নোটারি পাবলিক কী, কীভাবে করবেন এবং এর আইনি গুরুত্ব

বাংলাদেশে নোটারি পাবলিকের বিষয়টি অনেকের কাছে একটু রহস্যময় মনে হয়। অনেকে জানতে চান যে এটা আসলে কী, কোথায় করতে হয়, কখন দরকার পড়ে এবং এর আইনি ক্ষমতা কতটা। বিশেষ করে যারা চুক্তি, বিবাহ, তালাক বা বিদেশ যাত্রার জন্য ডকুমেন্ট তৈরি করছেন, তাদের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্লগ পোস্টে আমরা সবকিছু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব, যাতে পাঠকরা সহজেই বুঝতে পারেন।
এই পোস্টটি লিগাল সাপোর্ট বাংলাদেশ চ্যানেলের পক্ষ থেকে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাকির হোসেনের আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেছেন যে লোকেরা নোটারি অ্যাফিডেভিট নিয়ে অনেক প্রশ্ন করে থাকেন। আমরা সেই তথ্যগুলোকে ভিত্তি করে এখানে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেব, এবং কিছু অতিরিক্ত তথ্য যোগ করে পোস্টটিকে আরও সমৃদ্ধ করব।
(১) নোটারি পাবলিক কী?
নোটারি পাবলিক হলো বাংলাদেশ সরকারের দ্বারা নিবন্ধিত এবং অনুমোদিত একজন ব্যক্তি। তিনি ডকুমেন্টগুলোকে সত্যায়িত করেন, যাতে সেগুলো আইনি মর্যাদা পায়। নোটারি হলো একটা সাইন এবং সিল, যা সরকারের দ্বারা অনুমোদিত। সবাই চাইলেও নোটারি করতে পারেন না; শুধুমাত্র যাদেরকে সরকার ইমপাওয়ার করেছে, তারাই এটা করতে পারেন।
এটা মূলত একটা সত্যায়ন প্রক্রিয়া। যখন কোনো ডকুমেন্ট নোটারাইজ হয়, তখন সেটা অরিজিনাল রাষ্ট্রীয় ডকুমেন্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশের নোটারি অ্যাক্ট ১৯৬১ অনুসারে, নোটারি পাবলিকরা অ্যাফিডেভিট, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, চুক্তি ইত্যাদি সত্যায়িত করতে পারেন। এর ফলে ডকুমেন্টগুলো আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
অনেকে ভাবেন যে নোটারি শুধু একটা স্ট্যাম্প। কিন্তু না, এটা অনেক বেশি। এটা ডকুমেন্টের সত্যতা নিশ্চিত করে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথ সুগম করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো চুক্তি নোটারাইজ না হয়, তাহলে পরবর্তীতে বিবাদ হলে প্রমাণ করা কঠিন হয়।
(২) নোটারি পাবলিকের ক্ষমতা কতটা?
নোটারি পাবলিকের ক্ষমতা সরকারের দ্বারা নির্ধারিত। যেহেতু সরকার তাদেরকে রেজিস্টার করে এবং ইমপাওয়ার করে, তাই নোটারির পাওয়ার আছে। এটা দিয়ে আপনি আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন।
বাংলাদেশে নোটারি পাবলিকরা অ্যাফিডেভিট নেওয়া, ওথ অ্যাডমিনিস্টার করা, ডকুমেন্ট সত্যায়িত করা ইত্যাদি করতে পারেন। এর ক্ষমতা এমন যে, নোটারাইজড ডকুমেন্ট আদালতে স্বীকৃত হয়। যদি কোনো চুক্তি ভায়োলেট হয়, তাহলে নোটারাইজড পেপার দিয়ে মামলা করা যায়।
অনেকে জিজ্ঞাসা করেন যে নোটারি দিয়ে কোনো কাজ হয় কি না। অ্যাডভোকেট জাকির বলেছেন যে এটা ভুল ধারণা। নোটারি সরকারি রেজিস্টার্ড এবং এর মাধ্যমে কনফার্মেশন দেওয়া হয় যে কাজটা সম্পাদিত হয়েছে এবং এর আইনি ভিত্তি আছে। উদাহরণস্বরূপ, পার্টনারশিপ চুক্তি বা বিবাহ সার্টিফিকেট নোটারাইজ করে আইনি সুরক্ষা পাওয়া যায়।
(৩) নোটারি কখন করতে হয়?
নোটারি করতে হয় যখন কোনো ডকুমেন্টকে আইনি মর্যাদা দেওয়া দরকার। যখন আপনি একটা চুক্তি করবেন, তখন নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে স্ট্যাম্পে সাইন করে সম্পাদন করতে হয়।
উদাহরণস্বরূপ, কোর্ট ম্যারেজের ডকুমেন্টে নোটারি দরকার। ডিভোর্সের ক্ষেত্রে ২০০০ টাকার স্ট্যাম্পে নোটারি করতে হয়। অংশীদারিত্ব চুক্তি বা যেকোনো চুক্তিতে এটা ম্যান্ডেটরি।
যদি কেউ স্পাউস হিসেবে বিদেশ যাবেন, তাহলে বিবাহ সার্টিফিকেট ফরেন মিনিস্ট্রি এবং ল মিনিস্ট্রিতে অ্যাটেস্ট করতে হবে, এবং তার জন্য নোটারি দরকার। ভবিষ্যতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও নোটারি গুরুত্বপূর্ণ।
(৪) নোটারি কোথায় করতে হয়?
নোটারি করতে হয় বিজ্ঞ আদালতে অথবা নোটারি পাবলিকের কাছে। নোটারি পাবলিকরা সাধারণত কোর্টে বসেন। আপনি বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করে নোটারি করতে পারেন।
বাংলাদেশের যেকোনো জায়গা থেকে নোটারি করা যায়। যেমন, ঢাকায় থেকে চট্টগ্রাম থেকে করতে পারেন, বা উল্টো। কোনো জটিলতা নেই। অনেক জায়গায় নোটারি পাবলিক পাওয়া যায়, বিশেষ করে কোর্ট কমপ্লেক্সে।
আজকাল অনলাইন প্ল্যাটফর্মও আছে, যেমন notarybd.com, যেখানে ডকুমেন্ট অ্যাটেস্ট করা যায়। কিন্তু মনে রাখবেন, অরিজিনাল নোটারির জন্য ফিজিক্যাল প্রেজেন্স দরকার হতে পারে।
(৫) কোন কোন বিষয়ের উপর নোটারি করতে হয়?
নোটারি ম্যান্ডেটরি কয়েকটা বিষয়ে। কোর্ট ম্যারেজ, ডিভোর্স, অংশীদারিত্ব চুক্তি, যেকোনো চুক্তি ইত্যাদিতে নোটারি দরকার।
বিয়ের সার্টিফিকেট বিদেশ যাত্রার জন্য ফরেন মিনিস্ট্রিতে অ্যাটেস্ট করতে হলে নোটারি ম্যান্ডেটরি। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, অ্যাফিডেভিট ইত্যাদিতেও এটা লাগে।
অন্যান্য বিষয়ে যেমন প্রপার্টি ট্রান্সফার, লোন অ্যাগ্রিমেন্ট, ব্যবসায়িক চুক্তি ইত্যাদিতে নোটারি করে সুরক্ষা বাড়ানো যায়। বাংলাদেশের আইনে, নির্দিষ্ট ডকুমেন্টগুলোর জন্য এটা বাধ্যতামূলক।
(৬) নোটারি করার প্রক্রিয়া কী?
নোটারি করতে প্রথমে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি বা অ্যাফিডেভিট তৈরি করতে হয়। উভয় পক্ষ সাইন করবেন, সিল মারবেন। তারপর বিজ্ঞ আইনজীবী অ্যাটেস্ট করবেন।
নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সাইন এবং সিল করে এটা সম্পাদন হয়। এরপর এটা রাষ্ট্রীয় ডকুমেন্ট হয়ে যায়।
বাংলাদেশে নোটারি অ্যাক্ট অনুসারে, নোটারি পাবলিককে সরকার নিয়োগ করে। প্রক্রিয়ায় ফি লাগে, যা ডকুমেন্টের উপর নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ, অ্যাফিডেভিটের জন্য ১০০-৫০০ টাকা হতে পারে।
(৭) অরিজিনাল নোটারি চেক করার উপায়
অরিজিনাল নোটারি বুঝবেন কীভাবে? অরিজিনাল নোটারিতে একটা লাল পেপার থাকবে। তার উপরে বাংলাদেশ সরকারের সিল থাকবে, যা লোহার মাধ্যমে দেওয়া হয়। সিলটা স্পষ্ট দেখা যাবে।
যদি সিল না থাকে বা অস্পষ্ট হয়, তাহলে সন্দেহ করুন। সরকারি সিল ছাড়া নোটারি অরিজিনাল নয়। এছাড়া, নোটারি পাবলিকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর চেক করুন।
বাংলাদেশের ল মিনিস্ট্রির ওয়েবসাইটে নোটারি পাবলিকের লিস্ট পাওয়া যায়। সেখানে ভেরিফাই করতে পারেন।
(৮) নোটারি পরবর্তী জটিলতা এবং প্রতিকার
নোটারি করার পর যদি জটিলতা হয়? যদি ডিভোর্স বা চুক্তি ভায়োলেট হয়, তাহলে নোটারাইজড পেপার দিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এটা খুব শক্ত প্রমাণ হয়।
আপনি মামলা করতে পারেন। নোটারি কনফার্ম করে যে দুই পক্ষ চুক্তি করেছে বা বিবাহ/তালাক হয়েছে। এটা আইনি ভিত্তি দেয়।
যদি কেউ ইগনোর করে, তাহলে আদালতে যান। নোটারি থাকলে কেস স্ট্রং হয়। বাংলাদেশের সিভিল প্রসিডিউর কোড অনুসারে, নোটারাইজড ডকুমেন্ট প্রাইমা ফেসি প্রুফ।
(৯) বিদেশ থেকে নোটারি বা অ্যাটেস্টেশন
বিদেশে থাকলে কী করবেন? যেমন USA থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাংলাদেশে পাঠাতে হলে প্রথমে লোকাল নোটারি পাবলিক দিয়ে নোটারাইজ করুন। তারপর কাউন্টি ক্লার্ক বা স্টেট সেক্রেটারি দিয়ে অথেনটিকেট করুন।
এরপর বাংলাদেশ এম্বাসি বা কনসুলেটে অ্যাটেস্ট করুন। বাংলাদেশে এলে ল মিনিস্ট্রি এবং ফরেন মিনিস্ট্রিতে অ্যাটেস্ট করতে হবে। এটা ম্যান্ডেটরি বিদেশি ডকুমেন্টের জন্য।
অনলাইন নোটারি সার্ভিসও আছে, যেমন onlinenotaryusa.com, কিন্তু বাংলাদেশের আইনে ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন লাগতে পারে। US Embassy in Bangladeshও নোটারিয়াল সার্ভিস দেয়।
(১০) নোটারির ভ্যালিডিটি কতদিন?
নোটারির ভ্যালিডিটি ডকুমেন্টের উপর নির্ভর করে। সাধারণত নোটারাইজড অ্যাফিডেভিটের কোনো এক্সপায়ারি ডেট নেই, যতক্ষণ না ডকুমেন্টের কনটেন্ট অপ্রাসঙ্গিক হয়।
কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে, যেমন SSS বা অন্যান্য অর্গানাইজেশন, নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে পারে। বাংলাদেশে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির জন্য ভ্যালিডিটি স্পেসিফাই করা হয় ডকুমেন্টে। যদি না স্পেসিফাই হয়, তাহলে ইনডেফিনিট।
নোটারি একবার হয়ে গেলে সেটা স্থায়ী প্রমাণ। কিন্তু বিদেশি অ্যাটেস্টেশনের জন্য রিনিউ করতে হতে পারে।
(১১) নোটারি নিয়ে সাধারণ ভুল ধারণা
অনেকে ভাবেন নোটারি কোনো কাজ করে না। অ্যাডভোকেট জাকির বলেছেন যে এটা ভুল। নোটারি সরকারি অনুমোদিত এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য হেল্প করে।
আরেকটা ভুল যে নোটারি শুধু ঢাকায় করতে হয়। না, যেকোনো জেলায় কোর্টে পাওয়া যায়। অনেকে অনলাইন নোটারিকে বিশ্বাস করেন না, কিন্তু সঠিক প্ল্যাটফর্ম হলে এটা বৈধ।
নোটারি অ্যাফিডেভিটকে রেজিস্টার্ড ডকুমেন্টের সাথে গুলিয়ে ফেলেন অনেকে। নোটারি সত্যায়ন করে, কিন্তু রেজিস্ট্রেশন আলাদা প্রক্রিয়া।
(১২) নোটারি করার খরচ এবং টিপস
নোটারির খরচ ডকুমেন্টের উপর নির্ভর করে। ২০২৫ সালে, সাধারণ অ্যাফিডেভিটের জন্য ২০০-৫০০ টাকা, পাওয়ার অব অ্যাটর্নির জন্য বেশি। স্ট্যাম্পের খরচ আলাদা।
টিপস: সবসময় বিজ্ঞ আইনজীবী নিয়ে যান। ডকুমেন্টের কপি রাখুন। অরিজিনাল আইডি নিয়ে যান। যদি বিদেশ থেকে, এম্বাসি চেক করুন।
যদি কোনো সমস্যা হয়, ল মিনিস্ট্রিতে কমপ্লেইন করুন। নোটারি পাবলিকের লাইসেন্স চেক করুন।
(১৩) নোটারি নিয়ে FAQ
প্রশ্ন: নোটারি কি রেজিস্টার্ড ডকুমেন্টের মতো?
উত্তর: না, নোটারি সত্যায়ন করে, রেজিস্ট্রেশন আলাদা। কিন্তু উভয়ই আইনি মর্যাদা দেয়।
প্রশ্ন: বিদেশে নোটারি করা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, লোকাল নোটারি দিয়ে, তারপর অ্যাটেস্টেশন।
প্রশ্ন: নোটারির পর চুক্তি ভায়োলেট হলে কী?
উত্তর: আদালতে যান, নোটারি প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
প্রশ্ন: অনলাইন নোটারি বৈধ?
উত্তর: কিছু প্ল্যাটফর্মে হ্যাঁ, কিন্তু বাংলাদেশে ফুলি অ্যাকসেপ্ট না হতে পারে।
(১৪) উপসংহার
বাংলাদেশে নোটারি পাবলিক একটা গুরুত্বপূর্ণ আইনি টুল। অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জাকির হোসেনের আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে এটা শুধু সাইন নয়, বরং আইনি সুরক্ষা। যদি নোটারি নিয়ে আরও হেল্প লাগে, লিগাল সাপোর্ট বাংলাদেশ চ্যানেলে যোগাযোগ করুন।
আশা করি এই পোস্টটা পড়ে আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর মিলেছে। যদি কোনো তথ্য মিস হয়, কমেন্ট করুন। এই পোস্টটা শেয়ার করুন যাতে অন্যরাও উপকৃত হয়।





