ডোল পদ্ধতিতে কাঁচা ঘাস সংরক্ষণের পদ্ধতি বা সাইলেজ তৈরির উপায়

প্রকাশক: বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট
স্থান: সাভার, ঢাকা-১৩৪৩

(১) ভূমিকা
আমাদের দেশে গবাদিপশু উৎপাদনের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে খাদ্য সংকট। বর্ষাকালে প্রাকৃতিক দেশী ঘাস পর্যাপ্ত পাওয়া গেলেও শুকনো মৌসুমে ঘাসের সংকট দেখা যায়। তাই এই সময়ে অধিক পরিমাণ উৎপাদিত ঘাস সংরক্ষণ করে রাখলে সারাবছর পশুকে সরবরাহ করা যায়। কাঁচা ঘাস দিয়ে সাইলেজ তৈরীর প্রযুক্তিটি ইতোমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কিন্তু কম খরচে তা সংরক্ষণের যথাযথ প্রযুক্তি উদ্ভাবন না হওয়ায় খামারীরা প্রযুক্তিটির শুভভাগ সুফল থেকে এখনও বঞ্চিত। খামারীদের চাহিদার আলোকে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) দীর্ঘদিন যাবৎ এই সমস্ত প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। সাইলেজ সংরক্ষণের অনেক পদ্ধতি নিয়ে গবেষণার পরে দেখা গেছে যে, গ্রামীণ পর্যায়ে সবচেয়ে সাশ্রয়ে যে প্রযুক্তির মাধ্যমে সাইলেজ সংরক্ষণ করা যায় সেটি হচ্ছে “ডোল সাইলেজ”। গ্রামীণ পর্যায়ে সাধারণতঃ কৃষকরা ধান সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরী যে ডোল ব্যবহার করে থাকে সেটি দিয়েই কম খরচে সাইলেজ তৈরী করা যায়।
(২) সাইলেজ কি?


সাধারণভাবে বায়ুরোবৈক অবস্থায় সংরক্ষিত সবুজ ঘাস বা গাঁজনকৃত সবুজ ঘাসকে সাইলেজ বলে। বায়ুহীন পরিবেশে পর্যাপ্ত অদ্রিত্যযুক্ত (৬০-৬৫%) ফরেজ বা সবুজ ঘাসকে সংরক্ষণ করলে এতে কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে এবং এই প্রক্রিয়া বা পরিবর্তন ঘটানোর প্রক্রিয়াকে এনসাইলিং বলে। সাইলেজ তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য হলো, যে মৌসুমে সবুজ ঘাসের আধিক্য বেশী থাকে, সে মৌসুমে সাইলেজ প্রস্তুত করা এবং সবুজ ঘাসের অভাবের সময় গবাদি পশুকে তার সরবরাহ নিশ্চিত করা। এতে কাঁচা ঘাসের অপায় কম হয় এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। যদিও সাইলেজ পুষ্টিমান তার ঘাসের উপর এবং কোন্ অবস্থায় কাটা হচ্ছে, মাটির আদ্রতার উপর নির্ভর করে তথাপিও নিম্নে নেপিয়ার ঘাসের পুষ্টিমান দেয়া হলোঃ
(৩) সাইলেজের পুষ্টিমান (নেপিয়ার ঘাস)
| ক্র. নং | পুষ্টি শুপাশুণ | পুষ্টিমান |
|---|---|---|
| ০১ | শুক উপাদান (%) | ১৭.৫০ |
| ০২ | জৈব উপাদান (%) | ৮৮.২৫ |
| ০৩ | অমোধিত আমিষ (%) | ১০.২০ |
| ০৪ | ছাই (%) | ১১.৫৬ |
| ০৫ | এডিএফ (%) | ৪৬.৫০ |
(৪) সাইলেজের উপকারিতা
বর্ষা মৌসুমে কাটা ঘাস সংরক্ষণ বরা কঠিন কিন্তু সাইলেজ সহজেই করা সম্ভব, যা অত্যন্ত সুস্বাদু ও ল্যাকটিক এসিড সমৃদ্ধ খাদ্য এবং আমিষ ও ভিটামিনের উৎসও বটে।
(৫) সাইলেজ তৈরীর উপযোগী ঘাস বা ফডার
সাইলেজ তৈরী করার জন্য সাধারণতঃ কম নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ ফড়ার বা সবুজ ঘাস (যেমন, ওট, ভুটা, ঘোয়ার, নেপিয়ার সবচেয়ে বেশী উপযোগী। তবে অধিক নাইট্রোজেন যুক্ত সবুজ ঘাস (যেমন, বারশিম, লুসার্ণ, কাউপি কিংবা মাটি কালাই জাতীয় দিয়েও সাইলেজ তৈরী করা যেতে পারে। তবে এসব ঘাসের ক্ষেত্রে অন্য ঘাস বা খড় স্তরে স্তরে সাজিয়ে সাইলেজ করা যায়।
(৬) ডোল সাইলেজ তৈরীর পদ্ধতি
আমাদের দেশের যে সমস্ত কৃষক ক্ষুদ্র আকারের ডেইরী খামার পরিচালনা করেন তাদের জন্য ডোল-পদ্ধতি খুবই উপযোগী। এই পদ্ধতিতে একজন কৃষক তার প্রয়োজনের তাগিতে ৮০ কেজি থেকে ১,০০০ কেজি আকারের ডোল সাইলো তৈরী করতে পারেন।
এ ধরনের ডোল সাইলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অতি সহজেই স্থানান্তর করা যায়। এ পদ্ধতিতে কৃষকের নিজস্ব কোন গবাদি পশু না থাকলেও তিনি তার নিজস্ব জমিতে শুধু ঘাস উৎপাদন এবং ডোল সাইলো করে সংরক্ষিত সাইলেজ বাজারে বিক্রি করতে পারবেন। কেননা ডোল সাইলো অতি সহজেই পরিবহন করা যায়। মাটির গর্তে সাইলেজ তৈরীর যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, ডোল পদ্ধতিতে ঠিক একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়ে থাকে। ডোল পরিপূর্ণ করার পর ভালভাব মুখ বেধে রাখতে হবে।
ডোল চার প্রকারে তৈরী ও সংরক্ষণ করা যায় যথাঃ (১) হাট-বাজারে বাঁশের তৈরী ধান রাখার যে গোলাকার ডোল পাওয়া যায় সেটির ভেতরে পলিথিন মুড়িয়ে বায়ুরোধক করে, (২) একই ডোলের ভেতরে পলিথিন মুড়িয়ে এবং বাহিরে মাটি, তুম ও গোবরের প্রলেপ দিয়ে বায়ুরোধক করে, (৩) প্লাস্টিক কন্টেইনার (ড্রাম) এবং (৪) শুধু পলিথিনের ডোল তৈরী করে সংরক্ষণ। তবে সাইলো তৈরীর খরচ, ব্যবহারের স্থায়িত্ব কাল ও গুলগত মান বিবেচনা করে দেখা গেছে যে, প্রথম পদ্ধতিটিই গ্রামিন খামারী পর্যায়ে সাধুবী পদ্ধতি। যে ঘাসের সাইলেজ প্রস্তুত করা হবে, তা প্রথমে টুকরা টুকরা (গ্রাম ৩-৪ ইঞ্চি পরিমাণ) কেটে নিতে হবে। সাইলোতে (সেখানে সাইলেজ সংরক্ষণ করা হবে) ঘাস দেওয়ার পূর্বে সেটা পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে দিতে হবে এবং নীচে ৩-৪ ইঞ্চি পুরু করে খড় বিছাতে হবে। টুকরা টুকরা করা সবুজ ঘাস সাইলোর মধ্যে স্তর স্তরে সাজাত হবে যেন ভিতরে বাতাস না থাকে। ফড়ার বা ঘাস যত বেশী চেপে সাইলোতে রাখা যাবে, সাইলেজ তত বেশী উন্নত মানের হবে। সাইলেজ লালীগুড়/চিটাগুড় সহ অথবা ছাড়াও করা যেতে পারে। চিটাগুড় ব্যবহার করলে, সুবজ ঘাসের শতকরা ৩-৪ ভাগ চিটাগুড় মেপে একটি চাড়িতে নিতে হবে। তারপর ঘন চিটাগুড়ের মধ্যে ১৯১ অথবা পাতলা করে ৪৯৩ পরিমাণে পানি মিশালে ইহা ঘাসের উপর ছিটানোর উপযোগী হবে। ঝরনা বা হাত দ্বারা ছিটিয়ে এ মিশ্রণ ঘাসে সমভাবে মিশানো যাবে। প্রতি পরতে (স্তরে) পরতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘাসের জন্য পূর্বের হিসেবে যতটুকু চিটাগুড় লাগবে তা নিয়ে তা পরিমাণমত পানিতে মিশিয়ে উক্ত মিশ্রণ ঝরনা বা হাত দিয়ে সমভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে। সবুজ ঘাসের সাথে শুকনো খড় ব্যবহার করলে এক স্তর কাঁচা ঘাস এবং এক স্তর খড় দিতে হবে। উপরের নিয়মে প্রতি ১০০ কেজি সবুজ ঘাসের সাথে ৫ কেজি খড় দিতে হবে এবং ঘাস সাজানোর পর চিটাগুড় দিতে হবে। খড়ের মধ্যে কোন মোলাসেস বা চিটাগুড় দিতে হবে না। যতটা সম্ভব ভালভাবে পা দিয়ে পাড়িয়ে/মাড়িয়ে ভাল ভাবে আট সাট করে ভিতরের বাতাস বের করে দিতে হবে। সবুজ ঘাস যত এঁটে সাজানো যাবে সাইলেজ তত সুন্দর হবে এবং বেশি দিন সংরক্ষণ করা যাবে। সাইলো ভর্তি হলে মুখের উপরে ৪-৫ ইঞ্চি পর্যন্ত খড় সাজাতে হবে। সব শেষে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। পলিথিন দিয়ে ঢাকার পর ৩-৪ ইঞ্চি পুরু করে মাটি দিতে হবে যাতে বাতাসে উড়ে না যায় বা অন্য কোন পশু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, সাইলো একদিনেই সাজানো ভাল। তবে একদিনে বৃষ্টি অথবা অন্য কোন কারণে সাজানো সম্ভব না হলে প্রতিদিন অল্প অল্প করেও ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে এ কাজটি সমাধা করতে হবে।
(৭) সাইলেজ তৈরীর সময় যে বিষয় খেয়াল রাখা উচিত
উপরের পলিশিং সুন্দরভাবে এঁটে দিতে হবে যাতে কোন পানি “সাইলেজ” এর ভিতরে প্রবেশ করতে না করে। টিটোঁড় পাতলা হলে পরিমাণ বাড়িয়ে পানি কম করে মিশাতে হবে অর্থাৎ এমনভাবে দ্রবণ তৈরী করতে হবে যাতে আঠার মত ঘাসের গায়ে লেগে থাকে। ঘাস এবং খড় এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে ফাঁকা জায়গাগুলো যথাসম্ভব বন্ধ হয়ে যায়।
(৮) প্রয়োজনে সাইলেজে এডিটিভ বা খিজারডেটিভ সংযোজন
সাইলেজের পুষ্টিমান ও সংরক্ষণ গুণাবলী বৃদ্ধির জন্য নিম্নলিখিত হারে যে কোন এডিটিভ বা খিজারডেটিভ ব্যবহার করা যায়।
লালীগুড়: ৩-৪ %, ইউরিয়া: ০.৫%, লাইমস্টোন: ০.৫-১%, তৈব এসিড: ১%, ব্যাটেরিয়াল কালচার: প্রয়োজন মত।
(৯) ভাল সাইলেজের বৈশিষ্ট্য
হলুদাত সবুজ ও আচারের ন্যায় অল্প সুগন্ধ বিশিষ্ট, পিএইচ ৩.৫-৪.৫।
(১০) গো-খাদ্য হিসেবে সাইলেজের ব্যবহার
গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১০০ কেজি ওজনের একটি ঘাঁড় দৈনিক গড়ে তার দৈহিক ওজনের ১.৯২ হারে সাইলেজ শুরুপদার্থ গ্রহন করে থাকে। দুধাল গাভী প্রতিদিন কি পরিমান দুধ উৎপাদন করে তার উপর ভিত্তি করে সাইলেজ সরবরাহ করতে হয়। সাইলেজ এককভাবে কিংবা কাঁচা ঘাস অথবা শুকনা খড়ের সাথে গবাদি পশুকে খাওয়ানো যেতে পারে। সাধারণ নিয়মে দুই ভাগ সাইলেজ এর সাথে এক ভাগ কাঁচা ঘাস ও এক ভাগ খড় মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।
(১১) ডোল সাইলেজের আর্থিক মূল্যায়ন
| খরচের খাত সমূহ | টাকা |
|---|---|
| ঘাসের পরিমাণ (১০০০ কেজি) | |
| প্রতি কেজির উৎপাদন মূল্য ০.৭৫ টাকা হিসাবে ঘাসের মূল্য (টাকা) | ৭৫০/- |
| প্রমিক খরচ (টাকা) | ৪৫০/- |
| ম্যাটেরিয়াল ক্রয় খরচ (টাকা) | ১৫২৫/- |
| ১০০০ কেজি সাইলেজ তৈরীতে সর্বমোট খরচ | ২৭২৫/- |
বিঃদ্রঃ প্রতি কেজি সাইলেজ তৈরীর খরচ ২.৭৫ টাকা
(১২) উপসংহার
আমাদের দেশে কাঁচা ঘাসের অভাবের সময় তোল সাইলেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্যবক:
ড. নাশু রাম সরকার
মোঃ রুকুল আমিন
যুগরাহ তাবাসসুম
ড. মোঃ আহসান হাবীব
দিলরুবা ইয়াসমিন
ড. মোঃ জিবুর রহমান
শিউলি ইয়াসমিন
গবেষণা সমন্বয়কারী:
ড. নাশু রাম সরকার, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, সাভার, ঢাকা।
যোগাযোগের তথ্য:
প্রকাশনা নং-২৪২
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট
সাতার, ঢাকা-১৩৪১, ফোন: ৭৭৯১৬৭০-২, ফ্যাক্স: bbro-২-৭৭৯১৬৭৫
ই-মেইল: [email protected], web: www.blri.gov.bd






