যে ৩টি রোগের সমস্যা থাকলে কাজের ভিসায় বিদেশ যাওয়া যায় না!

বিদেশ যাওয়ার মেডিকেল টেস্ট
আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে, উচ্চশিক্ষা নিতে কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। কেউ যান সৌদি আরব, দুবাই বা ওমানের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাজের ভিসায়, আবার কেউ যান ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে স্টুডেন্ট কিংবা মাইগ্রেশন ভিসায়।
বিদেশে যাওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কিছুটা দুশ্চিন্তার ধাপ হলো ‘মেডিকেল টেস্ট’ বা শারীরিক পরীক্ষা। ভিসা পাওয়ার জন্য আপনার শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই জানেন না যে, ঠিক কোন কোন রোগের কারণে মেডিকেল রিপোর্টে ‘আনফিট’ (Unfit) বা অযোগ্য ঘোষণা করা হতে পারে। আজ আমরা অত্যন্ত সহজ ভাষায় আলোচনা করব এমন কিছু নির্দিষ্ট রোগ নিয়ে, যেগুলোর কারণে আপনার বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন আটকে যেতে পারে। একই সাথে মেডিকেল টেস্টের নামে বাজারে যে ধরনের প্রতারণা চলছে, তা থেকেও কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন, সেই বিষয়ে বিস্তারিত জানাব।
মেডিকেল টেস্টের নামে প্রতারণা
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে একটি অত্যন্ত জরুরি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কথা বলা দরকার। ইদানীং আমাদের দেশে কিছু অসাধু মেডিকেল সেন্টার বা দালালের খপ্পরে পড়ে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন।
প্রতারণার কৌশলটি সাধারণত এই রকম হয়: আপনি হয়তো ৫,০০০ টাকা দিয়ে একটি মেডিকেল সেন্টারে পরীক্ষা করালেন। কিছুদিন পর তারা আপনাকে জানাল যে আপনার শরীরে বড় কোনো রোগ বা সমস্যা আছে, যার কারণে আপনি বিদেশে যেতে পারবেন না। এরপর তারা আপনাকে ভয় দেখাতে শুরু করে। সাধারণ মানুষ যখন শোনে তার শরীরে বড় কোনো রোগ বাসা বেঁধেছে, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
ঠিক এই সুযোগটাই নেয় সেই অসাধু প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা বলে, “আরও ২০,০০০ বা ৩০,০০০ টাকা দিলে আমরা বিশেষ চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগ ভালো করে দেব অথবা মেডিকেল রিপোর্ট ‘ফিট’ করিয়ে দেব।” মানুষ তখন নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কষ্টার্জিত টাকা তাদের হাতে তুলে দেয়।
সতর্কবার্তা: এই ধরনের ফাঁদ থেকে সবসময় দূরে থাকবেন। কোনো অনুমোদিত বা সরকারি তালিকাভুক্ত মেডিকেল সেন্টার কখনো এভাবে পেছনের দরজা দিয়ে টাকা নিয়ে রিপোর্ট পরিবর্তন করে না। কোনো সেন্টার যদি আপনাকে এমন প্রস্তাব দেয়, তবে বুঝবেন সেখানে বড় কোনো জালিয়াতি হচ্ছে। কোনো রকম ভয় না পেয়ে তৎক্ষণাৎ অন্য একটি ভালো এবং সরকারি স্বীকৃত ল্যাব বা ডাক্তার দিয়ে পুনরায় পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হোন।
যে ৩টি প্রধান রোগের কারণে বিদেশ যাওয়া বন্ধ হতে পারে
বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব স্বাস্থ্য নীতিমালা রয়েছে। তারা চায় না তাদের দেশে বাইরে থেকে এমন কোনো মানুষ আসুক, যার কারণে তাদের দেশের সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য আইন অনুযায়ী, মূলত ছোঁয়াচে এবং রক্তবাহিত ৩টি মারাত্মক রোগ থাকলে কোনোভাবেই বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না। নিচে এই রোগগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B)
বর্তমানে বাংলাদেশে এই রোগটি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে এবং এর কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষের বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে। এটি মূলত লিভার বা যকৃতের একটি মারাত্মক ইনফেকশন বা সংক্রমণ, যা ‘হেপাটাইটিস বি’ ভাইরাসের কারণে ঘটে থাকে।
- কেন এটি বিপজ্জনক: হেপাটাইটিস বি দীর্ঘমেয়াদি হলে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো (যেমন- সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ওমান, আরব আমিরাত) এই রোগের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি নীতি অনুসরণ করে। রক্ত পরীক্ষায় এই ভাইরাসের উপস্থিতি সামান্যতম পাওয়া গেলেও রিপোর্টে সরাসরি ‘আনফিট’ লিখে দেওয়া হয়।
- বাংলাদেশে এর প্রকোপ বাড়ার কারণ: আমাদের অসচেতনতাই এর প্রধান কারণ। অনেকেই অনৈতিক বা অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, যার মাধ্যমে এটি খুব দ্রুত ছড়ায়। এছাড়া সেলুনে একই ব্লেড বারবার ব্যবহার করা, অন্যের ব্যবহৃত রেজার বা টুথব্রাশ ব্যবহার করার মাধ্যমেও এই ভাইরাস একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে প্রবেশ করে।
২. এইচআইভি (HIV)
এইচআইভি (Human Immunodeficiency Virus) হলো একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ভাইরাস, যা মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে একদম ধ্বংস করে দেয়।
- নীরব ঘাতক: এই ভাইরাসের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটি শরীরে প্রবেশ করার পর বছরের পর বছর মানুষটি একদম সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকতে পারে। বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায় থাকে না যে তিনি এই ভাইরাসে আক্রান্ত।
- কীভাবে ধরা পড়ে: যখন কোনো ব্যক্তি বিদেশ যাওয়ার জন্য ব্লাড টেস্ট বা রক্ত পরীক্ষা করেন, তখনই কেবল এটি প্রথম ধরা পড়ে। এই ভাইরাসের কোনো স্থায়ী নিরাময় বা প্রতিষেধক এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি, তাই এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কোনোভাবেই কোনো দেশে যাওয়ার ভিসা পান না।
৩. এইডস (AIDS)
এইডস (Acquired Immunodeficiency Syndrome) কোনো আলাদা ভাইরাস নয়, এটি মূলত এইচআইভি ভাইরাসেরই শেষ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ধাপ। যখন এইচআইভি ভাইরাসের কারণে মানুষের শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং শরীর যেকোনো ছোটখাটো রোগকেও প্রতিরোধ করতে পারে না, তখন সেই অবস্থাকে এইডস বলা হয়।
- লক্ষণ: দীর্ঘদিন ধরে একটানা পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া হওয়া, কোনো কারণ ছাড়াই শরীরের ওজন দ্রুত কমে যাওয়া, দীর্ঘদিন ধরে জ্বর থাকা এবং কোনো ক্ষত বা রোগ সহজে ভালো না হওয়া—এগুলো এইডসের অন্যতম লক্ষণ হতে পারে।
- পরিসংখ্যান: বাংলাদেশ এবং সারা বিশ্বে এইচআইভি বা এইডসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম (শতকরা প্রায় ০.০৮% বা তার কিছু কম-বেশি)। তবে কম হলেও এর ভয়াবহতা এবং সামাজিক ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এই রোগ থাকলে বিদেশ যাত্রার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
রোগগুলো যেভাবে ছড়ায়
উপরে যে ৩টি রোগের কথা বলা হলো (হেপাটাইটিস বি, এইচআইভি এবং এইডস), এগুলোর ছড়ানোর মাধ্যম বা প্রক্রিয়া কিন্তু প্রায় একই রকম। আমরা যদি একটু সচেতন থাকি, তবে খুব সহজেই এই রোগগুলো থেকে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে মুক্ত রাখতে পারি।
- রক্তের মাধ্যমে (Blood Transmission): কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত যদি আপনার শরীরে প্রবেশ করানো হয়, তবে আপনি নিশ্চিতভাবে এই রোগে আক্রান্ত হবেন। তাই কখনো শরীরে রক্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলে অবশ্যই তা ভালো ল্যাবে পরীক্ষা (Screening) করিয়ে নিতে হবে।
- অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক: অনৈতিক ও অনিরাপদ মেলামেশা এই রোগগুলো ছড়ানোর সবচেয়ে বড় এবং প্রধান মাধ্যম। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি এবং এইচআইভি এই উপায়ে খুব দ্রুত একজন থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়ায়। তাই ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনযাপন এবং বিশ্বস্ততা এই রোগ থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় ঢাল।
- ব্যবহৃত সুই বা সিরিঞ্জ (Used Needles): অতীতে একটি সিরিঞ্জ দিয়ে অনেক মানুষকে ইনজেকশন দেওয়া হতো, যা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। বর্তমানে অবশ্য বিশ্বজুড়ে ‘ওয়ান টাইম’ বা একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ ব্যবহার করা হয়। তবুও হাসপাতালে বা ক্লিনিকে ইনজেকশন নেওয়ার সময় সবসময় খেয়াল রাখবেন যেন আপনার সামনে নতুন সুইয়ের প্যাকেট খোলা হয়।
- মায়ের শরীর থেকে সন্তানে: কোনো গর্ভবতী মা যদি হেপাটাইটিস বি বা এইচআইভিতে আক্রান্ত থাকেন, তবে সন্তান প্রসবের সময় বা মায়ের দুধের মাধ্যমে শিশুটির শরীরে এই রোগ ছড়ানোর উচ্চ ঝুঁকি থাকে।
যেভাবে এই রোগগুলো ছড়ায় না
আমাদের সমাজে এই রোগগুলো নিয়ে অনেক ধরনের ভুল ধারণা বা কুসংস্কার রয়েছে। আক্রান্ত মানুষদের সমাজ থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়, যা একদমই অনুচিত। এই রোগগুলো কীভাবে ছড়ায় না, তা আমাদের পরিষ্কারভাবে জানা দরকার:
- ছোঁয়াচে নয়: হেপাটাইটিস বি বা এইচআইভি আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সাথে হাত মেলালে, তাকে জড়িয়ে ধরলে বা তার শরীর স্পর্শ করলে এই রোগ কখনো ছড়ায় না।
- হাঁচি-কাশির মাধ্যমে নয়: আক্রান্ত মানুষের হাঁচি, কাশি বা থুতুর মাধ্যমে এই ভাইরাস বাতাসে ছড়ায় না।
- একসাথে খাবার খেলে নয়: একই থালায় খাবার খেলে বা একই গ্লাসে পানি পান করলে এই রোগ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
- মশার কামড়ে নয়: মশা বা অন্য কোনো কীটপতঙ্গের কামড়ের মাধ্যমে এই রোগগুলো একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায় না।
তাই আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবহেলা না করে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত।
বিদেশ যাত্রার স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে আপনার করণীয়
আপনি যদি ভবিষ্যতে কাজের জন্য বা পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে মেডিকেল টেস্ট নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে পারেন:
- আগাম পরীক্ষা (Pre-Medical Test): চূড়ান্ত মেডিকেল টেস্টে বসার অন্তত কয়েক মাস আগে নিজের উদ্যোগে কোনো ভালো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে হেপাটাইটিস বি এবং এইচআইভি পরীক্ষা করিয়ে নিন। যদি কোনো সমস্যা থাকে, তবে আগে থেকেই চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব।
- হেপাটাইটিস বি ভ্যাক্সিন: হেপাটাইটিস বি থেকে বাঁচার জন্য অত্যন্ত কার্যকর ভ্যাক্সিন বা টিকা রয়েছে। আপনার যদি এই রোগ না থেকে থাকে, তবে অতি দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ভ্যাক্সিনের ডোজগুলো সম্পন্ন করে নিন। এটি আপনাকে সারাজীবন এই রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখবে।
- জীবনযাত্রায় পরিবর্তন: যেকোনো ধরনের অনৈতিক ও অনিরাপদ সম্পর্ক থেকে পুরোপুরি দূরে থাকুন। সেলুনে চুল বা দাড়ি কাটার সময় সবসময় নতুন ব্লেড ব্যবহার করতে বাধ্য করুন।
রোগ ধরা পড়লে কী করবেন? ভেঙে পড়বেন না
মেডিকেল টেস্টে যদি কখনো এই ধরনের কোনো রোগ ধরা পড়ে, তবে প্রথমেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন না। মনে রাখবেন, বিদেশ যাওয়াই জীবনের শেষ কথা নয়। জীবন বাঁচানো এবং সুস্থ থাকাটাই সবচেয়ে বড় বিষয়।
- লুকিয়ে রাখবেন না: লোকলজ্জা বা ভয়ের কারণে রোগ লুকিয়ে রাখলে তা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। কোনো কবিরাজ, ওঝা বা ভুয়া ডাক্তারের কাছে গিয়ে টাকা ও সময় নষ্ট করবেন না।
- রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ নিন: রোগ ধরা পড়ার সাথে সাথে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের (যেমন লিভার বিশেষজ্ঞ বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ) শরণাপন্ন হোন।
- নিয়মিত চিকিৎসা: হেপাটাইটিস বি এবং এইচআইভি পুরোপুরি নিরাময় না হলেও আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রেখে একদম সাধারণ মানুষের মতো দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব। সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে আপনার লিভার বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সচল থাকবে।
বিদেশ যাওয়া আমাদের দেশের যুবসমাজের জন্য একটি বড় সুযোগ, কিন্তু তার চেয়েও বড় হলো আপনার স্বাস্থ্য। কোনো অসাধু মেডিকেল সেন্টারের ভুয়া রিপোর্টে আতঙ্কিত হবেন না, আবার নিজের কোনো রোগ থাকলে তা অবহেলাও করবেন না। সচেতনতাই পারে আপনাকে এই সমস্ত জটিল রোগ এবং প্রতারণা থেকে দূরে রাখতে। সুস্থ থাকুন, সাবধানে থাকুন এবং নিজের যত্ন নিন।
