মুরগির বাচ্চার নাভি কাঁচা বা নাভি ফোলা রোগ ওমফেলাইটিস ও তার প্রতিকার

মুরগি পালন ব্যবসায় বাচ্চার প্রাথমিক অবস্থায় সবথেকে বড় সমস্যার একটি হলো ওমফেলাইটিস (Omphalitis)। একে সাধারণ ভাষায় ‘নাভি কাঁচা রোগ’ বা ‘Yolk Sac Infection’ বলা হয়। এটি মূলত একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ যা বাচ্চার জন্মের প্রথম সপ্তাহেই দেখা দেয় এবং সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে খামারে মৃত্যুর হার অনেক বাড়িয়ে দেয়।
(১) ওমফেলাইটিস যেভাবে ছড়ায় (Transmission)
এই রোগটি মূলত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ছড়ায়। সংক্রমণের প্রধান উৎসগুলো হলো-
- হ্যাচারি ও ইনকিউবেটর: ইনকিউবেটর সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত না করলে বাচ্চার জন্মের সময় সংক্রমণ হতে পারে।
- পরিবহন ব্যবস্থা: বাচ্চা বহনকারী কার্টুন বা যানবাহনের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে জীবাণু ছড়ায়।
- যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম: ডিমের ট্রে, হ্যাচারীর ট্রলি বা ইনকিউবেটরের ভেতরের যন্ত্রপাতির মাধ্যমে।
- অপরিচ্ছন্ন শ্রমিক: হ্যাচারি বা ব্রুডার ঘরে কাজ করা মানুষের হাত বা কাপড়ের মাধ্যমে।
- খাবার ও পানি: দূষিত খাবার এবং নোংরা পানির পাত্রের মাধ্যমে।
- লিটার ব্যবস্থাপনা: ব্রুডার ঘরের লিটার বা বিছানা ভেজা বা নোংরা থাকলে দ্রুত সংক্রমণ ঘটে।
(২) রোগের কারণ (Etiology)
ওমফেলাইটিস মূলত বিভিন্ন প্রকার গ্রাম-নেগেটিভ এবং গ্রাম-পজিটিভ ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
- Escherichia coli (E. coli): এটি এই রোগের প্রধান কারণ।
- Staphylococcus aureus: নাভির চারপাশে প্রদাহ সৃষ্টি করে।
- Streptococcus spp. ও Salmonella: এই ব্যাকটেরিয়াগুলোও নাভি কাঁচা রোগের জন্য দায়ী হতে পারে।
(৩) রোগের লক্ষণ (Symptoms)
আপনার খামারের বাচ্চা ওমফেলাইটিসে আক্রান্ত কি না, তা নিচের লক্ষণগুলো দেখে বুঝতে পারবেন-
- নাভি কাঁচা থাকা: বাচ্চার নাভি শুকাবে না এবং নাভির চারপাশ লাল বা কালো হয়ে ফুলে থাকবে।
- পেট ফোলা ও পানি জমা: বাচ্চার পেট অস্বাভাবিক ফুলে যাবে এবং ভেতরে পানি অনুভূত হবে।
- ঝিমুনি: বাচ্চা মাথা নিচু করে ঝিমাতে থাকবে এবং এক জায়গায় জড়ো হয়ে থাকবে।
- খাদ্যে অরুচি: বাচ্চা পানি ও খাবার খাওয়া প্রায় বন্ধ করে দেয়।
- মলত্যাগ: সাদা রঙের আঠালো বা পাতলা পায়খানা করতে পারে।
- পচা গন্ধ: আক্রান্ত বাচ্চার নাভি থেকে এক ধরনের পচা দুর্গন্ধ বের হতে পারে।
(৪) ওমফেলাইটিস বা নাভি কাঁচা রোগের চিকিৎসা (Treatment)
রোগ দেখা দিলে দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন। জেন্টামাইসিন, ডক্সিসাইক্লিন, বা এনরোফ্লক্সাসিন গ্রুপের ঔষধগুলো এ ক্ষেত্রে কার্যকর।
চিকিৎসা পদ্ধতি ১:
জেন্টামাইসিন, ডক্সিসাইক্লিন, নাইট্রোফিউরাস বা ট্রাই-মিথোপ্রিম গ্রুপের যেকোনো ঔষধ ০.০৪% হারে খাদ্যের সাথে মিশিয়ে টানা ৫-৭ দিন খাওয়াতে হবে।
চিকিৎসা পদ্ধতি ২ (প্রচলিত ঔষধ ও প্রয়োগমাত্রা):
নিচের টেবিল থেকে আপনার হাতের কাছে থাকা যেকোনো একটি ভালো মানের ঔষধ ব্যবহার করতে পারেন-
| ঔষধের নাম | প্রয়োগমাত্রা (প্রতি লিটার পানিতে) | প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান |
| এনরোসিন (Enrocin) | ০.৫ মি.লি. (টানা ৩-৫ দিন) | রেনাটা এনিমেল হেলথ |
| ডক্সি-এ ভেট (Doxy-A Vet) | ০.৫ গ্রাম/মি.লি. (টানা ৩-৫ দিন) | একমি |
| এসকাট্রিম (Esktrim Sus.) | ১ মি.লি. / ৩ লিটার পানিতে (৪-৬ দিন) | এসকেএফ (SK+F) |
| মাইক্রোনিড (Micronid) | ০.৫ থেকে ১.০ গ্রাম (৫ দিন) | রেনাটা এনিমেল হেলথ |
| এনফ্লক্স-ভেট সলিউশন | ০.৫ মি.লি. (টানা ৩-৫ দিন) | স্কয়ার ফার্মা |
| কসুমিক্স প্লাস | ২.০ – ২.৫ গ্রাম (টানা ৩-৫ দিন) | এলানকো বাংলাদেশ |
| সিপ্রোফ্লক্স (Ciproflox) | ২.০ – ২.৫ গ্রাম (টানা ৩-৫ দিন) | এসকেএফ (SK+F) |
(৫) রোগ প্রতিরোধে করণীয় (Prevention)
চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। ওমফেলাইটিস মুক্ত খামার গড়তে নিচের পরামর্শগুলো মেনে চলুন-
- হ্যাচারি পরিচ্ছন্নতা: ইনকিউবেটর ও হ্যাচারি সবসময় নিয়ম মেনে জীবাণুমুক্ত রাখুন।
- সঠিক ব্রুডিং: ব্রুডার ঘরের তাপমাত্রা সঠিক রাখুন যাতে বাচ্চার নাভি দ্রুত শুকিয়ে যায়।
- লিটার শুকনা রাখা: লিটার সবসময় ঝরঝরে ও শুকনা রাখার চেষ্টা করুন।
- বায়োসিকিউরিটি: খামারে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করুন এবং কাজ করার আগে হাত-পা জীবাণুমুক্ত করে নিন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: যেকোনো ঔষধ ব্যবহারের আগে নিকটস্থ রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি সার্জন বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।


