বেলারুশ ভিসা থাকা সত্ত্বেও কেন ফিরতে হচ্ছে এয়ারপোর্ট থেকে? ২০২৬

বর্তমানে ইউরোপের দেশ বেলারুশ নিয়ে আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে এক আতঙ্কের খবর—অনেকেই বৈধ ইনভিটেশন লেটার বা অরিজিনাল ভিসা নিয়ে বেলারুশ পৌঁছানোর পর এয়ারপোর্ট থেকেই ডিপোর্ট বা ফেরত পাঠানো হচ্ছে। ২০২৬ সালে এসে বেলারুশ যাওয়া কতটা বুদ্ধিমানের কাজ এবং সেখানে আসলে কী ঘটছে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।
১. এয়ারপোর্ট থেকে কেন ফেরত পাঠানো হচ্ছে?
বেলারুশের ভিসা প্রক্রিয়া অন্য অনেক দেশের চেয়ে আলাদা। সাধারণত আমরা অন্য দেশের ভিসা দেশ থেকে লাগিয়ে যাই, কিন্তু বেলারুশের ক্ষেত্রে আপনাকে কোম্পানি থেকে পাঠানো একটি ইনভিটেশন লেটার (Invitation Letter) নিয়ে যেতে হয়। এরপর বেলারুশ এয়ারপোর্টে পৌঁছে কনস্যুলার সেবা থেকে এক মাসের ভিসা নিয়ে ইমিগ্রেশন পার হতে হয়। সমস্যাটা ঠিক এখানেই হচ্ছে।
- ইন্টারভিউতে ব্যর্থতা: ইমিগ্রেশন অফিসাররা প্রশ্ন করেন—আপনি কেন এসেছেন? আপনার কোম্পানি কোনটি? বেতন কত? আমাদের অনেক ভাই এসব সহজ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেন না। নার্ভাস হয়ে যাওয়ার কারণে অফিসারদের মনে সন্দেহ জাগে।
- পোশাক ও উপস্থাপনা: আপনি যদি কনস্ট্রাকশন কাজের জন্য যান, কিন্তু এয়ারপোর্টে টাই-স্যুট পরে খুব বেশি ‘স্মার্টনেস’ দেখান, তবে সেটি সন্দেহজনক মনে হতে পারে। আবার অনেকে খুব অগোছালো বা উগ্র পোশাকে যান, যা অফিসারদের নেতিবাচক ধারণা দেয়।
- ফোন তল্লাশি: ইমিগ্রেশন অফিসাররা এখন মোবাইল ফোন চেক করছেন। ফোনে যদি কোনো দালালের সাথে চ্যাটিং বা অবৈধভাবে বর্ডার পার হওয়ার (গেম দেওয়া) কোনো তথ্য পাওয়া যায়, তবে সাথে সাথেই ডিপোর্ট করা হচ্ছে।
- ভুয়া নথিপত্র: অনেক অসাধু এজেন্সি একটি কোম্পানির ১০ জনের ইনভিটেশন লেটারকে এডিট করে ১৫ জনের বানিয়ে দেয়। ফলে আসল ৫ জনের সাথে বাকি ১০ জনেরও বিপদ হয় এবং সবাইকে ফেরত পাঠানো হয়।
২. বেতন ও কাজের সুযোগ
বেলারুশে মূলত কনস্ট্রাকশন, ফার্মিং (কৃষি কাজ) এবং ওয়্যারহাউস বা গুদামে কাজের সুযোগ বেশি। সেখানকার সরকারি হিসাব মতে গড় বেতন ৩৫০ থেকে ৪০০ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করলে এটি প্রায় ৪০,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকার আশেপাশে থাকে।
তবে মনে রাখা জরুরি, অনেক ক্ষেত্রে থাকার জায়গা কোম্পানি দিলেও খাওয়ার খরচ নিজের। ফলে ১২-১৪ লাখ টাকা খরচ করে বেলারুশ গিয়ে মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা আয় করা কতটা লাভজনক, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। তবে আপনি যদি দক্ষ বা স্কিলড ওয়ার্কার হন, তবে বেতন এর চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৩. বেলারুশ থেকে কি অন্য দেশে (ইউরোপে) যাওয়া সম্ভব?
অনেকেরই মূল লক্ষ্য থাকে বেলারুশ হয়ে পোল্যান্ড বা অন্য কোনো সেনজেনভুক্ত দেশে ‘গেম দিয়ে’ বা অবৈধভাবে ঢোকা। ২০২৬ সালের পরিস্থিতিতে এটি প্রায় অসম্ভব এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বেলারুশের সাথে পোল্যান্ডের বর্ডারে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বর্ডার গার্ডরা কঠোর ব্যবস্থা নেয়। বেলারুশ ও রাশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ইউরোপের অন্য দেশে যাওয়ার পথ এখন প্রায় বন্ধ। তাই বেলারুশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করার চিন্তা করাটা চরম বোকামি হতে পারে।
৪. ভিসা প্রসেসিং ও গুজব
বাজারে গুজব আছে যে এক মাসেই বেলারুশ যাওয়া যায়। আসলে সব কাগজপত্র ঠিক করতে এবং ইনভিটেশন লেটার আসতে কমপক্ষে ২ থেকে ৩ মাস সময় লাগে। তাই দ্রুত যাওয়ার প্রলোভনে পড়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেবেন না।
৫. সচেতন থাকার কিছু টিপস
আপনি যদি একান্তই বেলারুশ যেতে চান, তবে নিচের বিষয়গুলো মাথায় রাখুন:
- ইংরেজি চর্চা: ইমিগ্রেশনের সাধারণ প্রশ্নগুলোর উত্তর ইংরেজিতে দেওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন।
- স্বচ্ছতা: আপনার বেতন কত, কোথায় থাকবেন—এসব তথ্য মুখস্থ রাখুন।
- ফোন পরিষ্কার রাখা: ফোনে দালাল বা অবৈধ কোনো লেনদেনের তথ্য রাখবেন না।
- মার্জিত পোশাক: কাজের ধরন অনুযায়ী ভদ্র ও মার্জিত পোশাক পরে এয়ারপোর্টে যাবেন।
বেলারুশে বর্তমানে ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা ৫০-৫০। সবকিছু ঠিক থাকার পরেও আপনাকে এয়ারপোর্ট থেকে ফেরত পাঠানো হতে পারে। এমতাবস্থায় এত টাকা খরচ করে ঝুঁকি নেওয়াটা কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখুন। এর বদলে আপনি চাইলে বর্তমান সময়ে ভালো ভিসা দিচ্ছে এমন দেশ যেমন—সার্বিয়া, ইউক্রেন, নর্থ মেসিডোনিয়া কাজের ভিসার জন্য চেষ্টা করতে পারেন। সেখানে খরচ প্রায় কাছাকাছি হলেও ভবিষ্যৎ অনেক বেশি উজ্জ্বল ও নিরাপদ।
যেকোনো দেশে যাওয়ার আগে অবশ্যই এজেন্সির সত্যতা যাচাই করবেন এবং নিজের দক্ষতার ওপর ভরসা রাখবেন। আপনার কষ্টার্জিত টাকা ও জীবন যেন দালালের খপ্পরে পড়ে নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।





