হিন্দু ধর্মগ্রন্থসমূহে বর্ণিত, বিভিন্ন হিন্দু ভগবান ও দেবতা কর্তৃক নারী ধর্ষণ, জবরদস্তি ও যৌন নিপীড়নের কাহিনী সমূহের বর্ণনা

প্রাচীন Puranic (পৌরাণিক) এবং মহাকাব্যিক সাহিত্য আক্ষরিক অর্থে পাঠ করলে সেখানে সনাতন হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন ভগবান, দেব-দেবী ও চরিত্রের অনৈতিক সম্পর্ক, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ও নৈতিক সংজ্ঞায় যা স্পষ্টতই ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন—তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়।
নিচে হিন্দু ধর্মগ্রন্থসমূহে বর্ণিত, বিভিন্ন ভগবান ও দেবতা কর্তৃক নারী ধর্ষণ, জবরদস্তি ও যৌন নিপীড়নের কাহিনী সমূহের বর্ণনা এবং প্রতিটি ঘটনার সাথে সরাসরি যুক্ত হিন্দু ধর্মগ্রন্থের (পুরাণ ও মহাকাব্য) নির্দিষ্ট খণ্ড, অধ্যায় ও শ্লোকসহ রেফারেন্স উল্লেখ করা হলো:
১. ভগবান ব্রহ্মা কর্তৃক নিজ কন্যা শতরূপাকে জবরদস্তি ও যৌন নিপীড়ন (Sexual Assault)
- সম্পর্ক: পিতা ও কন্যা
- প্রধান গ্রন্থ ও রেফারেন্স:
- মৎস্য পুরাণ (Matsya Purana): অধ্যায় ৩ এবং ৪ (এখানে ব্রহ্মার শতরূপার প্রতি আসক্তি এবং চারদিকে মুখ তৈরি করার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে)।
- শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ (Bhagavata Purana): ৩য় স্কন্ধ, দ্বাদশ (১২) অধ্যায়, শ্লোক ২৮-৩৩।
- উদ্ধৃতি/বিবরণ: ভাগবতের ৩.১২.২৮ শ্লোকে বলা হয়েছে— “কবাচং দুহিতরং তন্বীং ধৃতীং নাম কুরূদ্বহ। ব্রহ্মা তস্যামভীকর্ষাত কামবাণবশং গতঃ।।” অর্থাৎ, ব্রহ্মা নিজের কন্যা বা নিজের শরীর থেকে সৃষ্ট ‘বাক’ (সরস্বতী/শতরূপা) এর প্রতি কামাসক্ত হয়ে পড়েন। শ্লোক ৩০-৩১ এ বলা হয়েছে, মরিচীসহ ব্রহ্মার অন্য পুত্ররা তাকে এই অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান। এরপর নিন্দার মুখে ব্রহ্মা সেই শরীর ত্যাগ করেন।
২. দেবতা বিষ্ণু কর্তৃক জলন্ধরের স্ত্রী বৃন্দাকে প্রতারণামূলক ধর্ষণ (Rape by Deception)
- সম্পর্ক: উপাস্য দেবতা ও ভক্ত
- প্রধান গ্রন্থ ও রেফারেন্স:
- শিব পুরাণ (Shiva Purana): রুদ্র সংহিতা (যুদ্ধ খণ্ড), অধ্যায় ২২, ২৩ এবং ২৪।
- পদ্ম পুরাণ (Padma Purana): উত্তর খণ্ড (এখানে বৃন্দার উপাখ্যান বিস্তারিত রয়েছে)।
- উদ্ধৃতি/বিবরণ: শিব পুরাণের যুদ্ধ খণ্ডের ২৪ নম্বর অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে যে, বিষ্ণু মায়াবলে জলন্ধরের রূপ ধারণ করে বৃন্দার উদ্যানে প্রবেশ করেন। স্বামীকে জীবিত দেখে বৃন্দা তাকে আলিঙ্গন করেন। টেক্সট অনুসারে, বৃন্দা যখন বুঝতে পারেন যে তিনি ছদ্মবেশী বিষ্ণুর সাথে সহবাস করেছেন এবং তার সতীত্ব নষ্ট হয়েছে (যার ফলে তার স্বামী জলন্ধরের অমরত্ব কবচ ভেঙে যায়), তখন তিনি বিষ্ণুকে তীব্র নিন্দা করেন এবং পাথর হওয়ার অভিশাপ দিয়ে নিজে চিতার আগুনে আত্মাহুতি দেন।
৩. ভগবান শিব কর্তৃক মোহিনীকে তাড়া ও যৌন হেনস্থা/নিপীড়ন (Sexual Harassment/Assault)
- সম্পর্ক: সহ-দেবতা বা সমকক্ষ শক্তি
- প্রধান গ্রন্থ ও রেফারেন্স:
- শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ (Bhagavata Purana): ৮ম স্কন্ধ, দ্বাদশ (১২) অধ্যায়, শ্লোক ২৫ থেকে ৩৫।
- উদ্ধৃতি/বিবরণ: ভাগবতের ৮.১২.২৬-২৭ শ্লোকে বলা হয়েছে, বিষ্ণুর মায়াবী নারী রূপ (মোহিনী) দেখে শিব সম্পূর্ণ কামবিহ্বল হয়ে পড়েন। শ্লোক ৩২-এ বলা হয়েছে— “তানুভাব্য ধাবন্তীং জগৃহেঽনুপদং হরের।” অর্থাৎ, মোহিনী অনিচ্ছা প্রকাশ করে যখন পালিয়ে যাচ্ছিলেন, শিব তার পিছু পিছু দৌড়ে গিয়ে তাকে জবরদস্তি জড়িয়ে ধরেন (যেমনটি কোনো মদমত্ত হাতি হস্তিনীকে ধরে)। শ্লোক ৩৪ অনুসারে, এই ধস্তাধস্তির সময় শিবের বীর্য স্খলিত হয়ে মাটিতে পড়ে, যা থেকে পরবর্তীতে বিভিন্ন পবিত্র ধাতুর সৃষ্টি এবং আয়াপ্পার জন্মকাহিনী যুক্ত হয়।
৪. সূর্য দেব কর্তৃক তার ভক্ত কুন্তীকে জোরপূর্বক গর্ভধারণ ও যৌন নিপীড়ন (Forced Impregnation/Sexual Assault)
- সম্পর্ক: দেবরাজ ও আশ্রিত ঋষিপত্নী
- প্রধান গ্রন্থ ও রেফারেন্স:
- মহাভারত (Mahabharata): আদি পর্ব (Sambhava Parva), অধ্যায় ১১১ ও ১১২ (সংস্করণভেদে অধ্যায় ১২২)।
- মহাভারত (বন পর্ব): কুন্ডলাহরণ পর্ব, অধ্যায় ৩০০-৩০৭।
- উদ্ধৃতি/বিবরণ: মহাভারতের কুন্ডলাহরণ পর্বে বর্ণিত হয়েছে, কুমারী কুন্তী যখন সূর্যদেবকে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন, তখন সূর্যদেব বলেন যে মন্ত্রের কারণে তিনি ফিরে যেতে পারবেন না। কুন্তী যখন লোকলজ্জা ও অসম্মতির কথা বারবার বলেন, তখন সূর্যদেব তাকে অভিশাপ ও তার পিতৃকুল ধ্বংসের ভয় দেখান। অবশেষে কুন্তীর স্পষ্ট সম্মতি না থাকা সত্ত্বেও সূর্যদেব অলৌকিক উপায়ে তাকে গর্ভবতী করেন, তবে কুন্তীর অনুরোধে তার কুমারীত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার বর দেন।
৫. দেবরাজ ইন্দ্র কর্তৃক তার নিকট আশ্রিত ঋষির স্ত্রী অহল্যাকে ছদ্মবেশে প্রতারণামূলক ধর্ষণ (Rape by Deception)
- সম্পর্ক: দেবরাজ ও আশ্রিত ঋষিপত্নী
- প্রধান গ্রন্থ ও রেফারেন্স:
- বাল্মীকি রামায়ণ (Valmiki Ramayana): বাল কাণ্ড (Bala Kanda), সর্গ ৪৮, শ্লোক ১৫-২০।
- উদ্ধৃতি/বিবরণ: রামায়ণের বাল কাণ্ডের ৪৮ নম্বর সর্গের ১৭ নম্বর শ্লোকে স্পষ্ট বলা হয়েছে— “মুনিরূপং সহস্রাক্ষো বিজ্ঞায় রঘুনন্দন। মতিং চকার দুৰ্মেধা দেবেশো গৌতমস্ত্ৰিয়ম্।।” অর্থাৎ, ইন্দ্র ঋষি গৌতমের রূপ ধারণ করে কামনাবশত অহল্যার কাছে আসেন। অহল্যা প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে ছদ্মবেশ ধরতে পারেন, কিন্তু ততক্ষণে প্রতারণা সম্পন্ন হয়ে যায়। এরপর ঋষি গৌতম ফিরে এসে ইন্দ্রকে চরম অভিশাপ দেন, যার ফলে ইন্দ্রের অণ্ডকোষ পতিত হয় (শ্লোক ২৮) এবং পরবর্তীতে তিনি সারা শরীরে কুৎসিত চিহ্ন ধারণ করেন।
৬. চন্দ্রদেব সোম কর্তৃক তার গুরুর স্ত্রী তারাকে অপহরণ ও ধর্ষণ (Abduction and Rape)
- সম্পর্ক: ছাত্র/শিষ্য ও গুরুর স্ত্রী
- প্রধান গ্রন্থ ও রেফারেন্স:
- শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ (Bhagavata Purana): ৯ম স্কন্ধ, চতুর্দশ (১৪) অধ্যায়, শ্লোক ৪-১৪।
- বিষ্ণু পুরাণ (Vishnu Purana): ৪র্থ অংশ, অধ্যায় ৬।
- উদ্ধৃতি/বিবরণ: ভাগবতের ৯.১৪.৪-৫ শ্লোকে বলা হয়েছে— “স একবারং বৃহস্পতের্ভাৰ্যাং তারাং নাম যশাস্বিনীম্। জহার কামাৎ তরসা…” অর্থাৎ, চন্দ্রদেব (সোম) কামাসক্ত হয়ে বৃহস্পতির রূপবতী স্ত্রী তারাকে জোরপূর্বক অপহরণ করেন। বৃহস্পতি বারবার তার স্ত্রীকে ফেরত চাইলেও সোম ঔদ্ধত্যের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং তারাকে নিজের কাছে আটকে রেখে সহবাস করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে “তারকাময়” নামক এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।









