গ্লকোমা নিয়ে সুস্থ থাকাঃ চোখের চাপ কমানো ও দৃষ্টিশক্তি রক্ষার সহজ উপায়

গ্লকোমা হলো চোখের এমন একটি রোগ যাকে ডাক্তাররা বলেন “দৃষ্টির নীরব চোর”। কারণ, এটি ধীরে ধীরে আমাদের চোখের ক্ষতি করে, অথচ আমরা অনেক সময় টেরও পাই না। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনি যদি সময়মতো কিছু নিয়ম মেনে চলেন এবং জীবনযাত্রায় ছোট কিছু পরিবর্তন আনেন, তবে গ্লকোমা নিয়েও দীর্ঘ সময় ভালো থাকা সম্ভব।
বাংলাদেশ ভিশন আই হাসপাতালের গ্লকোমা বিশেষজ্ঞ ডা. জিনাত জাহান বলেন, শুধু চোখের ড্রপ দিলেই হবে না, আপনি প্রতিদিন কী খাচ্ছেন বা কীভাবে ঘুমাচ্ছেন—তাও চোখের সুস্থতার জন্য অনেক জরুরি।
(১) গ্লকোমা আসলে কী?
আমাদের চোখের ভেতরে সবসময় এক ধরণের জলীয় পদার্থ তৈরি হয় এবং তা আবার বেরিয়ে যায়। কিন্তু গ্লকোমা হলে সেই রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় বা ঠিকমতো জল বের হতে পারে না। ফলে চোখের ভেতর চাপ বেড়ে যায় এবং তা চোখের প্রধান তার বা অপটিক নার্ভকে (যা মস্তিষ্কে ছবি পাঠায়) নষ্ট করে দেয়। একবার এই নার্ভ নষ্ট হয়ে গেলে তা আর আগের মতো করা যায় না। তাই যা আছে, তাকেই টিকিয়ে রাখা আমাদের লক্ষ্য।
(২) কেমন খাবার খাবেন?
খাবার দিয়ে গ্লকোমা পুরোপুরি সারে না, তবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়-
- সবুজ শাকসবজি: পালং শাক, ধনেপাতা, কলমি বা লাল শাক প্রচুর খাবেন। এতে থাকা উপাদান চোখের জন্য প্রাকৃতিক সানগ্লাসের মতো কাজ করে।
- রঙিন ফলমূল: গাজর, আম, পেঁপে, বেরি বা কমলা—এগুলোতে ভিটামিন-এ এবং সি আছে যা চোখের শক্তি বাড়ায়।
- মাছ ও বীজ: রুই, কাতলা, ইলিশ বা সামুদ্রিক মাছ এবং তিসির তেল চোখের রক্ত চলাচল ভালো রাখে।
- বাদাম: দিনে এক মুঠো আমন্ড বা আখরোট খেলে চোখের নার্ভ ভালো থাকে।
- যা এড়িয়ে চলবেন: ধূমপান ও মদ্যপান একদম করবেন না। অতিরিক্ত চা-কফি (দিনে ২ কাপের বেশি নয়) এবং বেশি লবণযুক্ত খাবার খাওয়া কমিয়ে দিন।
(৩) জল খাওয়ার নিয়ম
একবারে অনেকটা জল হড়হড় করে খেয়ে ফেলবেন না। এতে চোখের চাপ হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। অল্প অল্প করে সারাদিনে ৮-১০ গ্লাস জল খান। একবারে আধা লিটারের বেশি জল না খাওয়াই ভালো।
(৪) মোবাইল বা কম্পিউটারের ব্যবহার
মোবাইল ব্যবহার করলে গ্লকোমা বেড়ে যায় না, তবে কিছু নিয়ম মানতে হবে-
- অন্ধকার ঘরে মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করবেন না। ঘরের আলো স্ক্রিনের চেয়ে বেশি হতে হবে।
- ২০-২০-২০ নিয়ম: প্রতি ২০ মিনিট পরপর স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে ২০ ফুট দূরের কোনো জিনিসের দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন। এতে চোখের ক্লান্তি কমবে।
- চোখ বারবার পিটপিট করবেন যেন চোখ শুকিয়ে না যায়।
(৫) ঘুমের পজিশন
ঘুমানোর ধরন চোখের চাপের ওপর প্রভাব ফেলে।
- পেটে ভর দিয়ে বা উপুড় হয়ে কখনোই ঘুমাবেন না। এতে চোখের ওপর চাপ পড়ে।
- চিত হয়ে বা পাশ ফিরে ঘুমানো সবচেয়ে ভালো। মাথাটা সামান্য উঁচুতে (একটি পাতলা বালিশ দিয়ে) রেখে ঘুমালে চোখের চাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
(৬) ব্যায়াম ও শরীরচর্চা
শারীরিক পরিশ্রম চোখের রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়।
- সহজ ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪০ মিনিট জোরে হাঁটুন। এছাড়া সাঁতার কাটা বা হালকা জগিং করতে পারেন।
- যা করবেন না: ভারী ওজন তোলা বা এমন কোনো যোগব্যায়াম (যেমন- শীর্ষাসন) করবেন না যাতে মাথা হৃদপিণ্ডের নিচে থাকে। ডাক্তাররা বলেন—”এমনভাবে হাঁটুন যেন আপনার বাস ধরতে দেরি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দৌড়ে জীবন বাঁচানোর মতো তাড়াহুড়ো করবেন না।”
(৭) কিছু ভ্রান্ত ধারণা (ভুল বুঝবেন না)
- ভুল ধারণা: গ্লকোমা হওয়া মানেই অন্ধ হয়ে যাওয়া।
- আসল সত্য: নিয়ম মেনে চললে এবং ডাক্তার দেখালে বেশিরভাগ মানুষ আজীবন স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।
শেষ কথা:
গ্লকোমা একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা, তবে এটি আপনার জীবন থামিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নয়। প্রতিদিন সঠিক সময়ে চোখের ড্রপ দিন, পুষ্টিকর খাবার খান এবং সময়মতো ডাক্তার দেখান। ছোট ছোট এই অভ্যাসগুলোই আপনার চোখের দৃষ্টি আজীবন ভালো রাখতে সাহায্য করবে।
মনে রাখবেন, গ্লকোমা আপনার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে না, আপনিই গ্লকোমাকে নিয়ন্ত্রণ করবেন!
