আশুরার রোজা কী, কেন, কীভাবে?

আশুরার রোজা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য অপরিসীম ফজিলত বহন করে। এই রোজা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুশীলনই নয়, বরং এটি সত্যের বিজয়, ধৈর্য এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রতীক। এই ব্লগ পোস্টে আশুরার রোজার ফজিলত, এর ঐতিহাসিক পটভূমি, এ বছর কখন এটি পালন করতে হবে এবং এই দিনের শিক্ষা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এই পোস্টটি পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং তথ্যবহুল করার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে সবাই এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পায়।
(১) আশুরার রোজা কী?
আশুরা শব্দটি আরবি শব্দ “আশারা” থেকে এসেছে, যার অর্থ “দশ”। ইসলামী ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস মহররমের দশম দিনকে আশুরা বলা হয়। এই দিনে মুসলমানরা নফল রোজা পালন করেন, যা সুন্নাহ হিসেবে বিবেচিত। এই রোজা রাখার প্রধান উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পূর্ববর্তী বছরের গুনাহ মাফের আশা।
ক) হাদিসে আশুরার ফজিলত
সহী মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে আবু কাতাদা (রা.) থেকে উদ্ধৃত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, “আশুরার রোজা সম্পর্কে আমার বিশ্বাস, এটি পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়।” এই হাদিসটি আশুরার রোজার গুরুত্ব ও ফজিলতকে স্পষ্ট করে। এই রোজা রাখার মাধ্যমে একজন মুসলমান তার ছোটখাটো গুনাহ থেকে মুক্তি পেতে পারেন বলে আশা করা যায়।
খ) আশুরার রোজার ইতিহাস
আশুরার রোজার ইতিহাস হাজার হাজার বছর পুরনো। এই রোজা মূলত হযরত মুসা (আ.)-এর সময় থেকে পালিত হয়ে আসছে। কুরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুসারে, এই দিনে আল্লাহ তা’আলা হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারী বনী ইসরাইলকে ফেরাউনের নির্যাতন থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। ফেরাউনের সৈন্যবাহিনী নীল নদে ডুবে মারা যায়, আর মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা নিরাপদে পার হয়ে যান। এই অলৌকিক ঘটনার জন্য শুকরিয়া হিসেবে মুসা (আ.) এই দিনে রোজা রেখেছিলেন। নবী করিম (সা.) এই ঘটনার প্রতি সম্মান জানিয়ে এই রোজা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।
(২) কেন আশুরার রোজা পালন করবেন?
আশুরার রোজা পালনের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শুধু একটি ধর্মীয় আমল নয়, বরং এটি সত্যের বিজয় ও অসত্যের পরাজয়ের প্রতীক। এই রোজা পালনের মাধ্যমে একজন মুসলমান নিম্নলিখিত ফজিলত অর্জন করতে পারেন-
- গুনাহ মাফের আশা: হাদিস অনুসারে, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়।
- সুন্নাহ পালন: নবী করিম (সা.) এই রোজা পালন করতেন এবং এটি পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে এটি সুন্নাহ হিসেবে গণ্য।
- ঐতিহাসিক তাৎপর্য: এই দিনে সত্যের বিজয় হয়েছিল, যা আমাদেরকে সত্যের পথে অবিচল থাকতে শেখায়।
- ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা: রোজা পালনের মাধ্যমে আমরা ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
(৩) আশুরার রোজা কবে রাখতে হয়?
বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলে মহররম মাসের শুরু মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় একদিন পরে হয়। আজ আমাদের বাংলাদেশে মহররম মাসের কত তারিখ চলছে, তা আপনি ক্যালেন্ডারে অথবা গুগলে সার্চ দিয়ে দেখে নিবেন।
ক্যালেন্ডারে ইংরেজি, বাংলা ও আরবি উভয় মাসে ও তারিখ থাকে। আরিব দিন শুরু হয় সন্ধ্যার পর থেকে। আশুরার রোজা পালনের জন্য সবচেয়ে উত্তম সময় হলো ৯ ও ১০ মহররম। অর্থাৎ-
- ৯ মহররম: রোজা রাখা।
- ১০ মহররম (আশুরা): রোজা রাখা।
- বিকল্প হিসেবে ১১ মহররম: যদি কেউ ৯ মহররম রোজা রাখতে না পারেন, তবে ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখতে পারেন।
ক) তিন দিনের রোজা
কেউ যদি টানা তিন দিন রোজা রাখতে চান, তাহলে-
- রাতে সাহরি খেয়ে শনিবার (৯ মহররম) রোজা।
- রাতে সাহরি খেয়ে রবিবার (১০ মহররম) রোজা।
- রাতে সাহরি খেয়ে সোমবার (১১ মহররম) রোজা।
সোমবারের রোজা নফল রোজা হিসেবেও গণ্য হবে, কারণ নবী (সা.) সোমবার ও বৃহস্পতিবার নফল রোজা রাখতেন। এভাবে একজন মুসলমান তিন দিনের রোজার মাধ্যমে দ্বিগুণ সওয়াব অর্জন করতে পারেন।
খ) শর্টকাট পদ্ধতি
যারা শুধু দুই দিন রোজা রাখতে চান, তারা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখতে পারেন। এ ক্ষেত্রে রোজায় দুটি নিয়ত করা যেতে পারেঃ আশুরার রোজা এবং সোমবারের নফল রোজা। তবে, সর্বোচ্চ সওয়াবের জন্য ৯ ও ১০ মহররম রোজা রাখা উত্তম।
(৪) আশুরার রোজার প্রধান আমল
আশুরার দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো রোজা রাখা। নবী করিম (সা.) বলেছেন, “যদি আমি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তবে আমি ৯ ও ১০ মহররম রোজা রাখব।” এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে ৯ ও ১০ মহররম রোজা রাখা উত্তম। তবে, যদি কেউ শুধু ১০ মহররম রোজা রাখতে চান, তাও গ্রহণযোগ্য, যদিও কিছু ওলামা এটিকে এককভাবে রাখতে নিরুৎসাহিত করেছেন।
আশুরার দিনে নফল আমলঃ
আশুরার দিনে রোজা ছাড়াও কিছু নফল আমল করা যেতে পারে-
- ইস্তিগফার ও তওবা: ইমাম তিরমিজি (রহ.)-এর বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে, আশুরার দিনে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন। তাই এই দিনে বেশি বেশি ইস্তিগফার ও তওবা করা উচিত।
- দান-সদকা: এই দিনে দান-সদকা করলে সওয়াব বৃদ্ধি পায়।
- কুরআন তিলাওয়াত: কুরআন পড়া ও এর উপর চিন্তাভাবনা করা এই দিনে বিশেষ ফজিলতপূর্ণ।
- দুআ: আল্লাহর কাছে নিজের ও পরিবারের জন্য ক্ষমা ও কল্যাণের দুআ করা।
(৫) আশুরার শিক্ষা ও চেতনা
আশুরার দিন শুধু রোজা রাখার দিন নয়, এটি সত্যের বিজয় ও অসত্যের পরাজয়ের একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি। এই দিনে মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের উপর আল্লাহ তা’আলা সত্যের বিজয় দান করেছিলেন। ফেরাউন, যিনি নিজেকে শক্তিশালী ও অহংকারী মনে করতেন, তিনি এই দিনে পরাজিত হয়েছিলেন। এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে সত্য সবসময় জয়ী হবে, যত দুর্বলই হোক না কেন।
ক) সত্যের পথে অবিচল থাকা
আশুরার শিক্ষা আমাদেরকে সত্যের পথে অবিচল থাকতে উৎসাহিত করে। মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা সংখ্যায় কম ও দুর্বল ছিলেন, কিন্তু তারা আল্লাহর উপর ভরসা রেখে সত্যের পথে অটল ছিলেন। আমাদের জীবনেও এই শিক্ষা প্রয়োগ করা উচিত। শক্তি, সংখ্যা বা ক্ষমতার জোয়ারে ভেসে না গিয়ে আমাদের আদর্শের উপর অটল থাকতে হবে।
খ) ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা
আশুরার দিন আমাদের ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দেয়। মুসা (আ.) ফেরাউনের নির্যাতনের মুখে ধৈর্য ধরেছিলেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রেখেছিলেন। তাঁর এই ধৈর্যের ফল হিসেবে আল্লাহ তাঁকে বিজয় দান করেন। আমাদের জীবনেও চ্যালেঞ্জের মুখে ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
(৬) সাহাবীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভুল ধারণা
আশুরার দিনে কিছু ভুল ধারণা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়, বিশেষ করে হযরত মুয়াবিয়া (রা.) ও কারবালার ঘটনা নিয়ে। এটি স্পষ্ট করা জরুরি যে হযরত মুয়াবিয়া (রা.) ছিলেন নবী (সা.)-এর একজন সাহাবী এবং তিনি মুসলিম উম্মাহর কাছে শ্রদ্ধার পাত্র। নবী (সা.) সাহাবীদের সমালোচনা বা গালমন্দ করতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন।
ক) কারবালার ঘটনা ও মুয়াবিয়া (রা.)
কারবালার ঘটনায় হযরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি ঘটনা। তবে এই ঘটনার সাথে মুয়াবিয়া (রা.)-এর কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। কিছু মানুষ ভুলভাবে এই ঘটনার জন্য তাঁকে দায়ী করার চেষ্টা করে, যা শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ অনুচিত। মুয়াবিয়া (রা.) তাঁর ইজতিহাদের ভিত্তিতে তাঁর ছেলে ইয়াজিদকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, যা তাঁর একটি সিদ্ধান্ত ছিল। এই সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে, কিন্তু এটি ইজতিহাদের ভুল, যার জন্য তাঁকে সমালোচনা করা যায় না।
খ) সাহাবীদের মর্যাদা
কুরআন ও হাদিসে সাহাবীদের উচ্চ মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সহী বুখারীতে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের সম্পর্কে, “তোমরা যা খুশি করো, আল্লাহ তোমাদের মাফ করে দিয়েছেন।” এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে সাহাবীদের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। তাই তাঁদের সমালোচনা বা নিন্দা করা শরিয়তের লঙ্ঘন।
(৭) আশুরার দিনে কী করবেন?
আশুরার দিনে রোজা রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল। তবে এই দিনে আরও কিছু আমল করা যেতে পারে-
- ইস্তিগফার ও তওবা: আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
- দান-সদকা: গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা।
- কুরআন তিলাওয়াত: কুরআন পড়া ও এর শিক্ষা গ্রহণ করা।
- দুআ ও মুনাজাত: নিজের ও পরিবারের জন্য কল্যাণ কামনা করা।
বাচ্চাদের জন্য আশুরার রোজাঃ
সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের বাচ্চাদের এই রোজা রাখতে উৎসাহিত করতেন। যেসব বাচ্চারা রোজা রাখার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছাত, তাদেরকে এই নফল রোজা রাখতে শেখানো হতো। এমনকি তাদের মনোযোগ ধরে রাখতে খেলনা ও অন্যান্য উপায়ে উৎসাহিত করা হতো। এটি ছিল সাহাবীদের সুন্নাহ। আমরাও আমাদের সন্তানদের এই ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করতে পারি।
(৮) শেষ কথা
আশুরার রোজা শুধু একটি নফল ইবাদত নয়, এটি সত্যের বিজয়, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রতীক। এই দিনে রোজা রাখার মাধ্যমে আমরা গুনাহ মাফের আশা করতে পারি এবং নবী (সা.)-এর সুন্নাহ পালন করতে পারি। এ বছর ৯ ও ১০ মহররম (৬ ও ৭ জুলাই) রোজা রাখার চেষ্টা করুন। এই দিনে সত্যের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা গ্রহণ করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও কল্যাণ প্রার্থনা করুন। আশা করি, এই ব্লগ পোস্টটি আপনাকে আশুরার রোজার ফজিলত ও তাৎপর্য বুঝতে সাহায্য করবে। ইনশাআল্লাহ, আমরা সবাই এই দিনের আমল যথাযথভাবে পালন করতে পারব।









