রোজা ভঙ্গের কারণঃ ৬টি তালিকাতে মোট ৭১টি কারণ

নিম্নে রোজা ভঙ্গের কারণ/রোযা ভঙ্গের কারণ এর ৬টি তালিকাতে মোট ৭১টি কারণ তুলে করা হয়েছে।
রোজা ভঙ্গের কারণ/রোযা ভঙ্গের কারণঃ তালিকা-১
নিচে উল্লিখিত কারণে রোযা ভেঙ্গে যায় এবং কাযা, কাফফারা উভয়টা ওয়াজিব হয়। যথা-
১। রোযার নিয়ত (রাতে) করার পর ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করলে।
২। রোযার নিয়ত করার পর ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী সম্ভোগ করলে। স্ত্রীর উপরও কাযা কাফ্ফারা উভয়টা ওয়াজিব হবে। স্ত্রী যোনির মধ্যে পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ প্রবেশ করালেই কাযা ও কাফফারা ওয়াজিব হয়ে যাবে, চাই বীর্যপাত হোক বা না হোক।
৩। রোযার নিয়ত করার পর (পাপ হওয়া সত্ত্বেও) যদি পুরুষ তার পুরুষাঙ্গ স্ত্রীর পায়খানার রাস্তায় প্রবেশ করায় এবং অগ্রভাগ ভিতরে প্রবেশ করে (চাই বীর্যপাত হোক বা না হোক) তাহলেও পুরুষ স্ত্রী উভয়ের উপর কাযা এবং কাফ্ফারা উভয়টা ওয়াজিব হবে।
৪। রোযা অবস্থায় কোন বৈধ কাজ করল যেমন স্ত্রীকে চুম্বন দিল কিংবা মাথায় তেল দিল তা সত্ত্বেও সে মনে করল যে, রোযা নষ্ট হয়ে গিয়েছে; আর তার পরে ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার ইত্যাদি করল, তাহলেও কাযা কাফ্ফারা উভয়টা ওয়াজিব হবে।
রোজা ভঙ্গের কারণ/রোযা ভঙ্গের কারণঃ তালিকা-২
নিচে উল্লিখিত ২৪ টি কারণে রোজা ভেঙ্গে যায় এবং শুধু কাযা ওয়াজিব হয়। যথা-
১। কানে বা নাকে ঔষধ দিলে।
২৷ ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ভরে বমি করলে বা অল্প বমি আসার পর তা গিলে ফেললে।
৩। কুলি করার সময় অনিচ্ছাবশতঃ কণ্ঠনালীতে পানি চলে গেলে।
৪। স্ত্রী বা কোন নারীকে শুধু স্পর্শ প্রভৃতি করার কারণেই বীর্যপাত হয়ে গেলে।
৫। এমন কোন জিনিস খেলে যা সাধারণতঃ খাওয়া হয় না। যেমন কাঠ, লোহা, কাগজ, পাথর, মাটি, কয়লা ইত্যাদি।
৬। বিড়ি, সিগারেট বা হুক্কা সেবন করলে।
৭। আগরবাতি প্রভৃতির ধোঁয়া ইচ্ছাকৃতভাবে নাকে বা হলোকে পৌঁছালে।
৮। ভুলে পানাহার করার পর রোজা ভেঙ্গে গেছে মনে করে আবার ইচ্ছাকৃতভাবে কোন কিছু পানাহার করলে।
৯। রাত আছে মনে করে সুবহে সাদেকের পরে সেহরী খেলে।
১০। ইফতারীর সময় হয়নি, দিন রয়ে গেছে অথচ সময় হয়ে গেছে -এই মনে করে ইফতারী করলে।
১১। দুপুরের পরে রোজার নিয়ত করলে।
১২। দাঁত দিয়ে রক্ত বের হলোে তা যদি থুথুর চেয়ে পরিমাণে বেশী হয় এবং কণ্ঠনালীর নীচে চলে যায়।
১৩। কেউ জোর পূর্বক রোযাদারের মুখে কোন কিছু দিলে এবং তা কণ্ঠনালীতে পৌঁছে গেলে।
১৪। দাঁতে কোন খাদ্য-টুকরা আঁটকে ছিল এবং সুবহে সাদেকের পর তা যদি পেটে চলে যায় তবে সে টুকরা ছোলা বুটের চেয়ে ছোট হলে রোযা ভেঙ্গে যায় না, তবে এরূপ করা মাকরূহ। কিন্তু মুখ থেকে বের করার পর গিলে ফেললে তা যতই ছোট হোক না কেন রোযা কাযা করতে হবে।
১৫। হস্ত মৈথুন করলে যদি বীর্যপাত হয়।
১৬। পেশাবের রাস্তায় বা স্ত্রীর যোনিতে কোন ঔষধ প্রবেশ করালে।
১৭। পানি বা তেল দ্বারা ভিজা আঙ্গুল যোনিতে বা পায়খানার রাস্তায় প্রবেশ করালে।
১৮। শুকনো আঙ্গুল প্রবেশ করিয়ে পুরোটা বা কিছুটা বের করে আবার প্রবেশ করালে। আর যদি শুকনো আঙ্গুল একবার প্রবেশ করিয়ে একবারেই পুরোটা বের করে নেয়-আবার প্রবেশ না করায়, তাহলে রোযার অসুবিধা হয় না।
১৯। মুখে পান রেখে ঘুমিয়ে গেলে এবং এ অবস্থায় সুবহে সাদেক হয়ে গেলে।
২০। নস্যি গ্রহণ করলে বা কানে তেল ঢাললে।
২১। কেউ রোযার নিয়তই যদি না করে তাহলেও শুধু কাযা ওয়াজিব হয়।
২২। স্ত্রীর বেহুঁশ থাকা অবস্থায় কিংবা বে-খবর ঘুমন্ত অবস্থায় তার সাথে সহবাস করা হলে ঐ স্ত্রীর উপর শুধু কাযা ওয়াজিব হবে।
২৩। রমযান ব্যতীত অন্য নফল রোযা ভঙ্গ হলে শুধু কাযা ওয়াজিব হয়।
২৪। এক দেশে রোযা শুরু করার পর অন্য দেশে চলে গেলে সেখানে যদি নিজের দেশের তুলনায় আগে ঈদ হয়ে যায় তাহলে নিজের দেশের হিসেবে যে কয়টা রোযা বাদ গিয়েছে তার কাযা করতে হবে। আর যদি সেখানে গিয়ে রোযা এক দুটো বেড়ে যায় তাহলে তা রাখতে হবে।
রোজা ভঙ্গের কারণ/রোযা ভঙ্গের কারণঃ তালিকা-৩
নিচে উল্লিখিত ১৪ টি কারণে রোজা ভাঙ্গে না তবে মাকরূহ (দূর্বল) হয়ে যায়। যথা-
১। বিনা প্রয়োজনে কোন জিনিস চিবানো।
২। তরকারী চ্যাদির লবণ চেখে ফেলা দেয়া। তবে কোন চাকরের মুনিব বা কোন নারীর স্বামী বদ মেজাজী হলোে জিহবার অগ্রভাগ দিয়ে লবণ চেখে তা ফেলে দিলে এতটুকুর অবকাশ আছে।
৩। কোন ধরনের মাজন, কয়লা, গুল বা টুথপেষ্ট ব্যবহার করা মাকরূহ। আর এর কোন কিছু সামান্য পরিমাণও গলার মধ্যে চলে গেলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
৪। গোসল ফরয-এ অবস্থায় সারা দিন অতিবাহিত করা।
৫। কোন রোগীর জন্য নিজের রক্ত দেয়া।
৬। গীবত করা, চোগলখুরী করা, অনর্থক কথাবার্তা বলা, মিথ্যা বলা।
৭। ঝগড়া ফ্যাসাদ করা, গালি-গালাজ করা।
৮। ক্ষুধা বা পিপাসার কারণে অস্থিরতা প্রকাশ করা।
৯। মুখে অধিক পরিমাণ থুথু একত্র করে গিলে ফেলা।
১০। দাঁতে ছোলা বুটের চেয়ে ছোট কোন বস্তু আটকে থাকলে তা বের করে মুখের ভিতর থাকা অবস্থায় গিলে ফেলা।
১১। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না-এরূপ মনে হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রীকে চুম্বন করা ও আলিঙ্গন করা। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণের আস্থা থাকলে ক্ষতি নেই, তবে যুবকদের এহেন অবস্থা থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়। আর রোজা অবস্থায় স্ত্রীর ঠোট মুখে নেয়া সর্বাবস্থায় মাকরূহ।
১২। নিজের মুখ দিয়ে চিবিয়ে কোন বস্তু শিশুর মুখে দেয়া। তবে অনন্যোপায় অবস্থায় এরূপ করলে অসুবিধা নেই।
১৩। পায়খানার রাস্তা পানি দ্বারা এত বেশী ধৌত করা যে, ভিতরে পানি পৌঁছে যাওয়ার সন্দেহ হয়-এরূপ করা মাকরূহ। আর প্রকৃত পক্ষে পানি পৌঁছে গেলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়। তাই এ ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। এ জন্য রোজা অবস্থায় পানি দ্বারা ধৌত করার পর কোন কাপড় দ্বারা বা হাত দ্বারা পানি পরিষ্কার করে ফেলা নিয়ম।
১৪। ঠোটে লিপিষ্টিক লাগালে যদি মুখের ভিতর চলে যাওয়ার আশংকা হয় তাহলে তা মাকরূহ।
রোজা ভঙ্গের কারণ/রোযা ভঙ্গের কারণঃ তালিকা-৪
নিচে উল্লিখিত ১৮ টি কারণে রোজা ভাঙ্গে না এবং মাকরূহও হয় না। যথা-
১। মেসওয়াক করা। যে কোন সময় হোক, কাঁচা হোক বা শুষ্ক।
২। শরীর বা মাথা বা দাড়ি গোঁপে তেল লাগানো।
৩। চোখে সুরমা লাগানো বা কোন ঔষধ দেয়া। (তারা)
৪। খুশবু লাগানো বা তার ঘ্রাণ নেয়া।
৫। ভুলে কিছু পান করা বা আহার করা বা স্ত্রী সম্ভোগ করা।
৬। গরম বা পিপাসার কারণে গোসল করা বা বারবার কুলি করা।
৭। অনিচ্ছা বশতঃ গলার মধ্যে ধোঁয়া, ধুলাবালি বা মাছি ইত্যাদি প্রবেশ করা।
৮। কানে পানি দেয়া বা অনিচ্ছাবশতঃ চলে যাওয়ার কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে দিলে সতর্কর্তা হলো সে রোজা কাযা করে নেয়া।
৯। অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হওয়া। ইচ্ছাকৃতভাবে অল্প বমি করলে মাকরূহ হয় না, তবে এরূপ করা ঠিক নয়।
১০। স্বপ্ন দোষ হওয়া।
১১। মুখে থুথু আসলে গিলে ফেলা।
১২। যে কোন ধরনের ইনজেকশন বা টীকা লাগানো। তবে রোজার কষ্ট যেন বোধ না হয়-এ উদ্দেশ্যে শক্তির ইনজেকশন বা স্যালাইন লাগানো মাকরূহ।
১৩। রোজা অবস্থায় দাঁত উঠালে এবং রক্ত পেটে না গেলে।
১৪। পাইরিয়া রোগের কারণে যে সামান্য রক্ত সব সময় বের হতে থাকে এবং গালার মধ্যে যায় তার কারণে।
১৫। সাপ ইত্যাদিতে দংশন করলে।
১৬। পান খাওয়ার পর ভালভাবে কুলি করা সত্ত্বেও যদি থুথুতে লালভাব থেকে যায়।
১৭। শাহওয়াতের সাথে শুধু নজর করার কারণেই যদি বীর্যপাত ঘটে যায় তাহলে রোজা ফাসেদ হয় না।
১৮। রোজা অবস্থায় শরীর থেকে ইনজেকশনের সাহায্যে রক্ত বের করলে রোজা ভাঙ্গে না এবং এতে রোজা রাখার শক্তি চলে যাওয়ার মত দুর্বল হয়ে পড়ার আশংকা না থাকলে মাকরূহও হয় না।
রোজা ভঙ্গের কারণ/রোযা ভঙ্গের কারণঃ তালিকা-৫
নিচে উল্লিখিত ৫টি কারণে রোযা না রাখার অনুমতি আছে। যথা-
১। যদি কেউ শরী’আত সম্মত সফরে থাকে তাহলে তার জন্য রোযা না রাখার অনুমতি আছে; পরে কাযা করে নিতে হবে। কিন্তু সফরে যদি কষ্ট না হয়, তাহলে রোযা রাখাই উত্তম। আর যদি কোন ব্যক্তি রোযা রাখার নিয়ত করার পর সফর শুরু করে তাহলে সে দিনের রোযা রাখা জরুরী।
২। কোন রোগী ব্যক্তি রোযা রাখলে যদি তার রোগ বেড়ে যাওয়ার আশংকা হয় অথবা অন্য কোন নতুন রোগ দেখা দেয়ার আশংকা হয় অথবা রোগ মুক্তি বিলম্বিত হওয়ার আশংকা হয়, তাহলে রোযা ছেড়ে দেয়ার অনুমতি আছে। সুস্থ হওয়ার পর কাযা করে নিতে হবে। তবে অসুস্থ অবস্থায় রোযা ছাড়তে হলে কোন দ্বীনদার পরহেযগার চিকিৎসকের পরামর্শ থাকা শর্ত, কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ভিত্তিতে হতে হবে, শুধু নিজের কাল্পনিক খেয়ালের বশীভূত হয়ে আশংকাবোধ করে রোযা ছাড়া দুরস্ত হবে না। তাহলে কাযা কাফফারা উভয়টা ওয়াজিব হবে।
৩। রোগ মুক্তির পর যে দুর্বলতা থাকে তখন রোযা রাখলে যদি পুনরায় রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবল আশংকা হয় তাহলে তখন রোযা না রাখার অনুমতি আছে, পরে কাযা করে নিতে হবে।
৪। গর্ভবতী বা দুগ্ধদায়িনী স্ত্রী লোক রোযা রাখলে যদি নিজের জীবনের ব্যাপারে বা সন্তানের জীবনের ব্যাপারে আশংকা বোধ করে বা রোযা রাখলে দুধ শুকিয়ে যাবে আর সন্তানের সমূহ কষ্ট হবে-এরূপ নিশ্চিত হলে তার জন্য তখন রোযা ছাড়া জায়েয, পরে কাযা করে নিতে হবে।
৫। হায়েয নেফাস অবস্থায় রোযা ছেড়ে দিতে হবে এবং পবিত্র হওয়ার পর কাযা করে নিতে হবে।
রোজা ভঙ্গের কারণ/রোযা ভঙ্গের কারণঃ তালিকা-৬
নিচে উল্লিখিত ৬টি কারণে যে সব কারণে রোযা শুরু করার পর তা ভেঙ্গে ফেলার অনুমতি রয়েছে। যথা-
১। যদি এমন পিপাসা বা ক্ষুধা লাগে যাতে প্রাণের আশংকা দেখা দেয়।
২। যদি এমন কোন রোগ বা অবস্থা দেখা দেয় যে, ওষুধ-পত্র গ্রহণ না করলে জীবনের আশা ত্যাগ করতে হয়।
৩। গর্ভবতী স্ত্রীলোকের যদি এমন অবস্থা হয় যে, নিজের বা সন্তানের প্রাণ নাশের আশংকা হয়।
৪। বেহুঁশ বা পাগল হয়ে গেলে।
৫। উল্লেখ্য যে, এসব অবস্থায় যে রোযা ছেড়ে দেয়া হবে তার কাযা করে নিতে হবে।
৬। কেউ যদি অন্যকে দিয়ে কাজ করাতে পারে বা জীবিকা অর্জনের জন্য অন্য কোন কাজ করতে পারে তা সত্ত্বেও সে টাকার লোভে রোদে গিয়ে কাজ করল এবং এ কারণে অনুরূপ পিপাসায় আক্রান্ত হল কিংবা বিনা অপারগতায় আগুনের কাছে যাওয়ার কারণে পিপাসায় আক্রান্ত হল, তাহলে তার জন্যে রোযা ছাড়ার অনুমতি নেই৷
[তথ্যসূত্র: আহকামে যিন্দেগী by মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন]









