২১ দিনের অভ্যাসে নিজের জীবনকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার সহজ উপায়

লেখাঃ আশরাফুল আলম, বরগুনা থেকে।
বন্ধুরা, আমি আশরাফুল, আপনাদের মতোই একজন সাধারণ মানুষ। দিনশেষে আমারও মনে হতো—ইশ! দিনটা যদি আর একটু গুছিয়ে চলতাম। সারাদিন ফোন ঘাটাঘাঁটি, অলসতা আর কাজের চাপে যখন নিজের জীবনটা একদম এলোমেলো লাগছিল, তখনই আমি ঠিক করলাম একটা পরীক্ষা করে দেখব। আমি শুরু করলাম ‘২১ দিনের অভ্যাস বদলানোর চ্যালেঞ্জ’। আজ আমি আপনাদের বলব, এই ২১ দিনে আমার জীবনে কী কী ঘটল।
শুরুটা কেন করলাম?
সত্যি বলতে, আমি একটা কথা প্রায়ই শুনতাম যে—কোনো কাজ ২১ দিন করলে নাকি সেটা অভ্যাসে পরিণত হয়। কিন্তু গভীরে গিয়ে দেখলাম, আসলে মানুষের অভ্যাস পুরোপুরি বদলাতে ১৮ থেকে ২৫৪ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে ২১ দিন হলো একটা ‘টার্নিং পয়েন্ট’। ২১ দিন একটা কাজ টানা করতে পারলে আপনার মস্তিষ্ক সেটা মেনে নিতে শুরু করে। আমি ভাবলাম, সারা জীবন তো এভাবেই গেল, অন্তত ২১টা দিন নিজের জন্য একটু চেষ্টা করে দেখি না!
আমার সেই ৬টি কঠিন কিন্তু সাধারণ নিয়ম
আমি নিজের জন্য ৬টি নিয়ম ঠিক করেছিলাম, যেগুলো মানা আমার মতো অলস মানুষের জন্য হিমালয় জয়ের মতো ছিল-
১. ভোর ৫টায় বিছানা ছাড়া: আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টের কাজ ছিল এটি। কিন্তু আমি ঠিক করলাম সূর্য ওঠার আগে পৃথিবী যখন শান্ত থাকে, তখন আমি জেগে থাকব। শুরুতে খুব কষ্ট হতো, কিন্তু কয়েকদিন পর দেখলাম ভোরের ওই সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি কাজ করা যায়।
২. মোবাইল থেকে মুক্তি (ডিজিটাল ডিটক্স): বিশ্বাস করুন, এটা আমার জীবন বদলে দিয়েছে। আমি নিয়ম করলাম—রাত ৯টার পর মোবাইল অন্য ঘরে রেখে দেব এবং পরদিন সকাল ১০টার আগে ওতে হাত দেব না। শুরুতে খুব অস্থির লাগছিল, কিন্তু ১০টার আগে মোবাইল না ধরায় আমার সকালটা অনেক বেশি প্রোডাক্টিভ হতে শুরু করল।
৩. প্রচুর পরিমাণে পানি খাওয়া: আমি আগে সারা দিনে ঠিকমতো জল খেতাম না। এই ২১ দিন আমি নিয়ম করে দিনে ৩ থেকে ৪ লিটার পানি তো খেয়েছি। এতে আমার শরীর অনেক হালকা লাগতে শুরু করল এবং ক্লান্তি ভাবটা কেটে গেল।
৪. কাগজের বই পড়া: আমরা সারাদিন ফোনের স্ক্রিনে পড়ি, কিন্তু আমি ঠিক করলাম ঘুমানোর আগে বা ভোরে অন্তত ১০ পাতা আসল বই পড়ব। এটা আমার মনকে শান্ত করতে দারুণ সাহায্য করেছে।
৫. শরীরের যত্ন নেওয়া: প্রতিদিন অন্তত ১ ঘণ্টা আমি ঘাম ঝরিয়েছি। সেটা জিমে গিয়ে হোক, পার্কে হাঁটা হোক বা বাড়িতে যোগব্যায়াম। শরীর ঘামলে মনটাও ফুরফুরে থাকে।
৬. নতুন কিছু শেখা: আমি প্রতিদিন ১ ঘণ্টা সময় রেখেছিলাম এমন কিছু করার জন্য যা আমাকে ভবিষ্যতে সাহায্য করবে। সেটা কোনো নতুন ভাষা হতে পারে বা ইন্টারনেটে কোনো কাজের কোর্স।
আমি কি প্রথমবারেই সফল হয়েছি?
একদম না! সত্যি বলতে আমি তিন তিনবার ব্যর্থ হয়েছি। কখনো ৩ দিন পর হাল ছেড়ে দিয়েছি, কখনো ৭ দিন পর। চতুর্থবারে গিয়ে আমি সফল হই। আমি একটা জিনিস বুঝেছি—‘পারফেক্ট’ হতে যাওয়ার দরকার নেই। যদি কোনোদিন ৫টার বদলে ৫টা ১৫ মিনিটে ঘুম ভাঙে, তার মানে এই নয় যে সব শেষ। আমি আবার সেখান থেকেই শুরু করেছি।
আমার সারাদিনের রুটিনটা এখন যেমন
- ভোর ৫:০০ – ৫:১০: ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস জল খেয়ে নিজের বিছানাটা গুছিয়ে নেওয়া।
- সকাল ৫:১০ – ৬:১০: ১ ঘণ্টা ব্যায়াম বা হাঁটা।
- সকাল ৬:১০ – ৭:০০: গোসল সেরে ফ্রেশ হওয়া এবং ১০ পাতা বই পড়া।
- সকাল ৭:০০ – ৭:৩০: কোনো ফোন ছাড়াই পরিবারের সাথে নাস্তা করা।
- সকাল ১০:০০: এই প্রথম আমি সারাদিনের জন্য নিজের ফোন হাতে নিই।
২১ দিন পর আমি যা পেলাম
আমার ওজন কিছুটা কমেছে, আমি অনেকগুলো বই শেষ করেছি এবং একটা নতুন স্কিল শিখেছি। কিন্তু সবচেয়ে বড় বদলটা হয়েছে আমার মনের ভেতরে। আগে আমি সবসময় চিন্তিত থাকতাম, কিন্তু এখন আমি জানি আমার দিনটা কীভাবে কাটবে। আমার কনফিডেন্স অনেক বেড়ে গেছে।
আপনার জন্য আমার ছোট্ট পরামর্শ
আপনি যদি আজ থেকে শুরু করতে চান, তবে একসাথে সব নিয়ম মানার দরকার নেই। হয়তো শুধু ৫টায় ওঠা বা ফোন দূরে রাখার নিয়ম দিয়ে শুরু করুন। মনে রাখবেন, আজকের ছোট একটু কষ্ট কালকের বড় একটা সাফল্যের শুরু।
আমি যদি পারি, আপনি কেন পারবেন না? বলুন তো, আপনি পারবেন যদি আপনি চান?
আমার লেখাটি শেষ অবধি পড়বার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন সবাই।

