ধানের পোকা ও কীটনাশক সমূহের নামের তালিকাঃ বোরো ধানের বিভিন্ন পোকা, রোগ ও আগাছা ব্যবস্থাপনা

(১) পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা
নিবিড় চাষাবাদ ও আবহাওয়াজনিত কারণে বোরো ধানে পোকামাকড়ের প্রাদুর্ভাব ও আক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। ফলে ক্ষতিকর পোকা দমন এবং ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। বোরো ধানের মুখ্য পোকাগুলো হলো- মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, পামরি পোকা, চুপড়ি পোকা, সবুজ পাতা ফড়িং, বাদামি গাছ ফড়িং, সাদা পিঠ গাছ ফড়িং, গ্যাল মিজ পোকা, শিঙ্গাকৃতি লেদা পোকা ইত্যাদি। পোকার ক্ষতির মাত্রা পোকার প্রকারভেদ, পোকার সংখ্যা, ফসলের সাময়িক পরিবেশ, জমির বা ফসলের অবস্থা, ধানের জাত, ধান গাছের বয়স, উপকারী পোকামাকড় ও পরজীবী পোকামাকড়ের সংখ্যা ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল।
১. ধান ক্ষেতে ক্ষতিকারক পোকা দেখা গেলে এর সাথে উপকারী পোকা, যেমন- মাকড়সা, লেডি-বার্ড বিটল, ক্যারাবিড বিটল সহ অনেক পরজীবী ও পরভোজী পোকামাকড় কী পরিমাণে আছে তা দেখতে হবে এবং শুধুমাত্র প্রয়োজনে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
২. নিম্ন লিখিত ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করে ধান ফসলে পোকার আক্রমণ কমানো সম্ভব-
| পোকার নাম | ব্যবস্থাপনা |
|---|---|
| মাজরা পোকা | ধানক্ষেতে ডালপালা লাগানো, আলোক ফাঁদ/সোলার লাইট ট্রাপ ব্যবহার |
| পাতা মোড়ানো | ধানক্ষেতে ডালপালা লাগানো, আলোক ফাঁদ/সোলার লাইট ট্রাপ ব্যবহার |
| সবুজ পাতা ফড়িং | আলোক ফাঁদ/সোলার লাইট ট্রাপ ব্যবহার |
| গ্যাল মিজ পোকা | আলোক ফাঁদ/সোলার লাইট ট্রাপ ব্যবহার |
| চুপড়ি পোকা | জমি থেকে পানি বের করে দেওয়া |
| বাদামি গাছ ফড়িং | জমি থেকে পানি বের করে দেওয়া |
| সাদা পিঠ গাছ ফড়িং | জমি থেকে পানি বের করে দেওয়া |
| শুপল | জমি থেকে পানি বের করে দেওয়া |
৩. উদ্ভাবিত ব্যবস্থা গ্রহণের পরও পোকার আক্রমণ বেশি হলে নিম্নলিখিত সরকার অনুমোদিত যেকোনো কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে-
| পোকার নাম | কীটনাশকের গ্রুপের নাম | ব্র্যান্ড নাম | প্রয়োগ/হেক্টর |
|---|---|---|---|
| মাজরা পোকা | কার্টাপ | সানটাপ ৫০ এসপি | ১৮৫-১৯০ গ্রাম |
| থায়ামেথক্সাম + ক্লোরানট্রানিলিপ্রোল | ভার্চুয়ো ৪০ ডব্লিউজি | ১০০ গ্রাম | |
| ক্লোরপাইরিফস | ডারসবান ২০ ইসি | ১৩৪ মিলি | |
| পাতা মোড়ানো পোকা | ক্লোরপাইরিফস | ডারসবান ২০ ইসি | ১৩৪ মিলি |
| আইসোপ্রোকার্ব অথবা এমআইপিসি | মিপসিন ৭৫ ডব্লিউপি | ১৭৫ গ্রাম | |
| কার্টালিন | সেন্টিন ৮৫ এসপি | ২২৮ গ্রাম | |
| চুপড়ি পোকা | কার্টাপ | সানটাপ ৫০ এসপি | ১৮৫-১৯০ গ্রাম |
| কার্টালিন | সেন্টিন ৮৫ এসপি | ২২৮ গ্রাম | |
| ক্লোরানট্রানিলিপ্রোল | মিপসিন ৭৫ ডব্লিউপি | ১৭৫ গ্রাম | |
| বাদামি গাছ ফড়িং | আইসোপ্রোকার্ব অথবা এমআইপিসি | মিপসিন ৭৫ ডব্লিউপি | ১৭৫ গ্রাম |
| পাইমেট্রোজিন | চেস ৫০ ডব্লিউজি | ৬৭ গ্রাম | |
| ক্লোরপাইরিফস | ডারসবান ২০ ইসি | ১৩৪ মিলি | |
| সাদা পিঠ গাছ ফড়িং | ক্লোরপাইরিফস | ডারসবান ২০ ইসি | ১৩৪ মিলি |
| ইমিডাক্লোপ্রিড | অ্যাডমায়ার ২০০ এসএল | ১৭ মিলি | |
| আইসোপ্রোকার্ব অথবা এমআইপিসি | মিপসিন ৭৫ পাউডার | ১৭৫ গ্রাম | |
| শিঙ্গাকৃতি লেদা পোকা | পাইমেট্রোজিন | চেস ৫০ ডব্লিউজি | ৬৭ গ্রাম |
| ক্লোরপাইরিফস | ডারসবান ২০ ইসি | ১৩৪ মিলি | |
| ক্লোরানট্রানিলিপ্রোল | সেন্টিন ৮৫ ডব্লিউপি | ২২৮ গ্রাম | |
| গ্যাল মিজ পোকা | ক্লোরানট্রানিলিপ্রোল | সেন্টিন ৮৫ ডব্লিউপি | ২২৮ গ্রাম |
| আইসোপ্রোকার্ব অথবা এমআইপিসি | মিপসিন ৭৫ পাউডার | ১৫০ গ্রাম | |
| পামরি পোকা | কার্বোফুরান | সোভিন ৫জি | ২২৮ গ্রাম |
| আইসোপ্রোকার্ব অথবা এমআইপিসি | মিপসিন ৭৫ পাউডার | ১৫০ গ্রাম |
(২) রোগ ব্যবস্থাপনা
বোরো মৌসুমে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া, খোল পোড়া, ব্লাস্ট, বাদামি দাগ, খোল পচা, টুংরো, বাকানে, এবং লক্ষীরঙ (False Smut) সচরাচর দেখা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ রোগগুলি হল খোল পোড়া, ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া, ব্লাস্ট, টুংরো, বাকানে এবং লক্ষীরঙ রোগ। নিম্ন লিখিত ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করে ধান ফসলে রোগের আক্রমণ কমানো যায়:
ক) খোল পোড়া রোগ
দমনের জন্য পটাশ সার সমান ভাগে কবে এক ভাগ জমি প্রস্তুতির শেষ চাষে এবং অন্য ভাগ শেষ ইউরিয়া সারের সঙ্গে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। পর্যায়ক্রমে তেয়ারা ও তকনা পদ্ধতিতে লেভেল ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। এছাড়া ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক, এবং আয়রন ইত্যাদি সেকেন্ডারি অনুসারিত মাত্রায় প্রয়োগ করে সুন্দরভাবে দমন করা যায়।
খ) ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া রোগ
এ রোগের প্রাথমিক অবস্থায় ৬০ গ্রাম স্ট্রেপটোমাইসিন, ৬০ গ্রাম কপার অক্সিক্লোরাইড ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। যোড় বেড়ে ওঠার আগে রোগ দেখা দিলে প্রতি হেক্টর ৫ কেজি পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
গ) ব্লাস্ট
এ রোগের সকল স্টেজে নেক ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ দেখা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে ধানে থোকের শেষ পর্যায় অথবা শীষের মাধ্যমে আক্রান্ত বেড়ে দেখা হওয়ার সাথে সাথে প্রতিরোধকৃত ছত্রাকনাশক ট্রাইসাইক্লাজল বা টেবুকোনাজল (৫৫%) + ট্রাইসাইক্লাজল (২৫%) যেমন লেটিভো ইত্যাদি অনুসারিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
ঘ) টুংরো
যদি দু’একটি পাহাড়ে টুংরো রোগের লক্ষণ দেখা যায়, আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলে বেড় করে দিতে হবে। রোগের বাহক পোকা সবুজ পাতা ফড়িং দমনের জন্য ব্যবস্থাপনার সাহায্যে অথবা আলোক ফাঁদ ব্যবহার করে সবুজ পাতা ফড়িং মেরে ফেলতে হবে। প্রতি হিলে যদি একটি সবুজ পাতা ফড়িং পাওয়া যায় তাহলে বীজশোধন বা জমিতে কীটনাশক যেমন মিপসিন, কার্টাপ অথবা ম্যালাথিয়ন অনুসারিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
ঙ) লক্ষীরঙ
লক্ষীরঙ দমনের জন্য (সিটার কার রিখ পানচ৪০ জাতে) ফুল আসা পর্যায়ে বিকাশ বেমা প্রোপিকোনাজল যেমন স্থানকনাশক যেমন; টিল্ট (২৫০ গ্রাম/হেক্টর) ৫-৭ দিন অন্তর দু’বার প্রয়োগ করতে হবে।
(৩) আগাছা ব্যবস্থাপনা
ধানক্ষেত ৪০-৫০ দিন পর্যন্ত আগাছামুক্ত রাখতে পারলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। নিম্ন লিখিত ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করে ধান ফসলে আগাছা দমন করা যায়-
১. হাত দিয়ে, নিড়ানি যন্ত্র দিয়ে এবং আগাছানাশক ব্যবহার করে আগাছা দমন করা যায়।
২. দুবার আগাছা দমন করতে হয়। প্রথম বার ধান রোপণের ১৫ দিন পর এবং পরের বার ৩০-৩৫ দিন পর। বোরো ধানে সেচ দিতে হলে আগাছার পরিমাণ বেড়ে যায় এবং আরেকবার হাত নিড়ানির প্রয়োজন হয়।
৩. নিড়ানি যন্ত্র দিয়ে ধানের দু’পাড়ির মাঝের আগাছা দমন হয় কিন্তু দু’পাড়ির ধারে যে আগাছা থাকে তা হাত দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়। যতদূর সম্ভব অবশ্যই সারিতে ধান রোপণ করতে হবে।
৪. আগাছানাশক ব্যবহারে কম পরিশ্রম ও কম খরচে বেশি পরিমাণ জমির আগাছা দমন করা যায় যেমন: প্রিটিলাক্লোর-আগাছানাশক ধান রোপণের ৩-৫ দিনের মধ্যে (আগাছা জন্মের পর্যায়ে ১-২ পাতা) এবং পেন্ডিমেথালিন আগাছানাশক ধান রোপণের ১০-২০ দিনের মধ্যে (আগাছা জন্মের পর্যায়ে ১-২ পাতা) ব্যবহার করতে হবে।
৫. আগাছানাশক প্রয়োগের সময় জমিতে ১-৩ সেন্টিমিটার পানি থাকলে ভাল।
৬. আগাছানাশক প্রয়োগের পর সাধারণত হাত নিড়ানির প্রয়োজন হয় না। তবে আগাছার ঘনত্ব বেশি থাকলে আগাছানাশক প্রয়োগের ৩০-৪৫ দিন পর হাত নিড়ানি প্রয়োজন হয়।
[তথ্য সূত্র: বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ওয়েব সাইট এবং উচ্চ ফলনশীল সংরক্ষণ উইং, বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।]









