আল্লাহ কেন শয়তান সৃষ্টি করলেন?

আল্লাহ কেন শয়তান সৃষ্টি করলেন? (একটি সহজ উত্তর)
আমাদের অনেকের মনেই মাঝেমধ্যে একটা প্রশ্ন জাগে—আল্লাহ তো সবকিছুই ভালোর জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাহলে তিনি ‘শয়তান’ কেন সৃষ্টি করলেন? শয়তান যদি না থাকতো, তাহলে তো কেউ পাপ করতো না, সবাই জান্নাতে যেত! আল্লাহ কেন এমন কাউকে বানালেন যে মানুষকে জাহান্নামের পথে নিয়ে যায়?
আসুন, খুব সহজ করে এই প্রশ্নের উত্তরটা খোঁজার চেষ্টা করি।
১. শয়তান কি জন্ম থেকেই খারাপ ছিল?
না। আল্লাহ কাউকে জোর করে ‘শয়তান’ বা খারাপ হিসেবে তৈরি করেননি। ‘শয়তান’ আসলে কোনো জাতির নাম নয়, এটি একটি বৈশিষ্ট্য। এর অর্থ হলো ‘বিদ্রোহী’ বা ‘অবাধ্য’।
মানুষের মতো জিনদেরও (ইবলিস জিন জাতিরই একজন) আল্লাহ ‘ইচ্ছাশক্তি’ বা স্বাধীনতা দিয়েছেন। সে চাইলেই ভালো কাজ করতে পারে, আবার চাইলেই খারাপ কাজ করতে পারে। ইবলিস নিজের ইচ্ছায় অহংকার করেছিল এবং আল্লাহর হুকুম অমান্য করে খারাপ পথ বেছে নিয়েছিল। অর্থাৎ, আল্লাহ তাকে খারাপ বানাননি, সে নিজের কর্মের দোষে শয়তান হয়েছে।
২. আলোর মর্ম বোঝার জন্য অন্ধকারের প্রয়োজন
একটা সহজ উদাহরণ দিই। পৃথিবীতে যদি অন্ধকার না থাকত, আমরা কি আলোর গুরুত্ব বুঝতাম? যদি অসুস্থতা না থাকত, তাহলে সুস্বাস্থ্যের কদর কি কেউ করত? ঠিক তেমনই, মন্দ বা খারাপ আছে বলেই ভালোর এত মর্যাদা।
আল্লাহ শয়তানকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে আমরা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারি। ফেরেশতারা কখনোই পাপ করে না, তাই তাদের কোনো পরীক্ষা নেই। কিন্তু মানুষের সামনে শয়তানের প্রলোভন আছে। এই প্রলোভন বা লোভ সংবরণ করে যারা আল্লাহর কথা মানে, তাদের মর্যাদা ফেরেশতাদের চেয়েও বেশি।
৩. জীবনটা একটা পরীক্ষার হল
পৃথিবীটা আমাদের জন্য একটা পরীক্ষার হল। যদি পরীক্ষার হলে কোনো কঠিন প্রশ্নই না থাকে, তবে ভালো ছাত্র আর খারাপ ছাত্রের পার্থক্য বোঝা যাবে কীভাবে?
শয়তান হলো সেই কঠিন প্রশ্ন বা বাধার মতো।
- সে আমাদের মনে খারাপ চিন্তা দেয়।
- পাপ কাজকে আমাদের সামনে চকচকে করে দেখায়।
এখন এই বাধার মুখে আমরা কী করি—সেটাই আল্লাহ দেখতে চান। আমরা কি শয়তানের ধোঁকায় পড়ব, নাকি যুদ্ধ করে আল্লাহর পথে থাকব? এই সংগ্রামের নামই ইবাদত। শয়তান আছে বলেই আমাদের ইমানের পরীক্ষা হয় এবং এই পরীক্ষায় পাস করলেই পুরস্কার হিসেবে আছে জান্নাত।
৪. ভুল করে ফিরে আসার সৌন্দর্য
মানুষ মাত্রই ভুল করে। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে অনেক সময় আমরা পাপ করে ফেলি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই ভুলের কারণেই আমরা আবার আল্লাহর কাছে নত হই, কাঁদি এবং ক্ষমা চাই।
আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ক্ষমা করতে খুব ভালোবাসেন। হাদিসে আছে, মানুষ যখন পাপ করার পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তখন ভীষণ খুশি হন। শয়তান না থাকলে এই ‘তওবা’ বা ফিরে আসার সুযোগটা থাকত না, আর আমরা আল্লাহর দয়ার সাগরে ভাসতে পারতাম না।
৫. শয়তানের ক্ষমতা কতটুকু?
অনেকে ভাবেন শয়তান বুঝি আমাদের জোর করে পাপ করায়। এটা ভুল ধারণা।
শয়তানের কোনো ক্ষমতা নেই আপনাকে দিয়ে জোর করে কিছু করানোর। সে শুধু ‘কুমন্ত্রণা’ বা ‘ওয়াসওয়াসা’ দিতে পারে। অনেকটা একজন বাজে বন্ধুর মতো, যে আপনাকে খারাপ কাজে উসকানি দেয়। কিন্তু কাজটা করবেন কি না—সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আপনার।
কিয়ামতের দিন শয়তান পরিষ্কার বলে দেবে— “আমার কোনো দোষ নেই, আমি শুধু তোমাকে ডেকেছি, তুমি আমার ডাকে সাড়া দিয়েছ। আজ আমাকে দোষ দিও না।”
শেষ কথা
শয়তান সৃষ্টি করা হয়েছে আমাদের পরীক্ষা করার জন্য। সে আমাদের প্রকাশ্য শত্রু। আল্লাহ আমাদের আগেই সাবধান করে দিয়েছেন তার ফাঁদ সম্পর্কে।
তাই শয়তান আছে বলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আমাদের কাজ হলো তার ধোঁকা থেকে বাঁচতে সব সময় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। মনে রাখবেন, যেই আল্লাহ শয়তানকে সৃষ্টি করেছেন, সেই আল্লাহই আপনাকে শয়তানের চেয়ে হাজার গুণ বেশি শক্তি (ইমান ও বুদ্ধি) দিয়েছেন তাকে পরাজিত করার জন্য।









