আল্লাহ ‘কুন ফায়াকুন’ বলেই মুহূর্তে কিছু ঘটাতে পারেন, তাহলে তিনি কেন পৃথিবীকে ৬ দিনে সৃষ্টি করলেন?

প্রশ্ন: আল্লাহ যখন কোন কার্য সম্পাদনের সিন্ধান্ত নেন তখন তিনি বলেন, ‘হয়ে যাও’ আর তৎক্ষণাৎ তা হয়ে যায়। তাহলে আকাশ এবং পৃথিবী সৃষ্টিতে তাঁর ৬ দিন (period) লাগলো কেন?
ব্যাখ্যা:
হ্যাঁ।
কুরআনে সত্যিই আল্লাহর ব্যাপারে বলা হয়েছে,
“যখন তিনি কোন কিছু ইচ্ছা করেন, তখন তিনি বলেন ‘হও’, আর তা সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যায়।”
— সূরা ইয়াসীন, ৩৬:৮২
অন্যদিকে কুরআনের বহু স্থানে বলা হয়েছে যে,
“নিশ্চয়ই আমি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছি।”
— সূরা ক্বাফ, ৫০:৩৮
তাহলে প্রশ্ন ওঠে — “আল্লাহ যখন কোন কার্য সম্পাদনের সিন্ধান্ত নেন তখন তিনি বলেন, ‘হয়ে যাও’ আর তৎক্ষণাৎ তা হয়ে যায়। তাহলে আকাশ এবং পৃথিবী সৃষ্টিতে তাঁর ৬ দিন (period) লাগলো কেন?”
আকাশ এবং পৃথিবী সৃষ্টিতে তাঁর ছয় দিন লাগেনি, আকাশ এবং পৃথিবীর লেগেছে ছয় দিন/পর্যায় এবং এই ছয় দিন/পর্যায় মানুষের perception অনুসারে। আল্লাহর কাছে কোন সময় নেই। তিনি সময়ের বাইরে। যখন কোন সত্তা সময়ের বাইরে চলে যায়, সময়ের সংজ্ঞা অনুসারে সেই সত্তা একই সাথে, একই মুহূর্তে পুরো সময়টা দেখতে পায়। সুতরাং তাঁর নির্দেশগুলো আসে এক ‘মুহূর্তে’, সময়ের ‘বাইরে’ থেকে এবং সেই নির্দেশগুলো সৃষ্টি জগতের মধ্যে কার্যকর হয় সৃষ্টি জগতের নিয়ম শৃঙ্খলা অনুসরণ করে। Space and Time হচ্ছে সৃষ্টি জগতের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।
সোজা বাংলায়, আল্লাহ যখন কোন কিছু সৃষ্টি করেন, তিনি বলেন হও এবং তা হয়ে যায়। তাঁর মানে এই না যে, তিনি বলেন হও, আর তা মানুষ যেভাবে সময়কে দেখতে পায়, সেই সময় অনুসারে তৎক্ষণাৎ হয়ে যায়।
বরং আল্লাহ যদি কখনও বলতেন তাঁর কিছু করতে সময় লাগে, তাহলে সেটা বিরাট ভুল হত কারণ সময়ের স্রস্টার ‘নিজে’ কিছু করতে সময় লাগে – এটা অবাস্তব।
১. সময় বা ‘ছয় দিন’ মানুষের বোধগম্যতার জন্য
আল্লাহ সময়ের বদ্ধ নন। কুরআনের ‘ছয় দিন’ (আরবি: সিত্তাতু আইয়ামিন) আমাদের বোঝার সুবিধার জন্য বলা হয়েছে। এটি মানুষের সময়ের দিন নয়— বরং পর্যায় বা ধাপ নির্দেশ করে। অনেক মুফাসসির (যেমন ইবন কাসির, তাবারি) বলেন, “ছয় দিন” বলতে “ছয় ধাপ” বা “ছয় পর্যায়” বোঝানো হয়েছে, যা আল্লাহর জ্ঞানের পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে।
২. ধৈর্য, পরিকল্পনা ও ক্রমবিকাশের শিক্ষা
আল্লাহ মুহূর্তেই সব করতে পারেন, কিন্তু তিনি চান তাঁর সৃষ্টি থেকে শিক্ষা হোক।
“সব কিছুই একটি নির্দিষ্ট পরিমাপে সৃষ্টি করা হয়েছে।”
— সূরা আল-কামার, ৫৪:৪৯
অর্থাৎ, আল্লাহ আমাদের শেখাতে চেয়েছেন যে কাজ ধীরে, পরিকল্পিতভাবে, ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়। এভাবেই তিনি বিশ্বে “ব্যবস্থা ও শৃঙ্খলা” প্রতিষ্ঠা করেছেন।
৩. ‘কুন ফায়াকুন’ মানে সঙ্গে সঙ্গে ফল নয়, বরং আল্লাহর আদেশ অবধারিত
‘কুন ফায়াকুন’ এর অর্থ এই নয় যে সময়ই লাগে না — বরং এর মানে, আল্লাহর আদেশ হলে সেটি অবশ্যই বাস্তবায়িত হয়, সময় যাই লাগুক না কেন। যেমনঃ মানুষের সৃষ্টি আল্লাহর আদেশে হয়েছে, কিন্তু গর্ভধারণ থেকে জন্ম পর্যন্ত সময় লাগে। তবুও তা আল্লাহর আদেশেই ঘটে।
৪. আল্লাহ সময়ের বাইরে, আমরা সময়ের ভিতরে
আল্লাহর জন্য সময়ের ধারণা নেই। তিনি সময়ের স্রষ্ঠা, সময় তারই একটি সৃষ্টি। “৬ দিন” মানে আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এক ক্রমান্বিত সৃষ্টির বিবরণ। তাঁর কাছে “এক দিন” হতে পারে “হাজার বছর” বা “পঞ্চাশ হাজার বছর”-এর সমান (সূরা হাজ্জ ২২:৪৭, সূরা মা’আরিজ ৭০:৪)।









