নেপিয়ার ঘাস চাষ ও ব্যবসা

(১) নেপিয়ার ঘাসের পরিচিতি
বাংলাদেশে চাষকৃত পশুখাদ্যের মধ্যে নেপিয়ার ঘাস উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় নেপিয়ার ঘাস খুব ভালো জন্মে। কচি অবস্থায় এর পুষ্টিমান বেশি থাকে। এ ঘাস একবার রোপণ করলে ৪-৫ বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। বছরের যে কোনো সময় এ ঘাস চাষ করা যায়। তবে ফাল্গুন-চৈত্র মাস নেপিয়ার ঘাস চাষের জন্য ভালো সময়। পানি জমে থাকা এমন জায়গা ছাড়া বাংলাদেশের যে কোনো ধরনের মাটি, এমনকি পাহাড়ি ঢাল ও হালকা লবণাক্ত জমিতেও এ ঘাস জন্মে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে মাটিকলাই এর সাথে লাইন করে নেপিয়ার ঘাস চাষ করা যেতে পারে।
(২) নেপিয়ার ঘাস চাষ পদ্ধতি
প্রায় সব মাটিতেই এ ঘাস জন্মায় তবে উঁচু ও বেলে দোআঁশ মাটি নেপিয়ার চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রথমে জমি ভালোভাবে চাষ দিতে হয়। জমিতে ৩/৪ টি চাষ দিয়ে ভালোভাবে আগাছা পরিষ্কারের পর কাণ্ড (মুকুল বা চোখ সহ) কেটে অথবা শিকড়সহ ঘাসের ঝোঁপ মাটিতে পোঁততে হয়। সাধারণত হেক্টর প্রতি ২৫-৩০ হাজার কাটিং/ঝোঁপ প্রয়োজন হয়। কাটিং রোপণের সময় এক সারি হতে অন্য সারির দূরত্ব ১.৫-২.০ ফুট এবং এক কাটিং হতে অন্য কাটিং এর দূরত্ব ১.০-১.৫ ফুট রাখতে হয়। রোপণের পর চারার গোড়া মাটি দিয়ে শক্ত করে চাপা দিতে হয়। মাটিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে চারা লাগানোর পরপরই সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।
(৩) নেপিয়ার ঘাস চাষে সার প্রয়োগ
জমি প্রস্তুতকালে একর প্রতি ২০০০-২৫০০ কেজি গোবর সার মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এছাড়া একর প্রতি ৩৫ কেজি ইউরিয়া, ২৬ কেজি টিএসপি ও ২০ কেজি এমওপি দিলে ফলন ভালো পাওয়া যায়। প্রতিবার ঘাস কাটার পর একর প্রতি ২৬ কেজি হারে ইউরিয়া সার প্রদান করলে পরবর্তী ফলন ভালো হয়। সার প্রয়োগের আগে দুই সারির মাঝখানের মাটি ভালোভাবে লাঙ্গল অথবা কোদাল দিয়ে আলগা করে দিতে হবে।
(৪) নেপিয়ার ঘাস চাষে সেচ
বর্ষা মৌসুমে সেচের প্রয়োজন নাই, তবে শুষ্ক মৌসুমে ১৫-২০ দিন পর পর সেচ প্রদান করতে হয়।
(৫) নেপিয়ার ঘাসের পরিচর্যা
নেপিয়ার ঘাস কাটার পর গরুতে খাওয়ানো ভালো। কারণ জমিতে গরু-ছাগল চরতে দিলে মাটি শক্ত হয়ে যায় অথবা ঘাসের গোড়া আলগা হয়ে ঘাস মরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রতিবার সার প্রয়োগের আগে সম্ভব না হলে বছরে দুইবার ঘাসের সারির মাঝখানের মাটি ভালোভাবে আলগা করে দিতে হয়। এতে ঘাসের শিকড় ভালোভাবে ছড়াতে পারে এবং সহজে মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করতে পারে। পৌষ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত শীতের তীব্রতা ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে নেপিয়ারের ফলন একেবারে কমে যায়। এসময় ছাগল যাতে ঘাস নষ্ট করতে না পারে সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে।
(৬) পশুকে নেপিয়ার ঘাস খাওয়ানোর নিয়ম
ঘাস কাটার পর টুকরো টুকরো করে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়ানো যায়। এছাড়া ২-৩ ইঞ্চি করে কেটে খড়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। নেপিয়ার ঘাস শুকিয়ে সংরক্ষণ করলে পুষ্টিমান কমে যায়। তবে সাইলেজ (কাঁচা ঘাস প্রক্রিয়াজাতকরণ) আকারে সংরক্ষণ করলে পুষ্টিমান অটুট থাকে।
(৭) নেপিয়ার ঘাস চাষে আয়-ব্যয়ের হিসাব (১০০ শতক জমিতে)
স্থির খরচের উপকরণ:
| উপকরণ | প্রয়োজন | একক মূল্য | মোট ব্যয় | কত বছর টিকে | অবচয়/বছর |
|---|---|---|---|---|---|
| লাঙ্গল | ১ | ১০০০ | ১০০০ | ৫ | ২০০.০০ |
| কোদাল | ২ | ২৫০ | ৫০০ | ৫ | ১০০.০০ |
| নিড়ানি | ১০ | ৮০ | ৮০০ | ৩ | ২৬৬.৬৭ |
| মই | ১ | ১৫০ | ১৫০ | ৩ | ৫০.০০ |
| মোট | ২৪৫০ | ৬১৬.৬৭ |
স্থায়ী খরচ:
এক একর জমি লিজ নিলে খরচ হয় ১০,০০০ টাকা প্রতি বছর তাহলে মোট স্থায়ী খরচ: জমির লিজ খরচ + অবচয় = ১০,০০০ + ৬১৬.৬৭ = ১০,৬১৬.৬৭ টাকা
নেপিয়ার হতে আয়:
প্রতি একর ৬০,০০০ কেজি উৎপাদন হলে এবং প্রতি কেজি ২.০০ টাকা দরে মোট বিক্রি: ৬০,০০০ X ২.০০ = ১,২০,০০০ টাকা
মোট লাভ:
১,২০,০০০ – (২৫,৯৬০ + ১০,৬১৬.৬৭) = ৮৩,৪২৩.৩৩ টাকা, এছাড়া সাথী ফসল হিসেবে নেপিয়ার ক্ষেতে চারদিকে মিষ্টি কুমড়া লাগানো যায়।
(রোপণের সময় ৩৫ কেজি ইউরিয়া এবং রোপণের পর বছরে কমপক্ষে ৫ বার ২৬ কেজি হারে ইউরিয়া ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। তবে অন্যান্য সার একবার প্রয়োগ করলেও চলে)
চলতি খরচ:
| কাঁচা মালের বিবরণ | পরিমাণ | একক মূল্য | মোট মূল্য |
|---|---|---|---|
| কাটিং/ঝোঁপ ক্রয় | ৩০ বস্তা | ২০০.০০ | ৬০০০.০০ |
| জমি চাষ | ৩ চাষ | ৫০০.০০ | ১৫০০.০০ |
| ইউরিয়া | ১৬৫ কেজি | ১২.০০ | ১৯৮০.০০ |
| টিএসপি | ২৬ কেজি | ৮০.০০ | ২০৮০.০০ |
| এমওপি | ২০ কেজি | ৪৫.০০ | ৯০০.০০ |
| গোবর সার | ২০০০ কেজি | ১.০০ | ২০০০.০০ |
| লেবার (রোপণ) | ২০ জন | ২০০.০০ | ৪০০০.০০ |
| সেচ | – | – | ১৫০০.০০ |
| আগাছা দমন, পরিচর্যা, পরিবহন ও অন্যান্য | – | – | ৫০০০.০০ |
| মোট | ২৫,৯৬০.০০ |
(৮) প্রতি কেজি নেপিয়ার কাঁচা ঘাসের পুষ্টিমান
প্রতি কেজি কাঁচা ঘাসে ২৫০ গ্রাম শুষ্ক পদার্থ, ২৪০ গ্রাম জৈব পদার্থ, ২৫ গ্রাম প্রোটিন ও ২.০ মেগাজুল digestible energy বিদ্যমান।









