হজ কী এবং কেন পালন করা হয়?

হজ কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক মিলনমেলা। প্রতিবছর বিশ্বের আনাচে-কানাচে থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ মুসলিম একত্রিত হন সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায়। আজ আমরা একদম সহজ ভাষায় জানবো এই বিশেষ আধ্যাত্মিক সফর—হজ সম্পর্কে।
হজ কী?
ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে হজ অন্যতম। ‘হজ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো কোনো পবিত্র স্থানে যাওয়ার সংকল্প করা বা জিয়ারত করা।
ইসলামী নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেক শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ এবং সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর জীবনে অন্তত একবার হজ পালন করা ফরজ বা আবশ্যক। এটি সাধারণত আরবি হিজরি সনের শেষ মাস জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে পালন করা হয়।
হজের আদি ইতিহাস
যদিও আমরা বর্তমানে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দেখানো পদ্ধতিতে হজ করি, তবে হজের প্রচলন হয়েছিল অনেক আগে। আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) পবিত্র কাবা ঘর পুনর্নির্মাণ করেন। এরপর থেকেই মূলত হজের সূচনা হয়। পরবর্তীতে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর ‘বিদায় হজের’ মাধ্যমে আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন কীভাবে সঠিক নিয়মে হজ পালন করতে হয়।
হজের নিয়ম ও প্রস্তুতি
হজ পালনের জন্য কিছু বিশেষ নিয়ম এবং ধাপ রয়েছে। চলুন এক নজরে দেখে নেই-
১. এহরাম ও তালবিয়া
হজের প্রথম কাজ হলো এহরাম বাঁধা। এর বিশেষ চিহ্ন হলো সেলাইবিহীন দুটি সাদা চাদর। এই পোশাক পরে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই সমান হয়ে যায়। এহরাম বাঁধার পর হাজীরা উচ্চস্বরে একটি দোয়া পড়েন, যাকে বলা হয় তালবিয়া:
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক…” (অর্থ: হে আল্লাহ, আমি হাজির! আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির!)
২. হজের তিন প্রকার
হজ করার পদ্ধতি অনুযায়ী একে তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
- হজে ইফরাদ: শুধুমাত্র হজের নিয়তে এহরাম করা।
- হজে কিরান: হজ ও ওমরাহ উভয়ের জন্য একসাথে এহরাম করা।
- হজে তামাত্তু: প্রথমে উমরার জন্য এহরাম করা এবং পরে আবার নতুন করে হজের জন্য এহরাম বাঁধা।
হজের মূল ৫টি দিনের কার্যক্রম
৮ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত হাজীদের অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটে। নিচে সংক্ষেপে ধাপগুলো দেওয়া হলো:
- ৮ জিলহজ (মিনা): হাজীরা মক্কা থেকে ৫ কিমি দূরে তাঁবুর শহর মিনায় গিয়ে অবস্থান করেন।
- ৯ জিলহজ (আরাফাত ও মুজদালিফা): এটি হজের প্রধান দিন। হাজীরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন। সূর্যাস্তের পর তারা মুজদালিফায় গিয়ে রাত কাটান এবং শয়তানকে মারার জন্য পাথর সংগ্রহ করেন।
- ১০ জিলহজ (কুরবানি ও পাথর নিক্ষেপ): মিনায় ফিরে বড় শয়তানকে পাথর মারা হয়। এরপর পশু কুরবানি দিয়ে মাথার চুল ফেলে এহরাম খোলা হয়। এদিন কাবা ঘর তাওয়াফ করাও হজের অংশ।
- ১১ ও ১২ জিলহজ: এই দুই দিন পর্যায়ক্রমে শয়তানের তিনটি স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করতে হয়।
হজ নিয়ে কিছু জানা-অজানা তথ্য
হজ পালন করতে আসা মানুষদের সংখ্যা এবং এর ব্যবস্থাপনা সত্যিই বিস্ময়কর। নিচে একটি সারণির মাধ্যমে কিছু তথ্য দেওয়া হলো-
হজে অংশগ্রহণকারী শীর্ষ দেশসমূহ
| অবস্থান | দেশের নাম |
| ১ম | ইন্দোনেশিয়া |
| ২য় | পাকিস্তান |
| ৩য় | ভারত |
| ৪র্থ | মিশর |
| ৫ম | বাংলাদেশ |
একটি মজার তথ্য: খনিজ তেলের পরেই সৌদি আরবের আয়ের বড় উৎস হলো হজ ও পর্যটন। পর্যটন খাত থেকে সৌদি আরব বছরে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা আয় করে, যার অর্ধেকই আসে হজ থেকে।
মদিনায় যাওয়ার গুরুত্ব
অনেকে মনে করেন মদিনায় যাওয়া হজের অংশ, আসলে তা নয়। তবে হজের আগে বা পরে রাসূল (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারত করতে মদিনায় যাওয়া এবং মসজিদে নববীতে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসূল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা থেকে হাজীরা সেখানে অবশ্যই যাওয়ার চেষ্টা করেন।
বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ: সেলফি ও বিশৃঙ্খলা
হজ হলো একাগ্র মনে আল্লাহর ইবাদত করার জায়গা। কিন্তু বর্তমানে অনেক হাজী ইবাদত ছেড়ে দিয়ে সেলফি তোলা বা ভিডিও করায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ইসলামী পণ্ডিতগণ একে ‘নীরব বিশৃঙ্খলা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। পবিত্রতা বজায় রাখতে সৌদি কর্তৃপক্ষ বর্তমানে কিছু বিশেষ জায়গায় ছবি তোলা নিষিদ্ধ করেছে এবং নিয়ম ভাঙলে ক্যামেরা বা মোবাইল বাজেয়াপ্ত করার আইন করেছে।
শেষ কথা
হজ হলো ত্যাগের শিক্ষা। মা হাজেরা (আ.) এবং শিশু ইসমাইল (আ.)-এর সেই কষ্টের স্মৃতি বিজড়িত সাফা-মারওয়া পাহাড় এবং জমজম কূপ আজও আমাদের সেই ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। জমজমের পানি আজও পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ পানি হিসেবে পরিচিত।
প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলিমের স্বপ্ন থাকে জীবনে একবার হলেও আল্লাহর ঘর স্পর্শ করা। এই সফর যেমন কষ্টের, তেমনি এর আত্মিক শান্তি অপরিসীম।
আপনি কি হজের এই বিস্তারিত তথ্যগুলো আগে জানতেন? কমেন্টে আমাদের জানান এবং এই পোস্টটি শেয়ার করে অন্যদেরও জানার সুযোগ করে দিন।




