কুরআনে চুরি করার জন্য হাত কেটে ফেলার নির্দেশ আছে (Quran 5:38) এটা অমানবিক নয়?

ইসলামে চুরির শাস্তি হিসেবে হাত কাটা: এটি কি আসলেই অমানবিক? আসুন ভুল ধারণা ভাঙি
আমাদের সমাজে বা সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রায়ই একটা প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে। প্রশ্নটা হলো— “ইসলামে চুরির শাস্তি হিসেবে হাত কেটে ফেলার যে বিধান আছে (সূরা মায়েদা, আয়াত ৩৮), সেটা কি খুব বেশি নিষ্ঠুর বা অমানবিক নয়?”
অনেকেই ভাবেন, কেউ হয়তো একটা ডিম বা সামান্য কিছু চুরি করল আর অমনি তার হাত কেটে ফেলা হলো! কিন্তু বিষয়টা আসলে মোটেও সেরকম নয়। ইসলাম ধর্ম আবেগের ওপর চলে না, এটি চলে ন্যায়বিচার আর যুক্তির ওপর। আজ আমরা খুব সহজ ভাষায় জানব, কখন এবং কোন পরিস্থিতিতে এই শাস্তি কার্যকর হয়। বিশ্বাস করুন, পুরো নিয়মটা জানলে আপনি বুঝবেন যে এই আইনটি কতটা ব্যালেন্সড বা ভারসাম্যপূর্ণ।
চোরের হাত কখন কাটা হয়? (৫টি জরুরি শর্ত)
ইসলামী আইনে হুট করে কারো হাত কাটার হুকুম দেওয়া যায় না। এর জন্য ৫টি খুব কঠিন শর্ত পূরণ হতে হয়। এই শর্তগুলোর কোনো একটিও যদি বাদ পড়ে, তবে চোরের হাত কাটা যাবে না। আসুন শর্তগুলো দেখি:
১. চুরির অকাট্য প্রমাণ থাকতে হবে
কারো বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ করলেই হবে না। চুরির ঘটনাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে। যদি প্রমাণের মধ্যে বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে, তবে ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী ওই ব্যক্তির হাত কাটা যাবে না। “সন্দেহ থাকলে শাস্তি মাফ”—এটি ইসলামের একটি মূলনীতি।
২. সংরক্ষিত জায়গা থেকে চুরি হতে হবে
এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। ধরুন, কেউ তার সাইকেল রাস্তায় তালা না দিয়ে ফেলে রেখেছে, অথবা ঘরের দরজা খোলা রেখে কোথাও গেছে—এমন অবস্থায় যদি চুরি হয়, তবে চোরের হাত কাটা যাবে না। হাত কাটার শাস্তি তখন প্রযোজ্য হবে, যখন চোর কোনো তালাবদ্ধ ঘর, সিন্দুক বা এমন কোনো জায়গা ভেঙে চুরি করবে যেখানে মানুষ সাধারণত তাদের মূল্যবান সম্পদ নিরাপদে রাখে। অর্থাৎ, অবহেলা করে ফেলে রাখা জিনিস চুরি গেলে হাত কাটা হয় না।
৩. বস্তুটি মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় হতে হবে
চোর যদি এমন কিছু চুরি করে যার কোনো বাজারমূল্য নেই বা মানুষের বিশেষ প্রয়োজনে আসে না (যেমন—রাস্তার ধুলাবালি বা পচা কোনো জিনিস), তবে তার জন্য হাত কাটা হবে না। বস্তুটি অবশ্যই সম্পদ হিসেবে গণ্য হতে হবে।
৪. নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি দাম হতে হবে
সামান্য ১-২ টাকা বা অল্প দামের কিছু চুরি করলে হাত কাটা যায় না। হাদীস অনুযায়ী এর একটি নির্দিষ্ট মাপকাঠি বা ‘নিসাব’ আছে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, চুরিকৃত সম্পদটির মূল্য যদি ১.০৬৫ গ্রাম স্বর্ণের সমপরিমাণ বা তার বেশি হয়, কেবল তখনই হাত কাটার প্রশ্ন আসবে। এর কম মূল্যের চুরিতে এই কঠিন শাস্তি দেওয়া হয় না।
৫. মালিকের দাবি বা নালিশ থাকতে হবে
যার জিনিস চুরি হয়েছে, তিনি যদি বিচারকের কাছে বিচার না চান বা চোরকে মাফ করে দেন, তবে হাত কাটা হবে না। মালিক যদি বলেন, “আমি আমার মাল ফেরত চাই এবং চোরের বিচার চাই”—কেবল তখনই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তাহলে কি ছোট চুরির কোনো বিচার নেই?
অবশ্যই আছে! ওপরের ৫টি শর্ত যদি পূরণ না হয়, তার মানে এই নয় যে চোরকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তখন বিচারক তাকে অন্য শাস্তি দেবেন। যেমন—জেল দেওয়া, জরিমানা করা, বেত্রাঘাত করা বা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া। কিন্তু হাত কাটা হবে না। হাত কাটা হলো সর্বোচ্চ শাস্তি (Capital Punishment), যা কেবল পেশাদার এবং বড় অপরাধীদের থামানোর জন্য রাখা হয়েছে।
কেন এই কঠোর আইন?
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের ফল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে। এবং আল্লাহ পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞানময়।” (সূরা আল-মায়েদা: ৩৮)
এই শাস্তির মূল উদ্দেশ্য হলো— ‘দৃষ্টান্তমূলক’ হওয়া। অর্থাৎ, শাস্তিটা এমন হবে যা দেখে অন্য দশজন মানুষ চুরি করার সাহস পাবে না। ভাবুন তো, যদি সমাজে চুরির শাস্তি এত কঠোর হয়, তবে মানুষ অন্যের সম্পদ হরণ করার আগে একশোবার ভাববে। ফলে সমাজে শান্তি বজায় থাকবে, মানুষ রাতে দরজা খোলা রেখেও ঘুমাতে পারবে। সমাজের লক্ষ লক্ষ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই কঠোরতা। একে কি অমানবিক বলা যায়, নাকি এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নিরাপত্তার গ্যারান্টি?
ইসলাম কি দয়া দেখায় না?
অবশ্যই দেখায়। ঠিক পরের আয়াতেই (আয়াত ৩৯) আল্লাহ ক্ষমার কথা বলেছেন।
“অতঃপর স্বীয় সীমালঙ্ঘণের পর যে তওবা করে এবং সংশোধিত হয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। অবশ্যই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।”
অর্থাৎ, কেউ যদি অপরাধ করার পর অনুতপ্ত হয়, আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে তওবা করে এবং নিজেকে শুধরে নেয়, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন। এমনকি অভাবের তাড়নায় বা দুর্ভিক্ষের সময় চুরি করলে হাত কাটার শাস্তি স্থগিত রাখার নজিরও ইসলামের ইতিহাসে আছে (যেমন খলিফা উমর রা.-এর শাসনামলে)।
শেষ কথা
ইসলামের এই আইনটি ঢালাওভাবে সবার জন্য নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ। এটি এমন এক ব্যবস্থা যা একদিকে মানুষের সম্পদ রক্ষা করে, অন্যদিকে অপরাধীকে লঘু পাপে গুরু দণ্ড দেওয়া থেকে বাঁচায়। শর্তগুলো মেনে বিচার করলে দেখা যায়, খুব কম মানুষেরই আসলে হাত কাটার প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু আইনের ভয়ে পুরো সমাজ অপরাধমুক্ত থাকে।








![চন্দ্রকে নূরের তৈরি এবং সূর্যকে প্রদীপ বা আগুণ বলা হয়েছে, চন্দ্র নূরের তৈরি নয় এবং সূর্যের পুরো অংশ আগুন নয়, তাহলে কোরানের একথা কিভাবে সত্য হল? [৭১:১৫-১৬; ২৫:৬১] চন্দ্রকে নূরের তৈরি এবং সূর্যকে প্রদীপ বা আগুণ বলা হয়েছে। চন্দ্র নূরের তৈরি নয় এবং সূর্যের](https://informationbangla.com/wp-content/uploads/2023/03/চন্দ্রকে-নূরের-তৈরি-এবং-সূর্যকে-প্রদীপ-বা-আগুণ-বলা-হয়েছে।-চন্দ্র-নূরের-তৈরি-নয়-এবং-সূর্যের.jpg)
