসারি ভাংগা | ১৮% | ১.৮০০ |
| ৪ | তিল বা বাদামের খৈল | ১০% | ১.০০০ |
| ৫ | খনিজ লবণ | ১% | ০.১০০ |
| ৬ | লবণ | ১% | ০.১০০ |
| মোট | ১০.০০০ |
(৩) গরুক দৈনিক কত কেজি দানাদার খাদ্য দিতে হয়?
- বাছুর: বয়স অনুসারে ০.৫০-১.০ কেজি।
- দুগ্ধবতী গাভী: দেশী গাভীর জন্য প্রত্যহ ১.৫-২.০ কেজি এবং সংকর জাতের উন্নত গাভীর জন্য ৩.০-৪.০ কেজি।
- অতিরিক্ত দুধের জন্য: গাভী ৩ লিটারের বেশি দুধ দিলে, প্রতি অতিরিক্ত ২.৫ কেজি দুধের জন্য ১.০ কেজি বাড়তি দানাদার খাদ্য দিতে হবে।
- দুগ্ধহীন গাভী: প্রত্যহ ১.৫-২.০ কেজি।
- বলদ বা ষাঁড়: প্রাপ্তবয়স্ক কর্মক্ষম বলদকে দৈনিক ৩-৪ কেজি দানাদার খাদ্য দিতে হবে।
(৪) গরুর খাদ্য ও খামার ব্যবস্থাপনা কী কী মেনে করতে হয়?
গবাদিপশুর সঠিক যত্নে খাদ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অপরিসীম-
- পানি: গাভীকে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি খাওয়াতে হবে। একটি মাঝারি আকারের গাভী দিনে প্রায় ৪০-৪৫ লিটার পানি পান করে। দিনে কমপক্ষে ৩ বার পানি সরবরাহ করতে হবে।
- খাবার সময়: দানাদার খাদ্য প্রতিদিন ২ বার (সকালে ও বিকালে দুধ দোহনের আগে) দিতে হবে। সবুজ ঘাস দিনে ৩ বার সরবরাহ করতে হবে। প্রয়োজনে মোট সবুজ ঘাসের তিন ভাগের এক ভাগ খড় দেওয়া যেতে পারে।
- পরিবেশন: দানাদার খাদ্য মিশ্রণটি শুকনো বা ভিজিয়ে দেওয়া যায়, তবে শুকনো দিলে সাথে সাথে পানি খাওয়াতে হবে।
- পরিচ্ছন্নতা: প্রতিদিন খাবার ও পানির পাত্র পরিষ্কার করতে হবে। গোয়াল ঘরের আশপাশ ও নর্দমা প্রতিদিন পরিষ্কার রাখা জরুরি।
- গোসল: গরমের সময় প্রতিদিন এবং শীতকালে কুসুম গরম পানি দিয়ে গাভীকে গোসল করাতে হবে।
(৫) গরুর জন্য জরুররি ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র (UMS) তৈরির পদ্ধতি
গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ এবং দুধ উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র বা ইউএমএস একটি অত্যন্ত কার্যকর প্রযুক্তি। এটি তৈরির নিয়ম নিচে দেয়া হলো-
ক) ইউএমএস তৈরির ফর্মুলা (১০ কেজি হিসেবে):
- ধানের খড়/বন: ১০ কেজি
- চিটাগুড়/রাব: ২-২.৫ কেজি
- ইউরিয়া: ৩০০ গ্রাম
- পানি: ৭-৮ লিটার
খ) ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র তৈরির ধাপসমূহ
১. প্রথমে খড়, ইউরিয়া, মোলাসেস ও পানি সঠিক পরিমাণে মেপে নিতে হবে।
২. খড়গুলোকে ৫-৬ ইঞ্চি মাপে কেটে নিতে হবে।
৩. পানির সাথে প্রথমে ইউরিয়া এবং পরে মোলাসেস মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করতে হবে।
৪. পাকা মেঝে বা পলিথিনে খড় বিছিয়ে তার ওপর সমানভাবে এই মিশ্রণটি ছিটিয়ে দিতে হবে। এভাবে স্তরে স্তরে খড় ও মিশ্রণ মিশাতে হবে যেন কোথাও কম-বেশি না হয়।
গ) ইউএমএস খাওয়ানোর নিয়ম ও সুবিধা
- প্রতি ১০০ কেজি শারীরিক ওজনের জন্য ২ কেজি হিসেবে এটি খাওয়ানো যায় এবং তৈরির সাথে সাথেই খাওয়ানো সম্ভব।
- এটি ২০ কেজি, ৩০ কেজি বা প্রয়োজনমতো বেশি পরিমাণেও তৈরি করা যায়।
- এটি থেকে পশু ধীরে ধীরে নাইট্রোজেন, শর্করা এবং খনিজ পদার্থ পায়, যা রুমেনের পরিবেশ ঠিক রাখে এবং পরিপাচ্যতা বাড়ায়।
- এটি বাছুর, দুগ্ধবতী গাভী ও মহিষকে খাওয়ানো যায় এবং এটি শুধু খাওয়ালেও ওজন বৃদ্ধি পায়।
- এর উৎপাদন খরচ বাজারের অন্যান্য খাবারের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। ১ টাকার মোলাসেস খাইয়ে প্রায় ৫-৭ টাকার মাংস উৎপাদন সম্ভব।
- ধীরে ধীরে খাওয়ার ফলে বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা থাকে না এবং সব বয়সের গরু এটি গ্রহণ করতে পারে।
ঘ) UMS বিশেষ সতর্কতা
- ইউরিয়া, মোলাসেস ও পানির অনুপাত ঠিক রাখতে হবে; ইউরিয়া কখনোই অনুমানের ওপর বেশি দেওয়া যাবে না।
- তৈরি করার ৩ দিনের বেশি এটি রাখা যাবে না।
- ইউএমএস খাওয়ানোর ১ ঘণ্টা আগে বা পরে পশুকে পেট ভরে পানি খাওয়ানো যাবে না।
আপনি যদি একজন খামারি হয়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই ইনফরমেশন বাংলা (informationBangla.com) ওয়েবসাইটটি মনে রাখবেন, নিয়মিত এই ব্লগে ভিজিট করুন, কারণ খামার ও পশু পালন সম্পর্কিত বিষয়ে আমরা এখানে নিয়মিত নতুন নতুন আলোচনা ও তথ্য নিয়ে হাজির হই, আমাদরে সম্মুখে উপস্থাপন ও আলোচনা করা হয়ে থাকে। সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।
[তথ্যসূত্র: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, বিএফডিসি ভবন, ঢাকা-১২১৫। ফোন: +৮৮-০২-৫৫০১২৪০৬, ওয়েবসাইট: www.flid.gov.bd।]









