মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যা

মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট বা আবিস (Automated Border Control System) সমস্যা প্রবাসী বাংলাদেশী নাগরিকদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এই সমস্যার কারণে অনেকে পাসপোর্ট নবায়ন বা ই-পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়ায় জটিলতার সম্মুখীন হন। বিশেষ করে ইতালি প্রবাসী বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা প্রায়ই দেখা যায়। এই ব্লগ পোস্টে আমরা এই সমস্যার বিস্তারিত বিবরণ, কারণ, সমাধান এবং প্রতিরোধের উপায় নিয়ে আলোচনা করব। এই পোস্টটি তথ্যবহুল, সহজবোধ্য এবং এসইও অপটিমাইজড, যাতে পাঠকরা সহজেই এই বিষয়ে সঠিক তথ্য পেতে পারেন।
(১) মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট কী?
মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট বলতে এমন একটি পরিস্থিতি বোঝায় যখন একজন ব্যক্তির নামে একই সঙ্গে একাধিক পাসপোর্ট সিস্টেমে সক্রিয় থাকে। সাধারণত, যখন কেউ একটি নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করেন, তখন পুরোনো পাসপোর্টটি সিস্টেমে বাতিল বা রিভোক (Revoke) হয়ে যায়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে, পুরোনো পাসপোর্টটি সিস্টেমে সক্রিয় থেকে যায়, যা সমস্যার সৃষ্টি করে।
যেমন একটি উদাহরণ-
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ২০১৪ সালে প্রথমবার মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) ইস্যু করেছেন। পরবর্তীতে তিনি ২০১৮ সালে পাসপোর্টটি নবায়ন করেন এবং নতুন একটি এমআরপি পান। এই ক্ষেত্রে, প্রথম পাসপোর্টটি সিস্টেমে বাতিল হয়ে যায়, এবং নতুন পাসপোর্টটি সক্রিয় থাকে। কিন্তু যদি তিনি অজান্তে বা কোনো দালালের প্ররোচনায় ভিন্ন নাম বা জন্ম তারিখ ব্যবহার করে আরেকটি পাসপোর্ট ইস্যু করেন, তাহলে সেই পাসপোর্টটিও সিস্টেমে সক্রিয় থাকতে পারে। এটিই মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যা হিসেবে পরিচিত।
(২) কেন মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যা হয়?
মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে কিছু সাধারণ কারণ নিম্নরূপ-
- ভুল তথ্য প্রদান: অনেকে অজান্তে বা দালালের মাধ্যমে ভিন্ন নাম, জন্ম তারিখ বা অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করে পাসপোর্ট ইস্যু করেন। এই তথ্যগুলো সিস্টেমে আলাদাভাবে সংরক্ষিত হয়।
- পুরোনো পাসপোর্ট বাতিল না করা: পাসপোর্ট নবায়নের সময় পুরোনো পাসপোর্ট বাতিল না হলে তা সিস্টেমে সক্রিয় থাকতে পারে।
- অঘোষিত পাসপোর্ট: কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তি অজান্তে বা ইচ্ছাকৃতভাবে পুরোনো পাসপোর্টের তথ্য গোপন করেন, যা পরবর্তীতে সমস্যা সৃষ্টি করে।
- দালালের প্রভাব: অসাধু দালালরা ভুল তথ্য বা জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্ট ইস্যু করতে পারে, যা মাল্টিপল পাসপোর্টের সমস্যা তৈরি করে।
(৩) মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট হলে কি সমস্যা হয়?
মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যা পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়ায় গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করে। এর কিছু প্রভাব নিম্নরূপ-
- আবেদন বাতিল: ই-পাসপোর্ট আবেদনের সময় বায়োমেট্রিক ডাটা (যেমন ফিঙ্গারপ্রিন্ট) পুরোনো পাসপোর্টের তথ্যের সঙ্গে মিলে গেলে আবেদনটি আবিস রিজেক্টেড দেখায়।
- বিলম্ব: সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করা সম্ভব হয় না, যা প্রবাসীদের জন্য সময়সাপেক্ষ।
- আইনি জটিলতা: ভিন্ন নাম বা তথ্যে পাসপোর্ট ইস্যু করা আইনি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
(৪) কীভাবে মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যা শনাক্ত করবেন?
যদি কেউ মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যায় পড়েন, তবে তিনি নিম্নলিখিত উপায়ে তা শনাক্ত করতে পারেন-
ই-পাসপোর্ট স্ট্যাটাস চেক
ই-পাসপোর্ট আবেদনের স্ট্যাটাস চেক করা যায় ই-পাসপোর্ট সিস্টেমের মাধ্যমে। আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদনকারী একটি ডেলিভারি স্লিপ পান, যেখানে একটি ইউনিক নম্বর থাকে। ইতালির রোম দূতাবাসের ক্ষেত্রে এই নম্বরটি সাধারণত ‘IT’ দিয়ে শুরু হয়। এই নম্বর ব্যবহার করে সিস্টেমে স্ট্যাটাস চেক করা যায়।
- যদি স্ট্যাটাসে ‘লোকাল রিওয়ার্ক’ (Local Rework) দেখায়, তবে সম্ভাবনা থাকে যে মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যা রয়েছে।
- লোকাল রিওয়ার্ক অন্য কারণেও হতে পারে, যেমন ভুল ডকুমেন্ট বা তথ্যের ঘাটতি। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি মাল্টিপল পাসপোর্টের কারণে হয়।
ইমেইল নোটিফিকেশন
আবেদনের সময় সঠিক ইমেইল ঠিকানা প্রদান করলে, সিস্টেম থেকে নোটিফিকেশন পাওয়া যায়। আবেদনকারীদের পরামর্শ দেওয়া হয় যে, আবেদন জমা দেওয়ার পর প্রতি দুই-তিন দিন অন্তর ইমেইল চেক করা উচিত। এতে সমস্যার বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।
(৫) মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যার সমাধান
মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যা সমাধানের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে-
১. দূতাবাসে যোগাযোগ
যদি সিস্টেমে ‘লোকাল রিওয়ার্ক’ দেখায়, তবে আবেদনকারীকে দূতাবাসে যোগাযোগ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে নতুন কোনো এপয়েন্টমেন্টের প্রয়োজন নেই। ডেলিভারি স্লিপ নিয়ে দূতাবাসের অফিস খোলা থাকা দিনে যেকোনো সময় যোগাযোগ করা যায়।
২. অঙ্গীকারনামা জমা দেওয়া
আবেদনকারীকে একটি অঙ্গীকারনামা ফর্ম পূরণ করে দূতাবাসে জমা দিতে হবে। এই ফর্মটি দূতাবাসের পাসপোর্ট কাউন্টারে পাওয়া যায় অথবা দূতাবাসের ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করা যায়।
ফর্ম পূরণের নিয়ম হলো-
- ফর্মটি ইংরেজিতে বড় হাতের অক্ষরে পূরণ করতে হবে।
- উপরের অংশে সর্বশেষ পাসপোর্ট আবেদনের তথ্য দিতে হবে।
- ফর্মের মাঝের অংশে অঘোষিত বা গোপন পাসপোর্টের তথ্য (নম্বর, নাম, জন্ম তারিখ) দিতে হবে। যদি একাধিক অঘোষিত পাসপোর্ট থাকে, তবে প্রতিটির জন্য আলাদা ছক পূরণ করতে হবে।
- নিচের অংশে বর্তমানে ব্যবহৃত পাসপোর্টের তথ্য এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা অনলাইন জন্ম নিবন্ধনের তথ্য দিতে হবে।
- ফর্মের নিচে স্বাক্ষর, মোবাইল নম্বর এবং ইমেইল ঠিকানা (যদি থাকে) উল্লেখ করতে হবে।
৩. জিডি বা লস রিপোর্ট
যদি অঘোষিত পাসপোর্টটি আবেদনকারীর হাতে না থাকে, তবে তাকে সেই পাসপোর্টের জন্য একটি জিডি (General Diary) বা লস রিপোর্ট দাখিল করতে হবে।
- বাংলাদেশে জিডি: যদি পাসপোর্টটি বাংলাদেশে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তবে অনলাইনে জিডি কপি জমা দেওয়া যায়।
- ইতালিতে লস রিপোর্ট: যদি পাসপোর্টটি ইতালিতে ব্যবহৃত হয়, তবে ইতালিয়ান কোস্তুরা (পুলিশ স্টেশন) থেকে লস রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে।
এই অঙ্গীকারনামা এবং জিডি/লস রিপোর্ট দূতাবাসের পাসপোর্ট কাউন্টারে জমা দিতে হবে।
৪. পাসপোর্ট হেডকোয়ার্টারে প্রক্রিয়াকরণ
অঙ্গীকারনামা এবং জিডি/লস রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর দূতাবাস পাসপোর্ট হেডকোয়ার্টারে একটি পত্র পাঠায়। এই পত্রে অঘোষিত পাসপোর্ট বাতিলের অনুরোধ করা হয়। পাসপোর্ট হেডকোয়ার্টার তখন স্থানীয় স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এর মাধ্যমে তদন্ত করে।
তদন্ত প্রক্রিয়া, সাধারনত এমন হয় যে-
- এসবি স্থানীয়ভাবে তথ্য যাচাই করে এবং একটি রিপোর্ট প্রেরণ করে।
- যদি রিপোর্টে বর্তমান আবেদন সঠিক বলে প্রমাণিত হয় এবং পুরোনো পাসপোর্ট অঘোষিত বলে নিশ্চিত হয়, তবে হেডকোয়ার্টার পুরোনো পাসপোর্ট বাতিল করে এবং নতুন আবেদন প্রক্রিয়াকরণের অনুমতি দেয়।
- এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ম্যানুয়ালি সম্পন্ন হয়, এবং এতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
৫. আবেদন পুনঃসাবমিট
হেডকোয়ার্টার থেকে অনুমোদন পাওয়ার পর দূতাবাস আবেদনটি ই-পাসপোর্ট সিস্টেমে পুনঃসাবমিট করে। এরপর আবেদনটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ইস্যু করা হয়।
মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যা সমাধানে সময় লাগতে পারে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস। এটি নির্ভর করে তদন্ত প্রক্রিয়া এবং হেডকোয়ার্টারের প্রতিক্রিয়ার উপর। আবেদনকারীদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে, কারণ দূতাবাসের এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ কম।
(৬) কীভাবে মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যা থেকে বাঁচা যায়?
মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যা এড়াতে নিম্নলিখিত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত-
- সঠিক তথ্য প্রদান: পাসপোর্ট আবেদনের সময় সঠিক নাম, জন্ম তারিখ এবং এনআইডি/জন্ম নিবন্ধন তথ্য ব্যবহার করুন।
- দালাল এড়িয়ে চলুন: অসাধু দালালদের মাধ্যমে পাসপোর্ট ইস্যু করা থেকে বিরত থাকুন। সরাসরি দূতাবাস বা পাসপোর্ট অফিসে আবেদন করুন।
- পুরোনো পাসপোর্ট বাতিল: নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করার আগে পুরোনো পাসপোর্ট বাতিল করা নিশ্চিত করুন।
- নিয়মিত স্ট্যাটাস চেক: আবেদন জমা দেওয়ার পর নিয়মিত স্ট্যাটাস চেক করুন এবং ইমেইল নোটিফিকেশন মনোযোগ দিয়ে দেখুন।
(৭) প্রবাসীদের জন্য পরামর্শ
ইতালি প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য এই সমস্যা সমাধানে দূতাবাসের পাসপোর্ট এবং ভিসা উইং সর্বদা সহায়তা প্রদান করে। তবে, আবেদনকারীদের নিজেদের সচেতনতা এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যা এড়ানো সম্ভব।
- দূতাবাসের ওয়েবসাইট নিয়মিত চেক করুন।
- সঠিক ডকুমেন্ট সংগ্রহ করুন এবং সময়মতো জমা দিন।
- কোনো সমস্যা হলে দ্রুত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
(৮) উপসংহার
মাল্টিপল একটিভ পাসপোর্ট সমস্যা একটি জটিল ইস্যু, তবে সঠিক পদক্ষেপ এবং দূতাবাসের সহায়তায় এটি সমাধান করা সম্ভব। আবেদনকারীদের সচেতনতা, সঠিক তথ্য প্রদান এবং সময়মতো পদক্ষেপ এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে সহায়ক। এই ব্লগ পোস্টে আমরা এই সমস্যার বিস্তারিত বিবরণ, সমাধান প্রক্রিয়া এবং প্রতিরোধের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছি। আশা করি, এই তথ্য প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য উপকারী হবে।









