মাসিকের তারিখ পার হলেও মাসিক দেরি হচ্ছে কেন?

আমাদের যখন প্রথমে মাসিকের তারিখ পার হয়ে যাওয়ার পরও মাসিক দেরিতে হয় (অর্থাৎ ৭ দিন, ১০ দিন বা ১৫ দিন দেরি হতে পারে), তখন কিন্তু আমরা অনেক বেশি টেনশনে পড়ে যাই। মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে—“আমার তো আগে মাসিক নিয়মিত হতো, কোনো মাসে মিস যেত না; তাহলে এ মাসে কেন মাসিকের তারিখ পার হলেও মাসিক হচ্ছে না?”
এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে যে বিষয়টি মাথায় আসে, তা হলো গর্ভধারণ বা প্রেগনেন্সি—“আমি কি প্রেগনেন্ট?” কিন্তু যখন প্রেগনেন্সি টেস্ট করার পর রেজাল্ট নেগেটিভ আসে, তখন ভয় ও দুশ্চিন্তা আরও বেশি বেড়ে যায়।
মাসিক দেরিতে হওয়ার ধরণ ও পরিভাষা
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মাসিকের এই বিলম্বিত হওয়াকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়:
- ডিলেড মেনস্ট্রুয়েশন (Delayed Menstruation): মাসিকের স্বাভাবিক সময় পার হয়ে যাওয়ার পর মাসিক হওয়া।
- অলিগোমেনোরিয়া (Oligomenorrhea): সাধারণত নারীদের নিয়মিত মাসিক চক্র ২১ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে হয়ে থাকে। কিন্তু এই চক্রটি যদি অনিয়মিত হয়ে ৩৫ দিনের বেশি সময় পর পর (যেমন: ৪৫ বা ৫০ দিন পর পর) হয়, তবে তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অলিগোমেনোরিয়া বলে। এটি মূলত হরমোনের ভারসাম্যহীনতার (Hormonal Imbalance) কারণে হয়ে থাকে।
- সেকেন্ডারি অ্যামেনোরিয়া (Secondary Amenorrhea): যাদের আগে নিয়মিত মাসিক হতো, কিন্তু কোনো কারণে টানা ৩ মাস মাসিক বন্ধ থাকে; অথবা যাদের অনিয়মিত মাসিক হতো এবং টানা ৬ মাস মাসিক বন্ধ থাকে—এই অবস্থাকে সেকেন্ডারি অ্যামেনোরিয়া বলা হয়।
মাসিক অনিয়মিত হওয়া বা বন্ধ থাকার কারণসমূহ
স্বাভাবিকভাবে মাসিক বন্ধ থাকার প্রধান ও প্রাকৃতিক কারণ হলো প্রেগনেন্সি (গর্ভাবস্থা)। তাই মাসিক বন্ধ হলে সবার আগে প্রেগনেন্সি টেস্ট করে নিশ্চিত হওয়া উচিত। তবে টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ আসার পরও যদি মাসিক না হয়, তবে তার পেছনে নিম্নলিখিত কারণগুলো থাকতে পারে:
১. অতিরিক্ত মানসিক চাপ (Stress)
আপনি যদি অতিরিক্ত মানসিক বা দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকেন, তবে আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস গ্ল্যান্ড (Hypothalamus Gland) পিটুইটারি গ্ল্যান্ডকে ঠিকভাবে সংকেত পাঠাতে পারে না।
- স্বাভাবিক নিয়মে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে FSH (Follicle Stimulating Hormone) এবং LH (Luteinizing Hormone) নিঃসৃত হয়।
- এই হরমোনগুলো ওভারিকে সংকেত পাঠিয়ে সেখান থেকে ইস্ট্রোজেন (Estrogen) ও প্রজেস্টেরন (Progesterone) হরমোন নিঃসরণ করায়।
- এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-ওভারিয়ান অ্যাক্সিস (Hypothalamic-Pituitary-Ovarian Axis বা HPO Axis) বলা হয়।
অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে এই HPO Axis-এর কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ফলে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড ও ওভারি থেকে হরমোন সঠিকভাবে নিঃসৃত হতে পারে না, যার কারণে মাসিক অনিয়মিত বা বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেই প্রেগনেন্সি নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করার কারণেও মাসিক আরও পিছিয়ে যায়।
২. ওজন অতিরিক্ত কমে যাওয়া (Low Body Weight)
শরীরের ওজন যদি হঠাৎ অনেক বেশি কমে যায়, তবে শরীরে চর্বির ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং মাসিক দেরিতে হতে পারে।
৩. অতিরিক্ত ওজন ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
শরীরের ওজন যদি প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি থাকে, তবে তা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। বিশেষ করে শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স (Insulin Resistance) তৈরি হলে এই সমস্যাটি বেশি দেখা দেয়।
৪. পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS)
পিসিওএস (PCOS)-এর কারণে ওভারি থেকে হরমোনগুলো সঠিকভাবে নিঃসৃত হতে পারে না। এর ফলে ওভারিতে ছোট ছোট পানিপূর্ণ থলির মতো দানাদার সিস্ট তৈরি হয়। সিস্ট থাকার কারণে প্রতি মাসে ডিম্বস্ফোটন বা ওভুলেশন (Ovulation) হয় না এবং মাসিক অনেক দেরিতে হয়।
৫. থাইরয়েডের সমস্যা
হাইপোথাইরয়েডিজম (Hypothyroidism) বা হাইপারথাইরয়েডিজম (Hyperthyroidism)—থাইরয়েডের এই দুই ধরনের সমস্যার কারণেই মাসিক দেরিতে হতে পারে কিংবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
৬. ব্রেস্টফিডিং (স্তন্যদানকাল)
সন্তানকে বুকের দুধ খাওনোর সময় মায়ের শরীরে প্রোল্যাক্টিন (Prolactin) হরমোনের মাত্রা বেশি থাকে। এই হরমোনের প্রভাবে প্রসবের পর ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত মাসিক দেরিতে হওয়া বা বন্ধ থাকা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
৭. পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে স্ট্রেস হরমোন অনেক বেশি নিঃসৃত হয়। এটি আমাদের হাইপোথ্যালামাস থেকে সঠিক সংকেত পাঠানোর ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে মাসিক দেরিতে হয়।
৮. অতিরিক্ত ব্যায়াম
অতিরিক্ত কঠোর শারীরিক পরিশ্রম বা ভারী ব্যায়ামের কারণেও শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
৯. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ যেমন—হরমোনাল ওষুধ, মানসিক রোগের ওষুধ ইত্যাদির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলেও মাসিক অনিয়মিত হতে পারে।
অনিয়মিত মাসিকের ঘরোয়া সমাধান
মাসিক অনিয়মিত হলে প্রাথমিকভাবে লাইফস্টাইলে কিছু পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি:
- পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন রাতে টানা ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘুমানোর অভ্যাস করুন।
- মানসিক চাপ মুক্ত থাকা: মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, ইয়োগা, মেডিটেশন বা প্রার্থনা করতে পারেন। সবসময় দুশ্চিন্তামুক্ত ও হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করুন।
- খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: ফাস্টফুড, জাঙ্কফুড এবং অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার পুরোপুরি পরিহার করুন।
- পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত সবুজ শাকসবজি, তাজা ফলমূল, পর্যাপ্ত পানি, ভিটামিন সি এবং ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার রাখুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ
মাসিক দেরিতে বা অনিয়মিত হওয়ার মূল কারণটি জানার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। পুষ্টির ঘাটতি, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা কিংবা অতিরিক্ত ওজন—ঠিক কী কারণে এটি হচ্ছে তা নিশ্চিত হয়ে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে মাসিক নিয়মিত করা সম্ভব।
অনেকে ভাবেন কেবল ১ মাস ওষুধ খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন না করলে এটি স্থায়ীভাবে ঠিক হয় না। তাই ধৈর্য ধরে লাইফস্টাইল ঠিক রাখার পাশাপাশি সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে।
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দূর করতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা অত্যন্ত কার্যকরী ও নিরাপদ। হেলদি লাইফস্টাইল মেইনটেইনের পাশাপাশি সঠিক হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নিলে সাধারণত ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে মাসিক পুনরায় নিয়মিত করা সম্ভব।
অযথা ঘরে বসে দুশ্চিন্তা না করে সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ ও চিকিৎসা নিন। ধন্যবাদ।
তথ্য সূত্র: ডা. রাশিদা ইয়াসমিন (নারী ও পুরুষের বন্ধ্যাত্বসহ নারীদের সকল স্বাস্থ্য ও গাইনি সমস্যার অভিজ্ঞ চিকিৎসক), মিরপুর কাজীপাড়া, হোমিওপ্যাথিক ফাউন্ডেশন হাসপাতাল।









