আজানের জবাব ও দোয়াঃ আজানের জবাব না দিলে কি গুনাহ হবে? আযানের দোয়া বাংলা অর্থসহ

নিম্নে আজানের জবাব ও দোয়াঃ আজানের জবাব না দিলে কি গুনাহ হবে? আযানের দোয়া বাংলা অর্থসহ প্রভৃতি বিষয়াদি সুন্দর ও সহজভাবে উপস্থাপন করা হলো-
(১) আজানের জবাব না দিলে কি গুনাহ হবে?
আযানের জবাব দেওয়া মোস্তাহাব (উত্তম ও পুণ্যের কাজ) হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়। শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে, আযানের জবাব না দিলে কোনো গুনাহ হয় না, কারণ এটি বাধ্যতামূলক নির্দেশ নয়। তবে, আযানের জবাব দেওয়া একটি সুন্নত আমল এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও সওয়াব লাভ করা যায়।
যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বা অলসতার কারণে আযানের জবাব না দেয়, তবে সে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে, কিন্তু এটি গুনাহের কারণ হবে না। তবে, নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে আযানের জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকা শরীয়তসম্মত:
- নামাযের সময়।
- খুতবার সময় (জুমু’আর খুতবা বা বিবাহের খুতবা)।
- হায়েয বা নেফাসের অবস্থায়।
- দ্বীনী ইলম শেখা বা শেখানোর সময়।
সুতরাং, আযানের জবাব দেওয়া উত্তম আমল হলেও, না দেওয়ার কারণে গুনাহ হয় না। তবে, এই আমল পালনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক উপকার ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়।
(২) আজানের জবাব দেওয়া কি?
আযান ও ইকামতের জবাব দেওয়া ইসলামী শরীয়তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মোস্তাহাব আমল। নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-
- মোস্তাহাব আমল: আযান ও ইকামতের জবাব দেওয়া নারী-পুরুষ সকলের জন্য মোস্তাহাব। মসজিদের ভিতরে বা বাইরে থাকা ব্যক্তি, পাক-নাপাক অবস্থায় থাকা সকলের জন্যই এটি মোস্তাহাব। তবে, ঋতুবতী (হায়েয অবস্থায়) এবং নেফাসওয়ালী (প্রসবোত্তর রক্তস্রাবের অবস্থায়) মহিলাদের জন্য আযানের জবাব দেওয়ার কোনো হুকুম নেই।
- মৌখিক ও ব্যবহারিক জবাব:
- যারা মসজিদের বাইরে আছেন, তাদের জন্য মৌখিক জবাব (ইজাবাত বিল্লিছান) দেওয়ার পাশাপাশি মসজিদে গিয়ে জামা’আতে নামাযে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ব্যবহারিক জবাব (ইজাবাত বিল কদম) দেওয়া জরুরি।
- অপারগতার ক্ষেত্রে (যেমন অসুস্থতা বা অন্য কোনো ওজর) শুধু মৌখিক জবাব দেওয়াই যথেষ্ট।
- একাধিক আযানের ক্ষেত্রে: যদি একাধিক স্থান থেকে আযান শোনা যায়, তবে প্রথমে যে আযান শোনা যায় (নিজের মহল্লার হোক বা অন্য মহল্লার) তার জবাব দেওয়াই যথেষ্ট। তবে সম্ভব হলে সব আযানের জবাব দেওয়া উত্তম।
- জুমু’আর দ্বিতীয় আযান: জুমু’আর ছানী (দ্বিতীয়) আযানের জবাব মৌখিকভাবে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে মনে মনে (উচ্চারণ ছাড়া) জবাব দেওয়া যায়।
- বিলম্বে জবাব দেওয়া: যদি কেউ আযানের সময় জবাব দিতে না পারে এবং বেশি সময় অতিবাহিত না হয়, তবে পরে জবাব দিতে পারে।
- উযূর সময়: উযূ করার সময় আযান হলে উযূ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আযানের জবাব দেওয়া যাবে।
(৩) কোন অবস্থায় আযানের জবাব দেওয়া উচিত নয়?
কিছু নির্দিষ্ট অবস্থায় আযানের জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এগুলো হলো-
- নামাযের সময়: নামাযে থাকা অবস্থায় আযানের জবাব দেওয়া যাবে না।
- খুতবার সময়: জুমু’আর খুতবা বা বিবাহের খুতবার সময় আযানের জবাব দেওয়া উচিত নয়।
- হায়েয অবস্থায়: ঋতুবতী মহিলারা আযানের জবাব দেবেন না।
- নেফাসের অবস্থায়: প্রসবোত্তর রক্তস্রাবের সময়ও আযানের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
- দ্বীনী ইলম শেখা বা শেখানোর সময়: শরীয়তের মাসআলা-মাসায়েল শেখা বা শেখানোর সময় আযানের জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে, কুরআন তিলাওয়াতের সময় আযান হলে তিলাওয়াত বন্ধ করে আযানের জবাব দেওয়া উত্তম।
(৪) আযানের জবাব দেওয়ার পদ্ধতি
আযানের প্রতিটি বাক্যের জবাব হিসেবে মুয়াজ্জিন যা বলেন, শ্রোতাও তাই বলবেন। তবে, নিম্নলিখিত বাক্যগুলোর ক্ষেত্রে ভিন্ন জবাব দেওয়া হয়-
- আযানের সময় যখন: حي على الصلاة এবং حي على الفلاح
বাংলা উচ্চারণ: হাইয়্যা ‘আলাস সালাহ, হাইয়্যা ‘আলাল ফালাহ
জবাব: لا حول ولا قوة إلا بالله
বাংলা উচ্চারণ: লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ
অর্থ: আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই। - ইকামতের সময় যখন: قد قامت الصلاة
বাংলা উচ্চারণ: ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ
জবাব: أقامها الله وأدامها
বাংলা উচ্চারণ: আক্বামাহাল্লাহু ওয়া আদামাহা
অর্থ: আল্লাহ নামাযকে কায়েম করুন এবং তাকে চিরস্থায়ী করুন।
(৫) আযানের দোয়া বাংলা অর্থসহ
আযানের বাক্যগুলোর জবাব দেওয়ার পর দরূদ শরীফ পড়া মোস্তাহাব। এরপর নিম্নোক্ত দোয়া পড়া উত্তম-
দোয়া ১:
اللهم رب هذه الدعوة التامة والصلوة القائمة آت محمدا الوسيلة والفضيلة وابعثه مقاما محمودا الذي وعدته إنك لا تخلف الميعاد
অর্থ: হে আল্লাহ! এই পরিপূর্ণ আহ্বান ও অনুষ্ঠিতব্য নামাযের রব, তুমি মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে দান কর ওসীলা ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাঁকে পৌঁছাও মাকামে মাহমূদে (প্রশংসনীয় স্থানে) যার ওয়াদা তুমি তাঁর সাথে করেছ। নিশ্চয়ই তুমি ওয়াদা ভঙ্গ করো না।
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বা হাযিহিদ দা’ওয়াতিত তাম্মাতি ওয়াস সালাতিল কায়িমাতি, আতি মুহাম্মাদানিল ওয়াসীলাতা ওয়াল ফাযীলাতা, ওয়াব’আছহু মাকামাম মাহমূদানিল্লাযী ওয়া’আদতাহু, ইন্নাকা লা তুখলিফুল মী’আদ।
দোয়া ২:
وأنا أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له وأشهد أن محمدا عبده ورسوله رضيت بالله ربا وبالإسلام دينا وبمحمد صلى الله عليه وسلم رسولا
অর্থ: আর আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা’বূদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। এবং আমি এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমি সন্তুষ্ট আল্লাহর প্রতি রব হিসেবে, ইসলামের প্রতি দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর প্রতি রাসূল হিসেবে।
বাংলা উচ্চারণ: ওয়া আনা আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদা-হু লা শারীকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান ‘আবদুহু ওয়া রাসূলুহু, রাযীতু বিল্লাহি রাব্বান, ওয়াবিল ইসলামি দীনান, ওয়া বিমুহাম্মাদিন সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামা রাসূলান।
দ্রষ্টব্য: এই দোয়া পড়ার সময় হাত উঠানোর কোনো প্রমাণ শরীয়তে পাওয়া যায় না।
(৬) আযানের সময়কার বিশেষ কিছু আমল
আযানের সময় কিছু বিশেষ আমল পালন করা উত্তম। এগুলো হলো-
- চুপ থাকা: আযানের সময় বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কথা-বার্তা না বলাই মোস্তাহাব। নীরব থেকে আযানের প্রতি মনোযোগ দেওয়া উচিত।
- ইস্তেঞ্জা এড়িয়ে চলা: আযান শুরু হলে ইস্তেঞ্জায় লিপ্ত হওয়া বা ইস্তেঞ্জাখানায় প্রবেশ করা উচিত নয়। তবে, নামাযের জামা’আত ভঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা বা বিশেষ কোনো ওজর থাকলে ভিন্ন কথা।
- মনোযোগের সাথে শোনা: আযানের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া এবং এর বাক্যগুলো মনে মনে অনুসরণ করা উত্তম।
আযান ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান, যা মুসলিমদের নামাযের জন্য প্রস্তুতি নিতে উদ্বুদ্ধ করে। আযানের জবাব দেওয়া এবং এর পরবর্তী দোয়া পড়া মুমিনের জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি মাধ্যম। এই আমলগুলো সঠিকভাবে পালন করলে আমাদের ইবাদত আরও পরিপূর্ণ হয় এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভ করা যায়।


