বিফ ফ্যাটেনিং বা গরু মোটাতাজাকরণ কী? উদ্দেশ্য, সুবিধা-অসুবিধা, সমস্যা ও উপকারিতা

(১) বিফ ফ্যাটেনিং বা গরু মোটাতাজাকরণ কী?

গরু মোটাতাজাকরণ বা বিফ ফ্যাটেনিং বলতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ১-২ বছরের একটি নির্দিষ্ট বয়সী গরুকে বিশেষ খাদ্য ও যত্নের মাধ্যমে মোটাতাজা করে তোলা বোঝায়। এতে গরু কম সময়ে বেশি ওজন বাড়ায় এবং বাজারে বিক্রির যোগ্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে এটি কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক উদ্যোগ, যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে সাহায্য করে।
(২) গরু মোটাতাজাকরণের উদ্দেশ্য ও উপকারিতা
গরু মোটাতাজাকরণের মূল উদ্দেশ্য হলো পশুসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। নীচে এর কিছু প্রধান উদ্দেশ্য ও উপকারিতা তুলে ধরা হলো-
- পশু মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধি করা।
- উন্নতমানের মাংস উৎপাদন করা যায়।
- অধিকতর লাভের মাধ্যমে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
- কৃষকের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন।
- পশু খাদ্যের সঠিক ব্যবহার।
- মাংসের সরবরাহ বৃদ্ধি করা।
- পশু খাদ্যের সঠিক ব্যবহার।
- দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা।
(৩) গরু মোটাতাজাকরণের সুবিধা
এই প্রক্রিয়াটি কৃষকদের জন্য অনেক সুবিধা নিয়ে আসে। প্রধান সুবিধাগুলো হলো-
- স্বল্প সময়ে অধিক লাভ।
- অল্প জায়গায় চাষ করা যায়।
- শ্রমিকের প্রয়োজন কম।
(৪) গরু মোটাতাজাকরণের অসুবিধা
তবে এতে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অসুবিধাগুলো নিম্নরূপ-
- পুঁজির প্রয়োজন।
- খাদ্যের খরচ বেশি।
- রোগব্যাধির ঝুঁকি।
- বাজারের অস্থিরতা।
- প্রশিক্ষণের অভাব।
- পরিবেশগত প্রভাব।
- পশু খাদ্যের ঘাটতি।
- প্রযুক্তির অভাব।
- নীতিমালার অভাব।
(৫) গরু মোটাতাজাকরণের জন্য গরু বাছাই
সফল মোটাতাজাকরণের জন্য সঠিক গরু বাছাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাছাইয়ের মানদণ্ডগুলো হলো-
- বয়স: ১-২ বছরের গরু।
- ওজন: কম ওজনের শীর্ণকায় গরু।
- স্বাস্থ্য: সুস্থ ও রোগমুক্ত।
- জাত: স্থানীয় বা হাইব্রিড জাত।
- লিঙ্গ: পুরুষ গরু পছন্দনীয়।
- চামড়া: মসৃণ ও চকচকে।
- চোখ: উজ্জ্বল ও সতর্ক।
- দাঁত: সুস্থ দাঁত।
গরু মোটাতাজাকরণের জন্য উপযোগী গরুর প্রকারভেদ: গরু মোটাতাজাকরণের জন্য নিম্নোক্ত প্রকারের গরু বাছাই করা যেতে পারে। যেমন- ১। ছোট গরু (দেশি গরু) ; ২। মাঝারি গরু (দেশি গরু) ; ৩। বড় গরু (হাইব্রিড গরু)।
(৬) গরু মোটাতাজাকরণে সমস্যা/প্রতিবন্ধকতা
বাংলাদেশে গরু মোটাতাজাকরণে বিভিন্ন সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এগুলো হলো-
১। পর্যাপ্ত চারণ ভূমির অভাব; ২। আবাদি জমি মানুষের খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহার; ৩। জলাভূমি সিরে মাছ চাষ করা; ৪। প্রাম অঞ্চলে জালানী হিসেবে ধর্তৃত্বে ব্যবহার; ৫। প্যাকিং ম্যাটেরিয়ালসহ শিল্প কারখানায় খর্তুর বহুবিধ ব্যবহার; ৬। চিনিকলের উৎপাদিত মোনাসেসের ক্রপিপূর্ব বাজার ব্যবস্থাপনা; ৭। বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে খাড় নষ্ট হয়ে যায়; ৮। বন্যার কারণে খর্তুর উৎপাদন কমে যায়, এমনকি উৎপাদিত খর্তও নষ্ট হয়ে যায়; ৯। অগ্রচলিত খাদ্যের উৎসের ব্যবহার বৃদ্ধি; ১০। অগ্রচলিত উৎসের পশু খাদ্য সংগ্রহ; ১১। নিম্ন পুষ্টিমান সম্পন্ন খাদ্যের পুষ্টিমান বৃদ্ধির ব্যবস্থা।
(৭) গরু মোটাতাজাকরণে সমস্যার সমাধান
এই সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে-
১। চর এলাকার ব্যবহার: নতুন জেলে উঠা চর এলাকা গবাদীপশুর চারণ ভূমি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
২। পশু খাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া: ধাতু ও অঞ্চলভেদে অধিক পরিমাণে উৎপাদিত খাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে সার্বিকভাবে পশু খাদ্যের অভাব হলেও বিশেষ বিশেষ ধাতুতে ও অঞ্চলভেদে বিভিন্ন খাদ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধি পায়।
অতিরিক্ত খাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিয়ে খাদ্যাভাবের সময় অথবা ঘাটতির অঞ্চলে সেগুলি ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন- ক) বর্ষা মৌসুমে ডিজা ও তাজা খড় সংরক্ষণ; খ) সবুজ ঘাস সংরক্ষণ (সাইলেজ পদ্ধতিতে)- ১। নেপিয়ার, পারা, জামীন ঘাস; ২। প্রচলিত দুর্বা, শ্যামা ইত্যাদি ঘাস; গ) হে তেরিতে খোমরী ও মাসকলাইয়ের ব্যবহার।
৩। পশু খাদ্যের অপব্যবহার রোধ: আমাদের দেশের উৎপাদিত খর্তুর বৃহদাংশ গৃহস্থালী জালানী ও বিভিন্ন কৃষি কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই জালানীর বিকল্প উৎসের ব্যবহার জনপ্রিয় করে খর্তুর অপচয় রোধ করা যায়। আবার বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে খড় পচে যায়, তাই এ মৌসুমে খড় এমোনিয়া প্রক্রিয়াজাত করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের লাগসই প্রযুক্তি উদ্যোগেদের হাতে পৌঁছাতে হবে তবে অপচয় রোধ করা যাবে।
৪। উচ্চ ফলনশীল জাতের ঘাস চাষ করা যেতে পারে: যেমন নেপিয়ার, পারা, জামীন, গিনি ইত্যাদি। তাছাড়া মৌসুমী ঘাস-ভুটা, কলাই, কাউপি, ওচস ইত্যাদি চাষের মাধ্যমে খাদ্যের অভাব পূরণ করা যায়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফসলের জমিতে উন্নত জাতের ঘাস চাষ করেও ঘাস উৎপাদন সম্ভব। তাছাড়া সরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় পতিত জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
৫। অপ্রচলিত খাদ্যের উৎসের ব্যবহার বৃদ্ধি: যেমন-
ক) শিল্প উপজাত পদার্থ:
- চিনির কলের উপজাত (মোলাসেস, ব্যাগাস, প্রেস মাড);
- তেল মিলের উপজাত (তেলের খৈল);
- চালের কলের উপজাত (চালের কুড়া, চালের ভুষি);
- গমের কলের উপজাত (গমের ভুষি);
- ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের উপজাত;
- মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের উপজাত;
- মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের উপজাত;
- অন্যান্য।
খ) কৃষি উপজাত পদার্থ:
- ভুট্টার খোসা;
- ধানের খড়;
- গমের খড়;
- জোয়ার;
- বাজরা;
- কাউপি;
- কলাই;
- মাসকলাই;
- ছোলা;
- অন্যান্য।
গ) অন্যান্য উৎস:
- জলজ উদ্ভিদ (জলকুম্ভী, কচুরিপানা);
- বনজ উদ্ভিদ;
- শিল্পজাত দ্রব্য (ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া) ইত্যাদি।
৬। পশু খাদ্যের পুষ্টিমান বৃদ্ধির ব্যবস্থা: নিম্নমানের খাদ্যের পুষ্টিমান বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়া অবলম্বন করা যেতে পারে। যেমন- ক) খড় এমোনিয়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ; খ) খড় ইউরিয়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ; গ) সাইলেজ তৈরি ; ঘ) হে তৈরি ; ঙ) ব্লক তৈরি ।
৭। পশু খাদ্যের বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা: পশু খাদ্যের বাজারজাতকরণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
৮। গবেষণা ও প্রশিক্ষণ: পশু খাদ্য সংক্রান্ত গবেষণা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া।
৯। নীতিমালা প্রণয়ন: পশু খাদ্য সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা।
গরু মোটাতাজাকরণ বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় খাত। সমস্যাগুলো সমাধান করে এবং সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এটি আরও লাভজনক করা যায়।
[তথ্যসূত্র: গরু মোটাতাজাকরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ সহায়িকা, ইউপিপি-উজ্জীবিত প্রকল্প, পিকেএসএফ]









