বেলারুশ কাজের ভিসার বাস্তবতা

অনেকেই বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে পাড়ি জমাতে চান। সেই স্বপ্নের তালিকায় ইদানীং বেলারুশ একটি আলোচিত নাম। তবে বেলারুশে যাওয়ার পথটি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা অনেকটা ভিন্ন এবং বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। একজন প্রবাসীর বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বেলারুশ যাওয়ার আদ্যোপান্ত এখানে তুলে ধরা হলো।
১. দালালের খপ্পর ও প্রাথমিক প্রতারণা
বিদেশে যাওয়ার প্রথম ধাপেই অনেকে দালালের খপ্পরে পড়েন। বেলারুশ যাওয়ার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় না। অনেকে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে ঢোকার স্বপ্ন নিয়ে দালালের হাতে টাকা তুলে দেন।
- মিথ্যা আশ্বাস: অনেক সময় দালালরা ভুয়া কাজের ভিডিও বা ভুয়া সার্টিফিকেট (যেমন: কনস্ট্রাকশন ডিপ্লোমা) তৈরি করে দেয়।
- আর্থিক ক্ষতি: দেখা যায়, দালাল কয়েক লাখ টাকা নিয়ে অন্য দেশে পালিয়ে যায় বা ফোন ধরা বন্ধ করে দেয়। এই দোটানার মধ্যেই অনেকে জমি-জমা বিক্রি করে বা ধারদেনা করে প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ টাকা খরচ করে ফেলেন।
২. ঢাকা থেকে বেলারুশ যাত্রা
বেলারুশ যাওয়ার প্রক্রিয়াটি অন্যান্য দেশের মতো অতটা সহজ নয়। এখানে অনেক সময় সরাসরি স্টিকার ভিসা পাওয়া যায় না, বরং কোম্পানির ইনভাইটেশন লেটার বা আমন্ত্রণপত্রের মাধ্যমে যেতে হয়।
- এয়ারপোর্ট কন্ট্রাক্ট: অনেক ক্ষেত্রে এয়ারপোর্ট কন্ট্রাক্ট ছাড়া যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনে নানা জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়।
- ট্রানজিট ও ডলারের বাধ্যবাধকতা: দুবাই বা অন্য কোনো দেশে ট্রানজিট থাকলে সেখানে পর্যাপ্ত ডলার (কমপক্ষে ১০০০ ডলার) সাথে রাখতে হয়। অন্যথায় এয়ারপোর্ট থেকেই ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্ট) ঝুঁকি থাকে।
- মালামাল হারানোর ভয়: ফ্লাইটে বিলম্ব বা ইমিগ্রেশন জটিলতার কারণে অনেক সময় বুকিং দেওয়া মালামাল হারিয়ে যায় বা সময়মতো পাওয়া যায় না।
৩. বেলারুশ এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন ও ভিসা প্রক্রিয়া
বেলারুশ এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর আসল পরীক্ষা শুরু হয়। সেখানে অন-অ্যারাইভাল ভিসার জন্য আবেদন করতে হয়।
- কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ: ভিসা অফিসাররা দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তারা ফোন চেক করেন, বিশেষ করে WhatsApp বা Messenger চেক করে দেখেন যে ইউরোপের অন্য কোনো দেশের (সেনজেন ভুক্ত) দালালের সাথে যোগাযোগ আছে কি না।
- কোম্পানির গ্যারান্টি: কোম্পানি যদি এয়ারপোর্টে বা ফোনে গ্যারান্টি না দেয়, তবে ভিসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অনেক সময় ১৮ দিনের প্রাথমিক ভিসা দেওয়া হয়, যা পরে এক বছরের জন্য বৃদ্ধি করা যায়।
৪. বেলারুশের আবহাওয়া ও জীবনযাত্রা
বেলারুশে নামার পর প্রথম যে ধাক্কাটি আসে, তা হলো সেখানকার প্রচণ্ড শীত।
- তীব্র শীত: এখানকার শীত বাংলাদেশের মানুষের জন্য সহ্য করা কঠিন। হাড়কাঁপানো ঠান্ডার সাথে কনকনে বাতাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
- থাকা ও খাওয়া: সাধারণত কোম্পানি থাকার জায়গা দেয়, তবে খাওয়ার খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়। মাসে খাওয়া বাবদ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হতে পারে।
৫. কাজের ধরন ও আয়ের সুযোগ
অনেকে ‘স্কিলড ওয়ার্কার’ হিসেবে গেলেও সেখানে গিয়ে সাধারণত সাধারণ শ্রমিকের কাজই করতে হয়।
- কাজের প্রকৃতি: কনস্ট্রাকশন সাইটে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা মালামাল টানার মতো কাজ করতে হয়। দক্ষ কাজগুলো সাধারণত স্থানীয়রাই করে থাকে।
- বেতন: যারা নতুন, তাদের বেতন সাধারণত ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার আশেপাশে হয়। তবে কয়েক মাস পুরনো হয়ে গেলে এবং ওভারটাইম করলে ১ লাখ টাকার উপরেও আয় করা সম্ভব।
৬. বেলারুশ থেকে ইউরোপের অন্য দেশে (সেনজেন) যাওয়া
অনেকের মূল লক্ষ্য থাকে বেলারুশ হয়ে পোল্যান্ড বা অন্য কোনো সেনজেন দেশে ঢোকা। কিন্তু বাস্তবে এটি অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল।
- বিপুল খরচ: বেলারুশ থেকে অন্য দেশে মুভ করতে হলে ৬ থেকে ৭ হাজার ইউরো (প্রায় ৮-১০ লাখ টাকা) প্রয়োজন হয়।
- নিরাপত্তা ঝুঁকি: বর্ডারে মাফিয়া বা দালালদের দৌরাত্ম্য থাকে। যদিও বেলারুশের ভেতরে রাস্তাঘাটে মাফিয়া নেই, তবুও বর্ডার পার হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
- বৈধ পথ: এখানে ৫-৭ বছর থাকলে স্থায়ী নাগরিকত্বের সুযোগ থাকে, যা পেলে পরবর্তীতে ইউরোপের যেকোনো দেশে বৈধভাবে যাওয়া যায়।
৭. নতুনদের জন্য পরামর্শ
যারা বর্তমানে বেলারুশ যাওয়ার চিন্তা করছেন, তাদের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ-
- শীতকাল এড়িয়ে চলুন: শীতের সময় বেলারুশে কাজের সুযোগ কম থাকে এবং আবহাওয়া অত্যন্ত প্রতিকূল থাকে। তাই এই সময়ে না যাওয়াই ভালো।
- সঠিক তথ্য যাচাই: দালালের কথায় অন্ধবিশ্বাস না করে সব কাগজপত্র নিজে যাচাই করুন।
- প্রয়োজনীয় নথিপত্র: পাসপোর্ট, ছবি এবং প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট সব সময় সাথে রাখুন। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সেরও প্রয়োজন হয়।
বেলারুশ প্রবাস জীবন মানেই প্রচুর কষ্ট আর হাড়ভাঙা খাটুনি। তবে ধৈর্য ধরে থাকতে পারলে এবং ভালো কোম্পানিতে কাজ পেলে এখান থেকে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব। শুধুমাত্র হুজুগে পড়ে বা দালালের খপ্পরে পড়ে নিশ্চিত না হয়ে বেলারুশ যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
বেলারুশ সম্পর্কিত আপনার আর কোনো তথ্য বা সাহায্যের প্রয়োজন থাকলে নির্দ্বিধায় জিজ্ঞাসা করতে পারেন। আপনার প্রবাস যাত্রা শুভ হোক!





