ভেড়ার উন্নত জাত নির্বাচন ও ভেড়া পালন পদ্ধতি

এখানে ভেড়ার উন্নত জাত নির্বাচন, ভেড়া পালন পদ্ধতি সম্পর্কে যা আলোচনা করা হবে।
(১) ভেড়ার উন্নত জাত নির্বাচন
বাংলাদেশে যে সকল ভেড়া পাওয়া যায়, এরা মূলত দেশি জাতের ভেড়া। কৃষি পরিবেশগত অবস্থান অনুসারে বাংলাদেশে ৩ (তিন) ধরনের ভেড়া পাওয়া যায়। যথা-
১. বরেন্দ্র এলাকার ভেড়া
২. যমুনা অববাহিকার ভেড়া
৩. উপকূলীয় অঞ্চলের ভেড়া
নিম্নে উন্নত জাতের ভেড়ার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি বর্ণনা করা হলো।
ক) বরেন্দ্র এলাকার ভেড়া
- এ জাতের ভেড়া রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর এলাকায় দেখা যায়।
- এদের মুখমণ্ডল ও পায়ের রং কালচে খয়েরি।
- সাধারণত মুখে, পায়ে ও পেটে কোনো উল নেই।
- এদের উল বছরে ২-৩ বার কাটা যায় এবং প্রতিবারে ০.৫-০.৮ কেজি উল উৎপন্ন হয়।
- উল মোটা এবং বুনন ক্ষমতা কম।
- গায়ের রং সাদা, খয়েরি বা এর মিশ্রণ।
- ভেড়া শিংযুক্ত কিন্তু ভেড়ি শিংবিহীন, শিং-এর রং সাধারণত কালো।
- ভেড়া ৫-৬ মাস বয়সেই প্রজননক্ষম হয়, ১০-১২ মাস বয়সে বাচ্চা দেয় এবং বছরে দু’বার বাচ্চা দেয়। গর্ভকাল ১৪৫-১৪৮ দিন।
- প্রতিবারে ১-৩টি পর্যন্ত বাচ্চা দেয় এবং বাচ্চার গড় মৃত্যুর হার কম (৫%)।
- একটি প্রাপ্তবয়স্ক ভেড়ার ওজন ২২-৩০ কেজি এবং ভেড়ির ওজন ১৫-২৫ কেজি।
- পর্যাপ্ত খাবার এবং উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় দৈনিক ৫০-৭০ গ্রাম হারে ওজন বৃদ্ধি পায়।
খ) যমুনা অববাহিকার ভেড়া
- এ জাতের ভেড়া টাঙ্গাইল, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধাসহ যমুনা অববাহিকা এলাকায় দেখা যায়।
- এদের গায়ের রং সাদা, হালকা থেকে গাঢ় বাদামি, কালচে খয়েরি, সাদা-কালো মিশ্রিত হয়।
- এদের মুখ খয়েরি, চোয়ালের দু’পাশ সাদাটে বাদামি।
- এদের সাধারণত মুখে, পায়ে ও পেটে কোনো উল নেই।
- ভেড়া তুলনামূলক বড় ও পেঁচানো শিংযুক্ত কিন্তু ভেড়ি শিংবিহীন।
- উল লম্বায় ছোট এবং মোটা এবং বছরে ২ বার কাটা যায়। প্রতিবারে ০.৪-০.৬ কেজি উল উৎপন্ন হয়।
- ভেড়া ৫-৬ মাস বয়সেই প্রজননক্ষম হয়, ১০-১২ মাস বয়সে বাচ্চা দেয় এবং বছরে দু’বার বাচ্চা দেয়। গর্ভকাল ১৪৫-১৪৮ দিন।
- প্রতিবারে ২-৩টি পর্যন্ত বাচ্চা দেয় এবং বাচ্চার গড় মৃত্যুর হার কম (৫%)।
- একটি প্রাপ্তবয়স্ক ভেড়ার ওজন ১৮-২৫ কেজি এবং ভেড়ির ওজন ১২-২২ কেজি।
- এই ভেড়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এরা তুলনামূলকভাবে বরেন্দ্র এলাকার ভেড়ার চেয়ে ছোট এবং আর্দ্র স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বেশি অভ্যস্ত।
- পর্যাপ্ত খাবার এবং উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় দৈনিক ৩০-৫০ গ্রাম হারে ওজন বৃদ্ধি পায়।
গ) উপকূলীয় অঞ্চলের ভেড়া
- এ জাতের ভেড়া পটুয়াখালী, ভোলা, হাতিয়াসহ নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও লক্ষ্মীপুরের উপকূলীয় চরাঞ্চলে দেখা যায়।
- এ ধরনের ভেড়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এরা উপকূলীয় লোনা স্যাঁতসেঁতে চরণভূমিতে চরে অভ্যস্ত।
- এদের গায়ের রং সাধারণত সাদা বা হালকা থেকে গাঢ় বাদামি রং-এর হয়।
- এদের সাধারণত মুখে, পায়ে ও পেটে কোনো উল নেই।
- কান তুলনামূলকভাবে ছোট।
- ভেড়ার শিং তুলনামূলক বড় ও রং বাদামি, যা ভেড়ার পিছনের দিকে বাঁকানো, কিন্তু ভেড়ি শিংবিহীন থাকে।
- বরেন্দ্র ও যমুনা অববাহিকার ভেড়ার চেয়ে এদের উল তুলনামূলকভাবে মিহি ও লম্বা। এদের উল বছরে ২-৩ বার কাটা হয়।
- ভেড়া ৫-৬ মাস বয়সেই প্রজননক্ষম হয়, ১০-১২ মাস বয়সে বাচ্চা দেয় এবং বছরে দু’বার বাচ্চা দেয়। গর্ভকাল ১৪৫-১৪৮ দিন।
- প্রতিবারে ২-৩টি পর্যন্ত বাচ্চা দেয় এবং বাচ্চার গড় মৃত্যুর হার কম (৫%)।
- একটি প্রাপ্তবয়স্ক ভেড়ার ওজন ১৮-২৫ কেজি এবং ভেড়ির ওজন ১২-২২ কেজি।
- এই ভেড়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এরা তুলনামূলকভাবে বরেন্দ্র এলাকার ভেড়ার চেয়ে ছোট এবং আর্দ্র স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বেশি অভ্যস্ত।
- পর্যাপ্ত খাবার এবং উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় দৈনিক ৩০-৫০ গ্রাম হারে ওজন বৃদ্ধি পায়।
(২) ভেড়া পালন পদ্ধতি
ভেড়া বিভিন্ন পদ্ধতিতে পালন করা যায়। নিম্নে কিছু পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো-
ক) আধা-নিবিড় সাবসিসটেন্স খামার পদ্ধতি
- আমাদের দেশে সর্বত্র এ পদ্ধতিতে সারা বছর ভেড়া পালন করা হয়।
- খামারিরা এককভাবে বা গরু/ছাগলের সাথে ২-৬টি পর্যন্ত ভেড়া পালন করে থাকেন।
- এ পদ্ধতিতে ভেড়া সারাদিন মাঠে/সড়ক পাড়ে/ফল বাগানে ইত্যাদি স্থানে চরে ঘাস খায় এবং সকালে ও সন্ধ্যায় সামান্য কুড়া, ভূষি, চাল ভাঙা, টাটকা ভাতের মাড় খাওয়ানো হয়।
- রাতে ভেড়াকে গরু/ছাগলের সাথে একই ঘরে রাখা হয়।
খ) সম্পূর্ণ ছেড়ে পালন করা ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক খামার পদ্ধতি
- এ পদ্ধতিতে সাধারণত ১৫-৪০টি ভেড়া পালন করা হয়।
- খামারিরা অনেকটা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ভেড়া পালন করে থাকেন।
- তবে এ পদ্ধতিতেও ভেড়ার জন্য কোনো খাদ্য পরিকল্পনা নেওয়া হয় না।
- সাধারণত মাঠে/ফলের বাগানে, রাস্তার ধারে ভেড়া এককভাবে অথবা গরু/ছাগলের সাথে চরিয়ে ঘাস খেয়ে পুষ্টি যোগায়।
- কোনো কোনো ক্ষেত্রে গর্ভবতী/দুগ্ধবতী ভেড়াকে কিছু চালের কুড়া, গম/ডালের ভূষি, চালভাঙা, ভাতের মাড় খাওয়ানো হয়।
- ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভেড়াগুলো অপুষ্টিতে ভোগে।
- সাধারণত ভেড়াকে কোনো কৃমিনাশক দেওয়া হয় না।
- রাতে ভেড়াকে গরু/ছাগলের সাথে একই ঘরে রাখা হয়।
গ) বরেন্দ্র এলাকার আধা-নিবিড় বাণিজ্যিক খামার পদ্ধতি
- এ পদ্ধতিতে খামারে বছরের সময়ভেদে ৫০-১৫০টি ভেড়া পালন করা হয়।
- সাধারণত উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকায় এ ধরনের ভেড়া পালন করা হয়।
- আমন ধান ও রবিশস্য কাটার পর মাঠে চরে বেড়ায় এবং ঝরা ধান/ছোলা/খেসারি বা অন্যান্য ঝরা ফসল এবং নতুন গজানো ঘাস খায়।
- এ সময়ে বাড়তি কোনো খাদ্য সরবরাহ করা হয় না।
- বর্ষাকালে নিচু জায়গা পানিতে ডুবে গেলে রেল লাইন, আম বাগান, লিচু বাগান, রাস্তার পাড়ে চরানো হয়।
- এই আপদকালীন সময়ে শুকনো খড়, গমের ভূষি, চালের কুড়া এবং বৃষ্টি-বাদলে গাছের পাতা বা ঘাস সরবরাহ করা হয়।
- এ ধরনের খামারে ভেড়াকে বছরে সাধারণত ২ বার কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো হয়।
ঘ) উপকূলীয় চরে সম্পূর্ণ ছেড়ে ভেড়া পালন পদ্ধতি
- এ পদ্ধতিতে ছোট খামারে ১০-৫০টি ভেড়া এবং বড় খামারে ২০০-৩০০টি ভেড়া পালন করা হয়।
- চরাঞ্চলে গজানো দূর্বা ঘাস, লতা-পাতা ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ঘাস ভেড়ার মূল পুষ্টির উৎস।
- তবে এসব এলাকায় লবণ ও চিংড়ি চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভেড়া পালন ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে।
- মহিষ ও গরুর সাথে সাধারণত এখানকার ভেড়া চড়ে বেড়ায়। এক বা দু’জন রাখাল তাদের তত্ত্বাবধানে থাকে।
- জোয়ারের সময় ও রাতে উঁচু জায়গায় নিয়ে অবস্থান করা হয়।
- এদেরকে পৃথকভাবে কোনো ঘাস বা দানাদার খাদ্য দেওয়া হয় না। চরের কর্দমাক্ত ঘাস খেয়েই এরা বেড়ে ওঠে। ফলে প্রায়ই অপুষ্টিতে ভোগে।
ঙ) নিবিড় ভেড়া পালন পদ্ধতি
- এ পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ আবদ্ধ অবস্থায় খামার পদ্ধতিতে ভেড়া পালন করা হয়। এ পদ্ধতিতে ভেড়ার সেড ও ব্যবস্থাপনার উপর ভিত্তি করে খামারে ভেড়ার সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়।
- এ পদ্ধতিতে ভেড়াকে নিয়মিত কাঁচা ঘাস, প্রক্রিয়াজাত খড় ও দানাদার খাদ্য সরবরাহ করা হয়।
- ক্ষুদ্র খামারের জন্য সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত ঘাস যথেষ্ট হয়, তবে বৃহৎ খামারের জন্য উচ্চ ফলনশীল ঘাস চাষের প্রয়োজন হয়।
- এ ধরনের খামারে সুষ্ঠু খাদ্য, স্বাস্থ্য, প্রজনন ও আবাসন ব্যবস্থা করতে হয়। তাছাড়া খামারের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জৈব নিরাপত্তার উপর গুরুত্ব দেওয়া একান্ত জরুরি।
[তথ্যসূত্র: সিআইজি রিফ্রেসার ট্রেনিং (ভেড়া পালন), পিআইইউ-ডিএলএস, ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম-ফেজ ২ (NATP-2), বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।]









