জমিতে অতিরিক্ত সার ব্যবহারে কী কী ক্ষতি হয়? জানুন

কৃষিতে কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে সারের ভূমিকা অপরিসীম। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বিভিন্ন সময় সার ফসল উৎপাদনের জন্য যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি সারের অতিরিক্ত ব্যবহার ফসল, মাটি ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সারের অপচয় রোধ এবং জমির উর্বরতা বজায় রাখতে সারের সঠিক ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
(১) অতিরিক্ত সার ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব
সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে শুধু পরিবেশের ক্ষতি হয় না, বরং ফসল উৎপাদনের খরচও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, পরিমিত সার ব্যবহারে রোগ ও পোকার আক্রমণ কম হয়, যার ফলে বালাইনাশকও কম লাগে।
বিভিন্ন সারের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে যেসব সমস্যা দেখা দেয় তা নিচে আলোচনা করা হলো:
ক) ইউরিয়া (নাইট্রোজেন-N) সারের প্রভাব
- অধিক ইউরিয়া ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন কখনো কখনো বৃদ্ধি পেলেও জমির উর্বরতা কমে যায়।
- অতিরিক্ত নাইট্রোজেন বাতাসে মিশে পরিবেশ দূষণ করে এবং পানিতে মিশে মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হয়।
- অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ব্যবহারে গাছের কোষপ্রাচীর পাতলা হয়ে যায়, ফলে গাছের কাঠামোগত শক্তি কমে যায়।
- গাছের কাণ্ড স্বাভাবিকের চেয়ে লম্বা ও নরম হয়ে যায় এবং কাণ্ডের চেয়ে পাতা বেশি ভারী হয়। এর ফলে গাছ সহজেই হেলে পড়ে।
- নাইট্রোজেন বেশি ব্যবহারে মাটিতে বোরন, দস্তা ও কপারের ঘাটতি দেখা দেয় ।
খ) টিএসপি/ডিএপি (ফসফরাস-P) সারের প্রভাব
- এই সার অতিরিক্ত ব্যবহার করলে ফসলের বৃদ্ধি কমে যায় এবং আগাম পরিপক্কতা দেখা দেয়।
- অম্ল মাটিতে ফসফেট আটকে যায় (Fixation), যা গাছের কোনো কাজে আসে না।
- বেশি ফসফেট জাতীয় সার ব্যবহার করলে মাটিতে নাইট্রোজেন, আয়রন, জিংক, কপার ও ম্যাঙ্গানিজ এর অভাব দেখা দেয়।
গ) পটাশিয়াম (এমওপি/এসওপি-K) ও অন্যান্য সারের প্রভাব
- পটাশিয়াম: অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটির ক্যালসিয়াম ও বোরন শুষে নেয় এবং পানি নিঃসরণের হার কমে যায়, ফলে গাছের বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।
- জিপসাম (Ca, S): অতিরিক্ত জিপসাম ব্যবহারে শিকড়ের বৃদ্ধি কমে যায়, যা গাছের শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত করে।
- জিংক সালফেট (Zn): এটি অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটিতে বিষক্রিয়া হয় এবং গাছের আমিষ উৎপাদন ব্যাহত হয়।
- বোরন: অতিরিক্ত বোরন ব্যবহারে কচি পাতা ও ডগা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ফলন কম হয়।
- চুন: অম্লীয় মাটিতে চুন বেশি ব্যবহার করলে জিংক, বোরন, আয়রন, কপার ও ম্যাঙ্গানিজের অভাব হতে পারে।
(২) আমাদের করণীয় ও সঠিক সার ব্যবস্থাপনা
কৃষক ভাইদের জন্য সারের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ নিচে দেওয়া হলো-
- জৈব সারের ব্যবহার: জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। খামার বা গৃহস্থালীর আবর্জনা ও উচ্ছিষ্ট পদার্থ দিয়ে বিনা খরচে জৈব সার উৎপাদন করে তা ব্যবহার করা উচিত।
- সারের প্রয়োগ মাত্রা:
- ইউরিয়া সার প্রতি ফসলেই পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগ করতে হয়।
- রবি মৌসুমে টিএসপি/ডিএপি প্রয়োগ করলে পরবর্তী মৌসুমে ৩০-৫০% কম লাগে এবং এমওপি পরবর্তী মৌসুমে ৩০-৪০% কম লাগে।
- জিপসাম পরবর্তী ফসলে ভিজা জমিতে পূর্ণমাত্রায় এবং শুকনা জমিতে ৫০% দিলেই চলে।
- জিংক সার পরবর্তী মৌসুমে অর্ধেক দিলেই চলে এবং বোরন বছরে ১ বার দিলেই যথেষ্ট।
- জমিতে একবার চুন ব্যবহারের পর পরবর্তী ১ বছর আর চুন ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না।
- মাটি পরীক্ষা: সুষম মাত্রায় পরিমিত সার ব্যবহারের জন্য মাটি পরীক্ষা করে অনলাইনে প্রাপ্ত ‘সার সুপারিশ নির্দেশনা’ মেনে সার প্রয়োগ করুন।
- বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আপনার ব্লকের উপসহকারী কৃষি অফিসার (এসএএও) অথবা নিকটস্থ উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করুন।
সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগের মাধ্যমে আপনার অর্থ বাঁচান এবং জমি ও ফসলকে নিরাপদ রাখুন।









