শিয়া ও সুন্নিদের পার্থক্য কি?

শিয়া এবং সুন্নি ইসলামের দুটি প্রধান সম্প্রদায়, যারা মৌলিক বিশ্বাস ও ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের ক্ষেত্রে একমত হলেও, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং আইনি বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যগুলো প্রধানত ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর খলিফা নির্বাচনের প্রশ্নে উদ্ভূত হয়।
ইসলামের একমাত্র উৎস হলো কুরআন এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহ।
কুরআন আল্লাহর বাণী এবং সুন্নাহ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবন, শিক্ষা ও কথার সমন্বয়।
কুরআন ও সুন্নাহ ছাড়া তৃতীয় কোনো স্বাধীন উৎস ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। এই ২টি উৎস ইসলামের ভিত্তি।
অর্থাৎ বলা যায়, ইসলাম মহান আল্লাহর নিকট তারই প্রদত্ত একমাত্র গ্রহণ যোগ্য পূর্ণাঙ্গ জীবণ ব্যবস্থ্যা।
ইসলাম ও মুসলিম বলতে বুঝায়- শুধুমাত্র কুরআন ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসণকারী। বাকি যা কিছু বাতিল/গ্রহণযোগ্য নয়।
(১) শিয়া ও সুন্নিদের পার্থক্য কি?

নিচে টেবিল আকারে শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলো উপস্থাপন করা হলো-
| শিয়া | সুন্নি |
|---|---|
| নামের অর্থ: শিয়া শব্দটি “শিয়াতু আলী” থেকে এসেছে, যার অর্থ “আলীর অনুসারী”। তারা বিশ্বাস করে, নেতৃত্ব হযরত আলী (রা.) ও তার বংশধরদের প্রাপ্য। | নামের অর্থ: সুন্নি শব্দটি “আহলুস সুন্নাহ” থেকে এসেছে, যার অর্থ “সুন্নাহ বা নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনুসারী”। তারা নির্বাচিত খলিফাদের নেতৃত্ব মানে। |
| জনসংখ্যা: বিশ্বের মুসলিমদের ১০-১৫% (প্রায় ১৫৪-২০০ মিলিয়ন)। ইরান, ইরাক, বাহরাইন, আজারবাইজানে সংখ্যাগরিষ্ঠ; লেবাননে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। | জনসংখ্যা: বিশ্বের মুসলিমদের ৮৫-৯০%। সৌদি আরব, মিশর, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানসহ ৪০টির বেশি দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ। |
| নেতৃত্বের বিশ্বাস: নেতৃত্ব (ইমামত) হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, বিশেষ করে হযরত আলী (রা.) ও তার বংশধরদের মাধ্যমে। ইমামরা আল্লাহ কর্তৃক নিযুক্ত এবং পাপমুক্ত (ইসমাহ)। | নেতৃত্বের বিশ্বাস: খলিফা সম্প্রদায়ের যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবে। হযরত আবু বকর (রা.)-কে প্রথম খলিফা হিসেবে মানে। খলিফারা পাপমুক্ত নন। |
| ইমামতের ধারণা: ইমামরা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা, আল্লাহর দ্বারা নির্বাচিত। বারো ইমামী শিয়ারা বিশ্বাস করে, দ্বাদশ ইমাম মুহাম্মদ আল-মাহদী গোপনে আছেন এবং শেষ সময়ে ফিরে আসবেন। | ইমামতের ধারণা: ইমাম সাধারণত মসজিদে নামাজের নেতৃত্বদানকারী বা সম্মানিত ব্যক্তি। এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত নয় এবং পাপমুক্ততার ধারণা নেই। |
| খলিফাদের মর্যাদা: শিয়ারা প্রথম তিন খলিফা (আবু বকর, উমর, উসমান)-কে সাধারণত বৈধ খলিফা হিসেবে মানে না এবং তাদের কিছু সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে। | খলিফাদের মর্যাদা: প্রথম চার খলিফা (আবু বকর, উমর, উসমান, আলী)-কে “রাশিদুন খলিফা” হিসেবে সম্মান করে এবং তাদের নেতৃত্বকে বৈধ মনে করে। |
| হাদিসের উৎস: শিয়ারা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিবার (আহলুল বাইত) ও তাদের নিকটবর্তী সাহাবীদের হাদিস গ্রহণ করে। যেমন, কুতুবুস সিত্তাহর পরিবর্তে তারা “আল-কাফি” ব্যবহার করে। | হাদিসের উৎস: সুন্নিরা বিস্তৃত সাহাবীদের হাদিস গ্রহণ করে, বিশেষ করে সাহিহ বুখারি, সাহিহ মুসলিমসহ কুতুবুস সিত্তাহর ছয়টি হাদিস সংকলন। |
| নামাজের পদ্ধতি: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তিনবারে আদায় করতে পারে (ফজর, জোহর-আসর, মাগরিব-ইশা একত্রে)। নামাজে কপাল মাটি বা মোহরে রাখে। হাত শরীরের পাশে রাখে। | নামাজের পদ্ধতি: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পৃথকভাবে আদায় করে। নামাজে কপাল সরাসরি মুসল্লায় রাখে। হাত বুকে বাঁধে (মালিকি ব্যতীত)। |
| মুহাররম ও আশুরা: আশুরা শিয়াদের জন্য শোকের দিন, হযরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের স্মরণে। মাতম ও তাজিয়া অনুষ্ঠান পালন করে। | মুহাররম ও আশুরা: আশুরা সুন্নিদের জন্য রোজার দিন, হযরত মূসা (আ.)-এর মিশরীয়দের হাত থেকে মুক্তির স্মরণে। মাতম বা তাজিয়া পালন করে না। |
| আইনি ব্যবস্থা: প্রধানত জাফরি মাজহাব অনুসরণ করে। ইমামদের ব্যাখ্যাকে গুরুত্ব দেয়। | আইনি ব্যবস্থা: হানাফি, মালিকি, শাফিঈ, হাম্বলি—এই চারটি মাজহাবের একটি অনুসরণ করে। বিভিন্ন ব্যাখ্যার স্বাধীনতা রয়েছে। |
| মুতআ বিয়ে: বারো ইমামী শিয়ারা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য মুতআ বিয়েকে বৈধ মনে করে। | মুতআ বিয়ে: মুতআ বিয়েকে অবৈধ মনে করে। হযরত উমর (রা.)-এর সময় এটি নিষিদ্ধ করা হয়। |
| তীর্থস্থান: মক্কা-মদিনার পাশাপাশি নাজাফ, কারবালা, মাশহাদের মতো ইমামদের মাজারে জিয়ারত করে। | তীর্থস্থান: প্রধানত মক্কা ও মদিনায় হজ ও ওমরাহ পালন করে। মাজার জিয়ারত কিছু সুন্নির মধ্যে প্রচলিত হলেও বিতর্কিত। |
| ধর্মীয় নেতৃত্ব: আয়াতুল্লাহ বা মারজা (ধর্মীয় পণ্ডিত) ব্যাপক প্রভাব রাখেন। ইরানে ভেলায়েতে ফকিহ (ফকিহের অভিভাবকত্ব) ধারণা প্রচলিত। | ধর্মীয় নেতৃত্ব: আলেম বা মুফতিরা পরামর্শ দেন, তবে কোনো কেন্দ্রীয় ধর্মীয় পদবী নেই। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব পৃথক। |
| মাহদীর ধারণা: শিয়ারা (বিশেষ করে বারো ইমামী) বিশ্বাস করে, মাহদী (দ্বাদশ ইমাম) গোপনে আছেন এবং শেষ সময়ে ফিরে আসবেন। | মাহদীর ধারণা: সুন্নিরা বিশ্বাস করে, মাহদী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধর হবেন এবং শেষ সময়ে ইসলামের পুনরুজ্জীবন ঘটাবেন। |
| ঐতিহাসিক ঘটনা: কারবালার যুদ্ধ (৬৮০ খ্রি.) ও হযরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত শিয়া পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। | ঐতিহাসিক ঘটনা: কারবালার ঘটনাকে দুঃখজনক মনে করে, তবে এটি ধর্মীয় পরিচয়ের কেন্দ্রীয় বিষয় নয়। |
(২) শিয়া ও সুন্নিদের মিল কি?

শিয়া ও সুন্নি ইসলামের দুটি প্রধান সম্প্রদায়, যারা ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, এবং ধর্মীয় কিছু বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, আচার, এবং উৎসে ব্যাপক মিল রয়েছে।
উভয় সম্প্রদায়ই কুরআন ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহকে প্রধান উৎস হিসেবে মানে এবং ইসলামের একটি ঐক্যবদ্ধ উম্মাহর অংশ।
নিচে শিয়া ও সুন্নিদের মিলের একটি বিস্তৃত তালিকা দেওয়া হলো-
১। মৌলিক বিশ্বাসে মিল
- তাওহিদ (আল্লাহর একত্ব): শিয়া ও সুন্নি উভয়ই বিশ্বাস করে যে আল্লাহ এক, অদ্বিতীয়, এবং সর্বশক্তিমান। তিনি সকল সৃষ্টির স্রষ্টা এবং কোনো শরিক নেই।
- নবুওয়াত (নবীত্ব): উভয় সম্প্রদায়ই হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর শেষ নবী ও রাসূল হিসেবে মানে। তারা নবী আদম (আ.), নূহ (আ.), ইব্রাহিম (আ.), মূসা (আ.), ঈসা (আ.)-সহ সকল নবীতে বিশ্বাস করে।
- কুরআন: শিয়া ও সুন্নি একই কুরআনকে আল্লাহর বাণী হিসেবে গ্রহণ করে। উভয়ই কুরআনের অখণ্ডতা ও পবিত্রতায় বিশ্বাসী এবং এটিকে জীবনের পথনির্দেশক হিসেবে মানে।
- আখিরাত: উভয়ই পরকাল, বিচার দিবস, জান্নাত, জাহান্নাম, এবং পুনরুত্থানে বিশ্বাস করে। তারা বিশ্বাস করে যে প্রত্যেকে তাদের কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে।
- কিতাব ও ফেরেশতা: শিয়া ও সুন্নি আল্লাহর পূর্ববর্তী কিতাব (তাওরাত, জাবুর, ইঞ্জিল) এবং ফেরেশতাদের (যেমন, জিবরাইল, মিকাইল) উপর বিশ্বাস করে।
- কদর (ভাগ্য): উভয়ই বিশ্বাস করে যে আল্লাহ সবকিছুর পরিকল্পনাকারী, তবে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মের জন্য দায়িত্ব রয়েছে।
২। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভে মিল
শিয়া ও সুন্নি উভয়ই ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ পালন করে, যদিও কিছু পদ্ধতিতে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে-
- শাহাদাহ (বিশ্বাসের স্বীকৃতি): উভয়ই ঘোষণা করে, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল)। শিয়ারা কখনো কখনো এর সাথে “আলীয়ুন ওয়ালিউল্লাহ” যোগ করে, তবে এটি শাহাদাহর মূল অংশ নয়।
- নামাজ: শিয়া ও সুন্নি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ (ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব, ইশা) আদায় করে। পার্থক্য শুধু পদ্ধতিতে (যেমন, শিয়ারা তিনবারে নামাজ একত্র করতে পারে, সুন্নিরা সাধারণত পৃথকভাবে আদায় করে)।
- রোজা: উভয়ই রমজান মাসে রোজা পালন করে। তারা ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য, পানীয়, এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকে।
- জাকাত: শিয়া ও সুন্নি সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে। শিয়ারা অতিরিক্তভাবে খুমস (মুনাফার ২০% দান) পালন করে, তবে জাকাত উভয়ের জন্য বাধ্যতামূলক।
- হজ: শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকলে শিয়া ও সুন্নি মক্কায় হজ পালন করে। হজের মূল আচার (যেমন, তাওয়াফ, আরাফাতে অবস্থান) উভয়ের ক্ষেত্রে একই।
৩। নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধে মিল
- সততা ও ন্যায়: শিয়া ও সুন্নি উভয়ই সততা, ন্যায়বিচার, এবং সত্যবাদিতাকে ইসলামের মূল মূল্যবোধ হিসেবে গ্রহণ করে।
- দয়া ও দান: দরিদ্রদের প্রতি দয়া, দানশীলতা, এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করা উভয় সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
- আল্লাহর প্রতি ভক্তি: উভয়ই নিয়মিত দোয়া, জিকির, এবং কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে।
- পরিবার ও সম্প্রদায়: শিয়া ও সুন্নি পরিবারের প্রতি দায়িত্ব, সম্প্রদায়ের সেবা, এবং ভ্রাতৃত্বের উপর জোর দেয়।
৪। ধর্মীয় উৎসব ও আচারে মিল
- ঈদুল ফিতর: শিয়া ও সুন্নি রমজানের শেষে ঈদুল ফিতর উদযাপন করে। এটি রোজার সমাপ্তি এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার উৎসব।
- ঈদুল আজহা: হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের স্মরণে উভয় সম্প্রদায় ঈদুল আজহা উদযাপন করে এবং কোরবানি করে।
- মুহাররম: শিয়ারা মুহাররমে হযরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের শোক পালন করে, আর সুন্নিরা আশুরায় রোজা রাখে। তবে, উভয়ই মুহাররমকে গুরুত্বপূর্ণ মাস হিসেবে বিবেচনা করে।
- মিলাদুন্নবী: শিয়া ও সুন্নির মধ্যে অনেকে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিন উদযাপন করে, যদিও পদ্ধতিতে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।
৫। তীর্থস্থানে মিল
- মক্কা ও মদিনা: শিয়া ও সুন্নি উভয়ই মক্কার কাবা ও মদিনার মসজিদে নববীকে পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে সম্মান করে। হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য উভয়ই এই স্থানে যায়।
- জিয়ারত: শিয়ারা নাজাফ, কারবালা, মাশহাদের মতো ইমামদের মাজারে জিয়ারত করে। অনেক সুন্নিও মাজার জিয়ারত করে (বিশেষ করে সুফি ঐতিহ্যে), যদিও এটি কিছু সুন্নির মধ্যে বিতর্কিত। তবে, উভয়ই মক্কা-মদিনার পবিত্রতায় একমত।
৬। নবী ও আহলুল বাইতের প্রতি শ্রদ্ধা
- নবী মুহাম্মদ (সা.): শিয়া ও সুন্নি উভয়ই নবীকে আল্লাহর প্রিয় রাসূল এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে সম্মান করে।
- আহলুল বাইত: উভয়ই নবীর পরিবার (আহলুল বাইত)—হযরত ফাতিমা (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত হাসান (রা.), এবং হযরত হুসাইন (রা.)—এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করে। শিয়ারা তাদের ধর্মীয় নেতৃত্বে বিশেষ গুরুত্ব দেয়, তবে সুন্নিরাও তাদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান দেখায়।
- সাহাবীদের প্রতি শ্রদ্ধা: শিয়া ও সুন্নি উভয়ই নবীর সাহাবীদের সম্মান করে, যদিও শিয়ারা প্রথম তিন খলিফার নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে, হযরত আলী (রা.), হযরত হামজা (রা.)-এর মতো সাহাবীদের প্রতি উভয়েরই শ্রদ্ধা রয়েছে।
৭। ইসলামি আইন ও শরিয়াহ
- শরিয়াহর গুরুত্ব: শিয়া ও সুন্নি উভয়ই শরিয়াহ (ইসলামি আইন) অনুসরণ করে, যা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উদ্ভূত।
- নৈতিক নীতি: বিয়ে, উত্তরাধিকার, ব্যবসা, এবং শাস্তির ক্ষেত্রে শরিয়াহর মূল নীতিগুলো উভয়ের ক্ষেত্রে একই।
- হালাল-হারাম: খাদ্য, পোশাক, এবং আচরণে হালাল ও হারামের নিয়ম উভয়ই মেনে চলে। উদাহরণস্বরূপ, শুয়োরের মাংস, মদ, এবং সুদ উভয়ের জন্য হারাম।
৮। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে মিল
- ইসলামি ইতিহাসের শ্রদ্ধা: শিয়া ও সুন্নি উভয়ই বদর, উহুদ, এবং খন্দকের যুদ্ধের মতো ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসকে সম্মান করে।
- নবীর হিজরত: নবীর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
- ইসলামি শিল্প ও সংস্কৃতি: শিয়া ও সুন্নি উভয়ই ইসলামি শিল্পকলা (ক্যালিগ্রাফি, স্থাপত্য) এবং সাহিত্যে অবদান রেখেছে।
৯। মাহদীর ধারণা
- শিয়া ও সুন্নি উভয়ই বিশ্বাস করে যে ইমাম মাহদী শেষ সময়ে আগমন করবেন এবং ইসলামের পুনরুজ্জীবন ঘটাবেন।
- শিয়ারা বিশ্বাস করে যে মাহদী (দ্বাদশ ইমাম) গোপনে আছেন, আর সুন্নিরা বিশ্বাস করে তিনি নবীর বংশধর হবেন। তবে, মাহদীর আগমনের ধারণা উভয়ের মধ্যে মিল রয়েছে।
১০। সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্যের প্রচেষ্টা
- ইসলামি সম্মেলন: শিয়া ও সুন্নি উভয়ই অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কো-অপারেশন (OIC)-এর মতো প্ল্যাটফর্মে একত্রে কাজ করে।
- ফিলিস্তিন ইস্যু: উভয় সম্প্রদায়ই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য একত্রে সমর্থন প্রকাশ করে।
- আন্তঃসম্প্রদায় সংলাপ: ইরান, ইরাক, এবং সৌদি আরবের মতো দেশে শিয়া-সুন্নি পণ্ডিতরা ঐক্যের জন্য সংলাপে অংশ নেয়।
১১। ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান
- মাদ্রাসা ও মসজিদ: শিয়া ও সুন্নি উভয়ই মাদ্রাসা ও মসজিদে কুরআন, হাদিস, এবং ইসলামি শিক্ষা প্রচার করে।
- আলেমদের ভূমিকা: উভয় সম্প্রদায়েই আলেম বা ধর্মীয় পণ্ডিতরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- তাফসির ও ফিকহ: কুরআনের তাফসির (ব্যাখ্যা) এবং ফিকহ (ইসলামি আইন) শিক্ষায় উভয়ই অবদান রেখেছে।
১২। চরমপন্থার বিরোধিতা
- শিয়া ও সুন্নি উভয়ই চরমপন্থী গোষ্ঠী (যেমন, আইএসআইএস) এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তারা ইসলামকে শান্তির ধর্ম হিসেবে প্রচার করে।
১৩। আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য
- সুফিবাদ: শিয়া ও সুন্নি উভয়ের মধ্যে সুফি ঐতিহ্য প্রচলিত। সুফি সাধকরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য জিকির, মেডিটেশন, এবং ভক্তি পালন করে।
- জিকির ও দোয়া: উভয়ই নিয়মিত জিকির (আল্লাহর নাম স্মরণ) এবং দোয়া (প্রার্থনা) করে। উদাহরণস্বরূপ, দুরুদ শরীফ পাঠ উভয়ের মধ্যে প্রচলিত।
১৪। বিশ্বব্যাপী উম্মাহর অংশ
শিয়া ও সুন্নি উভয়ই নিজেদের বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর অংশ মনে করে। তারা বিশ্বাস করে যে ইসলাম সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের জন্য একটি সার্বজনীন ধর্ম।
শিয়া ও সুন্নিদের মিল বোঝার জন্য নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিশ্লেষণ করা হলো-
- মৌলিক বিশ্বাসে ঐক্য: পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি সমীক্ষা (২০১২) দেখায়, শিয়া ও সুন্নি মুসলিমরা তাওহিদ, নবুওয়াত, এবং কুরআনের প্রতি বিশ্বাসে একমত। এই মৌলিক বিশ্বাসগুলো ইসলামের ভিত্তি এবং উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
- কুরআনের অখণ্ডতা: শিয়া ও সুন্নি একই কুরআন অনুসরণ করে, যা ১১৪টি সূরা নিয়ে গঠিত। কিছু চরমপন্থী দাবি করে শিয়ারা ভিন্ন কুরআন মানে, যা সম্পূর্ণ ভুল। শিয়া পণ্ডিতরা স্পষ্ট করেন যে তারা একই কুরআন মানে, যদিও কিছু আয়াতের তাফসিরে পার্থক্য থাকতে পারে।
- নবীর প্রতি শ্রদ্ধা: শিয়া ও সুন্নি উভয়ই নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর শেষ রাসূল এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে সম্মান করে। নবীর জীবনী, হিজরত, এবং যুদ্ধগুলো উভয়ের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
- পাঁচ স্তম্ভের পালন: শিয়া ও সুন্নি উভয়ই পাঁচ স্তম্ভকে ইসলামের অপরিহার্য অংশ মনে করে। যদিও নামাজের পদ্ধতি বা জাকাতের প্রয়োগে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে, তবে মূল উদ্দেশ্য একই। উদাহরণস্বরূপ, হজ পালনের সময় শিয়া ও সুন্নি একই কাবার চারপাশে তাওয়াফ করে।
- আধ্যাত্মিক ঐক্য: শিয়া ও সুন্নি উভয়ের মধ্যে সুফি ঐতিহ্য প্রচলিত, যা আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার উপর জোর দেয়। সুফি সাধক যেমন রুমি বা আব্দুল কাদির জিলানি উভয় সম্প্রদায়ের কাছে সম্মানিত।
- ঐতিহাসিক ঐক্যের প্রচেষ্টা: আধুনিক সময়ে শিয়া-সুন্নি ঐক্যের জন্য বহু প্রচেষ্টা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আল-আজহারের শায়খ মাহমুদ শালতুত (১৯৫৯) শিয়া জাফরি মাজহাবকে ইসলামের বৈধ অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেইনি সুন্নি-শিয়া ঐক্যের জন্য কাজ করেছেন।
(৩) তাহলে মোটা দাগে, শিয়া ও সুন্নিদের মাঝে মূল পার্থক্য কি থাকল?

মোটা দাগে, শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে মূল পার্থক্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতে-
- নেতৃত্ব ও ইমামত: শিয়ারা বিশ্বাস করে নেতৃত্ব (ইমামত) হযরত আলী (রা.) ও তাঁর বংশধরদের (আহলুল বাইত) মাধ্যমে আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত, এবং ইমামরা পাপমুক্ত। সুন্নিরা বিশ্বাস করে খলিফা সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচিত হন, এবং তারা পাপমুক্ত নন।
- হাদিসের উৎস: শিয়ারা প্রধানত আহলুল বাইত ও তাদের নিকটবর্তী সাহাবীদের হাদিস (যেমন, আল-কাফি) গ্রহণ করে। সুন্নিরা বিস্তৃত সাহাবীদের হাদিস (যেমন, সাহিহ বুখারি, সাহিহ মুসলিম) মানে।
- ধর্মীয় আচার: নামাজের পদ্ধতি (যেমন, শিয়ারা তিনবারে পাঁচ ওয়াক্ত, মোহর ব্যবহার), আশুরা পালন (শিয়ারা শোক, সুন্নিরা রোজা), এবং জিয়ারতের গুরুত্বে পার্থক্য রয়েছে।
- আইনি ব্যাখ্যা: শিয়ারা জাফরি মাজহাব অনুসরণ করে, সুন্নিরা হানাফি, মালিকি, শাফিঈ, বা হাম্বলি মাজহাব মানে। এটি শরিয়াহর প্রয়োগে সামান্য পার্থক্য সৃষ্টি করে।
- ইমামদের ভূমিকা: শিয়ারা ইমামদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেয়, যেখানে সুন্নিদের মধ্যে ইমাম মসজিদে নামাজের নেতা বা পণ্ডিত হিসেবে সীমিত।
তবে, উভয়ই কুরআন, তাওহিদ, নবুওয়াত, এবং ইসলামের পাঁচ স্তম্ভে একমত এবং মুসলিম হিসেবে স্বীকৃত।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা-
শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে পার্থক্য ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিন্নতা থেকে উদ্ভূত। নিচে মোটা দাগে এই পার্থক্যগুলো বিশ্লেষণ করা হলো, যা বাংলা ব্লগের জন্য সহজবোধ্য এবং তথ্যবহুল।
১। নেতৃত্ব ও ইমামত
- শিয়া:
- বিশ্বাস করে যে নেতৃত্ব (ইমামত) আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত এবং হযরত আলী (রা.) ও তাঁর বংশধরদের (বারো ইমাম, যেমন হাসান, হুসাইন) মাধ্যমে চলবে।
- ইমামরা পাপমুক্ত (ইসমাহ) এবং ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতা।
- গদীরে খুমের হাদিস (“যার আমি মাওলা, তার আলী মাওলা”; সুনান তিরমিজি, হাদিস নং: ৩৭১৩) ইমামতের প্রমাণ হিসেবে দেখে।
- প্রথম তিন খলিফার (আবু বকর, উমর, উসমান) নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
- সুন্নি:
- বিশ্বাস করে খলিফা সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচিত হন (যেমন, আবু বকর, উমর, উসমান, আলী)।
- খলিফারা পাপমুক্ত নন, তবে তাদের নেতৃত্ব বৈধ এবং সম্মানিত।
- গদীরে খুমের হাদিসকে আলী (রা.)-এর সম্মান ও সাহচর্যের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
- প্রথম চার খলিফাকে (খুলাফায়ে রাশিদীন) বিশেষভাবে সম্মান করে।
মূল পার্থক্য: শিয়াদের জন্য ইমামত আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত এবং ধর্মের মৌলিক অংশ, যেখানে সুন্নিদের জন্য খিলাফত সম্প্রদায়ের ঐকমত্যের ভিত্তিতে গঠিত।
২। হাদিসের উৎস
- শিয়া:
- সুন্নাহ হিসেবে প্রধানত আহলুল বাইত (নবীর পরিবার) ও তাদের নিকটবর্তী সাহাবীদের বর্ণিত হাদিস গ্রহণ করে।
- প্রধান হাদিস সংকলন: “আল-কাফি”, “মান লা ইয়াহদুরুহুল ফাকিহ”, “তাহজিবুল আহকাম”।
- প্রথম তিন খলিফার সাথে সম্পর্কিত কিছু হাদিসের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
- সুন্নি:
- সকল সাহাবীদের বর্ণিত হাদিস গ্রহণ করে, বিশেষ করে সাহিহ বুখারি, সাহিহ মুসলিম (কুতুবুস সিত্তাহ)।
- সাহাবীদের (আবু বকর, উমর, আলী) বর্ণিত হাদিসকে সমানভাবে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে।
- হাদিসের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ে কঠোর সনদ (বর্ণনাকারীর শৃঙ্খল) বিশ্লেষণ করে।
মূল পার্থক্য: শিয়ারা আহলুল বাইতের হাদিসকে অগ্রাধিকার দেয়, সুন্নিরা বিস্তৃত সাহাবীদের হাদিস গ্রহণ করে।
৩। ধর্মীয় আচার
- শিয়া:
- নামাজ: তিনবারে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একত্র করতে পারে (যেমন, জোহর-আসর, মাগরিব-ইশা)। কপাল মাটি বা মোহরে রাখে।
- আশুরা: মুহাররমে হযরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের শোক পালন করে, মাতম ও তাজিয়া প্রথার মাধ্যমে।
- জিয়ারত: ইমামদের মাজার (যেমন, নাজাফ, কারবালা) জিয়ারত ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
- খুমস: জাকাত ছাড়াও মুনাফার ২০% দান বাধ্যতামূলক।
- সুন্নি:
- নামাজ: সাধারণত পাঁচ ওয়াক্ত পৃথকভাবে আদায় করে। হাত বুকে বাঁধে (মালিকি ব্যতীত)।
- আশুরা: হযরত মূসা (আ.)-এর মুক্তির স্মরণে রোজা রাখে, শোক পালন করে না।
- জিয়ারত: কিছু সুন্নি (বিশেষ করে সুফি) মাজার জিয়ারত করে, তবে এটি বাধ্যতামূলক নয় এবং কিছু সুন্নির মধ্যে বিতর্কিত।
- জাকাত: জাকাতই প্রধান দান, খুমস পালন করে না।
মূল পার্থক্য: শিয়ারা আশুরা ও জিয়ারতের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং নামাজের পদ্ধতিতে ভ Married with Children এর মতো সিনেমা।
৪। আইনি ব্যাখ্যা (মাজহাব)
- শিয়া:
- জাফরি মাজহাব অনুসরণ করে, যা ইমাম জাফর সাদিক (রা.)-এর শিক্ষার উপর ভিত্তি করে।
- ইমামদের শিক্ষা এবং আকল (যুক্তি) ব্যবহার করে শরিয়াহর ব্যাখ্যায়।
- উদাহরণ: মুতআ (অস্থায়ী বিয়ে) জায়েজ মনে করে।
- সুন্নি:
- চারটি মাজহাব অনুসরণ করে: হানাফি, মালিকি, শাফিঈ, হাম্বলি।
- ইজমা (পণ্ডিতদের ঐকমত্য) এবং কিয়াস (যুক্তি) ব্যবহার করে শরিয়াহর ব্যাখ্যায়।
- মুতআ নিষিদ্ধ মনে করে, হযরত উমর (রা.)-এর ফতোয়ার ভিত্তিতে।
মূল পার্থক্য: শিয়ারা জাফরি মাজহাব এবং ইমামদের শিক্ষার উপর নির্ভর করে, সুন্নিরা বিভিন্ন মাজহাব এবং ঐকমত্যের উপর ভিত্তি করে।
৫। ইমামদের ভূমিকা
- শিয়া:
- ইমামরা (বারো ইমাম) আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত, পাপমুক্ত, এবং ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেতা।
- দ্বাদশ ইমাম (ইমাম মাহদী) গোপনে আছেন এবং শেষ সময়ে ফিরে আসবেন।
- সুন্নি:
- ইমাম মসজিদে নামাজের নেতা বা ধর্মীয় পণ্ডিত হিসেবে সীমিত ভূমিকা পালন করে।
- ইমাম মাহদী নবীর বংশধর হবেন এবং শেষ সময়ে আগমন করবেন, তবে গোপন অবস্থানের ধারণা নেই।
মূল পার্থক্য: শিয়াদের জন্য ইমামত ধর্মের মৌলিক অংশ এবং ইমামদের ভূমিকা ঐশ্বরিক, সুন্নিদের জন্য ইমামের ভূমিকা ব্যবহারিক।
(৪) গুরুত্বপূর্ণ চারটি প্রশ্নের উত্তর

এবার আমরা শিয়া ও সুন্নিদের পার্থক্য কি? এই প্রশ্নে সাথে জরিত আরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তরের মাধ্যমে আজকের আলোচনার ইতি টানব। প্রশ্ন গুলো হচ্ছে-
- এই শিয়া সুন্নি বিভাজন কি ইসলাম ধর্ম নিজেই তৈরি করেছে? আরও স্পষ্ট করে বললে, আল্লাহ তায়ালা বা নবি মুহাম্মদ (সাঃ) কি নিজেই শিয়া সুন্নি বিভাজন তৈরি করে দিয়েছেন?
- যদি শিয়া সুন্নি বিভাজন ইসলাম নিজে সৃষ্টি না করে থাকে, তাহলে কবে, কারা, কেন এটি সৃষ্টি করল?
- ইসলামকে শিয়া ও সুন্নি এই সম্প্রদায়ে ভাগ করা, এটাকে কি ইসলাম সমর্থন করে?
- ইসলামের সংজ্ঞা অনুযায়ী শিয়ারা কি মুসলিম?
চলুন উত্তরগুলো জেনে নিই।
প্রশ্ন: এই শিয়া সুন্নি বিভাজন কি ইসলাম ধর্ম নিজেই তৈরি করেছে? আরও স্পষ্ট করে বললে, আল্লাহ তায়ালা বা নবি মুহাম্মদ (সাঃ) কি নিজেই শিয়া সুন্নি বিভাজন তৈরি করে দিয়েছেন?
উত্তর: কুরআনে ও হাদিসে কোথাও শিয়া বা সুন্নি নামে কোনো সম্প্রদায়ের উল্লেখ নেই। এটি বোঝায় যে আল্লাহ তায়ালা বা তার রাসূল এই বিভাজন তৈরি করেননি।
কুরআনে কোথাও শিয়া বা সুন্নি নামে কোনো সম্প্রদায়ের উল্লেখ নেই। এটি বোঝায় যে আল্লাহ তায়ালা এই বিভাজন তৈরি করেননি।
নবী মুহাম্মদ (সাঃ) জীবদ্দশায় কোনো শিয়া বা সুন্নি নামে সম্প্রদায় ছিল না। তিনি সকল মুসলিমকে “উম্মাহ” হিসেবে একতাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
শিয়া-সুন্নি বিভাজনের উৎপত্তি এবং এটি ইসলাম ধর্ম, আল্লাহ তায়ালা, বা নবী মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কিনা তা বোঝার জন্য নিচে বিষয়টি কুরআন, হাদিস, এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হলো।
কুরআনের দৃষ্টিকোণ-
কুরআন মুসলিমদের ঐক্যের উপর জোর দেয় এবং সম্প্রদায়গত বিভাজনকে নিরুৎসাহিত করে। উদাহরণস্বরূপঃ
- সূরা আল-ইমরান (৩:১০৩):
“তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধরে থাক এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”
এই আয়াত মুসলিমদের একতাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দেয়। - সূরা আশ-শুরা (৪২:১৩):
“তিনি তোমাদের জন্য ধর্ম হিসেবে তাই নির্ধারণ করেছেন, যা তিনি নূহকে নির্দেশ দিয়েছিলেন… তোমরা ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করো না।”
এটি স্পষ্ট যে আল্লাহ তায়ালা ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছেন। - সূরা আল-আনআম (৬:১৫৯):
“যারা তাদের ধর্মে বিভক্ত হয়ে সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে, তুমি [হে মুহাম্মদ] তাদের সাথে কিছুই সম্পর্কিত নও। তাদের বিষয় আল্লাহর উপর নির্ভর করে।”
এই আয়াত সম্প্রদায়গত বিভাজনকে নিন্দা করে এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে এর সাথে সম্পর্কিত না হতে বলে। - সূরা আল-মায়িদা (৫:৩):
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছি এবং তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করেছি, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে ধর্ম হিসেবে পছন্দ করেছি।”
এই আয়াত ইসলামকে একটি সম্পূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ ধর্ম হিসেবে বর্ণনা করে, যেখানে সম্প্রদায়গত বিভাজনের কোনো স্থান নেই।
এককথায়, কুরআনে কোথাও শিয়া বা সুন্নি নামে কোনো সম্প্রদায়ের উল্লেখ নেই। এটি বোঝায় যে আল্লাহ তায়ালা এই বিভাজন তৈরি করেননি।
নবীর সতর্কবাণী-
নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেনঃ
“ইহুদিরা ৭১টি দলে বিভক্ত হয়েছে, নাসারারা ৭২টি দলে, আর আমার উম্মত ৭৩টি দলে বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে একটি দল ছাড়া বাকি সব জাহান্নামে যাবে।”
(সুনান তিরমিজি, হাদিস নং: ২৬৪১)
এই হাদিস ইঙ্গিত দেয় যে নবী বিভাজনের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন, কিন্তু তিনি নিজে এই বিভাজন তৈরি করেননি।
ইসলামের নবী মুহাম্মদ স. আরও বলেছেনঃ
“মুসলিমরা একটি দেহের মতো; যদি তার একটি অংশ ব্যথিত হয়, তবে পুরো দেহ ব্যথা এবং জ্বরে ভোগে।”
(সাহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৮৬)
এই হাদিস মুসলিমদের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক।
এককথায়, নবী মহাম্মদ স. এর জীবদ্দশায় কোনো শিয়া বা সুন্নি নামে সম্প্রদায় ছিল না। তিনি সকল মুসলিমকে “উম্মাহ” হিসেবে একতাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রশ্ন: যদি শিয়া সুন্নি বিভাজন ইসলাম নিজে সৃষ্টি না করে থাকে, তাহলে কবে, কারা, কেন এটি সৃষ্টি করল?

উত্তর: শিয়া-সুন্নি বিভাজন নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) খলিফা নির্বাচন নিয়ে মতভেদ থেকে শুরু হয়। এটি ধর্মীয় বিষয়ের চেয়ে প্রাথমিকভাবে রাজনৈতিক ছিল।
- গদীরে খুমের ব্যাখ্যা: শিয়ারা দাবি করে যে নবী গদীরে খুমে হযরত আলী (রা.)-কে “মাওলা” ঘোষণা করে ইমামতের ইঙ্গিত দিয়েছেন (হাদিস: “যার আমি মাওলা, তার আলী মাওলা”; সুনান তিরমিজি, হাদিস নং: ৩৭১৩)।
সুন্নিরা এটিকে আলী (রা.)-এর সম্মান ও সাহচর্যের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করে, নেতৃত্বের সরাসরি নির্দেশ নয়। এই ভিন্ন ব্যাখ্যা পরবর্তীকালে বিভাজনের একটি কারণ হয়, কিন্তু নবী নিজে এই বিভাজন তৈরি করেননি। - খলিফা নির্বাচন:
- সুন্নিরা বিশ্বাস করে যে সম্প্রদায়ের যোগ্য ব্যক্তি খলিফা হবেন। হযরত আবু বকর (রা.) প্রথম খলিফা হিসেবে নির্বাচিত হন, যাকে তারা বৈধ মনে করে।
- শিয়ারা বিশ্বাস করে যে নেতৃত্ব হযরত আলী (রা.), নবীর চাচাতো ভাই ও জামাতা, এবং তাঁর বংশধরদের প্রাপ্য ছিল। তারা মনে করে আলী (রা.)-কে প্রথম খলিফা হওয়া উচিত ছিল।
- কারবালার ঘটনা (৬৮০ খ্রিস্টাব্দ): হযরত হুসাইন (রা.), আলী (রা.)-এর পুত্র, কারবালায় ইয়াজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শহীদ হন। এই ঘটনা শিয়া পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এবং বিভাজনকে আরও গভীর করে। সুন্নিরা এই ঘটনাকে দুঃখজনক মনে করে, তবে এটি তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ নয়।
- ধর্মীয় পার্থক্যের বিকাশ: রাজনৈতিক মতভেদ পরবর্তীকালে ধর্মীয় ব্যাখ্যায় রূপ নেয়। শিয়ারা ইমামতের ধারণা এবং আহলুল বাইতের হাদিসের উপর জোর দেয়, যেমন “আল-কাফি”। সুন্নিরা বিস্তৃত সাহাবীদের হাদিস গ্রহণ করে, যেমন সাহিহ বুখারি।
- মানুষের সিদ্ধান্ত: খলিফা নির্বাচন নিয়ে মতভেদ এবং কারবালার মতো ঘটনা মানুষের সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল, যা শিয়া সুন্নি বিভাজনের জন্য দায়ী করা যায়।
এই বিভাজন মানুষের সিদ্ধান্ত, ব্যাখ্যা, এবং ঐতিহাসিক ঘটনার ফল, শিয়া সুন্নি বিভাজন করআন, হাদিস কিংবা আল্লাহ বা নবীর সরাসরি নির্দেশ নয়।
প্রশ্ন: ইসলামকে শিয়া ও সুন্নি এই সম্প্রদায়ে ভাগ করা, এটাকে কি ইসলাম সমর্থন করে?
উত্তর: ইসলাম ধর্ম শিয়া ও সুন্নি সম্প্রদায়ে ভাগ করাকে সমর্থন করে না। কুরআন এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষা মুসলিমদের ঐক্যের উপর জোর দেয় এবং সম্প্রদায়গত বিভাজনকে নিরুৎসাহিত করে।
শিয়া-সুন্নি বিভাজন ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, এবং সামাজিক কারণে নবীর মৃত্যুর পর (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) উদ্ভূত হয়, প্রধানত খলিফা নির্বাচন নিয়ে মতভেদ থেকে। যদিও শিয়া ও সুন্নি উভয়ই ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসে (তাওহিদ, নবুওয়াত, কুরআন) একমত এবং মুসলিম হিসেবে স্বীকৃত, তবে এই বিভাজন আল্লাহ বা নবীর নির্দেশিত নয়, বরং মানুষের ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তের ফল।
প্রশ্ন: ইসলামের সংজ্ঞা অনুযায়ী শিয়ারা কি মুসলিম?

উত্তর: ইসলামের সংজ্ঞা অনুযায়ী, শিয়ারা মুসলিম। শিয়ারা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস—যেমন, তাওহিদ (আল্লাহর একত্ব), নবুওয়াত (হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবীত্ব), এবং কুরআনের প্রতি বিশ্বাস—মেনে চলে। তারা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ (শাহাদাহ, নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ) পালন করে, যা তাদের মুসলিম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। তবে, শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে নেতৃত্ব, হাদিস, এবং কিছু ধর্মীয় আচারে পার্থক্য রয়েছে, যা ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিন্নতা থেকে উদ্ভূত।
ইসলামের সংজ্ঞা এবং শিয়াদের মুসলিম হিসেবে অবস্থান বোঝার জন্য নিচে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো। এই আলোচনা কুরআন, হাদিস, এবং ইসলামি পণ্ডিতদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
ইসলামের সংজ্ঞা-
ইসলামের মৌলিক সংজ্ঞা হলো একজন ব্যক্তি যিনিঃ
- তাওহিদে বিশ্বাস করেন: আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়।
- নবুওয়াতে বিশ্বাস করেন: হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর শেষ নবী।
- কুরআনকে আল্লাহর বাণী হিসেবে গ্রহণ করেন: এটি ইসলামের প্রধান ধর্মগ্রন্থ।
- ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ পালন করেন: শাহাদাহ (বিশ্বাসের স্বীকৃতি), নামাজ, রোজা, জাকাত, এবং হজ (সামর্থ্য থাকলে)।
- আখিরাতে বিশ্বাস করেন: পরকাল, বিচার দিবস, এবং জান্নাত-জাহান্নাম।
শিয়ারা এই সকল মৌলিক বিশ্বাস এবং স্তম্ভ মেনে চলে, যা তাদের ইসলামের সংজ্ঞার আওতায় রাখে।
শিয়াদের বিশ্বাস-
শিয়ারা (বিশেষ করে বারো ইমামী শিয়া, যারা শিয়াদের সংখ্যাগরিষ্ঠ) নিম্নলিখিত বিশ্বাস পোষণ করেঃ
- তাওহিদ ও নবুওয়াত: তারা আল্লাহর একত্ব এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবীত্বে অবিচল বিশ্বাসী।
- ইমামত: তারা বিশ্বাস করে যে নবীর পরে নেতৃত্ব (ইমামত) হযরত আলী (রা.) এবং তার বংশধরদের (আহলুল বাইত) মাধ্যমে চলবে। ইমামরা আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত এবং পাপমুক্ত (ইসমাহ)।
- কুরআন: শিয়ারা কুরআনকে অপরিবর্তনীয় এবং আল্লাহর বাণী হিসেবে গ্রহণ করে। তারা একই কুরআন অনুসরণ করে, যদিও কিছু ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকতে পারে।
- পাঁচ স্তম্ভ: শিয়ারা নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ, এবং শাহাদাহ পালন করে। তবে, নামাজের পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে (যেমন, তিনবারে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়, মোহর ব্যবহার)।
- অতিরিক্ত বিশ্বাস: শিয়ারা কিছু অতিরিক্ত বিশ্বাস পোষণ করে, যেমন ইমামত, আশুরায় হযরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের শোক পালন, এবং মাহদীর গোপন অবস্থান ও পুনরাগমন।
এই বিশ্বাসগুলো ইসলামের মৌলিক সংজ্ঞার সাথে সাংঘর্ষিক নয়, যদিও সুন্নিদের সাথে নেতৃত্ব এবং হাদিসের উৎস নিয়ে পার্থক্য রয়েছে।
শিয়াদের মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি-
ইসলামি পণ্ডিত এবং প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শিয়াদের মুসলিম হিসেবে অবস্থান পরিষ্কারঃ
- আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় (সুন্নি): ১৯৫৯ সালে আল-আজহারের শায়খ মাহমুদ শালতুত একটি ফতোয়া জারি করে বলেন, শিয়া জাফরি মাজহাব ইসলামের একটি বৈধ মাজহাব, এবং শিয়ারা মুসলিম।
- অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কো-অপারেশন (OIC): শিয়া-প্রধান দেশ যেমন ইরান, ইরাক এবং আজারবাইজান OIC-এর সদস্য, যা তাদের মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
- কুরআনের দৃষ্টিকোণ: কুরআন (৬:১৫৯) সম্প্রদায়ে বিভক্ত হওয়াকে নিরুৎসাহিত করে, তবে যারা তাওহিদ, নবুওয়াত, এবং কুরআনে বিশ্বাস করে তাদের মুসলিম হিসেবে গণ্য করা হয়। শিয়ারা এই শর্ত পূরণ করে।
- সুন্নি পণ্ডিতদের মতামত: বেশিরভাগ সুন্নি পণ্ডিত, যেমন শায়খ ইউসুফ আল-কারাদাভি, শিয়াদের মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি দেন, যদিও কিছু পার্থক্যের সমালোচনা করেন।
বিতর্ক এবং ভুল ধারণা-
কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী বা ব্যক্তি শিয়াদের মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে, যা প্রধানত নিম্নলিখিত ভুল ধারণা থেকে উদ্ভূতঃ
- ইমামতের ধারণা: শিয়াদের ইমামদের পাপমুক্ত মনে করাকে কিছু সুন্নি শিরকের সাথে তুলনা করে। তবে, শিয়া পণ্ডিতরা স্পষ্ট করেন যে ইমামদের পাপমুক্ততা (ইসমাহ) ঐশ্বরিক গুণ নয়, বরং নৈতিক ও ধর্মীয় নিখুঁততা।
- কুরআনের অখণ্ডতা: কিছু চরমপন্থী দাবি করে শিয়ারা কুরআনের ভিন্ন সংস্করণ ব্যবহার করে। এটি সম্পূর্ণ ভুল। শিয়ারা একই কুরআন অনুসরণ করে, যদিও কিছু আয়াতের তাফসিরে (ব্যাখ্যায়) পার্থক্য থাকতে পারে।
- আশুরা ও মাতম: শিয়াদের আশুরায় মাতম পালনকে কিছু সুন্নি বিদআত (ধর্মে নতুন সংযোজন) মনে করে। তবে, এটি ধর্মীয় আচারের পার্থক্য, যা তাদের মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতিকে বাতিল করে না।
এই ভুল ধারণাগুলো প্রায়শই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা (যেমন, সৌদি আরব বনাম ইরান) এবং চরমপন্থী গোষ্ঠী (যেমন, আইএসআইএস) দ্বারা উস্কে দেওয়া হয়। তবে, মূলধারার ইসলামি পণ্ডিতরা এই দাবিগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেন।
(৫) শেষ কথা
প্রিয় বন্ধুরা, উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা শিয়া ও সুন্নিদের পার্থক্য কি, তা জানলাম।
পুথিবী ৮৬-৯০% ভাগ মুসমানই মূল ধারা ইসলামকে মানে অর্থ্যাৎ সুন্নি। মাত্র ১০-১৫% কিছু কিছু বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে।
ইসলাম মূলত কোন বিভাগ বিভাজন সৃষ্টির সৃযোগ রাখেনি, কিন্তু মুসলিমরা নিজেরাই এই বিজাজনে জড়িয়ে পড়েছে।
শিয়া ও সুন্নি মুলিমদের নিজেদের তৈরি করা দুটি প্রধান সম্প্রদায়। তাদের মধ্যে নেতৃত্ব, হাদিসের উৎস, ধর্মীয় আচার, আইনি ব্যাখ্যা এবং ইমামদের ভূমিকায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যগুলো ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে উদ্ভূত। বিশেষ করে, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর খলিফা নির্বাচন এবং কারবালার ঘটনা এতে ভূমিকা রেখেছে।
শিয়ারা ইমামতের ধারণা এবং আহলুল বাইতের হাদিসের উপর জোর দেয়। তারা আশুরার শোক পালন করে। সুন্নিরা খিলাফত এবং বিস্তৃত হাদিস সংকলনের উপর ভিত্তি করে। তারা চারটি মাজহাব অনুসরণ করে। তবে, এই পার্থক্য সত্ত্বেও তাদের মধ্যে ঐক্যের ভিত্তি মজবুত।
শিয়া ও সুন্নি উভয়ই তাওহিদ, নবুওয়াত এবং কুরআনে বিশ্বাসী। তারা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ পালন করে। উভয় সম্প্রদায়ই কুরআনকে আল্লাহর অপরিবর্তনীয় বাণী মানে। নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে শেষ রাসূল হিসেবে সম্মান করে। এই মিলগুলো তাদের একটি ঐক্যবদ্ধ উম্মাহর অংশ করে।
কুরআন ঐক্যের নির্দেশ দেয়। “তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধরে থাক এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না” (সূরা আল-ইমরান ৩:১০৩)। নবী মুহাম্মদ (সা.) মুসলিমদের একটি উম্মাহ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। শিয়া-সুন্নি পার্থক্য মানুষের ব্যাখ্যা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ফল। এটি আল্লাহ বা নবীর নির্দেশ নয়।
আধুনিক বিশ্বে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এই বিভেদকে জটিল করেছে। চরমপন্থী গোষ্ঠীও বিভাজন বাড়িয়েছে। কিন্তু মূলধারার শিয়া ও সুন্নি পণ্ডিতরা ঐক্যের জন্য কাজ করছেন। আল-আজহারের ফতোয়া এবং ইরানের আয়াতুল্লাহদের আহ্বান এর প্রমাণ।
আমাদের দায়িত্ব পার্থক্যগুলো বোঝা এবং সম্মান করা। একই সাথে মিলের বিষয়গুলো উদযাপন করা। শিয়া হোক বা সুন্নি, আমরা সকলে এক আল্লাহর বান্দা। আমরা এক কুরআনের অনুসারী। আমরা এক নবীর উম্মত।
পার্থক্যের দেয়াল ভেঙে ইসলামের শান্তি ছড়িয়ে দিই। শিয়া-সুন্নি ঐক্য আমাদের শক্তি। এই ঐক্য আমাদের উম্মাহকে আরও সমৃদ্ধ করবে। আসুন, কুরআনের বার্তা অনুসরণ করি। একত্রে কাজ করে ইসলামের ভ্রাতৃত্বকে উজ্জ্বল করি।
অনুরোধ!! পোষ্ট ভালো লাগলে প্লিজ উপরের শেয়ার আইকনে ক্লিক করে পোষ্টটি শেয়ার করে দিন।
