১০+ কয়েকটি ইসলামিক প্রশ্নের উত্তর

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের আধ্যাত্মিক, সামাজিক এবং ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি দিক নির্দেশ করে। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়, যেমন ইবাদত, আকিদা, এবং ইতিহাস সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো আমাদের ধর্মীয় জ্ঞানকে গভীর করে এবং জীবনযাপনে সঠিক পথ দেখায়। এই ব্লগে আমরা ইসলামিক বিষয়ের উপর কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আলোচনা করব, যা পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য এবং ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
১. প্রশ্ন: অজু কিভাবে করতে হয়?
উত্তর:
অজুর পূর্ব প্রস্তুতি:
- উঁচু ও পবিত্র স্থানে বসা মুস্তাহাব
- কিবলামুখী হয়ে বসা উত্তম
- পানি ঢালার পাত্র বাম পাশে রাখা
- পুকুর বা হাউজ থেকে পানি নিলে ডান পাশে রাখা মুস্তাহাব
অজুর ধাপসমূহ:
- নাকে পানি দেওয়া
- ডান হাত দিয়ে পানি নাকে দিবে
- বাম হাত দিয়ে নাক ঝাড়বে
- কনিষ্ঠাঙ্গুল বা বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে নাক পরিস্কার
- তিনবার নাকে পানি দেওয়া সুন্নাত
- মুখমণ্ডল ধৌত করা
- কপালের চুলের গোড়া থেকে থুতনীর নিচ পর্যন্ত
- এক কান থেকে অন্য কান পর্যন্ত
- মুখে পানি এমনভাবে পৌঁছানো যাতে এক পশম পরিমাণও শুকনো না থাকে
- ঘন দাড়ি হলে খিলাল করা সুন্নাত
- হাত ধৌত করা (কনুইসহ)
- হাতের তালুতে পানি নিয়ে আঙ্গুলের অগ্রভাগ থেকে ধোয়া শুরু
- কনুই পর্যন্ত পানি পৌঁছানো
- ধোয়া শেষে পানি আঙ্গুলের অগ্রভাগ দিয়ে নিচে গড়িয়ে পড়া উচিত
- মাথা মাসাহ করা
- মাথার চার ভাগের এক ভাগ মাসাহ করা ফরয
- সম্পূর্ণ মাথা মাসাহ করা সুন্নাত
- ভেজা হাত দিয়ে মাথার অগ্রভাগ থেকে পেছনে টেনে মাসাহ
- পা ধৌত করা (গোড়ালীসহ)
- ডান হাত দিয়ে পায়ের সামনের অংশে পানি ঢালা সুন্নাতবাম হাত দিয়ে পা ও তলদেশ মর্দন করা মুস্তাহাবপায়ের আঙ্গুল খিলাল করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।
- খিলালের নিয়ম হলো ডান পায়ের কনিষ্ঠা থেকে শুরু করে বৃদ্ধাঙ্গুল পর্যন্ত ও বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল থেকে কনিষ্ঠা পর্যন্ত।
২. প্রশ্ন: সুরা নিসা আয়াত নং ১২ বুঝতে চাই! দয়া করে বুঝাবেন?
উত্তর:
জ্বি, আমি আপনাকে নিসা আয়াত নং ১২ বুঝিয়ে দিচ্ছি-
প্রথমেই আপনার সুবিধার্থে সুরা নিসা আয়াত নং ১২ টি এখানে সংযুক্ত করে দিলাম সাথে বাংলা অর্থঃ
আরবি আয়াত:
و لکم نصف ما ترک ازواجکم ان لم یکن لهن ولد ۚ فان کان لهن ولد فلکم الربع مما ترکن منۢ بعد وصیۃ یوصین بها او دین و لهن الربع مما ترکتم ان لم یکن لکم ولد ۚ فان کان لکم ولد فلهن الثمن مما ترکتم منۢ بعد وصیۃ توصون بها او دین و ان کان رجل یورث کللۃ او امراۃ و لهٗ اخ او اخت فلکل واحد منهما السدس ۚ فان کانوا اکثر من ذلک فهم شرکاء فی الثلث منۢ بعد وصیۃ یوصی بها او دین ۙ غیر مضار ۚ وصیۃ من الله و الله علیم حلیم
বাংলা অর্থ:
আর তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীগণ যা রেখে গেছে তার অর্ধেক, যদি তাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তারা যা রেখে গেছে তা থেকে তোমাদের জন্য চার ভাগের এক ভাগ। তারা যে অসিয়ত করে গেছে তা পালনের পর অথবা ঋণ পরিশোধের পর। আর স্ত্রীদের জন্য তোমরা যা রেখে গিয়েছ তা থেকে চার ভাগের একভাগ, যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে তাহলে তাদের জন্য আট ভাগের এক ভাগ, তোমরা যা রেখে গিয়েছে তা থেকে। তোমরা যে অসিয়ত করেছ তা পালন অথবা ঋণ পরিশোধের পর। আর যদি মা বাবা এবং সন্তান-সন্ততি নাই এমন কোন পুরুষ বা মহিলা মারা যায় এবং তার থাকে এক ভাই অথবা এক বোন, তখন তাদের প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের একভাগ। আর যদি তারা এর থেকে অধিক হয় তবে তারা সবাই তিন ভাগের এক ভাগের মধ্যে সমঅংশীদার হবে, যে অসিয়ত করা হয়েছে তা পালনের পর অথবা ঋণ পরিশোধের পর। কারো কোন ক্ষতি না করে। আল্লাহর পক্ষ থেকে অসিয়তস্বরূপ। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।
আয়াতটির ব্যাখ্যা:
নিচে উক্ত ব্যাখ্যাটি সহজ ভাষায় ও পয়েন্ট আকারে উপস্থাপন করা হলো, যাতে সহজে বোঝা যায়।
সুরা নিসা আয়াত ১২ এর সহজ ব্যাখ্যা-
১। স্ত্রী মারা গেলে স্বামীর অংশ
- যদি স্ত্রীর সন্তান না থাকে, তবে ঋণ ও ওসিয়ত বাদ দিয়ে স্বামী অর্ধেক (½) পাবে।
- যদি স্ত্রীর সন্তান থাকে, তবে ঋণ ও ওসিয়ত বাদ দিয়ে স্বামী এক-চতুর্থাংশ (¼) পাবে।
- অবশিষ্ট সম্পত্তি স্ত্রীর অন্য ওয়ারিশদের (যেমন: পিতা, মাতা, ভাইবোন) মধ্যে শরীয়ত অনুযায়ী বন্টিত হবে।
২। স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর অংশ
- যদি স্বামীর সন্তান না থাকে, তবে ঋণ ও ওসিয়ত বাদ দিয়ে স্ত্রী এক-চতুর্থাংশ (¼) পাবে।
- যদি স্বামীর সন্তান থাকে, তবে ঋণ ও ওসিয়ত বাদ দিয়ে স্ত্রী এক-অষ্টমাংশ (⅛) পাবে।
৩। স্ত্রীর সংখ্যা একাধিক হলে
- একাধিক স্ত্রী থাকলে তারা মিলে ¼ বা ⅛ অংশে শরিক হবে।
- প্রতিটি স্ত্রী আলাদা করে ¼ বা ⅛ পাবে না।
৪। বাকি সম্পত্তির বণ্টন
- স্বামী বা স্ত্রীকে নির্ধারিত অংশ দেয়ার পর বাকি সম্পত্তি অন্য ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন হবে।
৫। মাহর (মোহর) সংক্রান্ত বিধান
- স্ত্রী মারা গেলে যদি মাহর (মোহর) বাকি থাকে, তবে সেটি ঋণের মতো প্রথমে পরিশোধ করতে হবে।
- যদি স্বামী মারা যায় এবং মৃত্যুর আগে মাহর পরিশোধ না করে, তাহলে স্ত্রীর পাওনা হিসেবে সেটি প্রথমেই দেয়া হবে।
- যদি সম্পত্তি শুধু মাহর পরিশোধেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে ওয়ারিশরা আর কিছু পাবে না।
৬। ‘কালালাহ’ কাকে বলে?
- যার না পিতা আছে, না সন্তান আছে, তাকেই “কালালাহ” বলা হয় (ইবনে আব্বাস রা. মতে)।
৭। ‘কারো ক্ষতি না করে’ কথার ব্যাখ্যা
- মৃত ব্যক্তি যেন কারো ক্ষতি না করে; যেমন- ভিত্তিহীন ঋণ স্বীকার করে ওয়ারিশদেরকে বঞ্চিত করা।
- ওয়ারিশরা যেন মৃতের বৈধ অসিয়ত রোধ না করে; শরীয়তসম্মত অসিয়ত বা নির্দেশ মানা বাধ্যতামূলক।
৮। অন্যায় ওসিয়ত ও ক্ষতিসাধন
- মিথ্যা ওসিয়ত বা অপ্রয়োজনীয় ঋণ স্বীকার করে কারো সম্পদ কেড়ে নেয়া কবিরা গুনাহ।
এই ব্যাখ্যাটি কুরআনের আয়াত ও ইসলামি উত্তরাধিকার বিধানের মূলনীতি অনুসারে সংক্ষেপে ও সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রিয়, ভাই আশা করি সুরা নিসা আয়াত নং ১২ আপনকে বুঝাতে পেরেছে। ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ।
৩. প্রশ্ন: আকীদা আগে না হুকুমত আগে?
উত্তর:
আকীদা আগে, কারণ সঠিক বিশ্বাস (আকীদা) ছাড়া কোনো আমল (হুকুমত বা শরীয়তের বিধান) আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
মক্কা মোকাররমার প্রসিদ্ধ দারুল হাদিসে এক আলোচনায় বিশ্ব বরেণ্য ইসলামি চিন্তাবিদ প্রখ্যাত শায়খ মুহাম্মাদ কুতুব অতি গুরুত্বপূর্ণ এ প্রশ্নটির জবাব দিয়েছিলেন, আমরা এখানে সে উত্তরটি সম্মনীত পাঠক সমীপে উপস্থাপন করছি।
তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিলঃ বর্তমানে কিছুলোক বলে থাকেন, ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হলে ইসলাম পুনরুজ্জীবিত হত। আবার অন্যেরা বলেন: ইসলাম আবারো তাজা হবে যদি আকীদাকে সহিহ করার মেহনত করা হয় এবং জামাআত সুসংগঠিত করা হয়। এর কোনটা সত্য?
উত্তরে তিনি উল্টা প্রশ্ন করে বলেছিলেনঃ দুনিয়ার বুকে ইসলামি হুকুমত কায়েম হবে কোত্থেকে যদি না দায়ীরা মানুষের আকীদা সংশোধন করেন, সত্যিকারের ঈমানের প্রশিক্ষণ দান করেন, দ্বীনের ব্যাপারে পরীক্ষা করা হলে সবর করেন এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেন? উপরোক্ত বিষয়গুলোর পূর্ণতার পরই দুনিয়ায় দ্বীন মোতাবেক শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। এটাতো খুবই পরিস্কার ব্যাপার। হুকুমত কখনই আকাশ থেকে অবতীর্ণ হবে না, কেউ তা অবতীর্ণ করাতেও পারবে না। হ্যাঁ, সকল জিনিসই আকাস থেকে আসে, কিন্তু তা আসে ত্যাগ তিতিক্ষা ও কষ্ট-মেহনতের মাধ্যমে। এর জন্য আল্লাহ বান্দাদের উপর মেহনত ফরয করে দিয়েছেন।
আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতেন, কিন্তু তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। (সূরা মুহাম্মাদ: আয়াত ৪)
তাই আমাদের শুরু করতে হবে আকীদা সহিহ করার মাধ্যমে। এবং এ সমাজকে গঠন করে তুলতে হবে সত্যিকারের আকীদার উপর। যারা মেহনত শুরু করবে তারা অবশ্যই পরীক্ষার সম্মুখীন হবে, তাদেরকে সে পরীক্ষার উপর সবর করতে হবে। যেমনটি সবর করেছিলেন প্রথম যামানায় সাহাবায়ে কেরাম।
৪. প্রশ্ন: আলেমরা কেন জাহান্নামে যাবে?
উত্তর:
আলেমরা কয়েক ভাগে বিভক্ত-
১। প্রথম দল:
তারা তাওহিদের মর্ম কথা, প্রয়োজনীয়তা ও তার শ্রেণী বিন্যাসকে যথাযথভাবে বুঝেছেন। পাশাপাশি তাকে বিনষ্টকারী- শিরকের প্রকৃতি, ক্ষতিকর দিকসমূহ ও তার শ্রেণী-বিভাগ সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন। এরপর সঠিক নিয়মে সে সব বিষয়ে মানুষদেরকে অবহিত করছেন নিরলসভাবে। এ ক্ষেত্রে তারা কুরআন ও সহিহ হাদিসকেই রেফারেন্স হিসাবে গ্রহণ করেছেন। ফলে, নবীদেরকে যেমন মিথ্যা অপবাদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রতিঃনিয়ত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, বাধা-বিপত্তি, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। তবে তারা আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করেছেন নবীদেরকে তাই সহ্য করে চলেছেন শত বাধা ও নির্যাতন। দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছেন আল্লাহর যমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার পূণ্যময় মহান কাজে। কোনোভাবেই কর্তব্য-কাজ হতে বিরত হচ্ছেন না মুহূর্তের জন্যও।
তাদের পাথেয় হচ্ছে আল্লাহ তাআলার মহান বাণী,
“আর তারা যা বলে, তাতে তুমি ধৈর্য্য ধারণ কর এবং সুন্দরভাবে তাদেরকে পরিহার করে চল।”
(সূরা মুযযাম্মিল: আয়াত ১০)
লুকমান (আঃ) তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন,
“হে আমার প্রিয় সন্তান, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ কর এবং তোমার উপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য্য ধর। নিশ্চয় এগুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ।”
(সূরা লুকমান: আয়াত ১৭)
২। দ্বিতীয় দল:
যারা ইসলামের মূল ভিত্তি তাওহিদের দিকে দাওয়াত দেয়াকে খুব বেশী গুরুত্ব দেন না। তারা ঘুরে ফিরে মানুষকে আকিদাহ-বিশ্বাস সহিহ না করেই সালাত, ইসলামী রাষ্ট্র গঠন ও জিহাদের দিকে ডাকে। মনে হয় তাঁরা আল্লাহ তাআলার সে বাণীটি শুনেননি, যাতে তিনি শিরক সম্বন্ধে সতর্ক করে বলেছেন,
“যদি তারা শিরকে প্রবৃত্ত হয়, তাহলে তারা যত আমলই করুক না কেন নষ্ট হয়ে যাবে।”
(সূরা আনআম: আয়াত ৮৮)
যদি তারা নবী-রাসূলদের অনুসরণ করে তাওহিদকে অগ্রাধিকার দিতেন তাহলে তাদের দাওয়াত জয়যুক্ত হত এবং আল্লাহ তাদের সাহায্য করতেন, যেমন সাহায্য করেছিলেন তিনি নবী-রাসূলদের।
আল্লাহ বলেন,
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে যমীনের প্রতিনিধিত্ব প্রদান করবেন… তারা আমারই ইবাদাত করবে, আমার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না।…”
(সূরা নূর: আয়াত ৫৫)
৩। তৃতীয় দল:
আলেমদের মধ্যে তৃতীয় একটি দল আছে, তারা মানুষের শত্রুতার ভয়ে অথবা চাকরির ভয়ে কিংবা নিজেদের পজিশন নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাওহিদের দাওয়াত দেন না এবং শিরকের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করেন না। আল্লাহ তাআলা দ্বীনের তাবলীগ করার জন্য তাদেরকে যে ইলম ও মেধা দান করেছেন তা তারা গোপন করে রাখছেন।
আল্লাহ বলেন,
“নিশ্চয় যারা গোপন করে সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ ও হিদায়াত যা আমি নাযিল করেছি, কিতাবে মানুষের জন্য তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পর, তাদেরকে আল্লাহ লা’নত করেন এবং লা’নতকারীগণও তাদেরকে লা’নত করে।”
(সূরা বাকারা: আয়াত ১৫৯)
আল্লাহ বলেন,
“যারা আল্লাহর রিসালাতকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, এবং তাঁকে ভয় করে। আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেই ভয় করে না।”
(সূরা আহযাব: আয়াত ৩৯)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,
“যে ইলম গোপন রাখবে, আল্লাহ কিয়ামত দিবসে তার মুখে আগুনের লাগাম পরাবেন।”
(আহমদ, সহিহ)
৪। চতুর্থ দল:
এমন আলেম যারা বলেন, নবী, আউলিয়া ও মৃতদের কাছে দোয়া করা জায়েয। তারা মনে করেন, কুরআনের শিরক সম্পর্কিত আয়াতগুলো কেবল মুশরিকদের জন্য প্রযোজ্য। তারা ভুলে যান-
আল্লাহ বলেন,
“যারা ঈমান এনেছে এবং স্বীয় ঈমানকে যুলম (শিরক)-এর সাথে মিশ্রণ করেনি। তাদের জন্য রয়েছে নিরাপত্তা এবং তারাই হেদায়েত প্রাপ্ত।”
(সূরা আনআম, ৬:৮২)
এরা কবরের চারপাশে তাওয়াফ করা, নযর-মানত দেওয়া, ওলী-আউলিয়াদের নামে কসম খাওয়া ইত্যাদি মুবাহ করে। অথচ রাসূল (সা.) বলেন,
“আমি আমার উম্মতের জন্য বিপথগামীকারী ইমাম ও নেতৃবর্গের আশঙ্কা করছি।”
(তিরমিযি, সহিহ)
৫। পঞ্চম দল:
এমন আলেম যারা নিজেদের বুজুর্গদের কথা মানে, কিন্তু আল্লাহর হুকুম মানে না। তারা রাসূল (সা.)-এর এ হাদীস অমান্য করেন,
“স্রষ্টার অবাধ্যতার কাজে সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না।”
(আহমাদ, সহিহ)
আল্লাহ বলেন,
“যেদিন তাদের চেহারাগুলো আগুনে উপুড় করে দেয়া হবে, তারা বলবে, ‘হায়, আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম এবং রাসূলের আনুগত্য করতাম।’ তারা আরো বলবে, ‘হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নেতৃবর্গ ও বিশিষ্ট লোকদের আনুগত্য করেছিলাম, তখন তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল।’…”
(সূরা আহযাব: আয়াত ৬৬-৬৮)
ইবনে কাসির (রহ.) বলেনঃ “আমরা নেতাদের ও বড় বড় বুজুর্গদের অনুসরণ করেছিলাম আর বিরোধিতা করেছিলাম রাসূলদের। এবং এ ধারণা পোষণ করেছিলাম যে, নিশ্চয়ই তাঁদের কাছে কিছু আছে এবং তারাও কোনো কিছুর উপর আছে। কিন্তু এখন দেখছি তারা কোনো কিছুরই উপর নেই।”
৫. প্রশ্ন: ইমাম আবু দাউদ (র) কবে ও কোথায় জন্ম গ্রহণ করেন?
উত্তর:
নাম-সুলায়মান, উপাধি-আবূ দাউদ, পুরো নাম- সুলায়মান ইবনে আশআছ সিজিস্তানী। তাঁর জন্মভূমি কান্দাহারের নিকটবর্তী সিজিস্তান। তিনি ২০২ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষা ও হাদিস অনুসন্ধানার্থে ইমাম আবু দাউদ (র) বহু দেশ সফর করেন। ইরাক, খোরাসান, সিরিয়া, হিজাজ, মিসর ও আরবের অন্যান্য দেশের মুহাদ্দিসগণের নিকট তিনি হাদিস শুনেছেন। তিনি ইমাম বুখারী (র)-এর সমসাময়িক। তাঁর প্রসিদ্ধ উস্তাদ হলেন- ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (র), ইবনে মুঈন (র), উসমান ইবনে আবূ শাইবা (র), কুতাইবা (র), কানাবী (র) ও তায়ালুসী (র) প্রমুখ। ইমাম আবু দাউদ (র) তাঁর উস্তাদগণের থেকে পাঁচ লাখ হাদিস লিখেন। ইমাম তিরমিযি (র), ইমাম নাসায়ি (র) ও ইমাম আহ্মাদ ইবনে খিলাল (র) তাঁর নিকট হাদিস শুনেছেন। তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ লু’লুভী ইবনুল আরাবি এবং ইবনে ওয়াসা (র) প্রমুখ তাঁর মশহুর শিষ্য।
ইমাম আবূ দাউদ (র) ছিলেন উঁচুস্তরের হাদিসের হাফিয। ইবাদাত, আত্মশুদ্ধি ও ফাত্ওয়ার অলংকার দ্বারা তাঁর জীবন ছিল সুসজ্জিত। বহুবার বাগদাদ এসেছিলেন। বসরায় তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। ১৫ শাওয়াল ২৭৫ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব হলো সুনানে আবু দাউদ ও মারাসীল।
৬. প্রশ্ন: ইমাম ইবনে মাজাহ (র) কবে ও কোথায় জন্ম গ্রহণ করেন?
উত্তর:
নাম-মুহাম্মাদ, উপনাম-আবূ আব্দুল্লাহ, পুরো নাম- মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মাজাহ আল-কাযভীনী। দাইলাম এলাকার কাযভীন তাঁর বাসভূমি। তাঁর জন্ম ২০৯ হিজরিতে। হাদিস সন্ধানের অদম্য আগ্রহে তিনি ইরাক, বসরা, কুফা, বাগদাদ, সিরিয়া, মিসর ও হিজায যান এবং অসংখ্য হাদিস লিখেন। তিনি হাদিসের ইমাম এবং বিখ্যাত হাফিয ছিলেন। জাব্বরাহ ইবনুল মুগাল্লিস (র) প্রমুখ থেকে তিনি হাদিস শ্রবণ করেছেন। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে আবুল হাসান কাত্তান (র) ও ঈসা ইবনে আবহার (র) প্রমুখ প্রসিদ্ধ।
তাঁর গুরুত্বপূর্ণ লেখা হলো সুনানে ইবনে মাজাহ, যা সিহাহ সিত্তাহর অন্তর্ভুক্ত। এ কিতাবটির ব্যাপক চর্চা হচ্ছে। এ কিতাবটি বিশ্বের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমানভাবে সমাদৃতও হয়েছে। তিনি ২৭৩ হিজরির ২২ রমযান ইন্তেকাল করেন।
হাদিস বিজ্ঞানের আরো দু’জন মহামনীষী হলেন- ইমাম নাসায়ি ও ইমাম ইবনে মাজাহ (র)। তাঁদের দু’জনের সংকলিত দু’খানি গ্রন্থ ও সিহাহ সিত্তার অন্তর্ভুক্ত।
৭. প্রশ্ন: আধুনিক শিক্ষা ও লেখাপড়া সম্পর্কে ইসলাম কি বলে?
উত্তর:
বর্তমান যুগের পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞান, যেমন-
- স্বাস্থ্য বিজ্ঞান;
- চিকিৎসা বিজ্ঞান;
- প্রকৌশল বিজ্ঞান;
- অর্থ বিজ্ঞান;
- রাষ্ট্র বিজ্ঞান;
- কৃষি বিজ্ঞান;
- প্রাণী বিজ্ঞান;
- উদ্ভিদ বিজ্ঞান;
- বিদ্যুৎ বিজ্ঞান;
- ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞান;
- নক্ষত্র বিজ্ঞান;
- মনস্তত্ব বিজ্ঞান;
ইত্যাদি বিষয়গুলি শিক্ষা করা। যদি ইসলামের উৎকর্ষ সাধন ও মানব কল্যাণের উদ্দেশ্যে হয় তাহলোে তা বৈধ, কেননা ভাল উদ্দেশে তা শিক্ষা করা হচ্ছে।
এর বিপরীত কোন মন্দ উদ্দেশ্যে এগুলি শিক্ষা করা বৈধ নয়। ফেকাহর পরিভাষায় এগুলিকে ‘হারাম লিগাইরিহী’ বলে ৷ ‘হারাম লি আইনিহী’ নয় অর্থাৎ, প্রকৃত প্রস্তাবে এগুলি নিজে হালাল, জায়েয ও মোবাহ, কিন্তু অন্য হারাম কাজের ওছীলা ও মাধ্যম হওয়ার কারণে তা হারাম হয়ে যায়।
পক্ষান্তরে উদ্দেশ্য ভাল হলোে এগুলিই তখন অনেক নেকীর কাজে পরিণত হয়।
যদি কেউ ইঞ্জিনিয়ারিং শিখে সততা সহকারে মানব সমাজের সেবার মনোবৃত্তি নিয়ে রাস্তা, পুল, ঘর/বাড়ী তৈরী করে মানুষের উপকার করতে পারে, চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষা করে মানুষের সেবা করতে পারে, তাহলোে তা উচ্চ দরের নেকীর কাজ ও ছওয়াবের কাজ হবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
পক্ষান্তরে যদি ইঞ্জিয়ারিং পড়ে চোরামী ধোঁকাবাজী করে, ব্লাক মার্কেটিং করে, আমানতে খেয়ানত করে, মানুষের বাড়ি-ঘর, পুল, রাস্তা ইত্যাদি নষ্ট করে খারাপ কাজ করে দেয় ও চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়ে গরীব রোগীদের সেবার পরিবর্তে শুধু অর্থগৃধুতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে গরীবদের রক্ত শোষণ এবং গরীবদের প্রতি দুর্ব্যবহার করে, নতুন আবিষ্কারের মেশিন দ্বারা নিরীহ মানুষদের হত্যা করে, অর্থ শোষণ করে তাদেরকে কঙ্কালসার করে দেয়, তবে সেটা কুরআন হাদীসের সাধারণ সূত্র অনুসারে হারাম হবে, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
৮. প্রশ্ন: আকাইদ/আকাঈদ শব্দের অর্থ কি? আকাইদ কি বা কাকে বলে?
উত্তর:
আকাইদ আরবি শব্দ। এটি বহুবচন। এর অর্থ হচ্ছে বিশ্বাসমালা। এর একবচন হলো আকিদাহ, যার অর্থ বিশ্বাস।
আাকাইদ কি বা কাকে বলে: ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের প্রতি বিশ্বাসকেই আকাইদ বলে। যেমন – আল্লাহ, নবী-রাসূল, ফেরেশতা, আসমান কিতাব, আখিরাত, তকদির ইত্যাদির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।
মোটকথা, ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করা এবং তদনুযায়ী চলাকে আকাইদ বলে।
৯. প্রশ্ন: হযরত মুহাম্মদ স. এর কত জন ছেলে-মেয়ে বা সন্তান ছিল?
উত্তর:
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মোট ৭ জন সন্তান ছিলেন। তাঁদের মধ্যে-
কন্যা সন্তান (৪ জন):
- জাইনাব (রাঃ)
- রুকাইয়া (রাঃ)
- উম্মে কুলসুম (রাঃ)
- ফাতিমা (রাঃ)
পুত্র সন্তান (৩ জন):
- কাসিম (রাঃ)
- আবদুল্লাহ (তাইয়িব/তাহির রাঃ)
- ইব্রাহিম (রাঃ)
তাঁর সমস্ত পুত্র শিশু বয়সেই ইন্তেকাল করেন। আর কন্যাদের মধ্যে শুধু ফাতিমা (রাঃ) তার হযরত মুহাম্মদ স. এর মৃত্যুর পরেও কিছুদিন জীবিত ছিলেন।
১০. প্রশ্ন: বইপুস্তকে পা লাগলে কি সালাম করা জায়েজ?
উত্তর:
সালাম করা জায়েজ নয়। “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা, মানে মহান আল্লাহ’র কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। কেননা এটা অনিচ্ছাকৃত হয়েছে।
বই পায়ে পড়লে বা মাটিতে পড়লে সালাম করার কোনো বিধান নেই। সালাম করার নির্দিষ্ট ক্ষেত্র আছে, মানুষকেই কেবল সালাম করতে হয়, তাও মৌখিকভাবে। অন্য কোনো পদ্ধতিতে সালাম করা জায়েজ নেই।
বইকে সালাম করা যাবে না। এমনকি অসতর্কতাবশত কুরআন মাজিদও যদি হাত থেকে পড়ে যায়, তবুও সালাম করা কিংবা সমাজে প্রচলিত কোনো কাজ করার দরকার নেই। বরং এজন্য ইস্তিগফার তথা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে।
(রেফারেন্স: ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪ঃ৬০; তালিফাতে রশিদিয়া ২২১)
১১. প্রশ্ন: কাযা নামায আদায়ের নিয়ম কি?
উত্তর:
কোন লােক যদি ভুলবশত কিংবা অন্য কোন শরীয়তের অসুবিধার করনে নামাযের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কোন নামায আদায় করতে না পরে তখন ঐ নামায পরবর্তী সময় আদায় করে নেয়াকে কাযা নামায বলে।
শরীয়তের বিধান মতে ফরয ও ওয়াজিব নামাযের কাযা আদায় করতে হয়। সুন্নাত নামাযের কাযা আদায় করতে হয় না। তবে ফজর নামাযের কাযা যদি ঐ দিন দুপুরের মধ্যে আদায় করে নেয়া হয়, তখন সুন্নাতেরও কাযা আদায় করতে হবে। যদি যােহরের ওয়াক্ত এসে যায়, তবে শুধু ফজরের কাযা আদায় করবে। তবে অবশ্যই শতর্ক থাকতে হবে যদি নামাজ কাযা হয়ে যায় তা সাথে সাথে আদায় করে নিবে। কারণ মানুষের মৃত্যু যে কোন সময় হতে পারে।
বন্ধুরা, আজকের মত এখানেই শেষ করছি। ইসলামের শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখুন এবং নিজের জীবনে এর প্রতিফলন ঘটান। ‘ইনফরমেশন বাংলা’ এর সাথেই থাকুন।


