গরু মোটাতাজাকরণ ও কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ

গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পের সফলতা ও লাভ নিশ্চিত করতে হলে সঠিক সময়ে বাজারজাতকরণ এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। নিচে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-
(১) গরু বাজারজাতকরণ ও প্রাথমিক প্রস্তুতি
গরু মোটাতাজাকরণ উদ্যোগকে লাভজনক করতে হলে পালনকৃত গরুকে অবশ্যই উপযুক্ত সময়ে বিক্রি করতে হবে। এক্ষেত্রে বিক্রয় মূল্য যত বেশি হবে উদ্যোগের লভ্যাংশ তত বৃদ্ধি পাবে। তাই যে অঞ্চলের হাট বাজারে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়া যাবে সে সব হাট বাজারে গরু বিক্রয় করতে হবে।
অনেক সময় দীর্ঘ পথ হেঁটে বা যানবাহনে করে বাজারে আসার কারণে গরু খুঁড়িয়ে হাঁটতে পারে, সে ক্ষেত্রে দাম কম পাওয়া যেতে পারে। এ ধরনের সমস্যা দূর করতে প্রয়োজনীয় মাত্রার একটি অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া যেতে পারে।
(২) গরু পালনে অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ
উদ্যোগটি লাভজনক রাখতে এবং গরুর স্বাস্থ্য রক্ষায় কিছু দৈনন্দিন কাজ করা জরুরি-
- গরুকে প্রচুর পরিমাণে টিউবওয়েলের পানি সরবরাহ করতে হবে।
- গরুকে অতিরিক্ত হাঁটাচলা বা অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
- গরুকে প্রতিদিন স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি দিয়ে গা ভালোভাবে ঘষে গোসল করাতে হবে।
(৩) বাংলাদেশে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের প্রধান সমস্যাসমূহ
বাংলাদেশে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। নিচে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের প্রধান প্রধান সমস্যাগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-
- কৃষকের দারিদ্র্য: দারিদ্র্যের জন্য কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য অধিক দাম পাওয়ার আশায় বেশি সময় ধরে রাখতে পারে না। উল্লেখ্য, বেশিরভাগ গরীব কৃষক ব্যাংক বা অন্য কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ না পেয়ে মহাজনদের নিকট থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে থাকে, এতে কৃষি পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।
- কৃষকরা অসংগঠিত: আমাদের দেশের কৃষকরা অসংগঠিত এবং বিক্ষিপ্তভাবে ও অসংঘবদ্ধভাবে পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করে থাকে। যেহেতু প্রত্যেকটি কৃষকের উৎপাদনের পরিমাণ কম, তাই তাদের দর কষাকষি করার ক্ষমতা কম থাকে। ফলে তারা বেশি মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারে না।
- অপর্যাপ্ত ও অদক্ষ পরিবহণ ব্যবস্থা: পরিবহণ ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় পণ্য সামগ্রী স্থানান্তর করতে একদিকে যেমন প্রচুর সময় লাগে, অন্য দিকে তেমনি প্রচুর ব্যয়ও হয়। ফলে পণ্যের মূল্যের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
- বাজার তথ্যাদির অভাব: এ দেশের অধিকাংশ কৃষকের পণ্যের চাহিদা, যোগান, দাম ইত্যাদি সম্পর্কিত তথ্য অজানা থাকে। গ্রামাঞ্চলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাই তাদের নিকট পণ্যের বাজারের বিভিন্ন তথ্যের উৎস হিসাবে কাজ করে। বাজার তথ্যাদি অজানা থাকার কারণেই কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পায় না।
- মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব: আমাদের দেশে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে ফড়িয়া, বেপারি, আড়তদার, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা ইত্যাদি মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীদের অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়। এরা কৃষকদের নিকট থেকে কম দামে পণ্য ক্রয় করে এবং পরে এগুলো চড়া দামে ভোক্তাদের নিকট বিক্রি করে। এভাবে তারা কৃষকদেরকে ন্যায্য মূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত করে পণ্যমূল্যের একটি অংশ নিজেরাই আত্মসাৎ করে।
- সংগঠিত বাজারের অভাব: বাংলাদেশের কৃষি পণ্যের অসংখ্য প্রাথমিক বাজার এখানে সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে যেগুলো সুনিয়ন্ত্রিত ও সুসংগঠিত নয়। নিয়ন্ত্রণের অভাবে বিভিন্ন বাজারে বিভিন্ন হারে কৃষকদের নিকট থেকে কর খাজনা, দালালি, আড়তদারি, বাজারের চাঁদা ইত্যাদি আদায় করা হয়। ফলে কৃষকরা তাদের ফসলের বা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়।
- প্রতিযোগিতার অভাব: সুষ্ঠু যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবে কৃষি পণ্যের বাজারগুলো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। এতে বিভিন্ন বাজারের মধ্যে প্রতিযোগিতার অভাব দেখা দেয়। ফলে একই পণ্য কোন বাজারে কম দামে এবং কোন বাজারে চড়া দামে বিক্রি হয়। এতে কম দামের বাজারে বিক্রয়কারী কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
(৪) বাজারজাতকরণ সমস্যার প্রতিকারসমূহ
কৃষি বিপণনের সমস্যাগুলো দূর করার জন্য নিম্নোক্ত পন্থাসমূহ অবলম্বন করা যেতে পারে-
- আর্থিক সুবিধা প্রদান: কৃষকরা যাতে ফসল উঠার পর পরই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য না হয় সেজন্য তাদেরকে সহজ ও নমনীয় শর্তে প্রয়োজনমত ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এই ঋণ বাজারজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রদান করা যেতে পারে।
- সমবায় সমিতি ও দলীয় বাজারজাতকরণ: সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য একত্রিত করবে এবং দর কষাকষির মাধ্যমে ন্যায্য মূল্য পেতে সক্ষম হবে। এতে কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে এবং মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীদের প্রভাব কমে যাবে।
- পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়ন: সড়ক ও নৌ-পরিবহণের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামের সাথে শহর ও বন্দর এলাকার মধ্যে ভালো যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। এতে কৃষকগণ অতি সহজে এবং অল্প খরচে তাদের পণ্য দূরবর্তী বাজারে নিয়ে উপযুক্ত মূল্যে বিক্রয় করতে পারবে।
- খবরাখবর প্রচার: রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে বাজারদর, চাহিদা, সরবরাহ ও দামের উঠানামা সম্পর্কিত খবরাখবর প্রচার করে কৃষকদের পরিপূর্ণ জ্ঞান প্রদান করতে হবে।
- মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ: উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থাপনায় মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীদের সম্পূর্ণ বিলোপ সম্ভব না হলেও কৃষকরা যাতে ন্যায্য মূল্য পায় সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
- বাজার নিয়ন্ত্রণ ও আইন: কৃষি বাজার নিয়ন্ত্রণের বর্তমান আইনগুলো পরীক্ষা করে প্রয়োজনে পরিবর্তন করতে হবে যাতে উৎপাদনকারীরা চাঁদাবাজদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
- বাজার জরীপ: ব্যবসা শুরুর প্রাক্কালে এবং চলমান অবস্থায় নিয়মিত বাজার জরীপ করা উচিত। বাজার মূল্য পরিবীক্ষণ, প্রতিযোগীদের উৎপাদনের পরিমাণ ও পণ্যের মান সম্পর্কে খোঁজ রাখা এবং ভোক্তার মতামত নেওয়া বিক্রয় কৌশল প্রণয়নে সহায়তা করে।
- বিক্রয় উন্নয়ন: পণ্যের মূল্য, মান এবং বাজারে প্রাপ্যতা সম্পর্কে প্রচার করে পণ্যের চাহিদা বাড়ানোই হলো বিক্রয় উন্নয়ন কার্যক্রম।
(৫) আয়-ব্যয়ের হিসাব (নমুনা প্রকল্প)
প্রতি ব্যাচে ২টি দেশী/দো-আঁশলা এঁড়ে গরু ৪ মাস মেয়াদে মোটাতাজাকরণের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিচে দেওয়া হলো-
| ব্যয়ের বিবরণ | পরিমাণ/টাকা |
| ক) মূলধনী ব্যয় (ঘর তৈরি) | ৩,৬০০/- |
| খ) পরিচালন ব্যয়: | |
| গরু ক্রয় | ২৮,০০০/- |
| দানাদার খাদ্য ক্রয় (৩ কেজি × ১২০ দিন, ১৬/- দরে) | ৫,৭৬০/- |
| ইউএমএস (১০ কেজি × ১২০ দিন, ১.৫০/- দরে) | ১,৮০০/- |
| কৃমিনাশক, চিকিৎসা ও টিকা প্রদান | ২,৫০০/- |
| ঘরের অবচয় (৩,৬০০/- এর ২০%) | ৩৬০/- |
| মোট পরিচালন ব্যয় | ৩৮,৪২০/- |
| সর্বমোট ব্যয় (ক + খ) | ৪২,০২০/- |
আয় ও লাভ:
- গরু বিক্রয় (প্রতিটি ৩২,০০০/- টাকা করে ২টির মূল্য): ৬৪,০০০/- টাকা
- গোবর বিক্রয় বাবদ: ৫০০/- টাকা
- মোট আয়: ৬৪,৫০০/- টাকা
নিট লাভ: ২২,৪৮০/- টাকা।
[তথ্যসূত্র: গরু মোটাতাজাকরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ সহায়িকা, ইউপিপি-উজ্জীবিত প্রকল্প, পিকেএসএফ]









