দক্ষিণ কোরিয়া ওয়ার্ক পারমিট ভিসা ২০২৪ বিস্তারিত

আসসালামু আলাইকুম। যে যেখান থেকে এই লেখাটি পড়ছেন, সবাইকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। আজকে আমি আলোচনা করব দক্ষিণ কোরিয়ার ভিসা নিয়ে। পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি সারা বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয়। অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশিরা দক্ষিণ কোরিয়াতে যেতে মরিয়া হয়ে থাকে। বর্তমানে উচ্চশিক্ষা কিংবা কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে অসংখ্য বাঙালি দেশটিতে ভ্রমণ করছেন। আজকের আলেচনায় বেসরকারিভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ওয়ার্ক পারমিট ভিসা আবেদনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত—ফাইল জমা নিয়ম, বেতন কত হবে এবং কতদিন সময় লাগবে—সবকিছু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী নিয়োগের প্রেক্ষাপট
দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রচুর পরিমাণ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, তাই প্রতিবছর দেশটি সরকারিভাবে বিপুল পরিমাণ কর্মী নিয়োগ দেয়। দিন দিন সেখানে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদাও বাড়ছে। শিল্প খাতে এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেম (EPS)-এর আওতায় প্রতিবছর কয়েক হাজার কর্মী যাওয়ার সুযোগ পায়।
সরকারি পদ্ধতিতে যেতে হলে আপনাকে বেশ কিছু কঠিন ধাপ অতিক্রম করতে হয়, যা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না-
- লটারির মাধ্যমে সিলেক্ট হওয়া।
- ভাষা পরীক্ষায় পাশ করা।
- লিখিত পরীক্ষায় পাশ করা।
- স্কিল টেস্ট বা প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় পাশ করা।
এই ধাপগুলোর কারণে অনেকের আগ্রহ থাকলেও কোরিয়া যাওয়া সম্ভব হয় না।
যদিও এক যুগ আগে থেকেই সরকারি পক্রিয়ার কোরয়িাতে জনশক্ষি রপ্তানি হচ্ছে।
এদানিং, নতুন করে ব্যক্তিগত ভাবে প্রাইভেট এজেন্সি মাধ্যমে বেসরকারিভাবে দক্ষিণ কোরিয়াতে E7 ভিসায় দক্ষ কর্মী হেসেব যাবার বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে এই কঠিন ধাপগুলো অতিক্রম না করেই বাংলাদেশের দক্ষ জাহাজ শিল্পের কর্মীগণ যেতে পারছেন।
বাংলাদেশ থেকে সর্বপ্রথম বিএম ট্রাভেলস নামক একটি রিক্রুটিং এজেন্সি ও এসডিসি ট্রেনিং সেন্টার বেসরকারি ভাবে জাহাজ শিল্পে ৩০ জনেরও বেশি ওয়েল্ডারকে দক্ষিণ কোরিয়ায়ে পাঠিয়েছে।
এছাড়াও হুন্দাই শিপইয়ার্ডে সর্বপ্রথম বেসরকারিভাবে সফলতার সাথে কর্মী প্রেরণ করেছে বিজনেস এ্যালায়েন্স নামক একটি রিক্রুটিং এজেন্সি ও হায়াত টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার বেসরকারি ভাবে জাহাজ শিল্পে একটি গ্রুপ ওয়েল্ডারকে দক্ষিণ কোরিয়ায়ে পাঠিয়েছে।
এর পর থেকে আরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন শিপইয়ার্ড কম্পানিতে আরও বাংলাদেশে ওয়েল্ডারদের সফলভাবে দক্ষিণ কোরয়িাতে ফ্লাইট করাতে সফল হয়েছে।
তবে প্রথমে দিকে ভাষা জানা বাধ্যবাধকতা না থাকলো পরবর্তঅতে ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা হয়।
তার মানে, আপনি সরকারিভাবে অথবা বেসরকারিভাবে যেভাবেই কাজের ভিসায় দক্ষিণ কোরিয়াতে যান না কেন, ভাষা শিখতেই হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও অর্থনীতি
দক্ষিণ কোরিয়া উপদ্বীপের দক্ষিণ অংশ নিয়ে গঠিত দেশটির সরকারি নাম প্রজাতন্ত্র দক্ষিণ কোরিয়া। এর উত্তরে উত্তর কোরিয়া, পূর্বে পূর্ব সমুদ্র, দক্ষিণে ও দক্ষিণ-পূর্বে কোরিয়া প্রণালী (যা জাপান থেকে দেশটিকে পৃথক করেছে) এবং পশ্চিমে পীত সাগর অবস্থিত। ১৯৪৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯৩ সালে এসে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।
এজেন্সি ও প্রতারণা সংক্রান্ত সতর্কতা
বর্তমানে খুব অল্প সংখ্যক এজেন্সি দক্ষিণ কোরিয়ার ওয়ার্ক পারমিট ভিসা নিয়ে কাজ করছে। আপনারা শুধু তাদের মাধ্যমেই আবেদন করবেন যারা ইতিপূর্ব বেশ কিছু পরিমাণে লোক সফল ভাবে পাঠিয়েছে। তবে মনে রাখবেন-
- সতর্কতা: অধিকাংশ এজেন্সি ফাইল জমা নিলেও কাজ করতে পারে না।
- প্রতারণা: দালাল বা অসাধু চক্র কম টাকা ও কম সময়ের লোভ দেখিয়ে আপনার ফাইল ও টাকা আটকে রাখতে পারে। অনেক সময় এই টাকা ফেরত আনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই ফাইল জমা দেওয়ার আগে এজেন্সির বৈধতা অবশ্যই যাচাই করবেন। তাদের লাইসেন্স আছে কিনা দেখে নিবেন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
দক্ষিণ কোরিয়ার ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসার জন্য নিম্নলিখিত ডকুমেন্টগুলো জমা দিতে হয় সাধারনত-
- সিভি (CV): বর্তমান সময়ে ইউরোপীয় স্টাইলে (European Style) একটি আপডেট সিভি প্রয়োজন।
- পাসপোর্ট: পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ২ বছর থাকতে হবে এবং অন্তত দুটি খালি পাতা থাকতে হবে।
- ছবি: সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে ৩৫/৪৫ সাইজের ল্যাব প্রিন্ট ছবি। স্টুডিও থেকে সফট কপিটি সংগ্রহ করে রাখা ভালো।
- ফ্যামিলি সার্টিফিকেট: এটি আপনার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সংগ্রহ করতে হবে।
- অভিজ্ঞতার সনদ (Experience Certificate): এটি বাধ্যতামূলক। কোনো ভুয়া সার্টিফিকেট দেওয়া যাবে না, অরিজিনাল সার্টিফিকেট প্রদান করতে হবে।
- শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ: আপনি যে পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন, তার অরিজিনাল সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে।
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স: এটি অনলাইনে আবেদন করতে হয় ও জেলা এস.বি অফিস থেকে সংগ্রহ করতে হয়।
ভিসা প্রসেসিং ও সময়সীমা
পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে মোটামুটি ৪ মাস সময় লাগে (যদি অন্য কোনো সমস্যা না হয়)।
| ধাপ | কাজের বিবরণ | সময়সীমা |
| ধাপ ১ | এজেন্সিতে ডকুমেন্ট জমা ও কোম্পানিতে প্রেরণ | শুরুর প্রক্রিয়া |
| ধাপ ২ | কোম্পানির মাধ্যমে ওয়ার্ক পারমিট আসা | ১ থেকে ২ মাস |
| ধাপ ৩ | অ্যাম্বাসি ফেস করার জন্য ডকুমেন্ট সংগ্রহ | ২০ দিন |
| ধাপ ৪ | ফাইল জমা ও ভিসা প্রাপ্তি | ২০ দিন থেকে ১ মাস |
বি.দ্র.: আপনার পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বা ব্যাকগ্রাউন্ড একদম স্বচ্ছ হতে হবে। কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড থাকলে আপনার ওয়ার্ক পারমিট বা ভিসা আসবে না।
পদবী ও বেতন কাঠামো
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়াতে কর্মীদের প্রচুর চাহিদা এবং বেতনও অনেক বেশি।
- সাধারণ কর্মী: সর্বনিম্ন বেতন ১.৫ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ টাকা।
- টেকনিশিয়ান: আপনার বেতন হবে মাসিক ২২০০ ইউএস ডলার। যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২,৬৩,৫৬০ টাকা (১ ডলার = ১১৯.৮০ টাকা হিসেবে)।
আমরা বর্তমানে মাত্র দুটি নির্দিষ্ট পদে দক্ষ টেকনিশিয়ান বেসিরকারি ভাবে সাইথ কোরিয়াতে লোকবল নিচ্ছে:
- TIG Welder (টিআইজি ওয়েল্ডার)
- FCAW Welder (এফসিএডব্লিউ ওয়েল্ডার)
কিছু কিছু ক্ষেত্রৈ স্প্রে পেইন্টার ও নিচ্ছে তবে খুবই কম। মূলক বেসরকারিভাবে যে কাজে নিক না কেন, তা শুধু মাতবর জাহাজশিল্পেই নিয়োগ হচ্ছে। আর যেগুলো সিজনাল ভিসা সেগুলো কৃষি কাজে।
দক্ষিণ কোরিয়া আপনার ভাগ্য পরিবর্তনের এক বিশাল সুযোগ হতে পারে। যারা প্রকৃত টেকনিশিয়ান এবং কোরিয়ান ভাষা শেখার মত প্ররিশ্রিম করতে আগ্রহী তারা এই দেশের জন্য চেষ্টা করতে পারেন।
মনে রাখবেন কোরিয়ানরা ইংরেজি নয়, নিজেদরে ভাষাকেই প্রধান্য দেয়। তাছাই কাজের কোয়ালিটি নিখুঁত চায়।
তাই কোরিয়া যেতে হতে কাজ + ভাষা দুটোই পারদর্শী হতে হবে।
[তথ্যসূত্র: Bidesh Jabo. Com]
