গরু মোটাতাজাকরণে কৃমি নিয়ন্ত্রণ কেন জরুরি? কীভাবে গরুর কৃমি নিয়ন্ত্রণ করবেন?

গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পের সফলতার জন্য সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-
(১) গরুর রুচি ও ক্ষুধা বৃদ্ধিকরণ
মোটাতাজাকরণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গরুকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ও উন্নত সুষম খাবার সরবরাহ করে তার স্বাস্থ্যের উন্নতি করা অর্থাৎ শরীরে মাংস ও চর্বি বৃদ্ধি করা। আর এ জন্য গরুর অধিক পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় গরু ক্ষুধাহীনতা, ক্ষুধামন্দা বা খাদ্যে অরুচিজনিত সমস্যায় ভোগে। তাই গরুর রুচি বর্ধক ওষুধ দেয়া যেতে পারে, তবে কোম্পানিগুলোর ব্যবহার নির্দেশিকা দেখে সঠিক নিয়মে প্রদান করতে হবে।
(২) কৃমি মুক্তকরণ ও এর ক্ষতিকর প্রভাব
গরু নানা প্রকারের কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে। বিভিন্ন প্রকারের কৃমি গরুর পাকস্থলী, অন্ত্র এবং ফুসফুসে বাসা বাঁধে। কৃমি গরুকে বিভিন্নভাবে ক্ষতি করতে পারে। কৃমি গরুর হজমকৃত খাবারে ভাগ বসায় যার ফলে ঠিকমত খাবার দিলেও গরু আস্তে আস্তে রোগা হয়ে যেতে থাকে।
কৃমি সংক্রমণের কিছু সাধারণ লক্ষণ ও প্রভাব নিচে দেওয়া হলো-
- অনেক দিন ধরে কৃমিতে আক্রান্ত গরুর বুকের হাড়গুলি প্রকট হয়ে ওঠে এবং পেট মোটা দেখায়।
- কৃমি গরুর বিপাক প্রক্রিয়ায় বাঁধা সৃষ্টি করে, ফলে গরুর ক্ষুধামন্দা বা ক্ষুধাহীনতার ভাব দেখা দেয় এবং প্রায়ই উদরাময় হয় ও তরল পায়খানা করে।
- পায়খানায় গন্ধ থাকে এবং বড় কৃমিতে আক্রান্ত হলে পায়খানার সাথে কৃমি দেখা যায়।
- কোনো কোনো কৃমি বৃহদান্ত্রে স্ফিতির সৃষ্টি করে এবং কোনো কোনো সময় অধিক সংখ্যক কৃমি খাদ্যবস্তু চলাচলে বাঁধার সৃষ্টি করে, যার ফলে মাঝে মাঝে শক্ত পায়খানা হয়।
- কয়েক ধরনের কৃমি আবার গরুর রক্ত শুষে খায়, এর ফলে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়, চক্ষু নিস্তেজ ও ফ্যাকাশে দেখায় এবং চোখ গর্তে ঢুকে যায়।
- অনেক সময় অপ্রাপ্ত বয়স্ক কৃমি শরীরের ভিতর দিয়ে চলাচলের সময় রক্তনালী ছিঁড়ে দেহের ভিতর রক্তপাত ঘটায়, গায়ের চামড়া খসখসে হয়ে যায় এবং গায়ে হাত দিলেই অনেক লোম উঠে আসে।
- কৃমিতে আক্রান্ত গরুর রক্তে আমিষ জাতীয় খাদ্যের অভাব দেখা দেয়, ফলে শরীরের নরম জায়গায় যেমন থোতনার নিচে, শ্লৈষ্মিক ঝিল্লিগুলির নিচে পানি জমে এবং পিপাসা বেশি হয়।
(৩) গরুর কৃমির জটিল সমস্যা ও বাছুরের জন্য ঝুঁকি
কোনো কোনো সময় বড় গোল কৃমি একত্রিত হয়ে অন্ত্রের নালী বন্ধ করে দেয় অথবা অন্ত্রকে পেঁচিয়ে ফেলে যার ফলে খাদ্যবস্তু চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং আক্রান্ত গরু মারা যায়। আমাদের দেশে 1-3 মাস বয়সের বাছুরের মৃত্যুর এটি একটি প্রধান কারণ।
কোনো কোনো কৃমি আবার ফুসফুসে বাসা বাঁধে এবং অপেক্ষাকৃত কম বয়সের গরুই এ কৃমিতে আক্রান্ত হয়। 20ফুসফুসে যাওয়ার সময় এ কৃমি শ্বাসনালী এবং ফুসফুসের অবয়বের ক্ষতি সাধন করে ও ক্ষতের সৃষ্টি করে, যার ফলে দ্বিতীয় পর্যায়ে ফুসফুস সংক্রামক জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত গরু ঘন ঘন কাশে, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বেড়ে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় পেট বেশি ওঠা নামা করতে দেখা যায়। শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় (104-105° ফারেনহাইট), ফুসফুসে পানি জমে এবং গ্যাস হয়, ফলে গরুর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মুখ দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে থাকে, খুব জোরে ধাক্কা দিয়ে শ্বাস ত্যাগ করে, ঘোত ঘোত শব্দ হয়, মুখমণ্ডল নীলবর্ণ ধারণ করে এবং শেষ পর্যন্ত গরু মাটিতে পড়ে যায় ও মৃত্যুবরণ করে।
(৪) গরুর কৃমিজনিত নাকে ঘা বা নেজাল গ্রানিউলোমা (পিনাস্ রোগ)
এই রোগটি পিনাস্ রোগ, নাক পিয়াসি, নাকার্সি বা সেনসেনি নামেও পরিচিত। ‘সিস্টোসোমা নেজালিস’ নামক এক প্রকার কৃমি এ রোগের কারণ এবং সাধারণত গরু ও মহিষই এ রোগে আক্রান্ত হয়। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ যা সাধারণত নিচু জায়গা এবং আবদ্ধ জলাভূমি এলাকায় জলাঘাস খাওয়ার ফলে হয়। এক ধরনের শামুক এ রোগ বিস্তারের কারণ হিসেবে কাজ করে।
লক্ষণসমূহ:
- ঘন ঘন হাঁচি দেওয়া, নিশ্বাসের সাথে ফরফর আওয়াজ এবং নাক দিয়ে অনবরত পানি পড়া এ রোগের প্রাথমিক লক্ষণ।
- কিছু দিনের মধ্যে নাকের ছিদ্রপথে সরিষার মতো ছোট ছোট গুটি ওঠে এবং পরে ফেটে গিয়ে ঘায়ে পরিণত হয়।
- এই ঘা দেখতে ফুলকপির মতো হয় এবং এর ফলে নাকের ছিদ্রপথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
- শ্বাস-প্রশ্বাসে বাঁধার সৃষ্টি হয় এবং নাক দিয়ে রক্ত মেশানো পুঁজ বের হতে থাকে।
- উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে গরু স্বাস্থ্যহীন হয়ে পড়ে এবং মারা যেতে পারে।
চিকিৎসা:
এ রোগের চিকিৎসার জন্য এ্যানথিওম্যালিন ইনজেকশন বা এনটিমেনি জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
[তথ্যসূত্র: গরু মোটাতাজাকরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ সহায়িকা, ইউপিপি-উজ্জীবিত প্রকল্প, পিকেএসএফ]









