গবাদি পশুর সাধারণ রোগসমূহ ও তাদের প্রতিকারের জেনে নিন

গবাদি প্রাণি পালন ও মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ায় প্রাণির সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গরু মোটাতাজাকরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ সহায়িকার এই হ্যান্ডআউটটিতে ক্ষুরারোগ, তড়কা, বাদলা এবং জলাতঙ্কের মতো মারাত্মক রোগসমূহ ও এদের প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
(১) ক্ষুরারোগের (Foot-and-Mouth Disease) লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধে করণীয়

এটি একটি ভাইরাসজনিত অত্যন্ত সংক্রামক ছোঁয়াচে রোগ। এই রোগ প্রাণিকে দীর্ঘসময় কষ্ট দেয় এবং প্রাণি তার কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
লক্ষণসমূহ:
- আক্রান্ত প্রাণির প্রথমে ১০৪০-১০৭০ ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর হয়।
- দাঁতের মাড়ি, জিহ্বা, মুখের ভিতরে এবং পায়ের ক্ষুরের মাঝখানে ফোঁস্কা ওঠে।
- পায়ে হওয়া ফোঁস্কাগুলো পরবর্তীতে ফেটে গিয়ে ঘায়ে পরিণত হয়।
রোগের সময় করণীয় ও চিকিৎসা:
- ভাইরাস ধ্বংসের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় সেকেন্ডারি ইনফেকশন রোধে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
- ফিটকারি বা পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট মেশানো পানি দিয়ে দিনে ২ বার মুখ ধুইয়ে দিতে হবে।
- মুখ ধোয়ার পর মধু, নারকেল তেল অথবা প্যারাফিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
- পায়ের ঘায়ে দিনে ২ বার অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম লাগাতে হবে।
- পা ধোয়ার পর ক্ষতে সকেটিল পাউডার ব্যবহার করতে হবে।
- মাছি তাড়াতে পায়ের লোমে তারপিন তেল বা ফিনাইল মিশ্রিত পানি দিতে হবে, যাতে ক্ষতে পোকা না পড়ে।
- আক্রান্ত প্রাণিকে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত নরম খাদ্য এবং বাছুরকে বোতলে করে দুধ বা তরল খাদ্য খাওয়াতে হবে।
প্রতিরোধ:
- সুস্থ গরুকে নিয়মিত ক্ষুরারোগের প্রতিষেধক টিকা দিতে হবে।
- আক্রান্ত প্রাণিকে সুস্থ প্রাণি থেকে আলাদা করে রাখতে হবে।
- গোয়াল ঘর ও আশেপাশে জীবাণুনাশক (যেমন: ১ লিটার পানিতে ২-৪ চামচ আইওসান) ছিটিয়ে দিতে হবে।
(২) তড়কা (Anthrax) রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধে করণীয়
তড়কা একটি অত্যন্ত মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি যা মানুষেও ছড়াতে পারে। এই রোগের জীবাণু মাটিতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে।
লক্ষণসমূহ:
- হঠাৎ মৃত্যু ঘটে বলে অনেক সময় লক্ষণ বোঝা যায় না।
- দেহের তাপমাত্রা হঠাৎ ১০৩-১০৬ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং শরীর কাঁপতে থাকে।
- গলা ও বুকের নিচে ফুলে উঠতে পারে এবং পা অবশ হয়ে যেতে পারে।
- মৃত্যুর আগে বা পরে নাক, মুখ, মলদ্বার ও কান দিয়ে আলকাতরার মতো কালো রক্ত বের হয়।
- মৃতদেহ শক্ত হয় না এবং দ্রুত পচন শুরু হয়।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ:
- লক্ষণ দেখা দিলে গরুর বয়স অনুপাতে ১২-২০ লাখ পরিমাণ পেনিসিলিন ইনজেকশন দিতে হবে।
- সুস্থ গরুকে নিয়মিত প্রতিষেধক ভ্যাকসিন ও সিরাম টিকা দিতে হবে।
- আক্রান্ত মৃত প্রাণিকে উন্মুক্ত স্থানে বা জলাশয়ে না ফেলে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।
(৩) বাদলা (Black Quarter) রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধে করণীয়
এটি একটি সংক্রামক রোগ যা সাধারণত অল্প বয়সের গরুকে বেশি আক্রমণ করে। বিশেষ করে জলাভূমি বা কর্দমাক্ত স্থানে থাকা গরু এতে বেশি আক্রান্ত হয়।
লক্ষণসমূহ:
- পা ফুলে যায় এবং হাঁটতে কষ্ট হয় বা খোড়ায়।
- ফোলা স্থানে চাপ দিলে ‘পচ্ পচ্’ বা ‘বজ্ বজ্’ শব্দ হয়।
- দেহের তাপমাত্রা ১০৩-১০৬ ফারেনহাইট পর্যন্ত ওঠে এবং পেটে গ্যাস জমে।
- মৃত্যুর হার প্রায় ৯০-৯৫% এবং আক্রান্ত প্রাণি ১-২ দিনের মধ্যেই মারা যেতে পারে।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ:
- লক্ষণ দেখা মাত্রই প্রাণি চিকিৎসকের পরামর্শে পেনিসিলিন বা টেট্রাসাইক্লিন জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে।
- প্রতিরোধের প্রধান উপায় হলো নিয়মিত বাদলা রোগের টিকা প্রদান করা।
(৪) রেবিস বা জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ ও করণীয়
রেবিস একটি স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ যার আক্রমণ হলে মৃত্যু অবধারিত। সাধারণত আক্রান্ত কুকুর বা শিয়ালের কামড় থেকে এই রোগ ছড়ায়।
লক্ষণসমূহ:
- প্রাণি অস্বাভাবিক আচরণ করে, কণ্ঠ পরিবর্তন হয় এবং যেকোনো জিনিস কামড়াতে থাকে।
- জল পানে অনীহা বা ভীতি তৈরি হয়।
- লেজ উঁচু করে রাখে এবং ক্রমশ শুকিয়ে গিয়ে পক্ষাঘাত দেখা দেয়।
করণীয়:
- কুকুর কামড়ালে সাথে সাথে ক্ষতস্থান সাবান বা জীবাণুনাশক দিয়ে ৪-৫ বার ধুয়ে দিতে হবে।
- চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন দিতে হবে।
- মৃত আক্রান্ত প্রাণিকে গভীর মাটিতে চাপা দিতে হবে এবং লালাযুক্ত জিনিস পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
পরিশেষে বলব, গরু মোটাতাজাকরণে কৃমিনাশ করার পরবর্তী পদক্ষেপ হলো নিয়মিত টিকা প্রদান। তড়কা, বাদলা, গলাফোলা এবং ক্ষুরারোগের মতো প্রাণঘাতী রোগ থেকে বাঁচতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের সাথে যোগাযোগ করে রুটিন টিকা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রতিষেধক টিকাই গবাদি প্রাণিকে সুরক্ষিত রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
[তথ্যসূত্র: গরু মোটাতাজাকরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ সহায়িকা, ইউপিপি-উজ্জীবিত প্রকল্প, পিকেএসএফ]









